মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে সমাজ ও আধিপত্য: অর্থ, ক্ষমতা ও কাঠামোগত শোষণের ব্যবচ্ছেদ

বাংলা কথাসাহিত্যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯০৮–১৯৫৬) একমাত্র ঔপন্যাসিক, যিনি মধ্যবিত্তীয় ভাবালুতা বা আবেগপ্রবণ নীতিবোধের আড়াল সরিয়ে সমাজের বাস্তব রূপকে নির্মোহভাবে উন্মোচিত করেছেন। তাঁর উপন্যাস সাহিত্যিক কল্পনার ফসল হলেও তার প্রতিটি ইট-পাথর নির্মিত হয়েছে সামাজিক বাস্তবতার কঠিন উপাদানে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সৃষ্টিজগতে সমাজ কোনো নিশ্চল পটভূমি নয়; বরং তা এক ক্রমাগত দ্বান্দ্বিক ক্ষেত্র, যেখানে টাকা, ক্ষমতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাবের জোর প্রতিষ্ঠা পায় ‘আধিপত্য’ (Hegemony)।

শ্রেণিবিভক্ত সমাজে অর্থই যে সমস্ত সামাজিক মান-সম্মান, ক্ষমতা এবং আধিপত্যের একমাত্র মাপকাঠি—এই রূঢ় সত্যটি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় অত্যন্ত সুনিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। যার হাতে পুঁজি বা সম্পত্তি রয়েছে, সেই সমাজকে চালনা করে; আর যার কাছে অর্থ নেই, সে পরিণত হয় কেবল আজ্ঞাবহ দাসে। এই সামাজিক কাঠামোর ভেতর অর্থনৈতিক অবস্থান কীভাবে মানুষের ব্যক্তিসত্তা, মনস্তত্ত্ব এবং চরিত্রকে নিয়ন্ত্রিত করে, তা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে এক বৈজ্ঞানিক সত্যের মতো উদ্ভাসিত হয়েছে।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস সমাজ আধিপত্য

সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপ:

  • মূল প্রতিপাদ্য: মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসসমূহে (বিশেষত ‘জননী’, ‘শহরতলী’, ‘অহিংসা’, ‘জীবনের জটিলতা’) অর্থ ও সম্পত্তিকে সামাজিক আধিপত্যের প্রাথমিক উৎস হিসেবে দেখানো হয়েছে।
  • আধিপত্যের ধরন: আধিপত্য কেবল একক কোনো রূপ নিয়ে আসে না; তা কখনো পারিবারিক পর্যায়ে প্রবীণ শাশুড়ির কর্তৃত্ব, কখনো শিল্পাঞ্চলে ধনকুবেরের স্বৈরাচার, আবার কখনো আশ্রমের পবিত্র আড়ালে সামন্ততান্ত্রিক নিগড় হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
  • সামাজিক প্রভাব: প্রচারমাধ্যম (সংবাদপত্র), চিকিৎসা ব্যবস্থা, ক্লাব-লাইব্রেরি এমনকি ব্যক্তিগত সম্পর্কগুলোকেও পুঁজির জোরে কিনে রাখা বা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব—মানিক এ সত্যকে নগ্নভাবে উদ্ভাসিত করেছেন।

Table of Contents

পারিবারিক অণু-বিশ্বে বিত্তের আধিপত্য: ‘জননী’ ও গৃহস্থালি শোষণ

সামাজিক আধিপত্যের প্রাথমিক মহড়া শুরু হয় পরিবারের অণু-কাঠামোয়। পরিবারকে আমরা প্রথাগতভাবে ভালোবাসার নিরাপদ আশ্রয় ভাবলেও, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় দেখিয়েছেন অর্থনৈতিক অসমতা কীভাবে গৃহস্থালি পরিবেশকেও শোষণের কেন্দ্রে পরিণত করে। ‘জননী’ (১৯৩৫) উপন্যাসে বিত্তশালীদের আচরণ এবং দরিদ্রের ওপর তাদের প্রচ্ছন্ন বা প্রত্যক্ষ নিপীড়ন অত্যন্ত তীক্ষ্ণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

অর্থ এবং পারিবারিক মর্যাদার সমীকরণ

‘জননী’ উপন্যাসে টাকা ছাড়া যে সম্মান মেলে না, তার প্রমাণ প্রতিটি মোড়ে। বিষ্ণুপ্রিয়াদের ধনাঢ্য সামাজিক অবস্থান তাদের শ্যামাদের মতো দরিদ্র স্বজনদের প্রতি অবহেলা ও তুচ্ছতাচ্ছিল্য প্রদর্শন করতে প্ররোচিত করে। ঠিক একইভাবে মন্দা নিজের বৈষয়িক সচ্ছলতার জোর প্রকাশ করে শ্যামা কিংবা নিজের সতীন সুপ্রভার ওপর। পরিবারের অভ্যন্তরে এই যে কর্তৃত্ব বিস্তার, তার মূলে কোনো নীতিগত বা বয়সজনিত শ্রেষ্ঠত্ব নেই—আছে কেবল টাকার দম্ভ।

প্রবীণত্ব বনাম অর্থসম্পদ: বকুলের শ্বশুরালয়ের চিত্র

বকুলের শ্বশুরবাড়িতে পিসশাশুড়ির যে অনিয়ন্ত্রিত প্রভাব, তার উৎস তাঁর প্রবীণ বয়স নয়, বরং তাঁর হাতে থাকা নগদ টাকা ও সম্পত্তি। পিসশাশুড়ির কথায় সবাই ওঠে আর বসে। তাঁর ভয়ে ছোট-বড় কেউ টু শব্দ পর্যন্ত করতে পারে না। তুচ্ছ কারণে বকুলের হাতের শাখা ভেঙে গেলে পিসশাশুড়ি তাকে ‘অলক্ষ্মী’, ‘বজ্জাত’ বলে গালিগালাজ করে, যা কেবল এক প্রবীণ নারীর মানসিক কদর্যতা নয়, বরং অর্থজোর থেকে আসা মানসিক আধিপত্যের নগ্ন রূপ।

বকুলের জবানীতেই এই সামাজিক বাস্তবতার স্বরূপ প্রকাশ পায়, যখন সে শ্যামাকে এসে বলে:

“ঘরদোর তার কিনা সব, নগদ টাকা আর সম্পত্তিও নাকি অনেক আছে শুনলাম, তাইতো সবাই তাকে মেনে চলে। বুড়ির ভয়ে কেউ জোরে কথাটি কয় না মা।” (১ম খণ্ড, পৃ. ৯৫)

এই উক্তিটি প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষের কাছে আনুগত্য আদায় করার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো সম্পত্তি। নগদ টাকা ও ঘরদোরের মালিকানা বুড়িকে এক ধরনের অলিখিত ‘স্বৈরাচারী শাসক’-এর আসনে বসিয়েছে।

 

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস সমাজ আধিপত্য

 

 

‘শহরতলী’: পুঁজিবাদী দানব ও সত্যপ্রিয় চরিত্রের স্বৈরাচারী আধিপত্য

যদি ‘জননী’ উপন্যাসে আধিপত্যের রূপটি পারিবারিক পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে ‘শহরতলী’ (১৯৪০) উপন্যাসে তা এক বিরাট পুঁজিবাদী সামাজিক কাঠামোর আকার ধারণ করে। এই উপন্যাসের ‘সত্যপ্রিয়’ চরিত্রটি হলো উদীয়মান শিল্পপুঁজি ও স্বৈরাচারী আধিপত্যের এক মহাকাব্যিক প্রতিরূপ।

                                [সত্যপ্রিয়র সর্বগ্রাসী আধিপত্যের চক্র]
                                                 |
         +---------------------------------------+---------------------------------------+
         |                                       |                                       |
[অর্থনৈতিক ক্ষমতা]                        [প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ]                  [ব্যক্তিগত ও সামাজিক নিগড়]
         |                                       |                                       |
- মিলের কুলি-মজুর শোষণ                  - ক্লাবের সভাপতিত্ব ক্রয়                     - অপরাজিতার ডাক্তারকে হুমকি
- সম্পত্তি গ্রাস (যশোদার বাড়ি)          - সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন-ঘুষ                      - "সোনার ওজনে" জামাই ক্রয়

শ্রেণী-অহংকার ও আত্মবিশ্বাসের দম্ভ

সত্যপ্রিয় কেবল ধনী নয়, সে জানে কীভাবে টাকা দিয়ে মানুষের স্বাভাবিক প্রতিবাদের আত্মবিশ্বাসকে গুঁড়িয়ে দিতে হয়। মেসের চালিকাশক্তি যশোদা যখন সত্যপ্রিয়র মেয়েকে তার বেয়াদবির জন্য শাসন করে, তখন সত্যপ্রিয় অবাক হয়ে যায়। কোনো সাধারণ মানুষ যে তার মেয়েকে কটু কথা বলার সাহস দেখাতে পারে, তা সত্যপ্রিয়র শ্রেণী-মানসিকতার বাইরে। সে যশোদাকে ডেকে অত্যন্ত ধীর অথচ অহংকারী কণ্ঠে বলে:

“শুনলাম বেয়াদবির জন্য নাকি মেয়েকে ধমক দিয়াছ? […] আমার বাড়িতে আমার মেয়েকে অমন করে বলবার সাহস কারও হতে পারে, ভাবতেও পারিনি যশোদা।” (৩য় খণ্ড, পৃ. ১৭৮)

যশোদা এর প্রতিবাদ করে সাধারণ যৌক্তিকতা দিয়ে বোঝাতে চেয়েছিল যে, ছোটমানুষের দোষ ধরিয়ে দেওয়ার মধ্যে সাহসের কিছু নেই। কিন্তু শ্রেণী-বিভক্ত সমাজে সত্যপ্রিয়র অবস্থান এত উঁচুতে যে, সাধারণ যুক্তির সেখানে কোনো স্থান নেই। সে নিজেই নিজের আধিপত্যের ব্যাপ্তি স্বীকার করে বলে:

“আমার চাকরবাকরের দোষ দেখিয়ে দেবার সাহস পর্যন্ত অনেকের হয়না। যাদের কোনোদিন একটি পয়সা পাবার ভরসা নেই যারা চায়ও না একটি পয়সা, তারা পর্যন্ত ভয়ে মরে আমি পাছে চটে যাই।” (৩য় খণ্ড, পৃ. ১৯৮)

এই বক্তব্যটি চরম সত্য। সত্যপ্রিয়র আধিপত্য সুদূরপ্রসারী—মিলের সাধারণ কুলি-মজুর, আশ্রিত আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী, মারাঠি-ইংরেজ কর্মকর্তা, এমনকি সমাজের বুদ্ধিমান ও তথাকথিত ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণীও তার ভয়ে তটস্থ থাকে। সে এক অদৃশ্য ভীতি সঞ্চার করে পুরো শহরকে নিজের বশে রাখে।

সামাজিক প্রতিষ্ঠান দখল: ক্লাব, সংবাদপত্র ও জনমত নির্মাণ

আধিপত্য টিকিয়ে রাখার জন্য আধুনিক পুঁজিবাদ কীভাবে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কিনে নেয়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তা ‘শহরতলী’ উপন্যাসে নিখুঁতভাবে দেখিয়েছেন। সত্যপ্রিয় তার নাম ও খ্যাতি চারদিকে ছড়ানোর জন্য একটি আলাদা ‘প্রচার বিভাগ’ খোলে।

  • ক্লাব ও লাইব্রেরি দখল: ‘মডার্ন ক্লাব ও লাইব্রেরি’র প্রতিষ্ঠা দিবসে পাঁচশত টাকা চাঁদা দিয়ে সে এক রাতেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়। চাঁদার প্রভাবে সে ক্লাবে নিজের রচিত অদ্ভুত, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও প্রতিক্রিয়াশীল প্রবন্ধ পাঠ করতে সবাইকে বাধ্য করে।
  • সংবাদপত্র ও সম্পাদকদের কেনা: সাময়িকপত্রগুলোতে নিজের অসামঞ্জস্যপূর্ণ প্রবন্ধ ও বক্তৃতা ছাপানোর জন্য সে বিজ্ঞাপনের টোপ ব্যবহার করে। যেসব সম্পাদক সচেতনতার খাতিরে সেই লেখা ছাপাতে চান না, তাদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা হয়। জ্যোতির্ময় অন্য সম্পাদকদের অনুনয় করে বলে:
“মুশকিল হয়েছে কী জানেন, লেখাটা না ছাপলে উনি হয়তো চটে যাবেন, বিজ্ঞাপনের কনট্রাক্টটা—একটু হাসে জ্যোতির্ময়, বোঝেন তো সব।” (৩য় খণ্ড, পৃ. ১৪৯)

তবে সব সংবাদপত্র বিকিয়ে যায় না। কিছু প্রগতিশীল ও বিবেকবান সংবাদপত্র সত্যপ্রিয়র এই টাকার গরম ও উদ্ভট তত্ত্বের বিরুদ্ধে তোপ দাগে। তারা প্রশ্ন তোলে:

“দেশের জন্য যাঁরা জীবন উৎসর্গ করেছেন, অর্ধেক জীবন জেলে কাটিয়েছেন, তাঁরা সবাই ভুল করে দেশকে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন সর্বনাশের দিকে, আর টাকার গদিতে শুয়ে আপনার পাগলা জগাই আবিষ্কার করেছেন দেশোদ্ধারের একমাত্র উপায়। দু-জায়গায় লিখেছেন, গভর্নমেন্টের সঙ্গে বিবাদ করা অন্যায়, আর এক জায়গায় লিখেছেন, প্রকৃতির নিয়মে যখন যে জাতি রাজপদে অধিষ্ঠান করে তাদের প্রাপ্য রাজসম্মান না দিলে দেশের কখনও উন্নতি হবে না! রাজার জাতিকে রাজসম্মান দিতে থাকলে প্রকৃতির নিয়মে আমরা একদিন নিজেরাই রাজার জাত হতে পারব, নয় তো কোনোদিন পারব না। এ সব কোন দেশি কথা মশাই?” (৩য় খণ্ড, পৃ. ১৪৯)

এই পংক্তিগুলোর মধ্য দিয়ে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় পুঁজিবাদের সেই কদর্য চেহারাকে উন্মোচিত করেছেন, যেখানে ধনাঢ্য ব্যক্তিরা নিজেদের শোষকশ্রেণী ও উপনিবেশক রাজশক্তিকে তুষ্ট রাখার দর্শনকে ‘জাতীয় উন্নতি’ বলে চালিয়ে দিতে চায়।

প্রতিষ্ঠান ও শোষণের প্রাতিষ্ঠানিক কৌশল
শোষণের মাধ্যম সত্যপ্রিয়র ব্যবহৃত কৌশল ভুক্তভোগী শ্রেণী মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক ফলাফল
সাংস্কৃতিক ক্লাব মোটা অঙ্কের চাঁদা (৫০০ টাকা) দিয়ে সভাপতি পদ লাভ সাধারণ নাগরিক ও যুবক সমাজ কায়েমি স্বার্থের মতামতকে ‘আদর্শ’ হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া
সংবাদপত্র/মিডিয়া বিজ্ঞাপনের চুক্তি বাতিল করার গোপন হুমকি সম্পাদক ও সাংবাদিকবৃন্দ সত্য উন্মোচনে বাধা ও মিথ্যা প্রচারের প্রসার
চিকিৎসা খাত গম্ভীর ব্যক্তিত্ব ও সামাজিক ক্ষমতার মনস্তাত্ত্বিক ভয় অপরাজিতা ও উপস্থিত চিকিৎসক জীবনের ঝুঁকি সত্ত্বেও প্রতিবাদের ক্ষমতা হরণ
নগরায়ন ও রিয়েল এস্টেট পৌরসভা ও প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার যশোদার মতো স্বাধীন নিম্নবিত্ত জোরপূর্বক ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ

জীবন নিয়ে খেলা: চিকিৎসার ওপর ক্ষমতার থাবা

অর্থের অহংকার সত্যপ্রিয়কে এতটাই নিষ্ঠুর করে তোলে যে, মানুষের জীবন-মৃত্যুর সিদ্ধান্তও সে নিজের হাতে নিতে দ্বিধা করে না। তার মেয়ের বিয়েতে অপরাজিতা নামের এক নিমন্ত্রিত নারী হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে। উপস্থিত দুইজন চিকিৎসক তাকে পরীক্ষা করেন। তরুণ ডাক্তারটি স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিলেন যে, অপরাজিতাকে এই মুহূর্তে নড়াচড়া করালে তার জীবন বিপন্ন হতে পারে; তাই তাকে হাসপাতালে পাঠানোর জন্য অ্যাম্বুলেন্স ডাকা দরকার।

কিন্তু সত্যপ্রিয় উৎসবের মেজাজে কোনো গোলমাল বা মৃত্যুচিন্তার আঁচ লাগতে দিতে চায় না। সে ডাক্তারদের কথার ওপর কৌশলগত ও মানসিক চাপ সৃষ্টি করে। কমবয়সী ডাক্তারটি যখন কিছু বলতে উদ্যত হয়, তখন সত্যপ্রিয় তাকে থামিয়ে দেয়:

“পরম ধৈর্যের ভঙ্গিতে তার মুখের দিকে একদৃষ্টে চাহিয়া থাকিয়া শান্তকণ্ঠে বলিল, বলুন? বলুন, আপনি কী বলছেন?” (৩য় খণ্ড, পৃ. ১৯৭)

সত্যপ্রিয়র সেই হিংস্র, শান্ত ও ক্ষমতাশালী দৃষ্টির সামনে তরুণ ডাক্তারের সমস্ত পেশাগত নীতি ও সত্য বলার সাহস নিমেষে উবে যায়। অপরাজিতাকে সেই মুমূর্ষু অবস্থায় গাড়িতে তুলে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এটি কেবল একজন ডাক্তারের মুখ বন্ধ করা নয়, বরং অর্থের জোরে একটি মানবজীবনকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়ার এক ভয়াবহ নিদর্শন।

অর্থনৈতিক ক্ষমতা দিয়ে গৃহ ও সম্পর্ক দখল

সত্যপ্রিয় তার মেয়ের জন্য সুন্দর বর খুঁজে আনে না, বরং টাকা দিয়ে জামাই কিনে আনে। লেখক যথার্থই লিখেছেন—“যেন সোনার ওজনে সোনার পুতুলই সত্যপ্রিয় কিনিয়া আনিয়াছে মেয়ের জন্য।” (৩য় খণ্ড, পৃ. ২৪১)

এমনকি যশোদা যখন নিজের ভিটেমাটি কোনো অবস্থাতেই সত্যপ্রিয়র কাছে বিক্রি করতে রাজি হয় না, তখন সে প্রশাসনিক ও পৌরসভার ক্ষমতা ব্যবহার করে যশোদার বাড়ির ওপর দিয়ে নতুন রাস্তা তৈরির সরকারি নোটিশ পাঠায়। শেষ পর্যন্ত বাড়ি বিক্রি করা ছাড়া যশোদার আর কোনো গতি থাকে না। পুঁজি কীভাবে প্রশাসনিক কলকাঠি নেড়ে দরিদ্রের শেষ আশ্রয়টুকু কেড়ে নেয়, যশোদার ট্র্যাজেডি তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ।

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস সমাজ আধিপত্য

‘অহিংসা’: ধর্মের ছদ্মবেশে সামন্ততান্ত্রিক ও আধ্যাত্মিক আধিপত্য

অর্থনৈতিক শোষণের পাশাপাশি সমাজ ব্যবস্থার আরেকটি বড় হাতিয়ার হলো ধর্মীয় ও অলৌকিকতার আধিপত্য। ‘অহিংসা’ (১৯৪১) উপন্যাসে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় দেখিয়েছেন, কীভাবে ভণ্ড সাধুতা ও আশ্রমি কাঠামোর আড়ালে তীব্র ব্যক্তিস্বার্থ ও মনস্তাত্ত্বিক দাসত্ব তৈরি করা হয়।

বিপিনের অদৃশ্য স্বৈরাচার ও চরম অবদমন

সদানন্দের আশ্রমটি প্রথাগতভাবে ধর্মের কেন্দ্র হলেও, তার প্রকৃত মালিক ও নিয়ন্ত্রক হলো বিপিন। বিপিনের কাছে আশ্রমটি একটি ব্যবসায়িক ও ক্ষমতার ক্ষেত্র। তাই আশ্রমের ভেতরের ন্যায়-অন্যায় বা নীতি-নৈতিকতা বিপিনের খেয়ালখুশির ওপর নির্ভর করে।

বিপিনের কামজ দৃষ্টি ও যৌন লালসার শিকার হয় আশ্রমে আসা নারীরা। রত্নাবলী নামের তরুণী যখন বিপিনের উপস্থিতি ও আচরণের উদ্দেশ্য বুঝতে পারে, তখন সে ভয়ে শিউরে ওঠে। কিন্তু সামাজিক ক্ষমতার কাঠামোটাই এমন যে, অপরাধী বিপিন হলেও বলির পাঁঠা হতে হবে রত্নাবলীকেই। রত্নাবলীর অবচেতন মনের অনুভূতির বর্ণনায় মানিক লিখছেন:

“বুঝিতেও পারে যে দোষ আগাগোড়া বিপিনের, তবু বিপিনের একটুকু আসিয়া যাইবে না—বিপিনের কিছু হইবে না, বিপদে পড়িবে সে। সে যদি গোলমাল করে, সকলে তাহাকেই দোষ দিবে। বিপিন যদি তাহাকে হাত ধরিয়া টানিয়া লইয়া যায়, কেহ তাহাকে বাঁচাইতে আসিবে না, মারা পড়িবে সেই।” (৩য় খণ্ড, পৃ. ৩১৮)

এই চিন্তা নির্দেশ করে যে, একটি অবদমিত সমাজে শোষিত নারী ভালো করেই জানে শোষকের সামাজিক শক্তিমত্তা কতটা গভীরে প্রোথিত।

গুরুত্বপূর্ণ নোট

‘অহিংসা’ উপন্যাসে বিপিনের আধিপত্য কেবল বস্তুগত নয়; তা গভীর মনস্তাত্ত্বিক ভীতিভিত্তিক। শোষিত ব্যক্তি অপরাধ না করেও অপরাধবোধে ভোগে, কারণ শোষকের হাতে রয়েছে সামাজিক স্বীকৃতি ও ক্ষমতার চাবিকাঠি।

ধর্মীয় ব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র: সীতা ও কল্যাণীর ঘটনা

বিপিনের কায়েমী স্বার্থের সামান্যতম ক্ষতি বা বাধা হলে সে মানুষকে অনায়াসে নিশ্চিহ্ন বা বিতাড়িত করে। সীতা নামের এক শিষ্যা যখন বিপিনের লালসার কারণে আশ্রমে থাকতে অপারগতা প্রকাশ করে, তখন বিপিন নাটক সাজিয়ে সবাইকে বলে সীতা নাকি নিজে বিদায় নিচ্ছে। অথচ সীতা জানিয়েছিল, তার স্বামীকে বাইরে কাজে পাঠিয়ে বিপিন তাকে অন্যায়ভাবে তাড়িয়ে দিচ্ছে। এর কয়েকদিন পরেই সীতা রহস্যজনকভাবে ‘উধাও’ হয়ে যায়। আশ্রমে কেউ এই রহস্যের তদন্ত করার সাহস দেখায়নি।

একইভাবে শান্তিকামী, স্বাধীনচেতা কল্যাণী ও তার বাবাকে বিপিন মাত্র এক ঘণ্টার নোটিশে আশ্রম থেকে তাড়িয়ে দেয়। কারণ কল্যাণীর বাবা বিপিনের সব অন্যায় হুকুম মেনে নিচ্ছিলেন না। উপন্যাসে বর্ণনা করা হয়েছে:

“কল্যাণীর বাবার মতো রূপবান পুরুষ রত্নাবলী কখনো দ্যাখে নাই। শান্তির খোঁজে ভদ্রলোক সদানন্দের আশ্রমে আসিয়াছিল, কিন্তু একটু স্বাধীন প্রকৃতির মানুষ হওয়ায় বিপিনের সঙ্গে ক্রমাগত খিটিমিটি বাধিয়া অশান্তির সৃষ্টি হইতেছিল। মানুষটাকে সকলেই পছন্দ করিত, মেয়েকে সঙ্গে করিয়া আবার সংসারে ফিরিয়া যাইতেছে জানিয়া সকলের দুঃখও হইয়াছিল, আনন্দও হইয়াছিল, কিন্তু ঘটনার সীতা-সংক্রান্ত আকস্মিক পরিণতিতে সকলে থতোমতো খাইয়া গিয়াছিল।” (৩য় খণ্ড, পৃ. ৩১৭)

গুরু-শিষ্যের কৃত্রিম সম্পর্ক ও ক্ষমতার রাশ

আশ্রমে যে গুরু সদানন্দকে সবাই অবতার মনে করে পূজা করে, সে নিজেও মূলত বিপিনের হাতের পুতুল। সদানন্দ যদি কখনো বিপিনের পছন্দের বাইরে গিয়ে নিজস্ব সিদ্ধান্ত নিতে চায়, তবে বিপিন তাকে ক্ষণিকের মধ্যেই তার প্রকৃত অবস্থান মনে করিয়ে দেয়:

“আগে যেমন সব বিষয়ে আমার কথা শুনে চলতিস তেমনিভাবে যদি না চলিস, তোকে দিয়ে আমার কাজ হবে না।” (৩য় খণ্ড, পৃ. ৩৩৮)

অন্যদিকে, মহেশ চৌধুরী সদানন্দকে তিনবেলা পরম ভক্তিভরে প্রণাম করলেও, সদানন্দ যখন মহেশ চৌধুরীর বাড়িতে গিয়ে অবস্থান করা শুরু করে, তখন ভক্তির রূপ বদলে যেতে থাকে। মহেশ চৌধুরী আধ্যাত্মিক আলোচনার নামে গুরু সদানন্দকেই উপদেশ দেওয়া শুরু করে। ধীরে ধীরে তার হাত জোড় করার প্রবণতা কমে যায়, সমীহ কমে আসে। অর্থাৎ, আশ্রয়দাতা বা বিত্তবান গৃহস্থের ভূমিকার কারণে ভক্তির ওপর অর্থনৈতিক ও সামাজিক কর্তৃত্ব প্রাধান্য পায়।

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস সমাজ আধিপত্য

 

সমাজতাত্ত্বিক মূল্যায়ন: মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গি ও শ্রেণিসংগ্রামের আলোকপাত

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় যখন এই উপন্যাসগুলো রচনা করছিলেন, তখন তিনি কমিউনিস্ট পার্টিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেননি (যোগদান ১৯৪৪)। তবে তাঁর বিজ্ঞানমনস্ক পর্যবেক্ষণ ও সমাজভাবনা তাকে সমাজতন্ত্র ও দ্বান্দ্বিক বাস্তবতাবাদের দিকে ধাবিত করেছিল।

মানুষের অন্তর্লোকের ওপর অর্থনীতির প্রভাব

‘শহরতলী’ উপন্যাসে এসে মানিক স্পষ্টতই অনুধাবন করেছিলেন যে, মানুষের মনস্তত্ত্ব, যৌনতা বা নৈতিকতার চেয়েও বড় চালিকাশক্তি হলো তার অর্থনৈতিক অবস্থান। বিশিষ্ট সাহিত্য সমালোচক ও সমাজবিজ্ঞানী বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই সমাজবীক্ষণ সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন:

“[… …] তাঁর স্মৃতি চেতনা এবং মনে সক্রিয়ভাবে কাজ করেছে নির্যাতন এবং নির্যাতিতদের প্রতিবাদী এবং প্রতিরোধী ঐতিহ্য, তাঁর কাজে এ সকলের উদ্বোধন ঘটেছে।”

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বিশ্বাস করতেন, সমাজে যারা শোষণ চালায়—তারা আকাশ থেকে পড়ে না; বরং প্রচলিত অর্থনীতিই তাদের এই স্বৈরাচারী মানসিকতা গড়ে তোলে। টাকার জোরে নগেন প্রমীলার আবেগ নিয়ে ছিনিমিনি খেলে তাকে ছুড়ে ফেলে দিতে পারে, কিংবা সচ্ছলতার কারণে বিষ্ণুপ্রিয়া শ্যামাকে তুচ্ছ ভাবতে পারে।

[অর্থনৈতিক ভিত্তি (Economic Base)] 
       │ 
       ├───> রূপান্তর ঘটিয়ে নির্ধারণ করে ───> [উপরি কাঠামো (Superstructure)]
                                                     │
                                                     ├── সমাজনীতি ও মূল্যবোধ
                                                     ├── ব্যক্তিসম্পর্ক ও পরিবার
                                                     └── মিডিয়া, চিকিৎসা ও ধর্মীয় আশ্রম

শোষণ ও প্রতিরোধের দ্বান্দ্বিক সহাবস্থান

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কেবল শোষকদের অত্যাচার দেখিয়ে ক্ষান্ত হননি; তিনি দেখিয়েছেন যে এই আধিপত্য চিরস্থায়ী নয়। সত্যপ্রিয়র সমস্ত টাকাপয়সা সত্ত্বেও যশোদা বা শ্রমজীবী মানুষের ভেতরের নৈতিক দৃঢ়তাকে সে পুরোপুরি ধ্বংস করতে পারে না। শোষিতের মনে জমা হওয়া ক্ষোভই পরবর্তীতে প্রতিরোধের স্ফুলিঙ্গ হিসেবে কাজ করে।

পরামর্শ:

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস পড়ার সময় কেবল চরিত্রগুলোর সামাজিক সংলাপের ওপর নির্ভর না করে, তাদের আর্থিক লেনদেন, বাড়িঘরের মালিকানা এবং অর্থনৈতিক নির্ভরতার সম্পর্কগুলোর দিকে চোখ রাখুন। এগুলোই চরিত্রের আচরণের প্রকৃত রহস্য উন্মোচন করে।

সাধারণ ভুল ধারণাসমূহ ও সংশোধনী

  • ভুল ধারণা ১: মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় উপন্যাসে শোষকদের শুধুই খলনায়ক বানানোর উদ্দেশ্যে তাদের অত্যাচারী দেখিয়েছেন।
    • সংশোধন: মানিক চরিত্রগুলোকে আলাদা করে ভালো বা খারাপ হিসেবে আঁকেননি। তিনি দেখিয়েছেন, পুঁজিবাদী ও সামন্ততান্ত্রিক কাঠামোই একজন সত্যপ্রিয় বা বিপিনকে এমন স্বৈরাচারী করে তোলে। এটি ব্যক্তির চেয়ে ব্যবস্থার দোষ।
  • ভুল ধারণা ২: ‘অহিংসা’ উপন্যাসে কেবল ধর্মীয় ভণ্ডামির সমালোচনা করা হয়েছে।
    • সংশোধন: ‘অহিংসা’ কেবল ধর্মের সমালোচনা নয়; এটি মূলত আশ্রমি কাঠামোর আড়ালে চেপে বসা অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, যৌন অবদমন ও সামন্ততান্ত্রিক ক্ষমতার আধিপত্যের উন্মোচন।
  • ভুল ধারণা ৩: মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের চরিত্রগুলো শোষণের কাছে পুরোপুরি নতি স্বীকার করে।
    • সংশোধন: বাহ্যিকভাবে চরিত্রগুলোকে অসহায় মনে হলেও, যশোদা কিংবা প্রগতির পক্ষের সংবাদপত্রগুলোর মতো চরিত্র ও প্রতিষ্ঠান স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করে এবং পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ প্রতিরোধ বজায় রাখে।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস সমাজ আধিপত্য

 

আধিপত্যের নিগড় ভেঙে সত্যের মুখোমুখি

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস সমাজ ও তার ভেতরের আধিপত্যকামী শক্তিগুলোকে কোনো ঢাকঢাক-গুড়গুড় ছাড়াই পাঠকের সামনে হাজির করে। সংসারের খুদে পিসশাশুড়ি থেকে শুরু করে শহরের বিশাল মিলমালিক সত্যপ্রিয় কিংবা আশ্রমে বসে থাকা বিপিন—সবার ক্ষমতার মূল ভিত্তি একটাই: অর্থ ও সম্পত্তি।

টাকা কীভাবে মানুষের চরিত্রকে বিকৃত করে, সত্যকে স্তব্ধ করে এবং সাধারণ মানুষের জীবনকে পঙ্গু করে দেয়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তা নির্মোহ চিকিৎসকের মতো ব্যবচ্ছেদ করেছেন। তাঁর উপন্যাসে অঙ্কিত এই সামাজিক আধিপত্যের চিত্র কেবল অতীতে বন্দি কোনো সাহিত্য নয়; এটি আজকের একবিংশ শতাব্দীর পুঁজিবাদী ও করপোরেট সংস্কৃতির ভেতরেও সমভাবে সত্য ও প্রাণবন্ত।

 

আকর গ্রন্থ ও তথ্যসূত্র (References)

  1. বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিক — মানিক গ্রন্থাবলী (১ম, ২য় ও ৩য় খণ্ড), মেসার্স বেঙ্গল পাবলিশার্স, কলকাতা।
  2. জাহাঙ্গীর, বোরহানউদ্দিন খান — মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্যকর্ম ও সমাজভাবনা, বাংলা একাডেমি, ঢাকা।
  3. মিত্র, সরোজমোহন — মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবন ও সাহিত্য, গ্রন্থালয় প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা।
  4. আজাদ, হুমায়ুন — উপন্যাসশিল্প ও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, মুক্তধারা, ঢাকা।
  5. ঘোষ, নিত্যপ্রিয় — মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়: রাজনীতি ও সাহিত্য, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা।
  6. চৌধুরী, কবীর — আধুনিক বাংলা উপন্যাস ও সমাজ বাস্তবতা, জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনী, ঢাকা।

Leave a Comment

Are you human? Please solve:Captcha