মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে সমাজ ও নারী: এক রূঢ় বাস্তবতা, মনস্তাত্ত্বিক অবদমন ও অস্তিত্বের লড়াই

বাংলা কথাসাহিত্যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এমন এক অনন্য কারিগর, যিনি মানুষের মন এবং সমাজকে আলাদা কোনো খোপে ফেলে দেখেননি। তাঁর কাছে সমাজ মানে কেবল কিছু প্রথা বা নিয়মের সমষ্টি নয়, বরং এটি মানুষের অবদমন, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং বিশেষ করে নারীর নিয়তি নির্ধারণকারী এক অদৃশ্য শ্বাসরূদ্ধকর কাঠামো। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালজয়ী উপন্যাসগুলো—যেমন ‘জননী’, ‘শহরতলী’, ‘জীবনের জটিলতা’, ‘অহিংসা’, ‘নাগপাশ’, কিংবা ‘চতুষ্কোণ’—খুঁজলে দেখা যায়, নারী সেখানে কেবল একটি চরিত্রমাত্র নয়; সে হলো যুগ যুগ ধরে চলে আসা পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার নির্মম কষাঘাত সহ্য করা এক জীবন্ত দলিল। জনসংখ্যার অর্ধেক অংশ জুড়ে থাকা সত্ত্বেও নারী কীভাবে সমাজের চোখে চিরকাল পরাধীন ও নিম্নস্তরের প্রাণিূপে গণ্য হয়ে আসছে, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তা এক নির্মম অথচ পরম যত্নে তুলে ধরেছেন।

 

১. পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে নারীর মনস্তাত্ত্বিক অবদমন এবং পরাধীনতার শেকল

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে নারীর জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো তার নিজের সত্তার ওপর নিজের কোনো অধিকার বা নিয়ন্ত্রণ না থাকা। ‘জননী’ উপন্যাসের শ্যামা চরিত্রটি এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। এই উপন্যাসের গঠনশৈলী অত্যন্ত নিটোল ও নাটকীয়তামযুক্ত; এখানে কোনো অতিপ্রাকৃত চমক, বিপুল আত্মত্যাগ, গভীর দেশপ্রেম কিংবা টানটান উত্তেজনাময় প্রেমের রোমাঞ্চ নেই। শ্যামার ছোট্ট মনের জগৎটুকুই এই উপন্যাসের আসল পরিধি। কলকাতার শহরতলী থেকে বনগাঁ এবং পরবর্তীতে নিজের পৈতৃক বাড়ি বিক্রির পর সেই বাড়িরই ভাড়াটে হিসেবে বসবাসের এই দীর্ঘ যাত্রায় শ্যামার মনে আলোছাড়ার দোলা লেগেছে বারবার।

সংসারে পুরুষের স্বেচ্ছাচারিতা ও অন্যায়ের কোনো শেষ নেই। হঠাৎ করেই রাখালের দ্বিতীয় বিয়ে করার সিদ্ধান্ত শ্যামার সরল মনে কোনোভাবেই ধরা দেয় না। মানসিকভাবে আহত ও বিষণ্ন শ্যামা জননী মন্দার দুর্ভাগ্যের কথা ভেবে সান্ত্বনা খোঁজার চেষ্টা করে। সে মনে মনে ভাবতে চায়, মন্দা তো দেখতে কুশ্রী নয়! কিন্তু এখানেই সমাজের গভীরতম অসঙ্গতিটি প্রশ্ন হয়ে দেখা দেয়। সরোজ দত্ত অত্যন্ত যৌক্তিকভাবেই এই জায়গায় প্রশ্ন তুলেছেন—

“কুরূপা বলেই স্ত্রীর অমর্যাদা ঘটিয়ে পুরুষের পুনর্বিবাহের স্বেচ্ছাচার শ্যামা মেনে নেয় কেন? কেন মর্যাদাহীনতার মুল্যেও নারীকে ধরে রাখতে হবে তার পুরুষ তথা স্বামী নামক অবলম্বনটিকে? একি কোনো বিভ্রম?”

লেখক অত্যন্ত নিপুণভাবে দেখিয়েছেন যে সমাজ ও পরিবার নারীর কেবল বাহ্যিক জীবনকেই নয়, তার মানসিক দিকটিকেও পঙ্গু করে রেখেছে। শ্যামার অবচেতন মনে ভয় কাজ করে—মন্দা যদি ছেলেদের নিয়ে মেতে থাকে এবং রাখালের প্রাপ্য থেকে তাদের বঞ্চিত করে, তবে হয়তো রাখালের আরেকটি বিয়ের প্রয়োজন হয়েছে! এই ভেবে তার শরীর অবশ হয়ে আসে। সে প্রতিজ্ঞা করে যে শীতলকে সে কোনোভাবেই বঞ্চিত করবে না। কিন্তু পরদিন সকালে শীতলের ঘুম ভাঙার আগেই ডেকে সে কেবল গালাগালিই উপহার পায়। তখন সে পুনরায় এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, স্বামী যতটুকু চায় ঠিক ততটুকুই দেওয়া উচিত; অতিরিক্ত কিছু করতে গেলেই স্বামীর বিরক্তের উদ্রেক হবে। স্বামীর যেকোনো খামখেয়ালি আচরণে নারী প্রতিনিয়ত এক গভীর সংশয় ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটায়।

 

২. নিয়তির নির্মম পরিহাস এবং আত্মিক বন্দিদশা

‘শহরতলী’ উপন্যাসের দিকে তাকালে নারীর এই অসহায়ত্বের এক ভিন্ন ও মর্মান্তিক রূপ চোখে পড়ে। আশ্রমের কদমতলা থেকে মহেশ চৌধুরি যখন সদানন্দের দর্শন না পেয়ে বাড়ি ফিরে যেতে চান, তখন তার স্ত্রী বিভূতির মা তাতে তীব্র আপত্তি জানায়। সে জানে তার স্বামীর স্বভাব কেমন; এই মুহূর্তে মাঝপথ থেকে ফিরে গেলে ভবিষ্যতে সমস্ত দোষ তারই ঘাড়ে চাপবে। মহেশ চৌধুরি যখন ক্ষিপ্ত হয়ে বলে যে সে একা চলে গেলেও বিভূতির মা কি একা বসে থাকবে? তখন বিভূতির মা চরম সত্যটি উপলব্ধি করে মেনে নেয়—

“এখন গেলেই চিরকাল তুমি আমায় দুষবে, বলবে আমার জন্য তুমি প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করেছিলে।”

নারীর এই অসহায়ত্বের পরিধি যেন অন্তহীন। শীতলের দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী শ্যামার বিয়ের ক্ষেত্রে তার নিজের পছন্দ-অপছন্দের বিন্দুমাত্র কোনো মূল্য ছিল না। বাধ্য হয়ে তাকে এক মদ্যপ, বদমেজাজি এবং দোজবরের সঙ্গে সংসার পাততে হয়েছে। সংসারের সমস্ত বিপর্যয় ও বিশৃঙ্খলার মূল উৎস শীতল হলেও, সেই ভাঙা নৌকার পাল তোলার ভার আমৃত্যু বহন করে চলতে হয় কেবল অসহায় শ্যামাকে।

একই চিত্র ফুটে ওঠে বকুল ও অন্যান্য চরিত্রগুলোর বেলায়ও। শঙ্করের প্রতি গভীর আকর্ষণ থাকা সত্ত্বেও তীব্র শ্রেণিবৈষম্য এবং পারিবারিক-সামাজিক নিষ্ঠুরতার কারণে বকুলের সঙ্গে শঙ্করের মিলন ঘটে না; তার বিয়ে হয় মোহিনীর সঙ্গে। মোহিনী স্ত্রীকে ভালোবাসলেও তার বাড়ির অন্য সদস্যরা বকুলকে কখনো শান্তিতে থাকতে দেয় না। কিন্তু বকুলের কিচ্ছু করার থাকে না—স্বামী এবং এই নিঠুর সংসারকে যেকোনো মূল্যে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকা ছাড়া তার সামনে খোলা কোনো দরজা থাকে না। মন্দার স্বামী রাখাল দ্বিতীয় বিয়ে করার পরও তার নিয়তি হয় ওই একই পঙ্ক্তিতে দাঁড়ানো। আবার প্রমীলার ক্ষেত্রেও নগেনের উদাসীন ও নিষ্ঠুর আচরণ তাকে এমন এক পর্যায় নিয়ে যায় যেখানে আত্মহত্যার চিন্তাও তার মনে উঁকি দেয়। উপার্জনহীনতা এবং স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার সংস্কৃতির অনুপস্থিতি নিম্নমধ্যবিত্ত সমাজের নারীদের আজীবন পরাধীনতার শৃঙ্খলে বেঁধে রেখেছে।

 

৩. দুপুরের একঘেয়েমি জীবন এবং নারীদের সামাজিক আড্ডা ও আত্মিক প্রকাশ

শহর ও গ্রামের মধ্যবিত্ত নারীদের দৈনন্দিন রুটিন মূলত ঘরের চার দেওয়ালের মাঝেই সীমাবদ্ধ। দুপুরের রান্না ও খাওয়ার কাজ শেষ হওয়ার পর বিকেল পর্যন্ত সময়টা তাদের জীবনে চরম অলসতা ও একঘেয়েমিতে ভরা থাকে। এই সময়টাকে কাটার জন্য এবং নিজেদের রুদ্ধশ্বাস জীবন থেকে একটু মুক্তির নিঃশ্বাস ফেলার জন্য নারীরা একে অন্যের বাড়িতে ছুটে যায়।

‘জননী’ উপন্যাসে আমরা দেখি, শীতল জেলে যাওয়ার পর শ্যামা দুপুরের অবসরে বিষ্ণুপ্রিয়ার বাড়িতে যায়, যদিও বাড়ির ঝি তাকে ওপরে উঠতে নিষেধ করে। নকুল বাবুর বাড়িতে শ্যামার বেড়াতে যাওয়ার মাঝেও এই একঘেয়ে জীবন থেকে পালানোর এক সুপ্ত বাসনা কাজ করে। ‘শহরতলী’ দ্বিতীয় খণ্ডে এই মেয়েদের দুপুরের আড্ডার সংস্কৃতি এক বিশাল রূপ পরিগ্রহ করেছে। যশোদার বাড়িতে নতুন ভাড়াটে হিসেবে অজিত ও সুব্রতা আসার পর চিত্রটি সম্পূর্ণ বদলে যায়। সুব্রতা অত্যন্ত মিশুক প্রকৃতির হওয়ায় অল্পদিনের মধ্যেই পাড়ার সমস্ত গৃহিণীর সঙ্গে তার সখ্য গড়ে ওঠে।

কয়েক মাসের মধ্যে যশোদার বাড়িতে দুপুরবেলা রীতিমতো নারীদের এক জমজমাট বৈঠক বসতে শুরু করে। উকিল, ডাক্তার, মাস্টার, প্রফেসর, কেরানি কিংবা জীবনবীমার এজেন্টের মতো তথাকথিত ভদ্রলোকদের বাড়ির স্ত্রী-বিনীতারা সেখানে এসে ভিড় জমায়। বড় রাস্তার ধার থেকে শুরু করে আশপাশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নারীরা এই আড্ডায় যোগ দেয়। দুপুরবেলা যশোদার বাড়ি হাসি-গল্প, গান-বাজনা, এমনকি তাস ও ক্যারম খেলার সুবাদে এক ছোটখাটো ক্লাবে পরিণত হয়। বয়স ও শ্রেণিভেদে তাদের বসার ভিন্নতা থাকলেও, এই আড্ডার সুবাদে তাদের শ্যাওলা ধরা একঘেয়ে জীবন কিছুটা হলেও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। যশোদাও এই আড্ডার মধ্য দিয়ে এক অদ্ভুত মানসিক প্রশান্তি লাভ করে—

“হঠাৎ সে যেন আহত মনের ক্ষতে মিষ্টি মলমের মৃদু একটা স্বাদ অনুভব করিতে লাগিল।”

তবে এই আড্ডা কেবল সৌহার্দ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর ভেতরেও কাজ করে সূক্ষ্ম ঈর্ষা, দ্বন্দ্ব ও প্রতিপত্তির লড়াই। ডাক্তার অতসীর বড় ছেলে রমেন ডাক্তারি পড়ার গৌরব নিয়ে যখন সবার সামনে তৃপ্তির হাসি হাসে, তখন সুকুমার উকিলের বউ তার পসার নিয়ে টিপ্পনী কাটতে ছাড়ে না। বনলতা প্রফেসর সুনীল সেনের স্ত্রী অনুরূপার সঙ্গে কথা বলতে পছন্দ করে না, আবার অনুরূপার মেয়ে অলকার গানকে সে হেয় করে ‘প্যানপ্যানানি’ বলে অভিহিত করে। এই ছোট ছোট দ্বন্দ্ব, অহংকার এবং পরশ্রীকাতরতার মধ্য দিয়েই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় মধ্যবিত্ত সমাজের মনস্তত্ত্বকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। পরবর্তীতে যশোদার উদ্যোগে এই আড্ডার আসরটিই একটি অনানুষ্ঠানিক সংগীত বিদ্যালয়ে রূপ নেয়, যা নারীদের জীবনে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করে। ‘অহিংসা’ ও ‘নাগপাশ’ উপন্যাসেও নারীর এই দুপুরবেলা কাটানোর প্রতীক্ষা ও আড্ডার সংস্কৃতির চমৎকার চিত্র অঙ্কন করা হয়েছে।

৪. ঘরের বাইরে নারীর করুণ দশা এবং নারীতে নারীতে অন্তহীন বিরোধ

গৃহকোণ থেকে যখন নারী বাইরে পা রাখে, তখন তাকে পদে পদে লাঞ্ছনা ও অবমূল্যায়নের মুখোমুখি হতে হয়। বাসে কিংবা ট্রামে যাতায়াতের সময় সমাজের তথাকথিত ভদ্রলোকদের লোলুপ দৃষ্টি এবং অশ্লীল আচরণ নারীর নিরাপত্তাকে প্রতিনিয়ত প্রশ্নবিচারের মুখে ঠেলে দেয়। প্রমীলা ও বিমলের ট্রামে যাতায়াতের সময় বিমলের লক্ষ করা সেই রোগা, কাঁদো কাঁদো মেয়ের প্রতি অশ্লীল দৃষ্টি কিংবা ‘চতুষ্কোণ’ উপন্যাসে ট্রাম-বাসে হেংলা ছেলেদের কদর্য চাহনি—এ সবই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের অন্তর্নিহিত কদর্যতারই বহিঃপ্রকাশ।

তবে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসের একটি অত্যন্ত মর্মান্তিক দিক হলো—অনেক সময় পুরুষের চেয়ে নারীরাই নারীদের সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে দাঁড়ায়। সুব্রতা যশোদার কাছে আক্ষেপ করে বলে—“আসলে আমার জাত-ই যত নষ্টের গোড়া।” অজিতের বড় ভাইয়ের পছন্দমতো অন্য মেয়ে ঠিক হলেও অজিত নিজের পছন্দকে প্রাধান্য দিয়ে সুব্রতাকে বিয়ে করে। কিন্তু অজিতের বড় বউদি সুব্রতাকে কখনোই মেনে নিতে পারে না। সুব্রতার নিখুঁত রূপ ও যৌবনকে তার জায়ের গায়ের রঙের ভিন্নতা এবং বয়সের তারতম্যের কারণে সহ্য হয় না। মানুষমাত্রই রূপ-যৌবন ক্ষণস্থায়ী হওয়া সত্ত্বেও এই হিংসা ও পরশ্রীকাতরতা সমাজকে কলুষিত করে রাখে।

লেখক এই ছোট ছোট ঘটনার মধ্য দিয়ে এক সর্বজনগ্রাহ্য সামাজিক সত্যে উপনীত হয়েছেন। রাফাল ফক্সের মতে—“একমাত্র বাস্তব ক্রিয়াকলাপের মধ্য দিয়েই সত্যে উপনীত হওয়া যায়। কারণ কোনো বিষয়বস্তুর জন্যে মানুষের যে নিজস্ব প্রগাঢ় অনুন্ধান, তারই প্রকাশ সত্য।” অন্যদিকে মার্কসের মতে, বাস্তবের সামগ্রিক ঘটনা ও তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের ভেতর থেকেই সত্যের উদ্ভব ঘটে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে মেয়েরা বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অবচেতনভাবেই তাদের মায়ের ছাঁচে ঢেলে গড়ে ওঠে। বকুল শ্বশুরবাড়ি থেকে ফিরে আসার পর তার কথাবার্তা, চালচলন ও আচার-আচরণে শ্যামারই এক নতুন রূপ প্রতিফলিত হয়। সুব্রতার কথা বলার ধরন বা যশোদার চোখে অন্য কারও সুপ্ত ছায়া দেখতে পাওয়ার এসব বিবরণ প্রমাণ করে যে, সমাজ ও পরিবার নারীকে একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে ফেলে স্থায়ীভাবে গড়ে পিটিয়ে নেয়।

৫. ভিন্ন সামাজিক স্তর ও চরিত্রের বহুমুখী বিকাশ ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

‘চতুষ্কোণ’ উপন্যাসে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বিভিন্ন সামাজিক অবস্থানের নারীদের এক অপূর্ব সমাহার ঘটিয়েছেন। পনের-ষোল বছরের কিশোরী গিরির অবিকশিত শরীরের মাঝেও নারীত্বের স্বাভাবিক আত্মমর্যাদাবোধ ও প্রতিবাদী সত্তা বিদ্যমান। শেমীজ ছাড়া শুধু শাড়ি পরা অবস্থায় রাজকুমারের সামনে তার অস্বস্তিবোধ এবং তার গায়ে হাত দেওয়ার কারণে তার ক্ষোভ ও মায়ের কাছে নালিশ করা—নারীর সহজাত শালীনতারই বহিঃপ্রকাশ। অন্যদিকে, মনোরমার চরিত্রটি সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী; সে নিজের নিরাবরণ স্তনে রাজকুমারকে স্পর্শ করার জন্য প্ররোচিত করে এবং গেঁয়ো মানুষদের সংকীর্ণ মানসিকতা নিয়ে কটাক্ষ করতে দ্বিধা করে না।

এই উপন্যাসে সরসী, মালতী ও কালীর মতো ভিন্ন চরিত্রের নারী পাই। সরসী আধুনিক মননশীলতার প্রতীক—সে মিটিং-মিছিল করতে ভালোবাসে, ক্লাবে গিয়ে টেনিস খেলে এবং চমৎকার গান গায়। প্রখ্যাত সাহিত্য সমালোচক শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষায় এদের স্বরূপ বিশ্লেষিত হয়েছে এভাবে:

“রিপি খেয়ালী, অভিমানপ্রবণ, আদুরে মেয়ে, যাহার প্রবল আকাঙ্ক্ষা কোন বাধা-বন্ধ মানে না; মালতী কোমল, ভাবপ্রবণ, আত্মদানোন্মুখ, কিন্তু ভালোবাসার প্রকৃতি সম্বন্ধে অনভিজ্ঞ, সরসী-কর্মঠ, ব্যবহারিক জীবনে সহজ-নিপুণ, অবদমিত যৌন বুভুক্ষার মূল্যস্বরূপ স্বচ্ছ ও সুস্থ সহানুভূতি সম্পন্ন।”
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
উপন্যাস শিল্পে প্রকৃত সাহিত্যিক হলেন সেই ব্যক্তি যিনি মানুষের অন্তরের গভীরে প্রবেশ করে সুপ্ত মানবসত্তাকে আবিষ্কার করতে পারেন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর কালজয়ী উপন্যাসসমূহে নারীর বহুমাত্রিক রূপ, বঞ্চনা, সামাজিক অবদমন এবং মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বগুলোকে অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছেন। প্রতিটি মানুষকে তার নিজ কর্ম ও স্থানে স্থাপন না করলে যেমন মানবজীবনের পূর্ণতা আসে না, ঠিক তেমনি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ও তাঁর উপন্যাসের নারীদের সমাজের রূঢ় বাস্তবের পটভূমিতে জীবন্ত করে তুলেছেন—যা বাংলা কথাসাহিত্যে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবে।