বাংলা কথাসাহিত্য ও নাট্যসাহিত্যে সৈয়দ শামসুল হক এক অদ্বিতীয় নাম। ষাটের দশক থেকে শুরু করে আমৃত্যু যিনি তাঁর মেধা, মনন ও সৃষ্টিশীলতার আলোয় বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে গেছেন, তাঁর নাট্যভাবনা কেবল বিনোদনের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তা হয়ে উঠেছিল সমকালীন রাজনীতির এক দর্পণ। তাঁর কাব্যনাটকগুলোর মধ্যে স্বল্পায়তনিক অথচ অত্যন্ত শক্তিশালী রচনা হলো ‘মরা ময়ূর’ (২০১২)। নাটকটি মূলত তাঁরই ইংরেজিতে রচিত নাটক ‘দ্য ডেড পিকক’ (১৯৯০)-এর পরিশীলিত বঙ্গানুবাদ। স্বল্পকায় হলেও কাব্যনাটকটিতে নাট্যকারের প্রতিভার পরিচয় সুস্পষ্ট। এখানে সৈয়দ হকের নিরীক্ষাধর্মী মননের আরও বিস্তৃত পরিচয় পাওয়া যায়।
১. রূপক ও সাংকেতধর্মী নাটক হিসেবে ‘মরা ময়ূর’ এবং নগরজীবনের নির্মম সত্য
‘মরা ময়ূর’ রূপক ও সাংকেতধর্মী নাটক। এখানে রূপকার্থে সমকালীন রাজনীতি, বিনষ্ট সভ্যতা এবং সামাজিক পঙ্কিলতা উপস্থাপন করা হয়েছে, যেখানে রাষ্ট্রক্ষমতা শোষক হয়ে ওঠে, সামান্য খাদ্যাভাবে মানুষ মনুষ্যত্ব হারায়; অর্থাভাবে, রোগে-শোকে ভুগতে ভুগতে বিবেককে গলা টিপে হত্যা করে। নাটকটি প্রথম বাংলাদেশের মঞ্চে আসে ২০১৩ সালে নাট্যদল ‘চারুপীড়ম’-এর পরিচালক গাজী রাকায়েতের হাত ধরে। গাজী রাকায়েত নিজে নাটকটির এই রূপকধর্মিতা ও নান্দনিকতা প্রসঙ্গে নিম্নরূপ মন্তব্য করেছেন :
“The dead body of peacock is a symbol of urban hypocrisy through which the cleaner claims to lose his love. The play has every element of modern theatre, including metaphors, satires and more and we tried to do justice to it. We have plans to take the production abroad.”
বস্তুত, ‘দেশভাগের পর ঢাকাকেন্দ্রিক সাহিত্যে সৈয়দ শামসুল হক একটি মাইলফলক। যিনি ঢাকাকেন্দ্রিক সাহিত্যকে গ্রামনির্ভরতা থেকে প্রথম নাগরিকমনস্কতায় তুলে ধরেন। এরই ধারাবাহিকতায় ‘মরা ময়ূর’ কাব্যনাটকটিতেও নগরকেন্দ্রিক মানুষের নিষ্ঠুর জীবনবাস্তবতা প্রতিফলিত হয়েছে। মরা ময়ূরের কাহিনি আবর্তিত হয়েছে ঢাকা শহরের বস্তিতে বসবাসকারী একজন ধাঙড়ের জীবনের কর্মচাঞ্চল্য, হতাশা, প্রাপ্তি, ব্যর্থতা, স্বপ্ন আর বাস্তবতার বিস্তর ফারাক নিয়ে। ধাঙড়দের জীবনের কর্মচাঞ্চল্য শুরু কাকডাকা ভোরে; যখন পুরো শহরের মানুষ সুপ্তিমগ্ন থাকে। এ সময়ে ধাঙড়রা জমে থাকা অথবা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা জঞ্জাল নিজহাতে কুড়িয়ে কিংবা ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করে শহরটিকে বসবাসের উপযোগী করে তোলে।
নগরবাসী কেবল চকচকে পরিষ্কার শহরটাকেই দেখে; কিন্তু এর নেপথ্যে থাকা লোকগুলির জীবনকথা, সুখ-দুঃখ-হাসি-কান্না নিয়ে তাদের মাথা ব্যথা নেই; তারা থেকে যায় সমাজে অস্পৃশ্য, অস্ফুট; তাদের জীবনে কেবলি অন্নাভাব, অর্থাভাব। রোগে-শোকে কাতর হলেও তাদের মেলে না চিকিৎসা; এমনকি তাদের জীবনলালিত ভালোবাসাও বিকিয়ে দিতে বাধ্য হয় শহুরে ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণির লম্পটতা আর লালসার কাছে। তাই সর্বনাশা নেশার মধ্যে বুঁদ হয়ে থাকা ছাড়া তাদের আর কিছুই করার থাকে না। এমনই এক ধাঙরের জীবনকথার উল্লেখ প্রসঙ্গে লেখক সমকালীন সমাজ ও রাজনৈতিক বাস্তবতা উপস্থাপন করেছেন তাঁর ‘মরা ময়ূর’ কাব্যনাটকে।
বস্তুত, আলোচ্য নাটকে চরিত্র আর কাহিনির অন্তরালে মানুষের ভেতরকার রক্তাক্ত হৃদয়কথন এবং অব্যক্ত ও অধরা স্বপ্নগুলোর শিল্পিত উপস্থাপনই নাট্যকারের মূল অন্বিষ্ট। কেননা, ‘তাঁর সকল রচনার কেন্দ্রবিন্দুতে বার বার ‘মানুষ’- কেই পাওয়া যায়। মানুষ নিয়েই তাঁর ভাবনা। মানুষকে তিনি ভাষা, সমাজ ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার আলোকে চিত্রিত করেছেন। ৬০ বছরের দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে যত সৃষ্টি তিনি করেছেন সব সৃষ্টিতেই মানুষকে তিনি কেন্দ্রে রেখেছেন। মানুষকে ঘিরেই রাজনীতি, দেশ, সমাজ ও কাল আবর্তিত হয়েছে তাঁর রচনায়। দেশপ্রেম ও মানবপ্রেম উপস্থাপনায় তাঁর নাটকও তাই হয়ে উঠেছে বিশিষ্ট।’
২. মানুষকেন্দ্রিক শিল্পরীতি, বিতর্ক এবং মৌলবাদী গোষ্ঠীর আক্রমণ
সৈয়দ শামসুল হক যেমন ‘খেলারাম খেলে যা’ (১৯৭৩) উপন্যাসে উপস্থাপিত বিষয়বস্তুর কারণে সমকালে তীব্র নিন্দা ও বির্তকের শিকার হন, তেমনি ২০১৪ সালে ‘মরা ময়ূর’ প্রকাশের পর থেকে তিনি নতুন করে আবারও বিতর্কিত হন। তাঁর মৃত্যুর পর ধর্মীয় মৌলবাদীদের পক্ষ থেকে আপত্তি তোলা হয় – কোনো ধর্মপ্রাণ মুসলমান যেন সৈয়দ শামসুল হকের জানাজা-দাফন-কাফন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত না হন। প্রতিক্রিয়াশীল ও ধর্মান্ধ এই গোষ্ঠী এসময়ে সৈয়দ হকের বিভিন্ন লেখনী থেকে কাট-ছাঁট করে পরিপ্রেক্ষিতের সঙ্গে সঙ্গতিহীন ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক কথা মানুষের সামনে তুলে ধরেছে।
এসব উদাহরণের মধ্যে ‘মরা ময়ূর’ কাব্যনাটকের প্রারম্ভে ধাঙড়কর্তৃক উচ্চারিত আজান বিষয়ক একটি সংলাপ অন্যতম। বলা হয়, এ সংলাপের মাধ্যমে আজানের সুমধুর ধ্বনিকে অপমান করে সৈয়দ শামসুল হক সুচিন্তিত ভাবেই বাংলাদেশের মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেছেন। এমন কি দৈনিক প্রথম আলো-র ঈদ সংখ্যায় এটি প্রকাশিত হওয়ায় সম্পাদকের বিরুদ্ধেও মুসলিম-প্রধান দেশে নাস্তিক্যবাদ প্রচারের অভিযোগ ওঠে।
‘মরা ময়ূর’ নাটকে বর্ণিত সময় খুব ভোরবেলা। অর্থাৎ যখন ফজরের নামাজের সময়কাল। এসময়ে ধাঙড় লোকটি যখন আবর্জনা ফেলার গাড়ি নিয়ে রাস্তায় নামে, তখন চারিদিক থেকে একদল সর্বভুক কাক কর্কশ-কা কা স্বরে তাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরে। লোকটি প্রচণ্ড বিরক্ত হয়ে প্রথমে কাকগুলিকে তাড়াবার চেষ্টা করে। কিন্তু দলবদ্ধ কাকের বিচরণ, ঠুকরে ময়লাঘাটা ও কর্কশ আওয়াজ কিছুর উপরেই সে নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে না। এরমধ্যে চারপাশ থেকে উচ্চরবে শুরু হয় আজানের শব্দ। ফলত, কাকের তীক্ষ্ণ আওয়াজ, মাইকের উচ্চস্বর মিলেমিশে তার শ্রবণশক্তি, ধৈর্যশক্তিকে বিপর্যস্ত করে ফেলে। ফলে সে তখন কাককে উদ্দেশ্য করে বলে—
“লোক।কা কা কা কা কা কা !! কা কা !!!জন্মের মধ্যে কর্ম ওই কা কা পারিস তোআজানের আওয়াজটা ডুবিয়ে দে দেখি! দেখি গলার জোর!” (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৮১)
উপর্যুক্ত সংলাপের প্রথম চরণভুক্ত কা কা শব্দের পরে বিস্ময়বোধক চিহ্নের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, সারারাত নিদ্রাহীন, অভুক্ত ধাঙড়লোকটি – প্রথমত কাকের কর্কশ আওয়াজের ওপরই প্রচণ্ড বিরক্ত। আজান নয়, বরং তার বিরক্তির মূল কারণ ভোরের নির্জনতার বুকচিরে ভেসে আসা সুউচ্চ শব্দ। বস্তুত, সমাজের অস্পৃশ্য শ্রেণিভুক্ত একজন সুইপারের ধর্মীয় মূল্যবোধ কিংবা ধর্ম-অবমাননা কিছুই ধারণ করা সম্ভব নয়। সে শুধু জানে ক্ষুন্নিবৃত্তি; জানে কীভাবে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হয়। ফলে আজানের শব্দ কেবল নয়, যে-কোনো শব্দই তার কাছে তার শ্রমকাতর এ-মুহূর্তে অতি বিরক্তিকর বলে বিবেচিত হতে পারে।
অন্যদিকে, মসজিদের নগরী বলে পরিচিত ঢাকা শহরে এত ভোরে আজানের শব্দ ছাড়া নাটকে অন্য শব্দের ব্যবহারও অযৌক্তিক ও আরোপিত মনে হবার সম্ভাবনা ছিল। ফলে আজানের শব্দটির প্রয়োগ কিংবা কাকের শব্দ দিয়ে আজানের শব্দকে ডুবিয়ে দেবার আহবান মুসলমানদের মনে আঘাত দেবার জন্যে নাট্যকার রচনা করেননি, সে কথা নির্দ্বিধায় বলা যেতে পারে। বরং জীবনযুদ্ধে পোড় খাওয়া ধাঙড় লোকটি জীবনের প্রতি, কর্মের প্রতি যে অনেক বেশি বীতশ্রদ্ধ, তা বোঝানোর প্রয়োজনে নাট্যকার এ-সংলাপটি ব্যবহার করেছেন।
৩. রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততা ও রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের ইতিহাস
প্রতিক্রিয়াশীল ধর্মব্যবসায়ীরা যে পুরো নাটক না পড়েই নাটকের খণ্ডিত অংশ নিয়ে নাট্যকারের বিরুদ্ধে বিষোদগার করেছিল, তা ছিল মূলত লেখকের প্রতি মৌলবাদী-গোষ্ঠীর পূর্বতন বিদ্বেষের অংশ। কেননা, নাট্যকার সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত না থাকলেও, পরোক্ষভাবে দেশের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলের একজন বড়ো সমর্থক ছিলেন। স্বাধীনতা-উত্তর বিরুদ্ধ পরিবেশে দাঁড়িয়েও তিনি তাঁর বিভিন্ন রচনায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেছেন। তাঁর প্রায় সবগুলো কাব্যনাটকের বিভিন্ন চরিত্রের সংলাপে বঙ্গবন্ধু হত্যার তীব্র নিন্দা করেছেন, এবং পরবর্তী দিনগুলিতে এই হত্যার বিচার না হওয়া প্রসঙ্গটি তিনি স্পষ্ট করে তুলে ধরেছেন।
নব্বইয়ের দশকে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের (১৯২৯-১৯৯৪) সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে এদেশ থেকে রাজাকার, আলবদর, আলশামস্ বাহিনির শেকড় উৎপাটন করতে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছেন। ফলত, এসব বিষয় মুক্তিযুদ্ধের সময়কালে পরাজিত শক্তি ও তাদের এদেশীয় সমর্থকদের গাত্রদাহনের কারণ হয়। যার ফলে শুরু থেকেই নাট্যকার সৈয়দ শামসুল হক দেশের প্রতিক্রিয়াশীল মৌলবাদী গোষ্ঠীর হিংস্র আক্রমণের শিকার হন। বস্তুত, মৌলবাদ-সমর্থিত রাষ্ট্রব্যবস্থা বরাবরই গণমাধ্যম, লেখক-প্রকাশকের বাক-স্বাধীনতার বিরুদ্ধে খড়গহস্ত। যখনই কোনো প্রগতিশীল লেখক প্রগতির পক্ষে কথা বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণমানুষের অধিকার, নারীস্বাধীনতা, লৈঙ্গিক বৈষম্য দূরীকরণ নিয়ে মত প্রকাশ করেছেন – তখনই তাঁদের নাস্তিক্য অপবাদ দিয়ে একঘরে করার চেষ্টা করা হয়েছে।
সৈয়দ শামসুল হক তাঁর ইংরেজি ভাষায় রচিত নাটক ‘দ্য ডেড পিকক’ যখন রচনা করেন, তখন এদেশের শাসনক্ষমতায় ছিল মুক্তিযুদ্ধবিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি। এরা ‘নব্বইয়ের পর থেকেই বিভিন্ন কারণে নিজেদের দুর্নীতি, অপকর্ম, স্বজনপ্রীতির তথ্য প্রকাশের ‘অপরাধে’ […] ভেতরে ভেতরে চক্রান্তও করেছে স্বাধীন ও সাধারণ মানুষের পছন্দের গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষতি করার।’ নাট্যকার তাঁর ‘মরা ময়ূর’ নাটকেও এই মৌলবাদী গোষ্ঠী এবং দেশ থেকে ধর্মনিরপেক্ষতার মূলনীতি সরিয়ে যারা দেশকে পুরাতন পাকিস্তানের আদলে সাম্প্রদায়িক উগ্রবাদী দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে, তাদের প্রতি তীব্র কটাক্ষ হেনেছেন।
৪. নারীর প্রতীকী রূপান্তর এবং পঁচাত্তর-পরবর্তী রাজনীতির কুৎসিত রূপ
নাটকের শেষপর্যায়ে যখন নারী চরিত্রটির নাটকীয় রূপান্তর ঘটে, যখন তার কোমল শান্ত মুখাবয়ব থেকে বেরিয়ে আসে সত্যস্বরূপ; কণ্ঠে থেকে নিঃসৃত হয় পরিবর্তিত ভাষারূপ। বাংলা নয়, তার ভাষা-সংলাপে উঠে আসে উর্দু ভাষা। প্রতিশোধপরায়ণ কণ্ঠে সে বলে ওঠে :
“হঠ যাও সব, হঠ যাও!তফাৎ তফাৎ হো যাও!দেখো মেরি জান,হামারি হাত ছে ক্যায়সে বানউদেশ মে নয়াস্তান ।ফির নারা লাগায়া। ফির মেশিনগান!হল্ট! মেশিনগান !” (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৯৬)
আলোচ্য নাটকের এই নারী চরিত্রটি মূলত একটি প্রতীকী চরিত্র। বাংলাদেশের রাজনীতিতে পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ে ক্ষমতায় আসীন সামরিক সরকার সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে ধর্মনিরপেক্ষতার পরিবর্তে সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি চর্চায় উৎসাহ যুগিয়েছে। বন্দুকের নলের জোরে ক্ষমতায় বসে অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে পাকিস্তানের আদলে ধর্মভিত্তিক বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের চর্চা করেছে। আশির দশকে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনের ধারায় স্বৈরাচারী শাসক পদত্যাগে বাধ্য হলেও এর অব্যবহিত পরবর্তী পর্যায়ে যারা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে, অচিরেই দেখা গেছে তারাও সামরিক শাসকের সেই পুরোনো নীতি থেকে বের হতে পারেনি। বরং দেশবিরোধী, সাম্প্রদায়িক, ধর্মব্যবসায়ী রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে জোটবদ্ধ হয়েছে।
ফলে বাংলাদেশের নব্বইয়ের দশকের রাজনৈতিক ইতিহাসের বাস্তবতায় বাংলাদেশের বিনষ্ট রাজনীতি আর স্বার্থান্ধ ক্ষমতার প্রতীক হয়ে উঠেছে নাটক-বর্ণিত এই নারী; যার ক্ষমতারোহণ সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে হয়নি; বরং তার পেছনে যে ছিল আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র, এবং পাকিস্তানের অপপ্রভাব, তা ‘হঠ যাও, হল্ট, মেশিনগান’ প্রভৃতি শব্দের তাৎপর্যপূর্ণ প্রয়োগে সুস্পষ্ট হয়েছে। ১৯৭১ এবং তৎপূর্ববর্তী সময়ে পাকসেনা শাসিত সরকারব্যবস্থা যেভাবে এদেশের জনগণের মৌলিক অধিকারকে বারবার ক্ষুণ্ণ করেছে, অস্ত্র ও মেশিনগানের ভয় দেখিয়ে তাদের প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরকে রুদ্ধ করতে সচেষ্ট থেকেছে, নাটকের এই নারী চরিত্রটিও তেমনিভাবে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে সত্যভাষী ধাঙড় ও ধাঙড় সর্দারকে তার পথ থেকে সরে যেতে হুকুম দিচ্ছে।
১৯৫২ সালে রাষ্ট্রভাষা বাংলা প্রচলনের দাবিতে এদেশের ভাষাসংগ্রামীরা রাজপথে আত্মদানের মাধ্যমে যে-ইতিহাস তৈরি করেছে, তাকে অবজ্ঞা করে ইংরেজি ও উর্দু ভাষার মিশ্রণে সংলাপ বলেছে নারী চরিত্রটি। ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সূত্রপাত ঘটে, এ সময় জিন্নাহ কর্তৃক উর্দুভাষাকে অখণ্ড পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করবার একপেশে প্রস্তাবের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে লাখো বাঙালি রাজপথে নেমে আসে। ধীরে ধীরে উপ্ত হয় বাঙালি জাতীয়তাবাদের বীজ, বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়, এবং মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয় ভাষারাষ্ট্র বাংলাদেশ। কিন্তু এদেশের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী পাকিস্তানপন্থী মৌলবাদীগোষ্ঠী বরাবরই বাংলাভাষাকে তাদের নিজেদের ভাষা হিসেবে মেনে নিতে পারেনি। মুক্তিযুদ্ধের সময়কার প্রাণের স্লোগান জয় বাংলাকে পঁচাত্তর-পরবর্তী অস্থির সময়ে যারা বর্জন করে ‘নারায়ে তকবির’, ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ স্লোগানের আদলে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ স্লোগান প্রচলন করে; – নারী চরিত্রটির মুখে উর্দুভাষায় উচ্চারিত শব্দাবলি আমাদের সেকথাই নির্দেশ করে।
এবং নারী চরিত্রটি উর্দুভাষাতেই ঘোষণা দিচ্ছে প্রাণের বাংলাদেশকে তিনি পুনরায় পাকিস্তানের আদলে নয়াস্তান বানাতে চান। বলাবাহুল্য এ ‘নয়াস্তান’ যে ১৯৭১ পূর্ব অখণ্ড পাকিস্তানের প্রতিরূপ সেটি পাঠক দর্শকের বুঝে নিতে সমস্যা হয় না। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধু যখন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ণের সময় সংবিধানের প্রথম পাতাতেই স্পষ্ট করে উল্লেখ করেন ‘প্রজাতন্ত্রের ভাষা হইবে বাংলা।’ কিন্তু পঁচাত্তরের কালরাতে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর একের পর এক সামরিক সরকার বাংলাকে ব্রাত্যজনের ভাষারূপে চিহ্নিত করে, এবং বিজাতীয় ভাষাকে প্রতিষ্ঠার প্রয়াস চালায়। এ প্রসঙ্গে ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন এক লেখায় আক্ষেপ করে জানান :
“১৯৭৫ সালের পর ইংরেজি ভাষাপ্রীতি সৃষ্টি করেছে একটি বিশেষ শ্রেণী। ইংরেজি স্কুল, অফিস-আদালতে ইংরেজি চর্চা এবং যারা বাংলা চর্চা করে তাদের মধ্যে এক ধরনের হীনমন্যতাবোধ তৈরি করা হয়েছে। শাসকরা সুপরিকল্পিত ভাবে আবার বাংলা ভাষাকে ব্রাত্যজনের ভাষা আর ইংরেজিকে শাসকশ্রেণীর ভাষা হিসেবে প্রতিপন্ন করেছে।”
৫. সংবিধানের অবমাননা ও শাসকশ্রেণির বিলাসিতা
আবার, নাটকের শেষের দিকে রহস্যময়ী নারীচরিত্রটি যখন প্রচণ্ড আলোকচ্ছটার মাঝে নিজের প্রকৃত মুখোশ উন্মোচন করে, তখন সে উন্মত্ত আক্রোশে ধাঙড় ও ধাঙড় সর্দারকে লক্ষ করে বলতে থাকে :
“আগুনো আমার ভোটের বাকসোপুড়ে হয়ে যায় ছাই!আমি কচকচ করে খাইপ্রজাতন্ত্রের সংবিধানের সবকটা পৃষ্ঠাই !আমি থু থু দিই জনতার মুখেযত আছে ভুখা নাঙা,জানিসনে তোরা আমার স্বপ্নওই নৌকার হাল ভাঙা!মুক্তিযুদ্ধ, সোনার স্বদেশ, স্বপ্নের সব বাড়ি –ভেঙে ফেলি আমি –লাথি মারি লাথি মারি ! –আরো কী ?ইতিহাস আমি চিবিয়ে চিবিয়েথেতো করে তবে ছাড়ি !” (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৯৫)
আলোচ্য সংলাপের মাধ্যমে নাট্যকার সৈয়দ শামসুল হক সমকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতার বেশ কয়েকটি চিত্রের সমন্বিত উপস্থাপন ঘটিয়েছেন। এখানে যেমন জনগণের মতামতকে উপেক্ষা করে, গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে ভোট জালিয়াতি, ভোট ডাকাতির মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতায় আরোহণের কুৎসিত দিকটি প্রকাশিত হয়েছে, ঠিক তেমনিভাবে পঁচাত্তর-পরবর্তীকালের একাধিক সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশের উদারনৈতিক সংবিধানকে একটি সাম্প্রদায়িক সংবিধানে পরিণত করার হীনচক্রান্তের দিকটিও স্পষ্ট হয়েছে।
বস্তুত, ‘পাকিস্তান ছিল ধর্মান্ধতা ও ধর্মব্যবসায়ী, পশ্চাদমুখী, গণতন্ত্রহীন বন্দুকধারী পরিচালিত রাষ্ট্রের প্রতীক। মুক্তিযুদ্ধ ছিল ঐ বৃত্ত ভেঙ্গে প্রজাপতির মতো রঙিন পাখা মেলে মুক্ত আকাশে ঘুরে বেড়ানো। বাঙালির সে আকাঙ্ক্ষা মূর্ত হয়েছিল ১৯৭২ সালের সংবিধানে।’ কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর একে একে হত্যা করা হয় এমন জাতীয় চার বীরকে, যারা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে বাহাত্তর সালে প্রণীত সংবিধানের ১ থেকে ৫ সংখ্যক স্বাক্ষরকারী ছিলেন। এরপর সামরিক শাসক মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে ৭২-এর সংবিধানে প্রথম হস্তক্ষেপ করেন। ‘জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা – এ প্রধান চারস্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল যে – সংবিধান, জিয়াউর রহমান সেটিকে সংশধোনের নামে সাম্প্রদায়িক রঙ যুক্ত করেন, যেটি ছিল বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য ও নীতির পরিপন্থী।’
জিয়ার হত্যাকাণ্ডের পর রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় আরেক সামরিক শাসক জেনারেল হোসেইন মোহাম্মদ এরশাদ; তিনি প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির রাজনৈতিক আদর্শ ও বৈদেশিক-নীতিকে অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন। উল্লেখ্য যে, জেনারেল এরশাদ হলেন সেই ব্যক্তি, যিনি পাকিস্তানের সর্বোচ্চ উপাধি ‘নিশান ই হায়দার’ পেয়েছেন। তিনিও ক্ষমতায় এসে প্রথমেই বাংলাদেশের সংবিধান সংশোধনে মাঠে নামেন; এবং অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে ইসলামকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ঘোষণা করেন। তবে দুঃখের বিষয় এই যে, নানান পট পরিক্রমায় বাংলাদেশের রাজনীতিতে পালাবদল হলেও পরবর্তীকালে কোনো সরকারই মৌলবাদী গোষ্ঠীকে ভোটের রাজনীতিতে তুষ্ট রাখার প্রয়োজনে এই সংশোধনীগুলোর কালিমা মোচনের উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেনি। আলোচ্য সংলাপে নাট্যকার বাংলাদেশের রাজনীতির এই অন্ধকার দিকগুলি বাস্তবতার নিরিখে শ্লেষাত্মক ভাষায় উপস্থাপন করেছেন।
৬. শোষণ, প্রান্তিক মানুষের বন্দিদশা এবং ধাঙড়-সর্দারের মনস্তত্ত্ব
এগুলি সমাজের কাছে বিক্রি হয়ে গেছে; ক্ষুধার কাছে জিম্মি হয়ে গেছে; রাজনৈতিক নেতার স্বার্থোদ্ধারে উৎসর্গীকৃত হয়েছে। ধর্ম, রাজনীতি, প্রশাসন মিলে-মিশে সমাজের নিম্নবিত্তকে শাসন-শোষণ করছে। ফলে নিজের ওপরও এই গরিবদের নিয়ন্ত্রণ নেই। ধাঙড় ব্যক্তিটি অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে বিদ্যমান সমাজের এই অসঙ্গতি প্রসঙ্গে নিম্নরূপ মন্তব্য করেছে :
“আর এই যে হাত, নেতাদের দখলে কবেই চলে গেছে!নেতারা যখন ময়দানে বক্তৃতা ঝাড়ে,এই হাত দুটো তখন তালি মারে, জোর তালি!আর এই চোখ, এই যে চোখজোড়া দেখছেন,কিছুদিন থেকে পাড়ার মসজিদের ইমাম সাহেবকবলা করে নিয়েছেন -” (কাব্যনাট্যসমগ্র: ৪৮৬)
আলোচ্য নাটকে ধাঙড় ও ধাঙড় সর্দারের পারস্পরিক সম্পর্ক উপস্থাপনের মাধ্যমে নাট্যকার রাজনীতির আরেকটি মৌল দিক তুলে ধরেছেন। এটি হল – দুর্বলের ওপর সবলের আধিপত্যের রাজনীতি। ধাঙড়-সর্দার সিটি করপোরেশনের নিম্নপদস্থ চাকুরীজীবী। কিন্তু ধাঙড়ের তুলনায় কিছুটা উঁচুশ্রেণির হওয়ায় তার কণ্ঠ ও ভাষায় রয়েছে প্রভুত্বের বলিষ্ঠতা। ধাঙড়কে কারণে-অকারণে পরিহাস করা, তার দুর্বলতা নিয়ে তামাশা করা, এমনকি তুচ্ছ কারণে কথায় কথায় তাকে চাকুরিচ্যুত করার হুমকি দেওয়া – প্রভৃতির মাধ্যমে সমাজে বিদ্যমান দরিদ্রশ্রেণির মধ্যেও ভেদাভেদের দৃশ্যটি পরিষ্কার হয়েছে। ধাঙড়সর্দার এখানে নিম্নবিত্ত, গরিব। কিন্তু মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১৯০৮-১৯৫৬) ‘পদ্মানদীর মাঝি’ (১৯৩৬) উপন্যাসের কুবের মাঝির মতো এখানে ধাঙড় লোকটি গরিবের মধ্যেও গরীব; ছোটলোকের মধ্যেও ছোটলোক। যে কারণে সে অনায়াসেই ধাঙড় সর্দারকর্তৃক তিরস্কৃত হওয়াকে স্বাভাবিক বলে ধরে নিয়ে তার সঙ্গে জীবনের একান্ত বিষয়গুলো বিনিময় করেছে।
তাকে আপন ভেবে শুনিয়েছে জীবনের হতাশা, ব্যর্থতা আর স্বপ্নের অজানা আলেখ্য। ধাঙড়সর্দারও ধাঙড়ের জীবনকথা শ্রবণ করে তার প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেছে, সান্ত্বনাবাক্যে তাকে আশ্বস্ত করবার চেষ্টা করেছে, এবং তাকে সামরিক-মদদপুষ্ট সরকারের শাসনামলে প্রকাশ্যে রাজনৈতিক আলাপ করা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়ে সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছে। হতে পারে ধাঙড়সর্দার নিজেও একদিন ধাঙড়ের মতোই মানবেতর বস্তিজীবন পার করে এসেছে। তাই এ জীবনের অলি-গলি তার জানা। এ জীবনের কষ্টগুলো, দুঃখগুলো অতি পরিচিত। কিন্তু জীবন পরিক্রমায় আজ অপেক্ষাকৃত কিছুটা উঁচু অবস্থানে উঠে সে অপরতাবোধে (otherness) ভুগছে। কেননা সে সমাজে বিদ্যমান শ্রেণি-বিভাজনচক্রের বাস্তবতার আলোকে দেখেছে – উঁচুতলার মানুষেরা নিচুতলার মানুষের সঙ্গে কী ভাষায় আলাপ করে, তাদের কতটা হীন দৃষ্টিতে দেখে থাকে।
ফলে সে ধাঙুরের প্রতি সংবেদনশীল হয়েও নিজ অবস্থান, পদ আর শ্রেণির কথা সচেতনভাবে মাথায় রেখে ধাঙড়ের সঙ্গে প্রভুত্বসুলভ আচরণ করে গেছে। এর বাস্তব প্রমাণ নাটকের মাঝখানে যখন দামি গাড়ি চাপিয়ে স্ত্রীলোকটি ঘটনাক্ষেত্রে আসে, তখন সর্দার কথাপ্রসঙ্গে তাকে আপাত মাতাল ধাঙর লোকটির সরল-কোমল হৃদয় প্রসঙ্গে জানাতে ভোলে না। কিন্তু সে আবার গাড়িওয়ালা নারীর শ্রেণি-অবস্থান আন্দাজ করে তাকে তুষ্ট করতে নিমিষেই ধাঙড়কে চাকুরিচ্যুত করার ঘোষণা দেয়। এমনকি উচ্চবিত্ত নারীটিকে খুশি করতে নিজেই উদ্যোগী হয় রাস্তা থেকে জঞ্জাল সরানোর কাজে। সৈয়দ শামসুল হক আলোচ্য নাটকের স্বল্প পরিসরে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে শ্রেণিবিভক্ত সমাজের মন ও মনস্তত্ত্ব পাঠক-দর্শকের সম্মুখে উপস্থাপন করেছেন।
৭. নাগরিক জীবনের অবক্ষয়, মৃত ময়ূরের প্রতীক এবং সামরিক বিলাসিতা
আবার, ধাঙড় চরিত্রটির আরেকটি সংলাপের মাধ্যমে সৈয়দ শামসুল হক সমকালীন সমাজমানসের প্রতিচ্ছবি অংকন করেছেন নিম্নরূপে:
“সারা শহর আবর্জনায় বুজে এসেছে। গন্ধ! গন্ধ!কী দুর্গন্ধ রে বাবা!গলা নোংরা পচা আবর্জনার পাহাড়!*শহরটাকে চেপে ধরেছে। […] *নাহ, কাক তো কাক! মানুষও আজকাল!কেউ কাউকে দেখে না! সাহায্য করে না!উহ, দুর্গন্ধ! নাক চেপেও নিস্তার নেই।” (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৮২)
বস্তুত, ধাঙড় লোকটি নিজ জীবন-যন্ত্রণায় আত্মমগ্ন হয়ে সবকিছু ভুলে থাকতে চায়; ভুলে যেতে চায় জাগতিক সব কলরব। যে কারণে চারপাশের আওয়াজ তাকে প্রচণ্ড উত্যক্ত ও বিরক্ত করে তোলে। তার এই বিরক্তি যে কেবল বিরুদ্ধ প্রকৃতির ওপর নয়, বরং শহরের মানুষরূপী অমানুষের ওপর – তা অচিরেই প্রকাশ পায়। তার ভাষায় গলা-পচা আবর্জনার পাহাড় শহরটাকে চেপে ধরেছে। চারপাশে কোনো পবিত্রতা নেই, শুদ্ধতা নেই। তীব্র দুর্গন্ধময় আবর্জনায় শহরটা যেন বুজে এসেছে। কিন্তু এগুলো পরিষ্কার করার লোকের বড়ো অভাব। যাদের দায়িত্ব এই আবর্জনা ধুয়ে মুছে সাফ করার – তারা কেউই তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করছে না।
বস্তুত, এই ময়লা কেবল দৃশ্যমান সড়কের ময়লা নয়; বরং নাগরিক মানুষের দূষিত হৃদয়; যেখান থেকে মানবিকতা, সততা, কর্মনিষ্ঠা উধাও হয়ে গেছে; জেঁকে বসেছে প্রতারণা-প্রবঞ্চনা-কুটিলতা। নাট্যকারের মতে, মানুষ আজকাল কাকের থেকেও নিকৃষ্ট প্রাণী হয়ে উঠেছে। মৃত ময়ূরটি আলোচ্য নাটকে একটি প্রতীক মাত্র। তাই সেটিকে ঘিরে বাস্তবতার পাশাপাশি নাটকীয় মুহূর্তও তৈরি হয়েছে একাধিকবার। যেমন, একটি পর্যায়ে ধাঙড় সর্দার অবিশ্বাসের সঙ্গে প্রত্যক্ষ করছে – মরা ময়ূরটি ক্রমশ ফুলে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে। এ দ্বারা নাট্যকার সমকালীন সময়ে বিনষ্ট রাজনীতি ও বিপর্যন্ত সমাজে মানুষের বিবেকহীন হয়ে নির্জীব প্রাণে পরিণত হবার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন।
আর এরই মধ্যে চলেছে মানুষের স্বার্থান্ধ হয়ে বিলাসিতা পূরণের কারবার। বস্তুত, প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য ধ্বংস করে প্রকৃতিকে বিলাসের সামগ্রী করে তোলার ইতিহাস মানবসভ্যতায় বহুদিনের। যেমন, ময়ূরের পালক কলম কিংবা পাখারূপে প্রাক্তন রাজা-বাদশাহরা তাদের নিত্যদিনের কর্মযজ্ঞে বিলাস সামগ্রীরূপে ব্যবহার করতো। কিন্তু এখন রাজতন্ত্রের বদলে ক্ষমতায় আসীন সামরিক মদদপুষ্ট শাসক। যে সামরিক বাহিনী দেশের প্রতিরক্ষায় সদাসর্বদা নিয়োজিত থাকার কথা, অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে তারা বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে প্রভাব বিস্তার করছে। তারা কখনো সরাসরি শাসকের ভূমিকা নিয়েছে, আবার কখনো কখনো ছায়া শাসক হয়ে ক্ষমতাসীন দলকে প্রভাবিত করে নিজেদের ব্যাক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থ হাসিল করেছে।
পূর্বেকার রাজা-বাদশাহদের বিলাসী জীবন এখন পরিণত হয়েছে সামরিক বাহিনীর বিলাসী জীবনে। অথচ জনগণ রয়ে গেছে সেই আগের মতোই বঞ্চিত, ক্ষুধার্ত, নির্যাতিত। সৈয়দ শামসুল হক ‘মরা ময়ূর’ নাটকে রাজনীতির এই বিনষ্ট দিকটি অত্যন্ত চমৎকারভাবে উপস্থাপন করেছেন সর্দার চরিত্রটির সংলাপে, যেখানে একদিকে যেমন সমকালীন স্বার্থান্ধ রাজনৈতিক চিত্র উপস্থাপিত হয়েছে, অন্যদিকে তেমনি প্রকৃতিকে ধ্বংস করে মানুষের স্বার্থপরতার নগ্নরূপটিও প্রকাশিত হয়েছে মৃত ময়ূরটির দ্রুত পালক খসানোর ঘটনায়। ময়ূরটির মরেও নিস্তার নেই। ধাঙড় সর্দারের প্রাসঙ্গিক সংলাপ উল্লেখ করা যেতে পারে :
“তাজ্জব মরা! মরেছে তো মরেছে,প্রতি মুহূর্তে ফুলে ডাবল হচ্ছে।আমার হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে।আর, মানুষেরাও যেমন!এরই মধ্যে ময়ূরের পালক তুলে সাফ!রোজ তো আর ময়ূর পাওয়া যায় না।ময়ূরের পালক দিয়ে চমৎকার কলম হয়। হাত পাখা হয়।আগে রাজা বাদশারা ময়ূরের পাখা দিয়ে হাওয়া খেতেন,এখন তো মিলিটারি জেনারেলদের ভাগ্যেময়ূর পাখার হাওয়া খাওয়া!অবাক কী! রাত পোহাতে না পোহাতেইময়ূরের পালক সব উপড়ে নিয়ে গেছে।” (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৮৩)
৮. বাক-স্বাধীনতা হরণ, মধ্যপ্রাচ্যমুখী প্রবাসজীবন ও রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিভঙ্গ
আবার, ধাঙড় চরিত্রটি একদা দুর্ভিক্ষে পতিত হয়ে অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের আশায় সস্ত্রীক শহরে এসেছিল। কিন্তু এক্ষেত্রেও সে প্রতারণার শিকার হয়। তার স্ত্রী এক গাড়িওয়ালার প্রলোভনে তাকে ত্যাগ করে। স্ত্রী চলে যাবার বেশ কিছুদিন পরে একবার ধাঙড়ের সঙ্গে তার দেখা হয় সংসদ ভবনের রাস্তায়। তখন সে আর সেই সাদামাটা গরিব ঘরের মেয়ে নয়; বড়লোক রাজনীতিবিদের সান্নিধ্যে এসে সে নিজেকে আমূল বদলে নিয়েছে। তাকে দেখে ধাঙড়ের বিস্ময়ের সীমা থাকে না। সংসদভবনের সামনে থাকা খাঁচাভর্তি আশ্চর্যসুন্দর পাখিগুলোর মতোই তার বউকে মনে হয়। বড়লোকেরা বিলাসের নেশায়, শখে বনের মুক্ত পাখিকে যেমন খাঁচায় পোষে, তার স্ত্রীও তেমনি উন্নতজীবনের মোহে, লোভ-লালসার খাঁচায় বন্দি হয়েছে।
এ পর্যায়ে ধাঙড় যখন রাজনীতিবিদদের নিয়ে শ্লেষাত্মক সংলাপ উচ্চারণ করে, তখন ধাঙড়-সর্দার তাকে সতর্ক করে যে – এখন এমন একটি সময় ও সমাজ চলছে, যেখানে রাজনীতিবিদ নিয়ে সামান্য কথা বলাও গর্হিত অপরাধ। রাশিয়ার প্রসঙ্গ তো দূরে থাক, আমেরিকা, চীন, ভারত, ইসরায়েল, আফ্রিকা কারো নামই নেয়া যাবে না। কেননা, ক্ষমতাসীন সরকারের পছন্দের তালিকায় এরা নেই। এদের কথা তুললেই তাকে বিরুদ্ধ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ভাবা হবে এবং প্রতিশোধ নেয়া হবে। এর দ্বারা সমকালীন রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং লোকজনের বাক-স্বাধীনতা হরণের বাস্তব পরিস্থিতি সহজেই অনুমান করা যায়। ধাঙড়সর্দারের বক্তব্য উল্লেখ্য :
“সর্দার।চুপ ! একবারে চুপ!রাজনীতি তুলবে না!গ্যাড়াকলে পড়লেতখন বোলো না।আমি তোমাকে সাবধান করিনি।কান পেতে আছে। চারদিকে!আর, ওই রাশিয়া —ভুলেও কখনো উচ্চারণ করবে না।না আমেরিকা, না চীন —মুখ এক্কেবারে খুলবে না।ইসরায়েল, আফ্রিকা — উঁহু, চুপ!মুখ বন্ধ রাখবে!এমনকি ভারতের ব্যাপারেও।” (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৯০)
উপর্যুক্ত সংলাপের মাধ্যমে সমকালীন সরকারের বৈদেশিক-নীতিও অনুমান করা যায়। পাশ্চত্যের আধুনিক দেশগুলোর তুলনায় তাদের পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য ও পছন্দ ছিল মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলো। মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোকে বশে নিতে তৎকালীন ক্ষমতাসীন সরকার ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে পাকিস্তানের মতোই রাষ্ট্র পরিচালনা করতে চাইতো। এ-সময়ে সাধারণ মানুষ কর্মসূত্রে মধ্যপ্রাচ্যে যেতে শুরু করেছে। একপর্যায়ে ধাঙড়ও এই স্রোতে গা ভাসাতে চায়। সেও স্বপ্ন দেখে আরবদেশে গিয়ে প্রচুর টাকা আয় করবে; এবং দেশে ফিরে প্রথমেই একটি মস্তবড় শাদা গাড়ি কিনবে। কেননা, তার বিশ্বাস এই গাড়ি আর নগদ অর্থই তার বৌকে ছিনিয়ে নিয়ে তাকে নিঃস্ব করে দিয়েছে। সমকালীন রাষ্ট্রযন্ত্রের এই রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, বাক-স্বাধীনতাহরণ এবং মাত্রাতিরিক্তভাবে আরব রাষ্ট্রগুলোর প্রতি অনুরক্তি সর্দার ও ধাঙড়ের নিম্নোক্ত সংলাপে প্রতীয়মান হয়েছে চমৎকারভাবে :
“লোক। আর দুবাই ?বলবো না ?আবুধাবি ?সৌদি আরব ?শুনেছি আমাদের এখান থেকেলোকেরা পাগলের মতো আরব দেশে যাচ্ছে।বিস্তর রিয়াল দিরহাম দিনার কামাচ্ছে।আপনার জানাশোনা কেউ আছে ?দয়া করে আমাকে নবীর দেশেপাঠিয়ে দিন না ?আমিও টাকা কামাতে চাই।ইয়াব্বড় শাদা একটা গাড়ি কিনবো !” (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৯১)
প্রবাসে গিয়ে ধাঙড়ের প্রচুর অর্থোপার্জনের স্বপ্নে বাধ সাধে ধাঙড়সর্দার। তাকে বোঝায় আরব বিশ্বের দেশে টাকা আছে সত্যি, কিন্তু নিয়মের বিষয়টি এতই কড়া যে, সেখানে কর্মীদের কঠোর পরিশ্রম করতে হয়, এবং অবসরে সামান্য বিশ্রামকেও ওরা সহ্য করে না। বিশেষত সৌদি আরবে অপরাধের প্রকাশ্য সাজা হিসেবে মানুষের শিরশ্ছেদ হয়। ধাঙর লোকটি তখন সর্দারকে জানায় – সে তার মস্তক নিয়ে ততটা ভাবিত নয়, বিশেষত যেখানে পেটের ক্ষুধায় সে নিয়ত মৃত্যুর দিকে ধাবিত হচ্ছে।
এ পর্যায়ে সে সর্দার লোকটির কাছে আরও একটি গোপন কথা ফাঁস করে দেয়। সে জানায় তার বৌ তাকে ছেড়ে যাবার পূর্বে আশ্বাস দিয়ে গেছে – সে ফিরে আসার সময় অগাধ টাকা পয়সা নিয়ে আসবে; ধাঙড়কে আর না খেয়ে থাকতে হবে না; থাকার মতো ঘর হবে, অসুখে চিকিৎসা হবে। ধাঙড় লোকটি পরবর্তীকালে তার প্রাক্তন স্ত্রী ও বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে আগন্তুক নারীটিকেও তার পূর্ব আশ্বাস স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছে :
“মনে পড়ে ? – সেই শাদা গাড়িতে করে যাবার সময়তুমি আমাকে কী বলেছিলে ?বলেছিলে না তুমি আমার জন্যে ভাত আনবে,কাপড় আনবে,আমাকে তুমি ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে, পেটের শূল ব্যাথাটার চিকিৎসা করাবে,বুকের যক্ষ্মাটার জন্যে হাসপাতালে নেবে বলোনি?” (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৯৩)
বস্তুত, ধাঙড় লোকটির স্ত্রীর এই কথার সঙ্গে হুবহু মিলে যায় ভোটের আগে আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের প্রদত্ত প্রতিশ্রুতির সঙ্গে। প্রতিটি নির্বাচনের প্রাক্কালে তারা যখন ব্যক্তিগত প্রচারে কিংবা জনসভায় সাধারণ লোকের নিকট ভোট প্রার্থনা করেন – তখন অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষাসহ নানান মৌলিক অধিকার পূরণের অঙ্গীকার করে থাকেন। কিন্তু ক্ষমত আরোণের পর ভুলে যান জনগণকে দেয়া যাবতীয় প্রতিশ্রুতি তারা তখন আরাম-আয়েশে, বিলাস-ব্যাসনে মত্ত হয়ে নিজেদের স্বার্থে দেশ ও ক্ষমতাকে পরিচালনা করেন ঠিক যেমন করে ধাঙড়ের স্ত্রী ভুলে গেছে তার পূর্ব-প্রতিশ্রুতির কথা। এমন কি সে এখন ধাঙড় লোকটিকে চিনতেও পারছে না।
ধাঙড় যখন নারীটিকে উদ্দেশ্য করে বলে – তাকে কি সে সত্যিই চিনছে না, নাকি তামাশা করছে, তখন ধাঙড়ের এহেন বক্তব্যে নারীটি তাকে ধমক দেয় এবং বেয়াদব বলে আখ্যায়িত করে কেননা সে আর বিগত দিন, বিগত দিনের লোকজন কিছুই মনে রাখতে চায় না। ঠিক যেমন ক্ষমতায় থাকা রাজনীতিক সাধারণ জনগণকে ভুলে যেতে চায় তেমনি। বস্তুত, এভাবেই সৈয়দ শামসুল হক আলোচ্য নাটকে একটি মৃত ময়ূরের প্রতীকে সমকালীন বিনষ্ট রাজনীতি আর বিপন্ন সমাজবাস্তবতার ছবি এঁকেছেন।