১৯৭২-২০০০ কালসীমায় বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও গ্রামবাংলা

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ ১৯৭২-২০০০ কালসীমায় বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও গ্রামবাংলা। যা বাংলাদেশের ছোটগল্পে গ্রামজীবনের এর অন্তর্গত।

 

১৯৭২-২০০০ কালসীমায় বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও গ্রামবাংলা

 

১৯৭২-২০০০ কালসীমায় বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও গ্রামবাংলা

সত্তর, আশি ও নব্বই দশকের (১৯৭২-২০০০ কালপর্ব) বাংলাদেশের ছোটগল্পসমূহে গ্রামীণ পটভূমি আলোচনার পূর্বে এ সময়ের সামাজিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশে বিরাজমান পরিস্থিতির সংক্ষেপ উপস্থাপন প্রয়োজন। কেননা, আধুনিক মানুষের জীবন, কর্মকাণ্ড এমনকি মনঃস্তত্ত্ব ও রাষ্ট্রীয়-সামাজিক- অর্থনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে নিয়ন্ত্রিত হয়। সাহিত্য মানুষ ও তার জীবনেরই কথা বলে।

১৯৭১ সালের দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে তিরিশ লক্ষ প্রাণের পবিত্র রক্তে বিধৌত হয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হল। দীর্ঘ চব্বিশ বছরের অন্তরে লালিত আকাঙ্ক্ষা বাস্তব রূপ গ্রহণ করল। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে নিজের অস্তিত্বের জোরালো ঘোষণা দিল।

১৯৭২ সালের ৪ঠা নভেম্বর বাংলাদেশের জনগণ তাদের নির্ভীকতা, ধৈর্য্য ও মননশীলতার পরিচয় দিল। স্বাধীনতার মাত্র দশ মাসের মধ্যেই দেশের সংবিধান প্রণয়ন সম্ভব হল। সংবিধানের প্রস্তাবনায় ঘোষণা করা হল- “এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা করা হবে এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত করা হবে। “১

রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে আরো ঘোষণা করা হল- “মানুষের উপর মানুষের শোষণ থেকে মুক্ত, ন্যায়ানুগ ও সাম্যবাদী সমাজ লাভ নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হবে।”২ কৃষক, জেলে, শ্রমিক তথা খেটে খাওয়া মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষা সংক্রান্ত বিষয়ে সংবিধানের মৌলিক অধিকার সংক্রান্ত ৭ থেকে ২৫ নং অনুচ্ছেদের মধ্যে অনেকবার বলা হয়েছে।

১৬ নং অনুচ্ছেদে স্পষ্ট বলা হয়েছে- “গ্রামীণ উন্নয়ন ও কৃষি বিপ্লব: নগর গ্রামাঞ্চলের জীবনযাত্রার মানের বৈষম্য ক্রমাগতভাবে দূর করিবার উদ্দেশ্যে কৃষি বিপ্লবের বিকাশ, গ্রামাঞ্চলের বৈদ্যুতিকরনের ব্যবস্থা, কুটির শিল্প ও অন্যান্য শিল্পের বিকাশ এবং শিক্ষা, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও স্বাস্থ্যের উন্নয়নের মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলের আমূল রূপান্তর সাধনের জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা করিবেন। ৩

কিন্তু বাস্তবে বহুদিনের শোষণে রিক্ত ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে বিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে ও পরিচালনায় সরকার ব্যর্থ হলেন। ‘স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে বাংলাদেশের প্রধান সমস্যা ছিল আইন-শৃঙ্ক্ষলার মারাত্মক অবনতি। নতুন সরকারের জন্য এটি ছিল একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ।

দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধের পর নব্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত বাংলাদেশের নাগরিকদের প্রত্যাশা ছিল এমন একটি সমাজ যেখানে আইনের শাসন এবং জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তা থাকবে। কিন্তু ‘৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর ভারতীয় বাহিনীর কাছে পাকিস্তানীদের আত্মসমর্পনের পর বাংলাদেশের ভূ-খণ্ডে আইন-শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে চরম বিশৃঙ্খলা বিরাজ করে। মুক্তিবাহিনী ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের শত শত সংগঠন ও ব্যক্তি বেআইনি স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে দেশব্যাপী স্ব-স্ব এলাকায় স্বেচ্ছাচারিতা চালাতে থাকে।”৪

সংবিধানে জাতীয় সংসদের প্রাধান্য স্বীকৃত হলেও দেশ শাসনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলই হয়ে উঠল প্রশাসনিক অবকাঠামোর নিয়ন্ত্রন ও পরিচালনার মুখ্য নিয়ামক। সরকার ব্যবস্থায় আওয়ামী লীগ দলের অবস্থান সুরক্ষিত করতে চেষ্টা করল। বস্তুতঃ বিরোধী দলগুলোর ঐক্যবদ্ধ ক্ষমতা তখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবিসংবাদিত জনপ্রিয়তা ও স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্রবাহিনী হিসেবে আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তি দৃঢ় ছিল।

আওয়ামী লীগ সরকারের ব্যর্থতার নিয়ামক হিসেবে কিছু অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণ উল্লেখ করা যায়। ১৯৭২ সালে আরব-ইসরাইল যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে অভাবনীয় হারে তেলের মূল্য বৃদ্ধি পায়, ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে মুদ্রাস্ফীতি এবং এর ভয়াবহ প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে।

অন্যদিকে, ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের শতকরা ৮৬ ভাগ শিল্প প্রতিষ্ঠান ও ৮৭ ভাগ বৈদেশিক বাণিজ্য জাতীয়করণ করা হয়। এ সকল জাতীয়কৃত প্রতিষ্ঠানের প্রশাসকদের অনেকেই ছিলেন দলীয় কর্মী ও তাদের অনুগ্রহভাজন ব্যক্তি। প্রশাসনিকক্ষেত্রে তাদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার অভাব এবং দুর্নীতি দেশের অর্থনৈতিক সঙ্কটের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এছাড়া দেশে চোরাচালান ও কালোবাজারী ব্যাপক হয়ে ওঠে। ফলে একদিকে দেশে চরম খাদ্যাভাব দেখা দেয় এবং অন্যদিকে কিছু সংখ্যক ব্যক্তি রাতারাতি প্রচুর সম্পদের মালিক হয়ে ওঠে।

উপরন্তু ‘৭৪-এর শেষভাগে মারাত্মক বন্যায় দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো প্রায় ভেঙে পড়ে এবং দেশে দুর্ভিক্ষাবস্থা দেখা দেয়। দেশের অর্থনৈতিক সঙ্কট ঘনীভূত হওয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক সঙ্কট দেখা দেয়। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ), পূর্ববাংলা সর্বহারা পার্টি, ইস্টবেঙ্গল কম্যুনিস্ট পার্টি-মার্কসবাদী-লেনিনবাদী, পূর্ববাংলা সমাজবাদী দল- মার্কসবাদী-লেনিনবাদী প্রভৃতি বৈপ্লবিক দল অর্থনৈতিক মুক্তি আনয়নের জন্য বাংলাদেশে ‘দ্বিতীয় বিপ্লব’ ঘটাতে সচেষ্ট হয়ে ওঠে। এতে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়ে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক-সামাজিক সঙ্কট নিরসনকল্পে বাংলাদেশে বহুদলীয় ব্যবস্থার পরিবর্তে একদলীয় ব্যবস্থার প্রবর্তন করে। বাংলাদেশ কৃষক-শ্রমিক আওয়ামীলীগ নামক একটি জাতীয় দল গঠন করলেন এবং দেশে জরুরী আইন ঘোষণা করলেন। ১৯৭৫-এর ২৫ শে জানুয়ারি চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থার পরিবর্তে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার পদ্ধতি প্রবর্তিত হল। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট রাতে দেশের সামরিকবাহিনীর একাংশের অভ্যুত্থানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে
সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করা হল এবং মুজিব সরকার অপসৃত হল।

 

১৯৭২-২০০০ কালসীমায় বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও গ্রামবাংলা

 

১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বর মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান দেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করলেন। ১৯৭৭ সালের জানুয়ারিতে তিনি শাসননীতিতে কিছু পরিবর্তন আনলেন। এ সময়কে শাসনযন্ত্রের বেসামরিকীকরণ প্রক্রিয়া বলে চিহ্নিত করা যায়। তিনি দেশের রাজনৈতিক দল, সংবাদপত্র প্রভৃতির উপর থেকে পূর্বতন সরকারের দেয়া নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলেন এবং দেশে সংসদীয় পদ্ধতির সরকারের পুনঃপ্রতিষ্ঠার আশ্বাস দিলেন। ১৯৭৭ সালের জানুয়ারী মাসে প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটে দেশের ৪,৩৫২টি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।”

অর্থনৈতিক কৌশল হিসেবে ১৯৭১-৭৫ সময়কালে শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনকালে উন্নয়নকৌশল হিসেবে উৎপাদন কর্মকা েরাষ্ট্রীয় অংশগ্রহণের উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। ১৯৭৫ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পর পূর্ববর্তী সরকার হতে ভিন্নতর উন্নয়ন কৌশল অবলম্বন করল। এ নতুন নীতির লক্ষ্য ছিল বেসরকারি খাতের উৎসাহ প্রদান, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং উৎপাদনক্ষেত্রে অধিকতর প্রবৃদ্ধি।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (১৯৭৩-৭৮) প্রণয়ন করা হয়েছি। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান প্রথম পরিকল্পনাকে সার্বিকভাবে বাতিল না করে পরবর্তী তিন বছরের (১৯৭৫-৭৮) ঞয়ত্বর ণবধৎ ঐধৎফ ঈড়ত্ব চষধহ জন্য প্রণয়ন করেন। এতে বেসরকারি খাতে বিশেষ করে বেসরকারি পর্যায়ে শিল্পোন্নয়নের জন্য অধিকতর সম্পদ বরাদ্দ ও গুরুত্ব প্রদান করা হয়। ৫

জিয়া সরকার ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যানদের সম্মানী ১০০ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ৩০০ টাকা করলেন এবং ইউনিয়ন পরিষদের ক্ষমতা বৃদ্ধি করলেন। রাষ্ট্রপতি জিয়া জনগণের স্বনির্ভরতা অর্জন ও ব্যাপক কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে খাল খনন কর্মসূচীর ব্যবস্থা করলেন।

এছাড়াও নানামুখী উন্নয়ন কর্মসূচী যেমন যুব কমপ্লেক্স, গ্রাম সরকার প্রভৃতির মধ্য দিয়ে জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণের পথ প্রশস্ত করেন। কিন্তু বাস্তবিক গ্রামসরকার বা যুব কমপ্লেক্স স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠতে পারেনি। কেননা, এসব প্রতিষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন তিনি স্বয়ং, ফলে তা প্রাতিষ্ঠানিকতার গতিতে প্রাণবন্ত হয়ে উঠেনি। ১৯৮১ সালের ৩০ শে মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সামরিক বাহিনীর একাংশের বিদ্রোহজনিত সঙ্কটে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে নিহত হলেন।

সাংবিধানিক ধারা অনুযায়ী নির্বাচনের মাধ্যমে ১৯৮১ সালের ১৫ই নভেম্বর বিচারপতি আবদুস সাত্তার বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। কিন্তু মাত্র ৪ মাস পরেই সাত্তার সরকারকে পদচ্যুত করে জেনারেল হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ ক্ষমতায় আসীন হন এবং দেশে পুনরায় সামরিক শাসন বহাল হয়।

এরশাদ সরকার সনাতন থানা প্রশাসনকে উন্নীত করেন। থানাকে শাসন ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করে, থানা পর্যায়ে প্রচুর সংখ্যক দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তা নিয়োগ করে এবং থানা পরিষদে নির্বাচিত প্রধানের মাধ্যমে উপজেলা ব্যবস্থার সূত্রপাত করেন। এছাড়া দেশের কিছু মহকুমাকে জেলায় উন্নীত করা হয়। ১৯৮৪ সালের মধ্যে রাষ্ট্রায়াত্ত শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশ বেসরকারী মালিকানায় ফেরত দেয়া হয়।

খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন ও কৃষিখাতকে অধিক উৎপাদনমুখী করার লক্ষ্যে সেচব্যবস্থার অগ্রগতি, কৃষিঋণ বিতরণ, উত্তম বীজ ও সারের ব্যবহারের উপর গুরুত্বারোপ এবং কৃষকদের উৎসাহদানের জন্য কৃষিপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি করে কৃষির সার্বিক উন্নতির চেষ্টা করেন।

ভূমি সংস্কারের মাধ্যমে কৃষকদের অবস্থা উন্নত করার লক্ষ্যে ভূমি মালিকানার সীমা নির্ধারণ, উদ্বৃত্ত জমি ভূমিহীনদের মধ্যে বণ্টন, বর্গাচাষীদের অধিকার সংরক্ষণ, ভূমি শ্রমিকদের মজুরী নির্ধারণ প্রভৃতি পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। এছাড়া, গ্রামের জনগণের স্বাস্থ্যসেবা ও সুচিকিৎসা দানের জন্য উপজেলা পর্যায়ে আধুনিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। আদর্শ গ্রাম গঠনের লক্ষ্যে গুচ্ছগ্রাম প্রকল্প হাতে নেন ।

কিন্তু দেশে সামরিক শাসন জারির পর থেকে দেশ ক্রমাগত এক সর্বগ্রাসী সঙ্কট ও অনিশ্চয়তার দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। একদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি, অন্যদিকে প্রতিবছর পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ করের বোঝা জনজীবনকে পর্যুদস্ত করে তোলে। কৃষি উপকরণের ব্যক্তিকরণ, শ্রমিক স্বার্থবিরোধী আইন প্রণয়নের ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাপন দুঃসহ হয়ে ওঠে। বেহিসেবী আমদানির কারণে কৃষকদের আয় পড়তিমুখী হয় এবং তারা চরম দুরবস্থার শিকার হয়। “

খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যে কয়েক দফা পিছিয়েছে। হ্রাসকৃত এসব লক্ষ্যমাত্রা সাত বছরে বাস্তবের মুখ দেখেনি। ১৯৮৫ সালের মধ্যে ২ কোটি টন খাদ্যশস্য উৎপাদনের লক্ষ্যও কাটছাট করে ১ কোটি ৭৫ লাখ টনে নামিয়ে আনা হয়।”৬ অন্যদিকে মুষ্টিমেয় ব্যক্তির হাতে সঞ্চিত হয় সীমাহীন সম্পদ। বৈদেশিক সাহায্যের সিংহভাগ যায় সরকারি আনুকূল্য ভোগকারী আমলা, সামরিক কর্মকর্তা, একশ্রেণীর রাজনীতিবিদ এবং এরশাদ সরকার সৃষ্ট একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের হাতে। সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি পায় অকল্পনীয় হারে।

 

১৯৭২-২০০০ কালসীমায় বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও গ্রামবাংলা

 

রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বরাদ্দ হয় সামরিক, আধা- সামরিক ও সাধারণ প্রশাসন ক্ষেত্রে। জেনারেল এরশাদের শাসন আমলে স্থানীয় ও সাধারণ নির্বাচন মিলিয়ে বহুসংখ্যক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং প্রত্যেকটিতে ব্যাপক কারচুপি ও দুর্নীতি সংঘটিত হয়। বিদেশী পত্র- পত্রিকায় এ নির্বাচনকে ‘এক হাস্যম্পদ প্রহসন’ বলে চিহ্নিত করা হয়।

এ সময় নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি জনগণের বিশ্বাস ও আস্থার ভিত্তি শিথিল ও বিনষ্ট হয়। প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে উপজেলা ব্যবস্থা রচিত হয়, কিন্তু তা ব্যবহৃত হতে থাকে স্বৈরশাসনের ভিত্তি হিসেবে। অবশেষে ৯০-এর ডিসেম্বর মাসে এক গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এরশাদ সরকারের স্বৈরশাসনের পতন হয়। নব্বই-এর এ গণ-অভ্যুত্থান নানান দিক থেকে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ছিল।

এ আন্দোলনের রূপরেখা ছিল স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের পতন, বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দান, জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদ প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি। এ আন্দোলন পরিচালিত হয়েছে ঐকমত্যের ভিত্তিতে। সর্বদলীয় ছাত্রঐক্য থেকে শুরু করে দলীয় পর্যায় পর্যন্ত পরিব্যপ্ত ছিল ঐকমত্য। দেশের রাজনৈতিক দলসমূহ সরকার পতনের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলন পরিচালনা করে। ব্যাপক আন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর এরশাদ সরকারের পতন হয়।

৬ই ডিসেম্বর শাসনভার ন্যস্ত হয় বিচারপতি শাহবুদ্দিন আহমেদের হাতে। তিনি হন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান ও অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি। ১৯৯১ সালের ৬ই আগস্ট গৃহীত হয় দ্বাদশ সংশোধনী এবং দীর্ঘ ষোল বছর পর বাস্তবায়িত হয় জনগণের আকাঙ্ক্ষা, বাস্তবায়িত হয় সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা। ১৯৯১ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের জনগণ প্রথম অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে লাভ করে একটি সরকার।

১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপি ক্ষমতায় আসে। এ দলের চেয়ারপারসন ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পত্নি বেগম খালেদা জিয়া ২৩ মার্চ ‘৯১ তারিখে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।

ক্ষমতায় গ্রহণ করে তিনি ঘোষণা করেন যে, তাঁর সরকারের লক্ষ্য হবে গণমুখী প্রশাসন, সন্ত্রাসমুক্ত শিক্ষাঙ্গন প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণ। বেগম জিয়া সরকার কৃষি উন্নয়নকে অগ্রাধিকার খাত হিসেবে চিহ্নিত করেন। ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এছাড়া কৃষিঋণ মওকুফ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এছাড়া কৃষিঋণ সংক্রান্ত সার্টিফিকেট মামলা এবং ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির উন্নয়ন কর সংক্রান্ত সার্টিফিকেট মামলা স্থগিত করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

এরপর ১৯৯৬ সালের ১২ই জুন বাংলাদেশের জনগণ দ্বিতীয়বারের মত অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে একটি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার লাভ করল। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ক্ষমতা গ্রহণ করল। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ২৩ জুন ‘৯৬ তারিখে ক্ষমতায় আসীন হলেন।

শেখ হাসিনা সরকার কৃষকদের সহজ শর্তে ঋণ দেয়ার ব্যবস্থা করেন। কৃষকেরা তাদের পূর্ব ঋণ পরিশোধ না করে নতুন ঋণ গ্রহণের সুযোগ পায়। এমনকি বর্গাচাষীদের জন্যও ঋণপ্রদানের ব্যবস্থা হয়। এছাড়া শেখ হাসিনা সরকার গ্রামবাংলার অসহায় দরিদ্র ও বয়স্ক ব্যক্তিদের কল্যাণে প্রথমবারের মতো বয়স্কভাতা কার্যক্রম চালু করে।

স্বাধীনতা উত্তরকালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন পরিবর্তন হয়েছে, সমাজপ্রবাহে দেখা গিয়েছে নানান ভাঙাগড়া, জনগণের জীবনে শোষণ ও বঞ্চনার অবসান এবং অর্থনৈতিক মুক্তি ঘটেনি। ঢাকা, চট্টগ্রাম প্রভৃতি বড় বড় শহরকে কেন্দ্র করে একশ্রেণীর উচ্চবিত্ত ব্যক্তিদের বিলাসবহুল জীবনযাপন বৃদ্ধি পেয়েছে।

ঢাকা শহরের প্রবৃদ্ধিও লক্ষ্য করার মত। কিন্তু দেশের আর্থ-সামাজিক ন্যায়শাসনের স্বাভাবিকতায় এ প্রবৃদ্ধি বা বিলাসিতা নয়, এর পিছনে দাঁড়িয়ে আছে দুর্নীতি ও কালোবাজার। তাই দেশের সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে এ উন্নয়ন, এ প্রবৃদ্ধি সম্ভব হয়নি। বাংলার কোন মিল নেই। ” ৭ বিদেশী টাকায় সৃষ্ট এই ঝকঝকে তকতকে ঢাকা নগরীর সঙ্গে বিশাল

স্বাধীনতা পরবর্তীকালে ত্রিশ বছরে সরকার পরিবর্তন হয়েছে বেশ কয়েকবার। বিভিন্ন সরকারের আমলে জনগণের মৌলিক চাহিদাপূরণ সুনিশ্চিত, সামগ্রিক জনগণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এবং গ্রামবাংলার অবকাঠামোগত জীবনযাপনের মান উন্নয়নের লক্ষ্যে নানানরকম কর্মসূচি ও নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। কিন্তু সরকারের সঠিক তত্ত্বাবধায়ন ও মনোযোগের অভাব, সরকারি বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্নীতি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দদের স্বার্থান্ধতায় এসকল পরিকল্পনা, কর্মসূচি ও নীতিমালার সুষ্ঠু ও সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন কখনও দেখা যায়নি।

এ জন্য বাংলার গ্রামগুলি সামগ্রিক জনজীবনের কোন পরিবর্তন হয়নি। অবকাঠামোগত কিছু উন্নতি, রাস্তাঘাটের কিছু সুব্যবস্থা, আংশিক বিদ্যুতায়ন, পূর্বের তুলনায় শিক্ষার হারের কিছু বৃদ্ধি হয়তো বা হয়েছে। কিন্তু গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষ এখনও নিজ অধিকার সম্বন্ধে অসচেতন কিংবা নিরক্ষর দরিদ্র গ্রামজনতা তাদের ন্যায্য মৌলিক অধিকার সম্বন্ধে ধারণাহীন। তারা আগের মতোই জোতদার মহাজন দ্বারা শোষিত ও পীড়িত এবং রাজনৈতিক ফড়িয়া ও দালাল এবং ধর্মব্যবসায়ীদের দ্বারা বিভ্রান্ত।” ৮

 

 

১৯৭২-২০০০ কালসীমায় বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও গ্রামবাংলা

 

দারিদ্র্যক্লিষ্ট গ্রামীণ কৃষকেরও জীবনপদ্ধতি বদলায়নি। এখনও তারা প্রকৃতিনির্ভর সনাতন কৃষিপদ্ধতিতেই অভ্যস্ত। কৃষি যন্ত্রপাতিও সনাতন। এখনও গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে নির্যাতিত-নিপীড়িত হচ্ছে নারী সমাজ। তাদের প্রতিবাদের ভাষা জানা নেই। এখনও একটি শিশুর জন্ম ও বেড়ে ওঠাতে ব্যবহৃত হয় না আধুনিক বৈজ্ঞানিক কোন স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে।

এখন গ্রামবাংলায় নেই আধুনিক চিকিৎসার সুব্যবস্থা। এই বিষয়গুলিই নানান অভিক্ষেপে আলোচ্য কালপর্বের গল্পকারদের বিভিন্ন গল্পে এসেছে। বিংশ শতাব্দীর শেষ তিন দশকে প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের উৎকর্ষের যুগে নগরমুখী সাহিত্যিকের গ্রামবাংলার এই চিত্রকে তাদের রচনায় সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেননি। বরং তাদের সংবেদনশীল ও অনুভূতিপ্রবণ শিল্পীমানস এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার উপলব্ধি থেকে আঘাত হেনেছেন গ্রামীন মানুষের দুর্দশার মর্মমূলে।

তথ্যনির্দেশ ঃ

১. গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান;

২. গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান;

৩. গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান; ১৬ নং অনুচ্ছেদ।

৪. বাংলাদেশের উন্নয়নের ইতহাস (নওয়াব সলিমুল্লাহ থেকে খালেদা জিয়া): আবুল কাসেম হায়দার, সোহেল মাহমুদ

প্রকাশকাল : ২০০৩ রিদম প্রকাশনা সংস্থা; পৃষ্ঠা – ২৫৩।

৫. বাংলাদেশের উন্নয়নের ইতহাস (নওয়াব সলিমুল্লাহ থেকে খালেদা জিয়া): আবুল কাসেম হায়দার, সোহেল মাহমুদ;

প্রকাশকাল : ২০০৩ রিদম প্রকাশনা সংস্থা; পৃষ্ঠা – ২৮২।

৬. বাংলাদেশের উন্নয়নের ইতহাস (নওয়াব সলিমুল্লাহ থেকে খালেদা জিয়া): আবুল কাসেম হায়দার, সোহেল মাহমুদ;

প্রকাশকাল : ২০০৩ রিদম প্রকাশনা সংস্থা; পৃষ্ঠা- ৩১৯

৭. আহমদ কবির ‘স্বাধীনতা-উত্তর বাংলা সাহিত্যের রূপান্তর বিষয় ও প্রকরণ প্রসঙ্গ- ছোটগল্প’; ‘একুশের প্রবন্ধ ‘৮৮’;

ফেব্রুয়ারি ১৯৮৮; বাংলা একাডেমী, ঢাকা। পৃষ্ঠা-৪৫।

৮. আহমদ কবির স্বাধীনতা-উত্তর বাংলা সাহিত্যের রূপান্তর বিষয় ও প্রকরণ প্রসঙ্গ- ছোটগল্প’; ‘একুশের প্রবন্ধ ‘৮৮’;

ফেব্রুয়ারি ১৯৮৮; বাংলা একাডেমী, ঢাকা। পৃষ্ঠা-১৫।

Leave a Comment