মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে নারী চরিত্র

বাংলা কথাসাহিত্যে নারীভাবনার চিরাচরিত ও প্রথাগত সংস্কারকে ভেঙে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯০৮–১৯৫৬)। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাবালু রোমান্টিকতা কিংবা শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের করুণ রসে সিক্ত, অতি-সহনশীল ও আত্মত্যাগী নারী রূপায়নের বিপরীতে তিনি সাহিত্যমঞ্চে হাজির করেছেন নিরাভরণ, রক্তমাংসের ও বিজ্ঞানসম্মত চেতনায় গড়া বাস্তববাদী নারী চরিত্র। বিজ্ঞানের প্রখর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, মার্কসীয় শ্রেণিচেতনা এবং ফ্রয়েডীয় গভীর মনস্তত্ত্বের আলোকে তিনি দেখিয়েছেন যে, সমাজের মধ্যবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্ত নারী কেবল কোনো নিছক কাব্যিক রূপক বা ভক্তির আধার নয়; বরং তারা অর্থনৈতিক শোষণ, পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর অদেখা শেকল এবং বেঁচে থাকার কঠিনতম অস্তিত্ব সংগ্রামের মুখোমুখি এক একটি জীবন্ত সত্তা।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসসমূহে (যেমন: ‘জননী’, ‘জীবনের জটিলতা’, ‘শহরতলী’, ‘অহিংসা’ ও ‘চতুষ্কোণ’) অর্ধশতকের কাছাকাছি নারী চরিত্রের সমাবেশ ঘটেছে। সংখ্যাগত বিচারে ‘জননী’ উপন্যাসে নারীর উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি (১৩টি চরিত্র) এবং ‘জীবনের জটিলতা’ উপন্যাসে সবচেয়ে কম (৬টি চরিত্র)। তাঁর উপন্যাসের অধিকাংশ নারীই পেশাগতভাবে গৃহিণী, যারা পুরুষশাসিত সমাজব্যবস্থায় কোনো অর্থনৈতিক পারিশ্রমিক ছাড়াই আমরণ অদৃশ্য শ্রম দিয়ে যান। তবে এই চিরাচরিত কাঠামোর ভেতরেই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তৎকালীন সময়ের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা মেনে নারীদের নানা ভিন্নমাত্রিক পেশায় ও সামাজিক ভূমিকায় উপস্থাপন করেছেন—যার মধ্যে রয়েছে গৃহপরিচারিকা, নার্স, সংগীত শিক্ষিকা, ছাত্রী, সমাজকর্মী থেকে শুরু করে মেসের পরিচালক ও শ্রমিক নেত্রীর রূপ। এই চরিত্রগুলো কখনোই প্রথাবদ্ধ রূপকথার ছাঁচে বন্দী থাকেনি; বরং লেখকের প্রখর ও শাণিত দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তারা প্রচলিত সমাজের সংকীর্ণ খোলস ভেঙে নিজেদের অধিকার ও স্বকীয়তা প্রকাশে সচেষ্ট হয়েছে।

মানিকীয় নারীভাবনার সবচেয়ে বৈপ্লবিক দিকটি উন্মোচিত হয়েছে ‘মাতৃত্ব’ ও ‘জননী-সত্তা’র চিত্রায়নে, যার সার্থকতম প্রতীক ‘জননী’ উপন্যাসের ‘শ্যামা’। বাংলা সাহিত্যসহ বিশ্বসাহিত্যের এক বৃহৎ অংশে ‘মা’ বা ‘জননী’কে অতিমানবিক দেবীর আসনে বসিয়ে তাঁর জাগতিক চাওয়া-পাওয়া, ঈর্ষা, কাম বা মানবিক ভুলত্রুটিকে আড়াল করার এক সার্বিক প্রবণতা ছিল। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এই অতিপ্রাকৃত দেবীত্বকে ছাঁটাই করে জননীকে এনে দাঁড় করিয়েছেন কঠিন বাস্তবতার ভূমিতে। তাঁর আঁকা শ্যামা কোনো কাল্পনিক প্রতিমা নয়—সে একদিকে সন্তানের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য মূল্যবোধ বিসর্জন দিতে, চুরি করতে কিংবা কঠোর হতে পিছপা হয় না, অন্যদিকে প্রাত্যহিক জীবনে প্রতিবেশী ও পুত্রবধূর প্রতি ঈর্ষা, দারিদ্র্যের হীনমন্যতা এবং দাম্পত্য সুখের অপূর্ণতায় ছটফট করে। মাক্সিম গোর্কির ‘মা’ বা শওকত ওসমানের ‘জননী’র দরিয়াবিবির মতো মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের শ্যামাও অস্তিত্ববাদের এক অনন্য নিদর্শন, যার কাছে নীতিবাক্যের চেয়ে সন্তান ও পরিবারের টিকে থাকাই মূল অগ্রাধিকার।

একইভাবে বকুল, মন্দা, সুপ্রভা, যশোদা কিংবা সরসীর মতো চরিত্রগুলোর মধ্য দিয়ে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় দেখিয়েছেন কীভাবে প্রতিকূল সামাজিক আবহে একজন নারী বধূ থেকে শক্ত গৃহিণীতে, কিংবা প্রেমিকা থেকে কঠোর বাস্তববাদীতে রূপান্তরিত হয়। বয়স ও পরিবেশের পরিবর্তনের সাথে সাথে নারীর রূপান্তরের এই সূক্ষ্ম সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক গ্রন্থিগুলো উন্মোচনের মধ্য দিয়েই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে নারী চরিত্রসমূহ কেবল সমকালীন সমাজের প্রতিচ্ছবিই হয়ে ওঠেনি, বরং বাংলা সাহিত্যে নারীবাদের এক বস্তুনিষ্ঠ, কালজয়ী ও গভীর অর্থবহ দলিলে পরিণত হয়েছে।

 

নারী চরিত্র পর্ব ১

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে নারী চরিত্র

 

নারী চরিত্র পর্ব ১

 

আমাদের আলোচিত উপন্যাসগুলোতে নারী চরিত্রের সংখ্যা প্রায় অর্ধশত। এর মধ্যে ‘অনন উপন্যাসে নারী চরিত্রের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি; তেরটি এবং ‘জীবনের জটিলতা’ উপন্যাসে এর সংখ্যা সবচেয়ে কম। ছয়টি। নারীচরিত্রগুলোর মধ্যে অধিকাংশই পেশায় গৃহিণী। অবশ্য ঘরকন্নার জন্য এদের কেউ অর্থ পান না। পুরুষশাসিত সমাজে সামোহারাহীন পেশার নারীরা যুগ যুগ ধরে কর্মরত।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসেও সে চিত্র আছে। এদের একজন নার্স বা গানের শিক্ষিকা, সামান্য অর্থ আয় যেখানে। একজন-দুজন শ্রমিক নেত্রী বা সমাজকর্মী। অনেকেই আশ্রিতা। মানিকের উপন্যাসে নারীদের যে পেশার উলেখ আছে তা তৎকালী সমাজের পরিপ্রেক্ষিতে খুবই বাস্তব। কিন্তু চরিত্রগুলো প্রথাবদ্ধ হয়ে উঠে আসে নি।

লেখকের দৃষ্টিভঙ্গির পৃথকতা ও দৃঢ়তায় নারীরা প্রচলিত জীবন ও সমাজের খোলস ভেঙ্গে বের হতে চেয়েছে। নিচে আলোচিত উপন্যাসে নারী চরিত্রসমূহের পরিচয় দেয়া হলোঃ

উপন্যাস

চরিত্র

পেশা

মন্তব্য

জননী

শ্যামা

গৃহিণী

উপন্যাসের আদ্যোপান্ত জড়িয়ে আছে।

জননী

মন্দাকিনী

গৃহিণী

উপন্যাসের আদ্যোপান্ত জড়িয়ে আছে।

জননী

বিষ্ণুপ্রিয়া

গৃহিণী

১ম থেকে ৬ষ্ঠ পরিচ্ছেদ পর্যন্ত পাওয়া যায়।

জননী

সত্যভামা

ঝি

১ম পরিচ্ছেদে পাওয়া যায়।

জননী

রাণী

ঝি

১ম থেকে ৬ষ্ঠ পরিচ্ছেদ পর্যন্ত পাওয়া যায়।

জননী

বকুলমালা

গৃহিণী

উপন্যাসের আদ্যোপান্ত জড়িয়ে আছে।

জননী

কনকলতা

গৃহিণী

৭ম পরিচ্ছেদে পাওয়া যায়।

জননী

সুপ্রভা

গৃহিণী

৭ম থেকে ৯ম পরিচ্ছেদ পর্যন্ত পাওয়া যায়।

জননী

রাজবালা

গৃহিণী

একটি দৃশ্যে পাওয়া যায়।

জননী

সরযূ

নার্স

৯ম পরিচ্ছেদে পাওয়া যায়।

জননী

বিভা

গানের শিক্ষক

৯ম পরিচ্ছেদে পাওয়া যায়।

জননী

শামু

ছাত্রী

৯ম পরিচ্ছেদে পাওয়া যায়।

জননী

সুবর্ণলতা

গৃহিণী

১০ম থেকে শেষ পরিচ্ছেদ পর্যন্ত পাওয়া যায়।

জীবনের জটিলতা

অনুরূপা

গৃহিণী

উপন্যাসের আদ্যোপান্ত জড়িয়ে আছে।

জীবনের জটিলতা

প্রমীলা

উপন্যাসের আদ্যোপান্ত জড়িয়ে আছে।

জীবনের জটিলতা

শান্তা

গৃহিণী

১ম থেকে ৮ম পরিচ্ছেদ পর্যন্ত পাওয়া যায়।

জীবনের জটিলতা

নগেনের কাকিমা

গৃহিণী

২য়, ৪র্থ, ১০ম পরিচ্ছেদে পাওয়া যায়।

জীবনের জটিলতা

লাবণ্য

গৃহকন্যা

৪র্থ ও ১০ম পরিচ্ছেদে পাওয়া যায়।

জীবনের জটিলতা

বিন্দু

ঝি

৭ম ও ৮ম পরিচ্ছেদে পাওয়া যায়।

শহরতলী ১ম পর্ব

যশোদা

শ্রমিক নেত্রী

উপন্যাসের আদ্যোপান্ত জড়িয়ে আছে।

শহরতলী ১ম পর্ব

অপরাজিতা

গৃহিণী

১ম থেকে ৫ম পরিচ্ছেদ পর্যন্ত পাওয়া যায়।

শহরতলী ১ম পর্ব

সুবর্ণ

গৃহিণী

উপন্যাসের আদ্যোপান্ত জড়িয়ে আছে।

শহরতলী ১ম পর্ব

চাঁপা

গৃহিণী

২য় থেকে ৪র্থ পরিচ্ছেদ পর্যন্ত পাওয়া

শহরতলী ১ম পর্ব

কালো

গৃহিণী

উপন্যাসের আদ্যোপান্ত জড়িয়ে আছে।

শহরতলী ১ম পর্ব

সুধীরা

গৃহিণী

২য় থেকে ৫ম পরিচ্ছেদ পর্যন্ত পাওয়া যায়।

শহরতলী ২য় পর্ব

যশোদা

শ্রমিক নেত্রী

উপন্যাসের আদ্যোপান্ত জড়িয়ে আছে।

শহরতলী ২য় পর্ব

কুমুদিনী

গৃহিণী

উপন্যাসের আদ্যোপান্ত জড়িয়ে আছে।

শহরতলী ২য় পর্ব

সুব্রতা

গৃহিণী

উপন্যাসের আদ্যোপান্ত জড়িয়ে আছে।

শহরতলী ২য় পর্ব

আশাপূর্ণা

গৃহিণী

৪র্থ পরিচ্ছেদে পাওয়া যায়।

শহরতলী ২য় পর্ব

অতসী

গৃহিণী

৪র্থ পরিচ্ছেদে পাওয়া যায়।

শহরতলী ২য় পর্ব

বনলতা

গৃহিণী

৪র্থ পরিচ্ছেদে পাওয়া যায়।

শহরতলী ২য় পর্ব

অলকা

গায়িকা

৪র্থ পরিচ্ছেদে পাওয়া যায়।

শহরতলী ২য় পর্ব

খুকু

গায়িকা

৪র্থ পরিচ্ছেদে পাওয়া যায়।

শহরতলী ২য় পর্ব

যোগমায়া

গৃহিণী

৫ম থেকে শেষ পরিচ্ছেদ পর্যন্ত পাওয়া যায়।

অহিংসা

মাধবীলতা

আশ্রমের আশ্রিতা

উপন্যাসের আদ্যোপান্ত জড়িয়ে আছে।

অহিংসা

মহেশের স্ত্রী

গৃহিণী

উপন্যাসের আদ্যোপান্ত জড়িয়ে আছে।

অহিংসা

রত্নাবলী

আশ্রমের আশ্রিতা

উপন্যাসের আদ্যোপান্ত জড়িয়ে আছে।

অহিংসা

উমা

আশ্রমের আশ্রিতা

উপন্যাসের আদ্যোপান্ত জড়িয়ে আছে।

অহিংসা

কল্যাণী

আশ্রমের আশ্রিতা

একটি দৃশ্যে পাওয়া যায়।

অহিংসা

সীতা

আশ্রমের আশ্রিতা

একটি দৃশ্যে পাওয়া যায়।

অহিংসা

শশধরের বউ

গৃহিণী

দশ থেকে ষোল পরিচ্ছদ পর্যন্ত পাওয়া যায়।

চতুষ্কোণ

মনোরমা

গৃহিণী

উপন্যাসের আদ্যোপান্ত জড়িয়ে আছে।

চতুষ্কোণ

গিরীন্দ্রনন্দিনীর

গৃহকন্যা

একটি দৃশ্যে পাওয়া যায়।

চতুষ্কোণ

গিরীন্দ্রনন্দিনীর মা

গৃহিণী

একটি দৃশ্যে পাওয়া যায়।

চতুষ্কোণ

সরসী

সমাজ কর্মী

উপন্যাসের আদ্যোপান্ত জড়িয়ে আছে।

চতুষ্কোণ

রিপি

গায়িকা

উপন্যাসের আদ্যোপান্ত জড়িয়ে আছে।

চতুষ্কোণ

মালতী

ছাত্রী

উপন্যাসের আদ্যোপান্ত জড়িয়ে আছে।

চতুষ্কোণ

কালী

গৃহকন্যা

উপন্যাসের আদ্যোপান্ত জড়িয়ে আছে।

চতুষ্কোণ

রুক্মিনী

স্কুলের শিক্ষিকা

দুটি দৃশ্যে পাওয়া যায়।

 

মানিক উপন্যাসে নারী চরিত্র বলিষ্ঠ। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম গ্রন্থিত উপন্যাস ‘জননী’তেই এর প্রমাণ পাওয়া যায়। ‘জননী’ উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র শ্যামা। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের জননী সে। এই পরিবারের মানুষগুলো যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে পারে না। এখানে প্রতিনিয়ত চাওয়া আর পাওয়ার মধ্যে ব্যবধান বাড়তে থাকে। না পাওয়ার যন্ত্রণায় দক্ষ হয় পরিবারের সদস্যরা। এর কর্তাস্থানীয় ব্যক্তি সর্বদাই মানসিকভাবে বিধ্বস্ত হয়। শ্যামা তার পরিবারের কর্তাস্থানীয়। শ্যামার জীবন-যাপনও সে রূপ:

“জননী’তে অতি স্বাভাবিক জীবনের ছবি

 

নারী চরিত্র পর্ব ১

 

অঙ্কিত হয়েছে। জীবন সম্পর্কে শ্যামা বলেছে:

“সুখে দুঃখে জীবনটা অমনই হইয়া গিয়াছে, সিদ্ধ করিবার চাল ও কুটিবার তরকারি থাকার মতো চলনসই।

এই চলনসই জীবনেই শ্যামা সংগ্রামরত। ছিটগ্রস্ত, বদমেজাজি স্বামীকে নিয়ে তার সংসার।

উপন্যাস শুরু হয়েছে এভাবে:

“সাত বছর বধূজীবন যাপন করিবার পর বাইশ বছর বয়সে শীতলের দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী শ্যামা প্রথমবার মা হইল। (১, পৃ.-১৩)

এখানে লেখক শ্যামার চরিত্রের দুটি দিক দেখিয়েছেন, ‘বধু’ জীবন ও ‘মা’ জীবন। বধূজীবন শুরু হওয়ার পূর্বে শ্যামার আরো একটি জীবন ছিল, সে ‘কুমারী’ জীবন। শ্যামার কুমারী জীবন উপন্যাসে অনুপস্থিত। ‘বধু’ জীবনের প্রতিও শুধু ইঙ্গিত দেওয়া আছে। স্বামীর কাছে একজন স্ত্রীর চাওয়া অনেক। সে চাওয়া মানসিক এবং শারীরিক দুই-ই।

স্বামীর সামান্যতম আদর বা অনাদর তার দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলে। এ জীবনে নারীর নারীসত্তা সক্রিয়। মান-অভিমান প্রকট, ছেলেমানসিও থাকে, প্রত্যাশা করে অনেক কিন্তু মনের চাওয়ার কাছে হেরে যায় যুক্তিতর্ক, তার মন কোমল থাকে। সে লতার মতো নির্ভরশীল হতে চায়। শ্যামা শীতলের কাছে এর কিছুই পায়নি। তার একটি যন্ত্রণাকর বধূজীবন শেষ হওয়ার পর মা-জীবন শুরু হয়েছে। মা জীবনে শ্যামা একচ্ছত্র আধিপত্যের অধিকারী। এমনকি সে শীতলকেও কথা শোনায়:

“আমি কি বারণ করেছি ছেলে দেব না। একটু বড়ো হোক, নিয়ো না তখন যত খুশি নিয়ো ।” (১খ,পৃ-২৮)

বাংলা সাহিত্যে ‘মা’ কে অতি মানব করে গড়ার একটি প্রবণতা রয়েছে। সাধারণ মানুষের মানবিক অবস্থা, চাওয়া-পাওয়া, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, সামাজিক কলুষতা, কু-প্রবৃত্তি প্রভৃতি থেকে মাকে আড়াল করেছেন সাহিত্যিকরা। কিন্তু মা একজন মানুষ, তারও চাওয়া-পাওয়া আছে, সেও মানবিক দোষ গুণের ঊর্ধ্বে নয়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাই মাকে দেবীর পর্যায়ে পৌঁছে দেননি। তিনি মানুষ শ্যামাকেই অংকন করেছেন:

“শ্যামা ঈর্ষা করে, সন্তানের চিন্তায় মগ্ন হয়, পরের মৃত্যুতে ব্যথিত হয়, দুঃখ পায়, কখনো কখনো সুখের স্বপ্ন দেখে, এমনকি, প্রতিবেশীদের দাম্পত্য সুখ দেখে সে হয় ঈর্ষান্বিত, উপরন্তু সে নিজের সন্তানের চোখের সঙ্গে বকুলের সন্তানের চোখের প্রতি তুলনা করেও ঈর্ষান্বিত হয়েছে, এমনকি পুত্রবধূর দেহের যৌবন প্রাচুর্য দেখেও শ্যামা বিদ্বেষপরায়ণ হয়ে উঠেছে। ৬

শ্যামা কাগজের বুকে কালো কালিতে আঁকা কোনো কাল্পনিক চরিত্র নয়: রক্ত-মাংসের মানব চরিত্র। ভালো-মন্দ মিলিয়ে মানুষের জীবন। সামাজিক জীবনে সব সময় আমরা যে মানুষের সাক্ষাৎ পাই, এখানে তার ব্যতিক্রম নেই। প্রয়োজনের কাছে মানুষ অসহায়, বিশেষ করে সেই মানুষটি যদি হয় নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের কেউ। তাই শ্যামাকে মাঝে মাঝে লজ্জাহীন হতে দেখি আমরা। সে বিষ্ণুপ্রিয়ার দেওয়া উপহারে বিগলিত হয়, আরো কিছু আশা করে, বিধানকে শঙ্করের সঙ্গে গাড়িতে স্কুলে পাঠিয়ে উৎফুল হয়। ননদের বাড়ি থাকার সময় হারাপ ডাক্তার নিজে টাকা পাঠাচ্ছে জেনেও চুপ করে থাকে। তার ভেতরের মূল্যবোধ তাকে পীড়া দেয় না।

সন্তানের জন্য সে সব করতে পারে। সন্তানের মঙ্গল চিন্তা ব্যতীত তার আর কোনো নীতি নেই ।

“মাতৃত্বই যেন তার সমগ্র সত্তা। “” শ্যামা একটি সক্রিয় চরিত্র। সে কখনো স্রোতে গা ভাসিয়ে দেয় নি। প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে তার প্রত্যক্ষ যোগাযোগ রয়েছে। কাহিনীর সকল পরিস্থিতিতে শ্যামার উপস্থিতি লক্ষণীয়। শ্যামার সত্তাই উপন্যাসের মূল বিষয়।

লেখক উপন্যাসে শ্যামাকে আঁকতে যেয়ে কোনো ভাবাবেগের শিকার হন নি। এর সঙ্গে আমরা ম্যাক্সিম গোর্কির ‘মা’ এবং শওকত ওসমানের ‘জননী’ উপন্যাসের তুলনা দিতে পারি। এই দুটি উপন্যাসেও আবেগতাড়িত হয়ে মাকে আঁকা হয় নি।

সমাজের রক্ত-মাংসের মানুষের ছবি আঁকা হয়েছে। ‘মা’ তে ছেলে পাভেল এবং তার সহযোগীদের মিটিং শুনে শুনে মা সংগ্রামের জন্য তৈরি হয়েছে এবং তারপর সক্রিয় হয়েছে। প্রতিটি ঘটনায়ই সে সঙ্গে থেকেছে, মতামত দিয়েছে, কাজ করেছে। সে অন্য একজন মা কে বলেছে:

যেতে দিন ওকে। ভয় নেই। প্রথমে আমিও খুব ভয় পেয়েছিলাম। আমার ছেলেও গেছে ওই দেখছেন? আগে আগে চলছে নিশান হাতে নিয়ে।

উপন্যাসে যা যা কিছু করেছে সব-ই ছেলের জন্যই করেছে। শওকত ওসমানের ‘জননী’ তে দরিয়াবিবি নিম্নবিত্ত পরিবারের জননী। সন্তানের ভরণ-পোষণের জন্য সে পদস্খলিত হয়েছে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও সে দূর সম্পর্কের দেবর ইয়াকুবের সাহায্য নিয়েছে, বিধবা পরিয়াবিবি ইয়াকুবের ঔরসজাত সন্তান গর্ভে ধারণ করেছে। আবার অনাকাঙ্ক্ষিত সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে সে অনুভব করেছে মাতৃত্ব:

“দরিয়াবিবির চোখে আর কোনো প্রশ্ন নাই। ত্বরান্বিত হোক, হে আদম শিশু তোমার আগমন। এত যন্ত্রণার মধ্যে জননী তোমার পথই তো চেয়ে থাকে। কত লজ্জা, কত অপমান ধিক্কার বাহিরের জগতে প্রতীক্ষমাণ, আমি তোমার জন্য প্রতীক্ষমাণ। এই তিনজন মা-ই সন্তানের জন্য আজন্ম সংগ্রামরত। তবে তাদের পথ ভিন্ন ভিন্ন। তাদের চিন্তাও ভিন্ন ভিন্ন। কিন্তু তাদের উদ্দেশ্য এক এবং তারা সে উদ্দেশ্যে সক্রিয়।

শ্যামা চরিত্রটি অস্তিত্ববাদের অনন্য নিদর্শন। তার চিন্তা, টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম, দায়িত্বশীলতা এবং সব কিছুর পর তার যে সীমাবদ্ধ অবস্থা সব-ই শ্যামা চরিত্রের অস্তিত্ববাদকে নির্দেশ করে। দারিদ্র্যের সঙ্গে প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে সংগ্রাম করে সন্তানদের নিয়ে শেষ পর্যন্ত টিকে থেকেছে সে। শ্যামার সংগ্রাম বহুমুখী।

নারীসত্তার সঙ্গে মা সত্তার সংগ্রাম, সন্তানকে মানুষ করার সংগ্রাম, সংসারবিবাগী স্বামীর সঙ্গে সংসারের সংগ্রাম, মনের ভেতরের চাওয়া-পাওয়াকে দমিয়ে রাখার সংগ্রাম। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এ উপন্যাসে একান্ত বাঙালী ঘরের চিত্র এঁকেছেন। সন্তান জন্মের সময়ের ঝঞ্ঝাট, তাদের বড় করা, লেখাপড়া, চাকরি, বিয়ে, বাড়িতে ঘর তোলা, ভবিষ্যতের ভাবনা ভাবা সবই শ্যামাকে একা সামলাতে হয়েছে। ‘সে কলের মতো নিখুঁত’ । (১খ, পৃ-৫১) ‘কলের মতো নিখুঁত হয়ে সে সুগৃহিণী হয়েছে। শ্যামা যখন প্রথম মা হয়, তখন সে ছিল একেবারে আনাড়ি। প্রথম মা হওয়ার উচ্ছ্বাসকে মানিক এভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন

“বেদনার জমানো রসের মতো টুলটুলে আশ্চর্য দুটি ঠোঁট। এ কী তার ছেলে? এই ছেলে তার? গভীর ঔৎসুক্যে সন্তর্পণে শ্যামা হাত বাড়াইয়া ছেলের চিবুক ও গাল ছুঁয়েছিল, বুকের স্পন্দন অনুভব করিয়াছিল।” (১খ, পৃ-৯১)

 

নারী চরিত্র পর্ব ১

 

প্রথম সন্তান শ্যামার মারা গিয়েছিলো। এরপর শ্যামার চারটি সন্তান হয়। সন্তানের ভালোমন্দ দেখতে গিয়ে সে নিজের সাধ-আহ্লাদ ত্যাগ করেছে। শওকত ওসমানের ‘জননী’ তে দরিয়াবিবিকে দেখি দূর সম্পর্কের দেবর ইয়াকুবের কাছ থেকে দান গ্রহণ করতে। সে নিজে কর্মমুখী না হয়ে ইয়াকুবের কাছে ধরা দিয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত বিধবা দরিয়াবিবি সন্তানের জন্ম দিয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। শ্যামা সেদিকে যায় নি।

যদিও তার ‘নতুন বউ’ অবস্থায় রাখালের সঙ্গে তার বন্ধুত্বের কথা উপন্যাসে পাওয়া যায়, তবুও রাখালের বাড়ি আশ্রিত অবস্থায় শ্যামা আর রাখালের বন্ধু হতে চায় নি, বরং সে দাসীর মতো খেটেছে। ভালো খাবার না খেয়ে ভালো কাপড় না পরে ছেলেকে স্কুলে পাঠিয়েছে।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় শ্যামার মাধ্যমে দেখিয়েছেন মায়ের জীবনে কতটা ত্যাগ করতে হয়, যদিও ‘মা’ও একজন মানুষ, তারও চাওয়া পাওয়া আছে। মা দেবী নয়, মানুষ। একজন মানুষের চাওয়া-পাওয়ার সঙ্গে ভিন্ন নয় তার চাওয়া-পাওয়া, কিন্তু প্রকৃতির নিয়মেই তার কাঁধে চাপে দায়িত্বের বোঝা। ইচ্ছে করলেই সে তা এড়াতে পারে না।

স্নেহ আর মায়ার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে একটি ত্যাগের পথেই পরিচালিত হয় মায়ের জীবন। মায়ের এই সাধারণ বোধ শ্যামার মধ্যেও পরিলক্ষিত হয়। হারাপ ডাক্তারের বাবার মতো মমতায় তাই শ্যামার চোখে জল আসে:

“অভিমানে কান্না আসিবার বয়স তাহার নয়, তবু মনের মধ্যে আজও যে অবুঝ কাঁচা মেয়েটা লুকাইয়া আছে যে বাপের স্নেহ জানে নাই, অসময়ে মাকে হারাইয়াছে, ষোল বছর বয়স হইতে জগতে একমাত্র আপনারঞ্জন মামাকে খুঁজিয়া পায় নাই, স্বামীর ভয়ে দিশেহারা হইয়া থাকিয়াছে, সে যদি আজ কাঁদিতে চায় প্রৌঢ়া শ্যামা তাহাকে বারণ করিতে পারিবে কেন?” (১৯, পৃ-৮০)

লেখক দেখিয়েছেন মানুষের মনের প্রবণতাগুলো সুপ্ত থাকে, কখনো হঠাৎ পরিবেশের চাপে বেরিয়ে আসে, তাকে আর চাপা দেওয়া যায় না ।

শ্যামা স্বামী-সন্তানের জন্য মরণপণ করে খেটেছে, তিল তিল করে টাকা জমিয়ে দোতলার ঘ তুলেছে, বিধানকে ভালো স্কুলে ভর্তি করেছে, কিন্তু তার দিকে কেউ তাকায়নি। এমনকি তার মামাও টাকা নিয়ে চলে গেছে । স্বামীর ভিটে ফেলে শ্যামা ননদ মন্দার বাড়ি আশ্রয় নিয়ে সন্তানদের জন্য দাসীর মতো আশ্রয় নিয়েছে।

এমন কি বিধানের পড়ার চাপের সময় দুধ, সর, খি, মাছ চুরি পর্যন্ত করেছে। এ সব-ই শুধু সন্তানের জন্য, মাতৃত্ববোধের কাছে হারিয়ে গিয়েছে মূল্যবোধ। কিন্তু এই শ্যামাও উদ্ভ্রান্ত চিন্তা করে। ‘মা’ বলে তার যে দীর্ঘশ্বাস নেই তা নয়। কর্তব্যপরায়ণ শ্যামার আড়ালে লুকায়িত একটি কোমলমতি, মুক্তি প্রত্যাশী শ্যামা ছটফট করে:

“জননীত্ব কেমন যেন নীরস অর্থহীন মনে হইত শ্যামার কাছে। কোথায় ছিল এই চারটি জীব, কী সম্পর্ক ওদের সঙ্গে তাহার, অসহায়া স্ত্রীলোক সে, মেরুদণ্ড বাঁকানো এ ভার তার ঘাড়ে চাপিয়া বসিয়াছে কেন? কীসের এই অন্ধ মায়া? জগজ্জননী মহামায়া কীসের ধাঁধায় ফেলিয়া তাহাকে দিয়া এত দুঃখ বরণ করাইতেছেন? সুখ কাকে বলে এক দিনের জন্য সে তাহা জানিতে পারিল না, তাহার একটা প্রাণ নিগুড়াইয়া চারটি প্রাণীকে সে বাঁচাইয়া রাখিয়াছে, – কেন? কী লাভ তাহার? চোখ – বুঞ্জিয়া সে যদি আজ কোথাও চলিয়া যাইতে পারিত!” (১খ, পৃ-৮১)

মায়ের জীবন লাভ-ক্ষতির হিসেবে চলে না। আবার সজ্ঞানের সুখে যে মায়ের সুখ নেই তা-ও নয়, সন্তানের প্রতিষ্ঠাতেই মায়ের সমৃদ্ধি। মানুষের মধ্যে এই বোধ চিরন্তন, সে তার কর্তব্য পালন করে, কিন্তু তার মধ্যেও বিভিন্ন চিন্তা ভর করে, নিজেকে ভেঙে ফেলতে চায়, কঠিন সত্য আবিষ্কার করতে চায়। তার চেতনাকে এভাবে দেখা যায়:

“সত্য যে কঠিন,

কঠিনেরে ভালোবাসিলাম-

সে কখনো করে না বঞ্চনা। “১০

শ্যামা নিজেকে ‘নারী’ বলেও অসহায় বোধ করে। আমাদের সমাজে পুরুষেরই আধিপত্য।

সমস্ত সৌভাগ্য পুরুষের পায়ে সমর্পিত। নারী হওয়ার অপরাধেই নারী কুণ্ঠিত, সমস্ত কর্ম- কৌশল থেকে বঞ্চিত। কিছুই তার অজানা নয়, তবু সে শৃঙ্খলিত। পুরুষের সঙ্গে নিজের অবস্থান তুলনা করে তাই শ্যামা অস্থির হয়:

“শ্যামা সব জানে। বড়লোক হইবার সমস্ত কলা কৌশল। কেবল স্ত্রীলোক করিয়া ভগবান তাহাকে মারিয়া রাখিয়াছেন।” (১খ, পৃ-১২১)

শ্যামার চরিত্রের একটি বড় দিক সে কখনো হতাশ হয় নি। সে চির সংগ্রামী একটি মানুষ। একটি পথ বন্ধ হয়ে গেলে সে নতুন পথের সন্ধান করেছে। শীতল জেলে গেলে শ্যামা সংসারের সমস্ত বাহুল্য হেঁটে ফেলেছে। বিধানকে ভালো স্কুল থেকে ছাড়িয়ে অন্য স্কুলে দিয়েছে। তার মামা টাকা নিয়ে চলে গেলে সে তার সংসারকে আরো আটপৌরে করেছে।

শীতলের জেলে যাওয়া, মামার টাকা নিয়ে চলে যাওয়া, নিজের বাড়ি বিক্রি করা, বিধানের লেখাপড়া ছেড়ে চাকরি নেওয়া-সবই মেনে নিয়ে আবার নতুন পথের সন্ধানে শ্যামা গমন করেছে। কলকাতায় বিধানের ভাড়া করা বাড়িতে আবার সে নিজের কর্তৃত্বে সংসার সাজিয়েছে। সন্তানদের জন্য সে যন্ত্রে পরিণত হয়েছে।

ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সচেতন শ্যামা। সংসারে সকলের ভালোমন্দ দেখতে তাই সে সমান পারদর্শী। বকুল আর শঙ্করের ঢেঁকি ঘরে বসে গল্প করা দেখে শ্যামা আতঙ্কিত হয়। ধনী ঘরের ছেলে শঙ্করের সঙ্গে বকুলের কখনো মিলন হবার নয়, বকুল শুধু কষ্টই পাবে। সন্তানের এই চিন্তায় সে অস্থির হয়।

বকুলকে তাই সে শঙ্করের কাছে থেকে দূরে রাখে। বকুলের বিয়ের পরও শ্যামা নিশ্চিত হতে চায় বকুলের সুখ সম্পর্কে। তাই বকুলের কাছে লেখা জামাইয়ের চিঠি গোপনে পড়ে শ্যামা। বিধান সম্পর্কেও শ্যামার ভয় কম নয়। বিধানের কাছে শামু এলে সে অসন্তুষ্ট হয়। তার এই মনোভাবে বিধান পাছে রাগ করে তাই সাবধানেও থাকে। অবশেষে নিজের শহরতলীর বাড়িতে ভাড়াটে হয়ে এসে সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে।

 

নারী চরিত্র পর্ব ১

 

শ্যামা সারা জীবনই স্বামী সোহাগ থেকে বঞ্চিত। আর সংসারের বোঝা বহন করতে করতে শারীরিক এবং মানসিকভাবে ভেঙে পড়া মানুষ। তাই বিধানের যৌবনপুষ্ট বউকে সে সহ করতে পারে না। নিজের সঙ্গে তুলনা করে ঈর্যান্বিত হয়। তার ভেতরে একটি দ্বিধার জন্ম হয়।

“এমনি মন্দ লাগে না, মায়া করিতে ইচ্ছা হয়, বকুল যে ফাঁকটা রাখিয়া গিয়াছে সুবর্ণকে দিয়া তাহা ভরিয়া তুলিবার কল্পনা প্রায়ই মনে হয় শ্যামার। কিন্তু হঠাৎ তাহার চমক ভাঙে, উঃ এ কী ছিলোল তুলিয়া সামনে দিয়া হাঁটিয়া গেল বউ, এ কী আগুন ওর দেহময়? এমন করিয়া কে ওকে গড়িয়াছিল, রক্ত-মাংসের এই মোহিনীকে? সুবর্ণ স্নান করে চাহিয়া দেখিয়া শ্যামার বুকের রক্ত যেন শুকাইয়া যায় ! বড়ো ভয় করে শ্যামার। কে জানে ওর ওই ভয়ানক সুন্দর দেহের আকর্ষণে কোথা দিয়া অমঙ্গল ঢুকিবে সংসারে।” (১৭,পৃ-১২৪)

আস্তে আস্তে শ্যামার মধ্যে বিকার দেখা দেয়। সে পরিণত হয় সাধারণ ঘরের সাধারণ শাশুড়িতে। কারণে-অকারণে সুবর্ণকে যন্ত্রণা দেয় শ্যামা। তার পর সুবর্ণ যখন সন্তানসম্ভবা হয়। তখন শ্যামা হয় শান্ত :

“সুবর্ণকে শ্যামা যেন বুকের মধ্যে লুকাইয়া রাখিয়া একটি দিনের প্রতীক্ষা করিতে লাগিল।”(১খ,পৃ-১২৪)

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় উপন্যাস শেষ করেছেন এভাবে:

“শ্যামার কোলে স্পন্দিত হইতে লাগিল জীবন।” (১খ, পৃ-১৭)

একটি নারী চরিত্রের উত্থান-পতন এভাবে দেখিয়েছেন মানিক। বিয়ের আগের জীবনে শ্যামা মামার ছায়ায় মানুষ হয়েছে। তারপর অর্থের লোভে শীতল তাকে বিয়ে করেছে। ছিটগ্রস্ত শীতল শ্যামার সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তোলে নি। নতুন বউ শ্যামা চোখে অন্ধকার দেখেছে। তাকে সঙ্গ দিয়েছে অসুস্থ ননন মন্দার স্বামী রাখাল। রাখালের কাছে সে পেয়েছে সহায়তাঃ

“শুধু সান্ত্বনা বা সহানুভূতি নয়, রাখাল তাহার অনেক লাঞ্ছনাও বাঁচাইয়া চলিত। কতদিন গভীর রাত্রিতে শীতল বাড়ি ফিরিলে (বন্ধুরা ফিরাইয়া দিয়া যাইত) রাখাল তাহাকে বাহিরে আটকাইয়া রাখিয়াছে, শ্যামার কত অপরাধের শাস্তি দিতে আসিয়া শীতল দেখিয়াছে রাখাল সে অপরাধের অংশীদার, শ্যামাকে শাসন করিবার উপায় নাই। শীতলের কত অসম্ভব সেবার আদেশ রাখাল যাচিয়া বাতিল করিয়া দিয়াছে।”(১খ,পৃ-৭৯)

তারপর এই শ্যামা হয়েছে সংসারের কর্মী। টাকার জন্য সে রাখালের সঙ্গে ঝগড়া করেছে। ভবিষ্যতের চিন্তার সে যখন দিশেহারা শীতল তাকে যন্ত্র বলে গালি দিয়েছে। শ্যামা পিছপা হয়নি। শেষ পর্যন্ত নিজের কর্তৃত্ব বজায় রেখেছে।

বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে শ্যামা চরিত্রটি বাস্তববাদের আদর্শ উদাহরণ। শ্যামা সম্পর্কে গৌরীশংকর ভট্টাচার্য বলেছেন:

“দ্বিতীয়বার ‘জননী’ পড়তে পড়তে আমার নিজের মায়ের কথা যে কতবার আমাকে অন্যমনস্ক করে তুলেছে তার ঠিক নেই। এ ছাড়া আরও এক গরিব ঘরের রমণীর ছবি মাঝে মাঝে উঁকি দিয়েছে- সে হল অপুর মা সর্বজয়ার ছবি। ১১

‘দিবারাত্রির কাব্য’ উপন্যাসে মালতীও জননী কিন্তু সে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে নি। আনন্দকে একটি অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিয়ে নিজে ঘর ছেড়েছে। ‘অমৃতস্য পুত্রাঃ’ উপন্যাসে সাধনা কঠোর সাধনা করে সংসার সন্তানের জন্য কিন্তু শ্যামার মতো সফল হতে পারে না। সাধনার ছেলে অনুপম মৃত বাবা আর সংগ্রামরত মায়ের আদর্শ থেকে সরে গিয়ে স্ত্রী আশালতার কথামত চলতে শুরু করে। আশাহত সাধনা একা গ্রামে চলে যায়।

‘পেশা’ উপন্যাসে মানিক দেখিয়েছেন ডাক্তার ছেলের উদাসীনতার কারণে মা শুভময়ী হাইবাড প্রেসারে মারা যায়। এ দিক দিয়ে শ্যামা অনেক ভাগ্যবান। শ্যামার ছেলে বিধান মায়ের সুখ আর স্বস্তির জন্য পড়া ছেড়ে চাকরি নিয়েছে, স্ত্রীর ওপর অন্যায় মেনে নিয়েছে, মায়ের বিকার মেনে নিয়েছে। শ্যামাও তার ছেলেদের জন্য জীবন যৌবন ক্ষয় করেছে, সন্তানকে আগলে রাখাই যেন তার এক মাত্র লক্ষ্য। কিন্তু ‘নাগপাশ’ উপন্যাসে নরেনের মা নরেনকে আগলে রাখে নি।

নরেনের চাকরি চলে গেলে তার মা তাকে কথা শুনিয়েছে, খারাপ ব্যাবহার করেছেন। নরেন শেষ পর্যন্ত বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। তবে মা শ্যামা আর বধু শ্যামার মধ্যে বিস্তর ব্যবধান। সে শীতলের কাছে স্বচ্ছ নয়। তাই বিধানের সামনে শীতলের এনে দেওয়া রঙিন শাড়ি পরতে সংকোচ বোধ করে।

আবার তাদের একতলার ভাড়াটে অল্প বয়সী স্বামী-স্ত্রীর দুষ্টুমি দেখেও বিরক্ত হয়। শ্যামা ভাবে:

“স্বামীর সঙ্গে মেয়েমানুষের এত কী ছেলেমানুষি, হাসাহাসি, খেলা ও ছলাকলা কলহ? একটি ছেলে হইয়াছে, সম্মুখে অন্ধকার ভবিষ্যৎ, কত দুশ্চিন্তা কত দায়িত্ব ওদের, এমন হালকা ফাজলামিতে দিন কাটাইলে চলিবে কেন?” (১খ, পৃ-৮৫)

আবার বনগাঁ এসে রাখালের মামাতো বোন রাজবালার স্বামীর সঙ্গে ফিসফিস কথা শুনেও ‘শ্যামা শিহরিয়া ওঠে। তবে স্বামীর জন্য দরদ তারও আছে, তাই জেল থেকে ছাড়া পেয়ে আসার পর শীতলও শ্যামার কাছে ‘শিশু’ হয়ে ওঠে। শ্যামা সেবা দিয়ে আস্তে আস্তে শীতলকে সুস্থ করে তোলে। এ সবই শ্যামার নিজের কাজ।

শ্যামা তাই কারো ওপর নিজের কাজের ভার দিয়ে নিশ্চিন্ত জীবনযাপন করে না। বকুল সংসার জীবনে সুখী কি না, জামাই মোহিনী বকুলকে ভালোবাসে কি না জানতে শ্যামা উদগ্রীব হয়ে ওঠে। তাই নিঃসংকোচে শ্যামা বকুলকে দেওয়া মোহিনীর চিঠি গোপনে পড়ে। এমনি করে সংসারের সকল দিক সে নিজের দখলে রেখেছে। তারপরও তার বুকে দীর্ঘশ্বাস ওঠে।

“সারা দিনের খাটুনির পর শরীর প্রান্ত অবসন্ন হইয়া আসিয়াছে, মনের মধ্যে একটা দুঃসহ ভার চাপিয়া আছে, কত যে একা আর অসহায় মনে হইতেছে নিজেকে সেই শুধু তা জানে, একটুকু সান্ত্বনা দিবারও কেহ নাই।” (১খ, পৃ-৯৭)

-এই হলো শ্যামা। এ রকমই নারীর মন। পাহাড় সমান বোঝা সে ঘাড়ে করে রাখে। কিন্তু চোখে জলও সাগর সমান ।

‘জননী’ উপন্যাসে শ্যামার পর নারী চরিত্রের মধ্যে বকুল চরিত্রটি উলেখযোগ্য। শিশু চরিত্র থেকে পূর্ণবয়স্ক চরিত্রে পরিণত হয়েছে বকুল। এ চরিত্রটি কয়েকটি পর্যায়ে ভাগ করা যায়- শিশু বকুল, প্রেমিক বকুল, বধূ বকুল এবং জননী বকুল। চরিত্রটি পুরো উপন্যাস জুড়ে আছে, কিন্তু পরিসর ব্যাপক নয়।

চরিত্রের মধ্যে লেখক কোনো ভাবালুতার অবতারণা করেন নি। চরিত্রটি ফুটে উঠেছে শ্যামার দৃষ্টিভঙ্গির মধ্য দিয়ে। বকুলের সুখ-দুঃখকে শ্যামা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে। তারই ফলোশ্রুতিতে আমরা বকুলের জীবন দেখতে পাই:

“ বিজ্ঞানীর মতো নির্মোহ মর্মভেদী দৃষ্টিতে মানিক যেমন জীবন ও জগৎকে নিরীক্ষণ করেছেন, যেমন চিরে চিরে টুকরো করে বিশেষণ করেছেন নরনারীর জীবনকে, ব্যক্তিচরিত্রকে, আবার সেই সঙ্গে তাঁর মনের মধ্যে যেমন কাজ করেছে সবকিছুকেই, সব খণ্ড অংশকেই একটি বোধের সূত্রে সমগ্রতায় গেঁথে তোলার প্রবণতা ………. …

 

নারী চরিত্র পর্ব ১

 

বকুল যখন নারী হয়ে উঠেছে তখন সে পিসি মন্দার বাড়ি আশ্রিত। তার মা শ্যামা হাড় ভাঙা পরিশ্রম করে তাদের বড় করছে। মন্দার সতীন সুপ্রভা তাকে বিশেষ স্নেহ করে। সুপ্রভার অনুগ্রহে বকুল লেখাপড়া শিখেছে। কলকাতার ছেলে শঙ্করকে বকুল ভুলতে পারে নি। শঙ্করের প্রতি বকুলের এক বিশেষ টান শ্যামা লক্ষ্য করে:

“শঙ্কর আসিয়াছে চার-পাঁচ দিন, সকলের সামনে শঙ্করের সঙ্গে কত কথা বকুল বলিয়াছে, দু-চার মিনিট একা কথা বলিবার সময়ও কতবার শ্যামা হঠাৎ আসিয়া ওদের দেখিয়াছে, শ্যামাকে দেখিয়াও কথা শঙ্কর বন্ধ করে নাই, বকুল হাসি থামায়। নাই। ঢেঁকিঘরে আজ ওরা কোন নিষিদ্ধ বাণীর আদান-প্রদান করিতেছিল, বকুলের মুখে যা রং আনিয়াছে, চোখে আনিয়াছে জল?” (১খ, পৃ-৯৪)

বকুলের প্রেম সত্তা বুঝাতে লেখক কোনো দৃশ্যের অবতারণা করেন নি, কিন্তু এই বর্ণনার মধ্য দিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রেম বোঝা যায়। বকুল আর শ্যামার পরবর্তী কথোপকথনে তা আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

“বকুল রাগ করিয়া বলিয়াছিল, সারাদিন পেছন পেছন ঘুরছ কেন বলো তো?

বকুলের বোধ হয় অপমান বোধ হইয়াছিল । শ্যামা বলিয়াছিল, পেছন পেছন আবার তোর ঘুরলাম কখন? তারপর বকুল কাঁদিয়া ফেলিয়াছিল, গিয়া বসিয়াছিল শীতলের কাছে, সারাটা দিন।” (১খ, পৃ-৯৪)

এর মধ্য দিয়ে বকুলের ব্যক্তিত্বের প্রকাশ পায়। বয়োসন্ধিক্ষণের বকুলের তীব্র মনোবেদনা, অভিমান পাঠকের মনকে নাড়া দেয়। মানিক মানুষের অন্তর জাতের ঘাত-প্রতিঘাতকে উপন্যাসে রূপ দিয়েছেন। মায়ের কাছে বকলের গোপন মনোভাব প্রকাশিত হওয়ার কষ্ট মায়ের আচরণে অপমানবোধ তার অন্তরজগতে আলোড়ন তোলে, সঙ্গত কারণেই সে নিজের ক্ষোভকে নিজের মতো করে প্রকাশ করে।

এর পর শুরু হয়েছে বকুলের বধু জীবন। শঙ্করের সঙ্গে তার বিয়ে হয় নি, বিয়ে হয়েছে পঞ্চাশ টাকা বেতনের পোস্ট অফিসের কেরানি মোহিনীর সঙ্গে। বিয়ের পর শঙ্কর সম্পর্কে বকুলের কোনো মনোভাবের ইঙ্গিত লেখক পাঠককে দেন নি। কিন্তু আবহমান বাংলার মেয়েরা সারা জীবন নিজের মনকে লুকিয়ে রেখে সুখী হওয়ার যে চেষ্টা করেছে বকুলও তার ব্যতিক্রম নয়।

বকুলকে লেখা মোহিনীর চিঠি গোপনে পড়ে তাই শ্যামা আশ্বস্ত হয়। কিন্তু তার আশঙ্কা যায় না। তারপর মোহিনী বাড়িতে আসলে ভোরে বকুল আর মোহিনী বেড়াতে বের হয়, বাড়ি ঢুকে শ্যামার মুখোমুখি হলে বকুলের মুখ রাঙা হয়ে ওঠে। শ্যামা কখন বকুলের সুখের ব্যাপারে নিশ্চিত হয়। এমনি মানুষের জীবন। বাস্তব জীবনের বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাতও এমনি করে মানুষকে বদলে দেয়, ভুলিয়ে দেয়।

এখানে ‘দিবারাত্রির কাব্য’ উপন্যাসের সুপ্রিয়ার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। সুপ্রিয়া বয়োসন্ধিক্ষণের ভালোলাগা হেরম্বকে ভুলতে পারে না, তাই স্বামীকে নিয়ে সে সুখের সংসার গড়তে পারে না। হেরম্ভের জন্য তার মন কেমন করে, সে হেরম্বের সঙ্গে ঘর বাঁধতে চায়। সুপ্রিয়া চরিত্রটি ভাবপ্রবণ।

‘জননী’ উপন্যাসে ভাবপ্রবণতার কোনো স্থান নেই। এ উপন্যাসের পাত্র-পাত্রীরা জীবনবাদী। তারা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য বদ্ধপরিকর। তাই প্রেমের স্মৃতিকে বকুল দমন করেছে। সংসারে টিকে থাকার জন্য স্বামীকে মেনে নিয়ে সুখের সংসার গড়ায় ব্রতী হয়েছে।

সে জননীও হয়েছে। প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যদিয়ে টিকে থাকাই তাদের সংগ্রাম। এরপর আমরা বকুলের জননী জীবনে যাবো। লেখক বকুলের শ্বশুরবাড়ির জীবন আমাদের কাছে তুলে ধরেন নি। কেবল জানিয়েছেন, বকুল থাকে গ্রামে আর মোহিনী চাকরির জন্য কলকাতায়। সন্তান সম্ভবা বকুলকে বিধান নিয়ে আসে তাদের কলকাতার বাড়িতে। কিন্তু বকুল শ্বশুরবাড়িতে ভালো ছিল না, শ্যামা বকুলকে দেখে আঁতকে ওঠে:

“এ কী রোগা শরীর বকুলের, নিষ্প্রভ কপোল, ভীরু চোখ, কাঞ্জিবিহীন মুখ, লাবণ্যহীন বর্ণ?” (১খ,পৃ-১০৯)

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় দেখিয়েছেন নারীর জীবনের সুখ কতটা ক্ষণস্থায়ী। স্বামী ভালো হলেও সংসারের আর দশজনের কারণে একটি নারী মানবেতর জীবনযাপন করে। চারপাশের মানুষের ওপর তার সুখ-স্বাচ্ছন্দ নির্ভর করে। তার মনের ভেতরের কষ্টকে দমিয়ে রেখে চিরদিন তার পথচলা।

অনেক আদরের মেয়েটি শ্বশুরশাশুড়ি, দেবর-ননদ, পিসশাশুড়ি কত মানুষের মন জুগিয়ে চলে। একটু এদিক ওদিক হলে তার সুখ নষ্ট হয়, সে হারিয়ে যায় দুঃখের অতল গহ্বরে। বকুলকে দেখেও তেমনি মনে হয়। মায়ের কাছে এসে বকুল স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় একান্ত পরিচিত পরিবেশ ও বিষয়বস্তু থেকে বকুলের জীবনের বিভিন্ন গ্রন্থি উন্মোচন করেছেন। এ যেন রবীন্দ্রনাথের ‘ইনার রিয়ালিটি’।

বকুল পাকা শিল্পীও হয়েছে। কঠোর বাস্তবের নিষ্পেষণে সে হয়েছে কঠোর বাস্তববাদী। বিধানের কাছে শামুর আসা সে শ্যামার চেয়েও বেশি অপছন্দ করে। ভালো মেয়ে দেখে বিধানের বিয়ে দেওয়ার জন্য মাকে বলে, অন্যদিকে বিধানকেও বিয়ের কথা বলে জ্বালাতন করে।

এই ঘটনার মধ্যদিয়ে মানিক দেখালেন বয়োসন্ধিক্ষণে মানুষ যে বিষয়গুলো ভালো মনে করে, প্রাণের তাগিদ অনুভব করে, যে বাধা মানতে চায় না, বয়োবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তার মধ্যে বিপরীত ধারা বইতে থাকে। সেও সমাজের শৃঙ্খলগুলোকে আকড়ে ধরে, সেই মতো জীবন যাপনে সম্মত হয়।

বকুলের আরো গিন্নিপনা দেখা যায় যখন সে মেয়ের বয়স দুমাস করে শ্বশুর বাড়ি যায়। মাকে সে-মন রাখা কথা বলতে ভোলে না। শ্যামাকে যত্ন করতে পারে না বলে কষ্ট পায়। তার কথায়, চালচলনে যেন শ্যামার-ই রূপ ফুটে ওঠে

“আমার যেমন কপাল! সেবা নিয়েই চললাম, তোমার কাছে থেকে একটু যে যত্ন করবো তা কপালে নেই।” (১খ, পৃ-১১৩)
লেখক বকুল সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন:

“কী গিন্নিই বকুল হইয়াছে। ছাঁচে-ঢালা হইয়া আসিতেছে তাহার চালচলন, কথার ধরন। যেন দ্বিতীয় শ্যামা।” (১খ, পৃ-১১৩)

বিধানের বিয়ে উপলক্ষে বকুল এলে তাকে আরো বাস্তব বুদ্ধিসম্পন্ন মনে হয়। শ্যামা যখন বউকে ভালোবাসতে পারে না, বউ সম্পর্কে কোনো আশাবাদ ব্যক্ত করে না তখন বকুল বলে

“দেখো, ও বউ যদি ভালো না হয় কান কেটে নিও আমার, মা-মরা মেয়ে একটু আদর যত্ন পাবে যার কাছে প্রাণ দেবে তার জন্য ।” (১খ, পৃ-১১৭)

এমনি টুকরো টুকরো কথা, ছোট ছোট জীবন বোধ দিয়ে সাজানো বকুলের জীবন। এই অল্প পরিসরে বকুলের জীবন বুঝতে পাঠকের কষ্ট হয় না। টুকরো টুকরো কথায় একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন প্রকাশিত হয়েছে। এমনি আরো একটি জীবন মন্দার। মন্দা শ্যামার ননদ। বিয়ে হয়ে এসে এই ননদকে অসুস্থ অবস্থায় দেখেছিল শ্যামা। দেখেছিল মন্দার স্বামী রাখাল সেবা-যত্ন দিয়ে মন্দাকে ভালো করে তুলছে।

সমাজে মানুষের মধ্যে যে ভালো আর মন্দের মিশেল, মন্দার মধ্যেও তা লক্ষ করা যায়। উপন্যাসে মন্দার দুটি বৈশিষ্ট্য দেখা যায় বধূ মন্দা এবং কর্ত্রী মন্দা। শাশুড়ির জীবিতকালে মন্দা ছিল বোকা, ভীরু, বঞ্চিত গৃহবধূ। এরপর মন্দা হয় কর্মী, পাকা গৃহিণী। মন্দা চরিত্রের মধ্যে অস্তিত্ববাদেরও নিদর্শন মেলে।

শ্যামার প্রথম সন্তান এবং দ্বিতীয় সন্তান বিধান হওয়ার সময় মন্দা শ্যামাকে সাহায্য করতে এসেছিল। কখনো দেখা গেছে মন্দা অনেকটা নিরীহ প্রকৃতির, বোকা স্বভাবের। ধনী বিষ্ণুপ্রিয়াকে সে ব্যক্তিগত প্রশ্ন করে ফেলে, বিষ্ণুপ্রিয়ার পাঠানো কাপড় দেখে অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস দেখায়, শ্যামার মতো চালাকি না করে বিষ্ণুপ্রিয়ার সামনে আসন তোরঙ্গে তোলা আছে বলে ফেলে।

আবার তার ছেলেরা পর হয়ে যাচ্ছে ভেবে শাশুড়ির কাছে থেকে নিজের সন্তান চুরি করে এনে নিজের কাছে রাখে। এই মন্দা হঠাৎই বুদ্ধিসম্পন্ন অস্তিত্বশীল নারীতে পরিণত হয়। যখন রাখাল চিঠি লিখে জানায় সে আবার বিয়ে করেছে।

তখন সংসারে নিজের আসন ঠিক রাখার জন্য সে মরিয়া হয়ে বনগাঁ চলে যায় এবং সুপ্রভা নামের তার সতিনকে মেনে নেয় নিজের কর্তৃত্বের জায়গাটি প্রতিষ্ঠিত করার জন্য। শ্যামাকে সতিন সম্পর্কে মম্পা বলে

“সতীন? হ্যাঁ, সে এখানেই থাকে বউ, বড্ড গরিবের মেয়ে, বাগের নেই চালচুলো, এখানে না থেকে আর কোথায় যাবে বল,” (১, পৃ-৩৯) সতিন আসলেও নিজের বুদ্ধিবলে মম্পা সুখি হয়েছে:

“আর বছর মন্দার শাশুড়ি মরিয়াছে, গৃহিণীর পদটা বোধহয় পাইয়াছে সেই, শাশুড়ির অভাবে মনদদের সে হয়তো আর গ্রাহ্য করে না। রাখালের ওপর তার অসীম প্রতিপত্তি দেখা গেলো। কথা তো বলে না যেন হুকুম দেয়, আর যা সে বলে তাই রাখাল শোনে।” (১৬, পৃ-৩৯)

বড়দিন উপলক্ষ্যে মন্দা আর রাখাল বেড়াতে এলে শ্যামা মন্দার ভেতরের পরিবর্তনটা দেখে সত্যিই খুশি হলো। এ সময় মন্দার সঙ্গে শ্যামার খুব ভাব হলো। মন্দার চলে যাওয়ার সময় দুজনই চোখের জল ফেললো। এ মন্দার এক রূপ। কিন্তু সময়ের প্রয়োজনে মানুষ পরিবর্তিত হয়।

শ্যামা যখন বনগাঁয়ে নিরুপায় হয়ে মন্দার বাড়ি গিয়ে ওঠে তখন মন্দার ভেতরের স্নেহ- মমতা উবে গিয়ে একটি কঠোর গৃহিণী বেরিয়ে আসে। সে তার স্বীয় অস্তিত্ব বজায় রাখার জন্য অনেক ত্যাগই করে। এমন কি

“সতীনের প্রতি স্বামীর গভীর ভালোবাসাকে হাসিমুখে গ্রহণ করে। ….. মন্দা ভুলিয়া গিয়াছে সে বধু। এই মূল্য দিয়া সে হইয়াছে গৃহিণী।” (১খ,পৃ-৮১)

এই গৃহিণীর পদটি অনেক যত্নে সে লালন করে। তাই প্রয়োজনে কঠোর হতে দ্বিধা করে না, সে শ্যামাকে বাড়ি পর্যন্ত বিক্রি করতে বলে:

“ও বাড়ি বেচতে বলতে আমার ভালো লাগছে ভেবো না বউ, আমার বাপের ভিটে তো। কিন্তু কী করবে বল? নিরুপায় হলে মানুষকে সব করতে হয়।” (১খ, পৃ-৮৪)

এই কথার মধ্য দিয়ে মন্দা বুঝিয়ে দেয় শ্যামা নিরুপায়। মন্দার কাছে সে আশ্রিত বই আর কিছু নয়। সে বারবার শ্যামা আর তার সন্তানদের প্রতি নির্মম হয়েছে খেতে দিয়েছে দাসীর মতো, পরতে দিয়েছে দাসীর মতো রেখেছে চাকর বাকরদের মতো করে। শ্যামা বিধানের জন্য একটু সন্দেশ নিলে সে চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় তুলেছে:

“সন্দেশ করে পাথরের বাটি ভরে রাখলাম বাটি অর্ধেক হল কী করে? এ কাজ মানুষের, বড়ো মানুষের,.. ” (১খ, পৃ-৮৮)

শুধু তাই নয়, শ্যামাকে শেষ পর্যন্ত বাড়িটি বিক্রি করতে হয় এবং নানা উপলক্ষ্যে মন্দা সে টাকা নিয়ে নিয়ে শ্যামাকে নিঃস্ব করে ফেলে। মন্দাকে একটু স্নেহপ্রবণ হতে দেখা যায় জেল থেকে ছাড়া পেয়ে অসুস্থ শীতল বনগাঁ পৌঁছলে। তখন মন্দা একটু কাঁদে, এবং ভাইয়ের জন্য ব্যস্ত হয়ে ওঠে। কিন্তু তার স্বভাব পরিবর্তন হয় না।

শ্যামাকে তাই বনগাঁয়ে দাসীর মতোই থাকতে হয়। নিজের বাড়ি থাকাকালীন আর মন্দা ভাইয়ের জন্য তেমন কিছু করে না। শ্যামারা কলকাতায় চলে গেলে বিধানের বিয়ে উপলক্ষ্যে গিয়ে মন্দা আরেক দফা ভাইয়ের জন্য উতলা হয় এবং ডাক্তার জবাব দিয়ে দিয়েছে বললে সে শ্যামকে বলে

“তবে আর কী, কর্তব্য করেছ এবার টান দিয়ে ফেলে দাও দাদাকে রাস্তায়। আজ বুঝতে পারছি বউ দাদা কেন বিবাগি হয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিল।” (১খ, পৃ- ১১৮)

ছিটগ্রস্ত শীতলকে আগলে রেখে, এতোগুলো সন্তানকে মানুষ করে শ্যামার ভাগ্যে এই অপবাদ জুটেছে মন্দার কাছে। মন্দা চরিত্রটি সাহিত্য বললে ভুল হয়, এ যেন সমাজের একটি জীবন্ত চরিত্র। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বাস্তব জগতের সঙ্গে কোনো ফাঁক না রেখে একটি একটি করে চরিত্র এঁকেছেন।

 

নারী চরিত্র পর্ব ১

 

মন্দার সম্পূর্ণ বিপরীত চরিত্র সুপ্রভা চরিত্রটি। সুপ্রভা রাখালের দ্বিতীয় স্ত্রী। গরিব ঘরের সুন্দরী সুপ্রভার মধ্যে বাংলাদেশের চিরন্তন স্নেহময়ী নারীকে মানিক ফুটিয়ে তুলেছেন। যে চরিত্র কেবল উপন্যাসেই সম্ভব। তবে, মানিক এখানে নিজের দোষ খণ্ডন করেছেন এভাবে:

“কিছু বুঝিবার উপায় নাই। সুপ্রভাকে অসুখী মনে হয় কদাচিৎ। চুপচাপ বসিয়া সে অনেক সময়ই থাকে । … ….] তৰু শ্যামা মাঝে মাঝে সন্দেহ করে।” (১খ, পৃ-৮২)

এভাবে মানিক দেখিয়েছেন সুপ্রভারও নিশ্চয় যন্ত্রনা আছে, সেও দগ্ধ হয়। তারও বিপরীত ধারা বহমান। সুপ্রভা মানুষের কষ্টে ব্যথিত হয়। শ্যামা যখনই কোনো বিপদে পরেছে তখনই সে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে। এমনকি বকুলকে স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছে। বকুলের বিয়ের পর তার পিসশাশুড়ি জ্বালাতন করে শুনে সে পিসশাশুড়িকে শাপ দেয়। শ্যামার প্রতিটি দুঃসময়ে, লজ্জায়, অপমানে তাকে রক্ষা করার চেষ্টার সুপ্রভার একটি কোমল দিক পাওযা যায়। শ্যামা সন্দেশ চুরি করলে মন্দা বুঝতে পেরে চেঁচামেচি করলে সুপ্রভা তাকে থামাতে চেষ্টা করে:

“অমন করে বোলো না দিদি, লক্ষ্মী, যে নিয়েছে, খাবার জিনিস নিয়েছে তো, বড়ো
লজ্জা পাবে দিদি।” (১খ, পৃ-৮৮)

আবার বয়সের ভারে শ্যামা যখন ক্লান্ত তখন সুপ্রভাই চেষ্টা করে শ্যামাকে কাজ থেকে নিবৃত করতে, বিধানকে বলে মায়ের দিকে তাকাতে। সুপ্রভার চরিত্রে আতিথিয়তার দিকটিও স্পষ্ট। শঙ্কর বনগাঁ এসে বোডিংয়ে উঠলে সুপ্রভা তাকে জোর করে বাড়িতে এসে থাকতে বলে, আবার হারাণ ডাক্তার আসলেও তার খাওয়া নিয়ে সুপ্রভাকে বিচলিত হতে দেখা যায়। হারাণ ডাক্তারকে ‘বুড়ো’ সম্বোধনে একটি আন্তরিকতার দিক ফুটে ওঠে।

আতিথিয়তা, আন্তরিকতা আর কোমলতার আবেষ্টনিতে সুপ্রভা চরিত্রটি একটি চির চেনা বাঙালি নারী চরিত্র। শ্যামার পরিবারের প্রতি স্নেহমমতা সুপ্রভার আরেকটি দিককে ইঙ্গিত করে- কর্তৃত্বের দিক। নিজে সে রাখালের দ্বিতীয় স্ত্রী। সংসারেরর সর্বময় কর্ত্রী মন্দা। তার নিজের কর্তৃত্ব বলতে কিছু নেই। শ্যামার ভালোমন্দ দেখে সে তার কর্তৃত্বের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করে।

কাহিনীর প্রয়োজনে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় যে সব চরিত্র উপন্যাসে এনেছেন তারা এক একটি পরিবেশ বা শ্রেণির প্রতিনিধি। এরা স্ব স্ব শ্রেণির সাধারণ বৈশিষ্ট্য নিয়ে উপন্যাসে উপস্থিত হয়েছে। সমাজে কিছু ধনী মানুষ আছে যারা নিজেদের খেয়ালে থাকে। কখনো মানুষকে কাছে টেনে নেয়, আবার কখনো তাকেই অবজ্ঞায় ছুঁড়ে ফেলে। জননী উপন্যাসে তেমনি একটি চরিত্র বিষ্ণুপ্রিয়া।

বিধানের জন্মের পর সে দেখতে এসেছিল, দামী উপহার পাঠিয়েছিল, এমনকি, বড় হওয়ার পর শঙ্করের সঙ্গে গাড়ি করে একই স্কুলেও পাঠিয়েছিল। তখন বিষ্ণুপ্রিয়া ছিল স্বামীর পাপের চিহ্নের ছাপ দেওয়া কন্যার জননী। কিন্তু আস্তে আস্তে আবার তার স্বরূপ প্রকাশ পায় । যখন শীতল জেলে যায়, তখন চোরের ছেলে বিধানকে না নিয়ে শঙ্করের গাড়ি স্কুলে চলে যায়।

শ্যামা বিষ্ণুপ্রিয়ার সঙ্গে দেখা করতে গেলে দাসী তাকে অপমান করে বের করে দেয়। মাত্র তিনটি দৃশ্যে এই চরিত্রটি অঙ্কিত হয়েছে কিন্তু এরই মধ্যে প্রকাশ পেয়েছে সে শ্রেণির গৃহিণী চরিত্র এবং ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে ওই সমাজের পুরুষদের উপার্জনের এবং জীবনযাপনের পাপ সম্পর্কে। আরেকটি চরিত্র সরফু, সে নার্স। তার চরিত্রের বিশেষ কিছু দিক লেখক দেখান নি, তবে বকুল যখন বাচ্চা হতে মায়ের বাড়ি আসে, তখন সরযূ শ্যামাকে বলে মেয়েকে বসিয়ে রাখবেন না।

সরযূর দুই মেয়ে বিভা আর শামু। বিভার মধ্যে একটি অহংকারী নারী চরিত্রের আড়ালে প্রেমিক চরিত্র পাওয়া যায়। সে বনবিহারীকে অধিকার করে রেখেছে। ছোট্ট একটি কথার মধ্য দিয়ে বনবিহারীরর প্রতি বিভার ভালোবাসা ফুটে ওঠে।

“সারাদিন ঘুরে এত রাত্রে ফিরে এলেন এখনও আপনাকে সংসারের কাজ করতে হবে।” (১খ, পৃ-১০৭)

বিভার বোন শামু উচ্ছ্বল প্রাণবন্ত মেয়ে। সে বিধানের কাছে পড়া দেখাতে এসে শুধু দুষ্টুমি করে। এ উপন্যাসে একটি ঝি চরিত্র পাই সত্যভামা। সে কঠোর পরিশ্রমী, বাস্তব সম্পর্কে বুদ্ধিসম্পন্ন। শিশু বিধানের জ্বর হলে শ্যামা তাকে থাকতে বললে সে থাকতে পারে না। বাস্তব এতোটাই নির্মম:

“ সে ধরিতে গেলে স্বামীহীনা, কিন্তু তাহার চারটি ছেলে মেয়ে আছে। তিন বাড়ি কাজ করিয়া সে ইহাদের আহার জোগায়, শ্যামার কাছে বসিয়া থাকিলে তাহার চলিবে কেন?” (১৯, পৃ-৩২)

কিন্তু সে নিষ্ঠুরও নয়, তাই তার দশ বছরের মেয়ে রাণীকে শ্যামার কাছে দিয়ে যায়। এই রাণী পরবর্তীতে শ্যামার বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করেছে। আরো দুটি নারী চরিত্র কনক আর রাজবালা কে আমরা উপন্যাসে পাই। কনক শ্যামার একতলার ভাড়াটে। কনকের নারী সত্তা-স্ত্রী সত্তা শ্যামাকে বিশেষ আলোড়িত করে। উপন্যাসের আরেকটি নারী চরিত্র সুবর্ণলতা।

খুব কম সময়ের জন্য সে উপন্যাসে এসেছে, কিন্তু সে শ্যামার একেবারে মূল ধরে টান দিয়েছে। সুবর্ণের যৌবনপুষ্ট দেহ শ্যামার আজীবনের সংযমকে ধাক্কা দিয়েছে। স্বামীর সোহাগ সে কখনোই পায় নি, বিয়ের পর শীতলের ভুতুড়ে বাড়িতে এসে বন্ধু হিসেবে সে পেয়েছিল ননদ মন্দার স্বামী রাখালকে। এই রাখালকেও কখনো কখনো আপন মনে হয় না।

“রাখালকেও তাহার মনে হইত নির্মম, মনে হইত লোকটা স্নেহ করে কিন্তু স্নেহের প্রত্যাশা মেটায় না।”(১খ, পৃ-১৭)

চির বঞ্চিত শ্যামা তাই সুবর্ণের রূপ-যৌবন-সুখ দেখে ঈর্ষান্বিত হয়। কিন্তু সুবর্ণ শ্যামাকে মায়ের মতো দেখে। মুখ বুজে সব সহ্য করে । শ্যামা বিকারগ্রস্ত হলে বিধান সুবর্ণকে সব সময় শ্যামার পাশাপাশি থাকতে বলে, এতে সুবর্ণের আরো অসুবিধা হয়। কিন্তু মুখ ফুটে বিধানকে বলতে পারে না। বিধান যদি তাকে ভুল বোঝে সেই আশঙ্কায়।

সমাজে বেশির ভাগ বধূজীবন এভাবে কাটে। স্ত্রীরা তাদের স্বামীদের সহানুভূতি পায় না, উপরন্তু ভুল বুঝে সংসারজীবন যন্ত্রণাময় করে তোলে। নারী অন্যায় মেনে নিয়ে অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে মুখ বুজে সহ্য করে সংসারকে একটি যন্ত্রণাময় অধ্যায়ের হাত থেকে রক্ষা করে।

একটি যৌথ পরিবারের বন্ধু সুবর্ণ নিজেকে সেই অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত করেছে। সুবর্ণ শীতলের গায়ে ওষুধ মালিশ করতে বসলে শ্যামা আপন খেয়ালেই বলে “দ্যাখ তো মণি ও বাড়ির ছাদে কে? নকুড়বাবুর বাঁশিবাজানে ভাইটে বুঝি? দে তো দরজাটা ভিজিয়ে, বউমা, আরেকটু সামলে-সুমলেই না হয় বসতে বাছা, একটু বেশি লজ্জা থাকলে ক্ষতি নেই কারও।” (১খ, পৃ-১২৩)

সুবর্ণ এর কোনো প্রতিউত্তর করে না। কোনো অভিযোগও নেই তার মুখে। শুধু নিজের মনে গুমরে কাঁদে:

“সুবর্ণ জড়সড় হইয়া যায়। রাঙা মুখ নত করে। শ্যামা যখন এমনিভাবে বলে কোনো উপায়ে মিশাইয়া যাওয়া যায় না শূন্যে?” (১, পৃ-১২৩)

এতো কিছুর পরও। বাবার বাড়ি যাওয়ার সময় সুবর্ণের চোখে জল আসে। ‘পুজোর পরেই আমাকে আনবেন মা’ (পৃ.-১২৩) বলে চলে যায়। এ নারী চরিত্রের আরেকটি জটিল দিক। তার সুখ হরণকারী মানুষগুলোকেই সে ভালোবাসে। স্বামীর জন্য তার মনে ভালোবাসা জ্বেগে থাকে। যে স্বামী তার প্রতি অন্যায় হচ্ছে জেনেও মুখ বুজে থাকে, সেই স্বামীর বাহুবন্ধনই তার আশ্রয়। নারীর ভালোবাসার এ এক রহস্যময় দিক।

শ্যামার ক্ষেত্রেও এমন রহস্যময় ভালোবাসা দেখা গেছে। শীতলের সঙ্গে তার কোনো মানসিক বন্ধন নেই, কিন্তু শীতল জেল থেকে ফিরে এলে তার জন্য সে মমতা অনুভব করে, যে বাড়ি তার প্রাণাধিক প্রিয়, সেই বাড়িটিও সে শীতলের চিকিৎসার জন্য বিক্রি করে দেয়।

অথচ সেই একদিন তার মামাকে বলেছিল শীতলের ফাঁসি হলেও সে বাড়ি বিক্রি করবে না। সেই বাড়ি সে এক রহস্যময় ভালোবাসার কারণে বিক্রি করে দেয়। সুবর্ণ সন্তান সম্ভবা হলে সুবর্ণের সুখের দিন আসে। শ্যামা তাকে বুকে তুলে নেয় ।

এমনি করে জননীর জন্য জননীর হৃদয়কে মানিক এঁকেছেন। শ্যামা সন্তানকে ভালোবাসে, আবার সন্তানের মাকেও ভালোবাসে, রাখাল দ্বিতীয় বিয়ে করলে সে জননী মন্দার জন্য ব্যাকুল হয়ে পরে, সুবর্ণ সন্তানসম্ভবা হলে সে তাকে বুকে তুলে নেয়।

‘জননী’ তে মানিক আটপৌঢ়ে ঘরের কাহিনী উপস্থাপন করে পাঠকের হৃদয়ে বিদ্ধ করেছেন। মানব সমাজ প্রতিনিয়ত সংকুচিত, কুণ্ঠিত, লুকাইত হয়ে চলেছে। বাস্তবের রূঢ় চাপে মানুষের অস্তিত্ব সংকটময়, তাদের অবদমিত কামনা-বাসনা পর্যন্ত অবরুদ্ধ মানিক এই বাস্তববোধকে ‘জননী’ উপন্যাসে তুলে ধরেছেন।

মানুষের জীবনের যেমন সংকট তেমনি তার মনের সংকটও কম নয়। মানব মনের এই সুক্ষ্মাতিসুক্ষ্ম অনুভূতির বাস্তবরূপ মানিক উপন্যাসের প্রধানতম বৈশিষ্ট্য। “জীবনের জটিলতা উপন্যাসে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বৈজ্ঞানিক সন্ধিৎসা নিয়ে চরিত্রগুলির অপার রহস্যের সন্ধান করতে চেয়েছেন।”১৬

এ উপন্যাসে তিনটি নারী চরিত্র-শাস্তা, প্রমীলা, লাবণ্য। তিনজনই মানসিক দ্বন্দ্বে বিধ্বস্ত হয়েছে। তারা নিজেদের গণ্ডির বাইরে অন্য কাউকে ভালোবেসেছে কিন্তু পরিস্থিতির কারণে সে ভালোবাসা স্বীকৃত হয় নি বরং তাদের জীবন জটিল হয়ে উঠেছে।

শাস্তা চরিত্রটি কুমারী, বধু এবং প্রেমিকা তিনটি পর্যায়ে বিভক্ত। পিতৃমাতৃহীন শান্তা মামা-মামীর কাছে বড় হয়েছে। মামী তাকে অনেক জ্বালাতন করতো, কখনো ভালোবাসা পায় নি। এরপর তার বিয়ে হয়েছে অধরের সঙ্গে। অধরের অনাদর অবহেলা এবং তর্জন-গর্জনে সে সদা তটস্থ থেকেছে। উপন্যাসে প্রথম যখন শান্তার আগমন ঘটেছে, সে তখন চওড়া লালপাড় শাড়ি পরা । লেখক বলেছেন:

“এ যেন তার প্রকাশ্য যুদ্ধ ঘোষণা । ” (২, পৃ-১০৩)

এ যুদ্ধ প্রেমের। স্বামীর কাছে অনাদর-অবহেলা পেয়ে কবি বিমলের কাছে পেয়েছে ভালোবাসার আশ্রয়, এই প্রেমিক কবি বিমলের বিরুদ্ধেই তার যুদ্ধ। স্বামী অধরের প্রতি অন্যায় হলেও প্রেমিক শাস্তা মনে মনে বলেছে:

“বাঃ, আমাকেও বাঁচতে হবে?” (২খ,পৃ-১০৬)

কিন্তু এই বাঁচার মধ্যে মৃত্যু নিহিত, সহজ সরল শাস্তা তা বুঝতে পারে নি। সমাজ যা স্বীকার করে না- পাস্তা তাও মানে নি। বাঁধ-ভাঙা বানের পানির মতো তার হৃদয়ে প্রেমের জোয়ার এসেছে–উপায়হীন শাস্তার প্রেমিক হৃদয় ভেসে গেছে সেই বানে।

‘পুতুল নাচের ইতিকথায় কুসুম যেমন ভেসেছিল শশীর প্রেমে। কিন্তু কুসুম শশীর সঙ্গে ঘর বাঁধতে পারে নি, কুসুমের ঘর বাধার ইচ্ছের দিকে শশী কখনো তাকায় নি, সে শুধু ফুলের সৌন্দর্য দেখেছে, ভ্রমর হতে পারে নি। একসময় কুসুম অধৈর্য হয়ে বাপের বাড়ি চলে গেছে, শেষ সময়ে যদিও শশী তাকে ডেকেছে কিন্তু কুসুম তার দিকে ফিরে তাকায় নি।

প্রেমের কূল পেয়েছে কপিলা। কপিলা কুবেরের সঙ্গে ময়নাদ্বীপে পাড়ি জমিয়েছে। তবে শান্তা উত্তাপ চায়, আগুনে পুড়তে চায় না। সে বিমলের সঙ্গে ঘর বাধবে না, শুধু সুখ-দুঃখের বন্ধু বানাবে। তার সঙ্গে মনের আদান-প্রদান হবে, হালকা রসিকতা হবে, কিন্তু চূড়ান্ত ফুলসজ্জা শান্তা চায় না।

শান্তা প্রেমের সঠিক মর্যাদা দিয়েছে। ভালোবাসার মানুষের সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেওয়ার ক্ষমতা সে অর্জন করেছে। বিমলকে সে কতটুকু মর্যাদা দেয়, তা বিমল জেনেও বিস্মিত হয়েছে। কোথায় কয়টি কবিতা বিমলের ছাপা হয় সব শান্তার নখদর্পণে। সে বলে:

যে কবিতা পড়তে প্রাণ বেরিয়ে যায়, তার কটা পড়লাম তা এমনি হিসেব থাকে। ” (২খ, পৃ-১০৪)

এক মেঘলা দুপুরে মন খারাপ করে শাস্তা জানালায় বসেছিল। বিমলকে দেখেও সে উঠে যায় নি, তখন থেকেই তাদের প্রেমের শুরু। শান্তা একে শুধু জানালা প্রেমেই সীমাবদ্ধ রাখে নি, সে প্রমীলার সঙ্গে বন্ধুত্ব করে বিমলের বাড়ি এসেছে। বিমলের সঙ্গে কথা বলেছে। সংসার জীবনে অসুৰী শান্তার কাছে বিমল মানসিক আশ্রয়স্থল। বিমলের অভাবের সময় সে টাকাও ধার দিতে চায়। বিমলের নেওয়ার পক্ষে সে যুক্তি দাঁড় করায়

“টাকা কারও নয়, যার দরকার হয় তার।” ( ২খ, পৃ-১০৪)

প্রথম দিকে শান্তা বিমলকে দেখে ঘোমটা দিত, প্রমীলার কাছে চেয়ে বিমলের কবিতার খাতা নিত, প্রমীলার মুখে বিমলের গল্প শুনতে পছন্দ করত। তারপর আরো সাহসী হয়ে সে বিমলের ঘর পর্যন্ত যায়। বিমল ঠাট্টার ছলে শান্তার হাতে কলমের কালি ফেলে তা অনেক সময় ধরে ধুয়ে দেয়-এই ছেলেমানসি প্রেমে আপুত হয় শান্তা। শান্তা যেন বিমলের জন্য পাপ-পুণ্যের বাধাও ভেঙে ফেলবে।

শান্তার স্বামী অধরের কাছে এই প্রেম গোপন থাকে না। অধর শান্তার সঙ্গে কথা বলে কম, কিন্তু একদিন বাড়ি ফিরে সে বাহুল্য কথা বলতে শুরু করে, শাস্তাকে আদরে মমতায় ভরিয়ে দিতে চায়। শাস্তা বিবর্ণ হয়ে যায়, বুঝতে পারে এটা কোনো বিশেষ ঘটনার ভূমিকা

“শান্তা এত ভীরু, এত ক্ষীণ তাহার গ্রহণ করিবার সামর্থ্য যে, ওর কাছাকাছি আসিয়া ওকে ভয় দেখানো যেমন কঠিন, হঠাৎ বন্যার মত মমতা ঢালিয়া দিয়া ওর নেওয়ার শক্তিটুকুকে পঙ্গু করাও তেমনি কঠিন।” (২খ, পৃ-১১৬)

শাস্তা সে রাতে আতঙ্কে, দুশ্চিন্তায় ঘুমাতে পারে না। বিমলের সঙ্গে তার প্রেম যে দিন দিন বিপদের মধ্যে এগিয়ে যাচ্ছে সে বিষয়ে শাক্তা সচেতন হয়ে ওঠে। যেখানে সে থামতে চেয়েছিল, সেখানে সে থামতে পারে নি। বিমলের আকর্ষণ বেড়েই চলেছে। চাওয়া আর পাওয়ার ব্যাবধানে সে হাঁপিয়ে ওঠে। প্রেম কোনো নিয়ম মানে না, বাধা মানে না। সে চিন্তিত
হয়:

“বিমলের দস্যুতাটুকু খুবই তুচ্ছ, কিন্তু ক দিন সে এমন দস্যুতাতে তুষ্ট থাকিবে?” (২খ, পৃ-১১৭)

 

নারী চরিত্র পর্ব ১

 

শান্তার মনের মধ্যে দ্বিধা যে নেই তা নয়, সে একজনের স্ত্রী। স্বামীকে ফাঁকি দেওয়া অন্যায়, এই অন্যায় করতে তার মন দোটানায় পরে। একদিকে তার ক্ষতবিক্ষত বিবেক, অন্যদিকে তার ক্ষুধার্ত হৃদয়। অধরও বুঝতে পারে শান্তার প্রতি অন্যায় করা হয়েছে।

সেও হঠাৎ করেই বিনা নোটিশে শান্তার দিকে ঝুঁকে পরে। দিন রাত গানবাজনা নিয়ে ব্যস্ত থাকে, মনে করে করে শান্তাকে সে গান শোনায়, শাস্তার কাছে গান শোনে, দাবা খেলে শান্তাকে জিতিয়ে দেয়। কিন্তু সে এমনভাবে জিতিয়ে দেয়, যেন অপমান করছে। আলো-আঁধারিতে তাকে আধ ঘণ্টা খোলা বুকের কাছে দুই হাত জড়ো করে এমনভাবে বসিয়ে রাখে সে যেন সার্কাসের জন্তু

“আলো ও ছায়ার ভাগাভাগিতে শান্তার সু-সাম সিত মুখখানি কুৎসিত হইয়া গেল।” (২, পৃ-১৩০ )

ভালো করতে গিয়ে অধর আরো খারাপ করে ফেলে। শান্তা তাই অধর আর বিমলের তুলনা করতে গিয়ে বিমলের দিকে আরো মনেপ্রাণে সমর্পিত হয়। শান্তার মনে হয়

“বিমল এ রকম করিত না। ইচ্ছা করিয়া তাকে জিতাইয়া দিলেও এমনভাবে দিত যে ইচ্ছা করিলে সে খুশিও হইতে পারিত আবার ইচ্ছা করিলে রাগ করিয়া দাবার ছক উল্টাইয়া দিয়া বলিতে পারিত, চাইনে খেলিতে। একটা নৌকা দান করিতে অধর কত কায়দা করে। হারিলে সে যেন কাঁদিবে। তাই কৌশলে অধর কান্না নিবারণ করিল।” (২খ, পৃ-১২০ )

বিমল একদিন ফাঁকি দিয়ে শান্তার ফটো তুলেছিল কিন্তু সে এমন রূঢ় নির্মম আমোদের জন্য নয়, শান্তাকে রাগ করতে দেখে সে হাসেও নাই। অধরের এমন আচরণে শান্তার মনে হতে থাকে বিমলকে সে অনুনয় করে বলবে আরেকটা ফটো তুলতে। কিন্তু সে সুযোগ শান্তা আর পায় না। অধর তাকে সারাক্ষণ ঘিরে থাকে। এক মুহূর্তের ছুটি মেলে না। শান্তা ছটফট করে। অধর যতটা শক্ত করে শান্তাকে বাঁধতে চায়, শান্তা ততটাই মানসিকভাবে বিমলমুখী হয়ে পড়ে

“কবিত্বের সুযোগে বিমল শাস্তার মনের কাছাকাছি যেতে পেরেছে, যে নৈকট্যে অধর স্বামীত্বের দাবিতেও যেতে পারে নি।১৪

অতপর অধর বাইরে গেলে বিমলের ঘরে গিয়ে শান্তা নিঃশ্বাস নিয়ে বাঁচে

“মানুষ মানুষকে বোঝে না বলেই তো বেঁচে থাকা এত কষ্টকর। আপনি আমাকে যেমন বোঝেন, আমি আপনাকে যেমন বুঝি, সকলের সঙ্গেই যদি সে রকম একটা সম্পর্ক থাকত তবে আর ভাবনা কী ছিল!” ( ২, পৃ-১৩৮)

কিন্তু শান্তার ভাগ্য অনুকূল নয়, সর্বদাই প্রতিকূল আবহাওয়ায় তার পথচলা। বিমল আর শাক্তার একাত্মতা অধর নিজের অন্ধকার ঘর থেকে দেখলো। এই বিশ্বাসঘাতকতার জন্য তো অধর শান্তাকে ছেড়ে দেবে না। শান্তা বাড়ি ফেরার পর সে শান্তাকে নিয়ে ছাদে যায়, শান্তাকে ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়তে বলে। মৃত্যুতে প্ররোচিত করে:

“আমি হলে মরতাম শান্তা, অসতী হওয়ার জন্য নয়, একজন নির্দোষ মানুষকে ঠকানোর জন্য আমি মরতাম।” ( ২, পৃ-১৪০)

শান্তা সত্যিই ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে। সে মৃত্যুর জন্য নয়, যেন বিমলের বুকে নিজেকে সঁপে দিচ্ছে এমনিভাবে। কিন্তু অধর সম্পর্কে তার জ্ঞানও হয় বিস্ময়কর। অধর তাকে বিমলের চেয়েও বেশি ভালোবাসে। শান্তার জন্য অধরের মাথা খারাপ হয়েছে। এই অসাধারণ ভালোবাসার খবর সাধারণ মেয়ে শান্তা কোনো দিন জানতে পারে নিঃ

“গুমোটের মধ্যে কালবৈশাখীকে আবিষ্কার করার দৃষ্টি তাহার ছিল না, ঝড় না ওঠা পর্যস্ত গুমোটের মানে সে বুঝিতে পারিত না।” ( ২খ, পৃ-১৪১ )

এরপর শাক্তার পরিণতি আরো ভয়াবহ। তার মাথা ফেটে গেছে, বাঁ হাতটা দু জায়গায় ভেঙেছে, কোমর মচকে গেছে, পাঁচ-ছয়টা বালিশের আশ্রয়ে সে শুয়ে থাকে, তার লজ্জা নিবারিত হয়েছে ব্যান্ডেজে, চোখের পাতারও মৃদুময় কম্পন নেই।

এ রকম অবস্থায় শান্তা জানালায় এসে বিমলের কাছে আদর দাবি করছে। তার কোনো বাহ্য জ্ঞান নেই, অধরের উপস্থিতিতে সে বিমলের সঙ্গে মান-অভিমানের খেলায় মেতে ওঠে। জ্ঞান হারালে অধর পরম মমতায় শাস্তার নিস্পন্দিত দেহ খাটে তুলে দেয়। এমনি করে এক দিন সে মারা যায়।

প্রেমের এমন-ই মূল্য দিতে হয় চিরবঞ্চিত শান্তাকে। সে ছোটবেলায় মা-বাবার আদর পায় নি, মামির অনাদর- অবহেলায় বড় হয়েছে, বিয়ের পর স্বামীকে সে বুঝতে পারে নি, বদমেজাজি স্বামী তাকে সর্বদা আতঙ্কে রেখেছে, আর তার প্রাণের সখার সঙ্গে প্রকাশ্য প্রেম করতে পারে নি ধর্ম-সমাজ- সংস্কারের ভয়ে।

লেখক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় শান্তা চরিত্রটি এঁকেছেন বাঙালি সমাজের চিরচেনা নারীরূপে। নিজের অস্তিত্ব বজায় রাখার জন্য নারী সর্বদা সংগ্রাম করে, কিন্তু বাস্তব জীবন তাকে নিরঞ্জ করতে সদা তৎপর। সমাজের মানুষগুলো নারীর অস্তিত্ব স্বীকার করে না।

স্বামীরা স্ত্রীকে হাতের খেলনা মনে করে, তারা ইচ্ছেমতো স্ত্রীকে ভালোবাসবে, ইচ্ছে হলে ঘৃণা করবে, আবার ইচ্ছে হলে ছুঁড়ে ফেলে দেবে। শান্তা সমাজের এই নীতির শিকার। তবু সে তার অস্তিত্বেও ঘোষণা দিতে চায়। মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শাক্তা অস্তিত্ববান হয়েছে। ‘জীবনের জটিলতা’র আরেকটি উজ্জ্বল নারী চরিত্র প্রমীলা। শান্তার মতো জটিল প্রমীলার চরিত্রও

” একই ধরনের জটিল চরিত্র প্রমীলা যে প্রেমের প্রদাহে প্রজ্বলিত হয়েও ভোগবাদী নগেনের প্রতি তীব্র দুর্বলতা বোধ করে, তার যুক্তি সংস্কার বা আত্মসম্মান তাকে বাঁচাতে পারে না- সে জেনেশুনেও বিষপান করতে চায়। ১৫

বাস্তবতার আগুনে সেও দক্ষ হয়েছে, ক্ষতবিক্ষত হয়েছে, তারপরও সে বেঁচে থাকবার লড়াই করে গেছে। অসহায় প্রমীলা যে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে চায়নি তা নয়, কিন্তু বিমল তাকে বেঁচে থাকার প্রেরণা দিয়েছে।

বাস্তবের সাধারণ বোধে নারী সব সময় পুরুষের ওপর নির্ভরশীল-মানিক সেই বোধটি উপন্যাসে সমূলে জায়গা দিয়েছেন। প্রমীলার ভার বিমলকেই নিতে হলো, সে নিজে নিজের ভার বহন করতে পারলো না। প্রমীলা কি পারত না নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে নিজের কষ্ট যন্ত্রণা দূর করে সুখী হয়ে উঠতে? কিন্তু সমাজ তা মেনে নেয় না- নারীর রক্ষক কামনা করে সে।

উচ্চবিত্ত নগেন প্রমীলাকে প্রতারিত করে, কাহিনীর পুরোটা জুড়ে প্রমীলা তাই মানসিকভাবে বিপর্যন্ত। এরপর বিমল আর শান্তার প্রণয়ের পর শান্তাকে সে আত্মহত্যা করতে দেখে। তারও পর প্রমীলার জন্য অপেক্ষা করছে আরো দুঃসংবাদ – সে হলো লাবণ্য আর নগেনের বিয়ের সংবাদ। তাই প্রমীলা চরিত্রটি স্বাভাবিকভাবেই একটি বিপর্যস্ত চরিত্র।

প্রমীলা চরিত্রের সবচেয়ে বড় দিক সে বাস্তববাদী এবং স্পষ্টভাষী। শান্তা যখন বিমলকে না জেনে পাপ করলে পাপ হবে না বলে তখনই প্রমীলা শান্তাকে না জেনে একবার উনুনে হাত দিতে বলে। এর মাধ্যমে সে শাস্তাকে বুঝিয়ে দিতে চায় পাপ সব সময়ই পাপ এবং পাপ করা মানুষের উচিত নয়, এতে পুড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বদমেজাজি, গম্ভীর প্রকৃতির অধরকেও সে কথা শোনাতে দ্বিধা করে না:

“অধরবাবু, আপনার মুখে একটা মিষ্টি কথা আজ পর্যন্ত শুনলাম না। কথা বললেই মনে হয় ধমকাচ্ছেন।” (২, পৃ-১১৪)

প্রমীলা অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয় না। বিমল তার ভাই হলেও সে অন্যায় করেছে জেনে সে ভাইকে কটুকথা বলে। বিমলের সঙ্গে দেখা করে যাওয়ার পরই যে শান্তা ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়েছে এটা তার কাছে অনেক গুরুত্ববহ। তার দৃঢ় ধারণা এ কাজের জন্য বিমল-ই দায়ী। তাই সে বিমলকে বলে,

“শেষ নিঃশ্বাসের সঙ্গে শান্তা যেন তোমাকে অভিশাপ দিয়ে যায়।” ( ২, পৃ- ১৪২) শাস্তা আর বিমলের খেলা সে পছন্দ করে নি। আর এ খেলার জন্য যে শাস্তাকে এতো বড় সাম দিতে হলো, তার জন্যও সে ভাইকে দায়ী মনে করে। বিমলকে সে এখন দৈত্য, দানব ভাবে। শাস্তার পরিণতি সম্পর্কে সে ভাবে এটাই ওর সমাধান। ভাইকে সে অপরাধী বানিয়ে অপমান করতে থাকে। শাস্তার জন্য তার চিরন্তন নারী হৃদয় হাহাকার করে। সে কিছুতেই বিমলকে ক্ষমা করতে পারে না। বিমলকে অভিযোগ করে বলে:

“অভিজ্ঞতার অভাবে তাপের খোঁজে সে যদি আগুনের মধ্যে গিয়ে পড়তে চায়, তুমি তাকে সেখানে পৌঁছে দেবে? শান্তা কী চেয়েছিল সে তো তুমিও জান আমিও জানি।” (২খ, পৃ- ১৫২)

বাস্তব বুদ্ধিসম্পন্ন, অসাধারণ কঠিন মনের দৃঢ়চেতা প্রমীলার মনেও দ্বন্দ্ব আছে। ভালোবাসার মানুষের কাছে সবাই শিশু। সেখানে কোনো যুক্তিতর্ক নেই। একচ্ছত্র আধিপত্যের দাবিদার: “মানুষ তার কাম্য বস্তুকে চাওয়ামাত্র পেতে পারে না বলেই মানুষের জীবন জটিল।

নগেনের অবহেলা তাকে অন্তর্থনেস্থ ফেলে দেয়। দু মাস ধরে নগেন আসা-যাওয়া কমিয়ে একটি অতি আধুনিক মেয়েকে নিয়ে বিদেশ বেড়াতে যাওয়ার খবরে সে উদ্ভ্রান্ত হয়ে পরে, সে ছোট ভাই পাঁচুর কান মলে দেয়, বাবার সঙ্গে ঝগড়া করে, মায়ের মুখে মুখে তর্ক করে।

অবশেষে মানসম্মানের তোয়াক্কা না করে বিমলের সঙ্গে স্টেশনে নগেনকে গিয়ে পাকড়াও করে বোঝাপড়া করে। কিন্তু প্রমীলার অপমানের পালা এখানেই শেষ নয়, নগেন তাকে খামের মধ্যে চিঠির পরিবর্তে একশো টাকা পাঠায় দেখে তার মুখ বিবর্ণ হয়ে যায়। সহজ-সরল ভালোবাসার প্রতিদানে এমন রূঢ়, খাপছাড়া আচরণ প্রমীলাকে বাকহীন করে ফেলে, তার ওপর বিমলের জিজ্ঞাসাবাদ তাকে আরো মর্মাহত করে।

ভদ্রলোকের মেয়ের সঙ্গে এ ধরনের আচরণের সাহস নগেন কোথায় পেল বিমলের মাথায় আসে না। প্রমীলা একবার শুধু বলে হয়তো লাবণ্য পাঠিয়েছে।’ (১৩৫)

কিন্তু প্রমীলা স্থির হতে পারে না। তার মনে বিভিন্ন রকম বন্ধ হতে শুরু করে। নগেন তার কাছে আধুনিকতা চায়, সেই আধুনিকতা মানে তো অপমান নয়, गा নগেনের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হতে পারে না। একটি বিপরীতমুখী বোধ তাকে তাড়া করে। সেদিন স্টেশনে তার কথায় তখনকার মতো তুললেও প্রমীলা সাধারণ মেয়ে, সে এভাবে থাকতে পারে না। প্রমীলা ভাবে “সে বিবাহ বোঝে, সংসার বোঝে, নগেনের মুখ চাহিয়াও জীবনে আর কোনো অসাধারণত্বকে সে প্রশ্রয় দিবে না। স্পষ্ট কথা স্পষ্ট করিয়া লিখিবে। ( ২খ, পৃ- ১৪৮)

 

নারী চরিত্র পর্ব ১

 

শাক্তার মৃত্যুর ডামাডোলে এ চিঠিটিও প্রমীলা লিখতে পারে না। তার আগেই নগেন গুজব হুড়ায় প্রমীলার বিয়ে হচ্ছে এবং পার্সেল করে হীরের হার পাঠায়। প্রমীলা এবার নির্বাক হয়ে পড়ে। শোকে-দুঃখে-অপমানে সে নিজের আত্মার কাছে ছোট হয়ে যায়। বিমল প্রমীলার পাশে এসে দাঁড়ায়। সে তাকে কষ্টে অবিচল থাকতে সাহায্য করে:

“আজ তোর কোনো কাজ নেই, কোনো দায়িত্ব নেই। কেউ তোকে ডাকবে না। এখানে বসে রাসকেলটার কথা ভাব আর ঘেন্না করতে শেষ। এক সপ্তাহের মধ্যে আমি তোর গরিব আর সাদাসিধে বর এনে দেব তাকে তোর ভালোবাসতে হবে।”
(২, পৃ-১৫৪)

কিন্তু প্রমীলা তা মেনে নিতে পারে না। প্রমীলার মন পাথর দিয়ে গড়া নয় যে যখন যাকে ইচ্ছে ঘৃণা করতে পারে, যাকে খুশি ভালোবাসতে পারে। প্রমীলা টলমল মন নিয়ে উনুন থেকে ভাত নামাতে গেল। প্রেমের দাম দিতে গিয়ে প্রমীলা তার দাদাকে চুপ করে থাকতে বলে।

“আমরা কিছুই করব না দাদা। চুপ করে থাকব।” ( ২খ, পৃ-১৫৪)

প্রেমিক প্রমীলার মন ভেঙে চুরে একাকার হয়ে যায়। হীরের গহনাটি তারা মিশন বা হাসপাতালে পাঠাবে সিদ্ধান্ত নেয়। নীরবে নিঃশব্দে একটি প্রেমের সমাপ্তি ঘটে। একজন প্রতারণা করে চলে যায়, অন্যজন বুকে ব্যথা নিয়ে বেঁচে থাকে। সে আবার সংসারে মন দেয়, সদ্য জন্ম নেওয়া ভাইটিকে মানুষ করবে বলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

বিমলকে গল্প লিখতে তাগাদা দেয়। শান্তার শ্রাদ্ধের কাজে সাহায্য করে। সে একেবারে ভেঙে পড়ে যখন অধরের সঙ্গে বিয়েতে তার মা-বাবা রাজি হয়। প্রমীলাও ছাদের আলসেতে দাঁড়িয়ে নিচে তাকায়, সেও আত্মহত্যার কথা চিন্তা করে। ক্লান্ত অবসন্ন প্রমীলা বিমলকে বলে:

“আমাদের এমন হল কেন দাদা? তোমার আর আমার?” (২খ, পৃ-১৬৭)

মানুষের জীবন সরল নয়। ছকে বাঁধা গণ্ডিতে সে বসবাস করে না। এক নিয়মহীন অদৃশ্য সুতোর ঘূর্ণিপাকে তার জীবন পাক খাচ্ছে। ‘জননী’তে বকুল ভালোবেসেছিল উচ্চবিত্ত শঙ্করকে। শঙ্করের সঙ্গেও বকুলের বিয়ে হয় নি, কিন্তু বকুল সংসার বেধেছে।

বকুলের মনে শঙ্করের স্মৃতি উঁকি দেয় কি-না তা জানা যায় না, কিন্তু নগেনকে যে প্রমীলা ভুলতে পারবে না- সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে। মানুষের জীবন এমনই ছন্নছাড়া কেউ যা সহজে পারে, অন্য কারো জন্য তা অসম্ভব। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’য় বলেছেন:

” পুতুল বই তো নই আমরা, একজন আড়ালে বসে খেলাচ্ছেন।” (১খ, পৃ. 890 )

‘জীবনের জটিলতা’য় দুটি দৃশ্যে লাবণ্যকে পাওয়া যায়। কিন্তু সে উপন্যাসের অনেকাংশ নিয়ন্ত্রণ করেছে। নগেনের সঙ্গে লাবণ্যর লখনৌ যাওয়া পরোক্ষভাবে প্রমীলার প্রেমের ওপর আঘাত করেছে। আবার লাবণ্য বিমলকে ভালোবাসে। এই ভালোবাসার কারণে শান্তার প্রতি বিমলের প্রেমের গভীরতা প্রমাণ করে। লাবণ্য উচ্চবিত্ত, শিক্ষিত, আধুনিক, বুদ্ধিমতী মেয়ে।

তার জীবনযাত্রা অতি আধুনিক। সে হেঁয়ালি করতে করতে স্পষ্ট কথা বলতে পারে। বিমল তাকে নগেনের ব্যাপারে সাবধান করতে গেলে তার কথায় বিমলের প্রতি ভালোবাসা এবং নিজের জীবনের প্রতি বুদ্ধিদীপ্ত সিদ্ধান্ত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিমল যখন লাবণ্যর কাছে যায় তখন সে টেনিস খেলছিল। খেলা ফেলে সে বিমলকে ড্রইংরুমে বসায়। নগেনের সম্পর্কে সাবধান করলে সে বিমলকে বলে:

“ভাবনা হয়, কিন্তু ভালোবাসা হয় না। লাবণ্যর মতো মেয়ের কাছেও তুমি একটি রহস্য হয়ে রইলে বাবু।” ( ২খ, পৃ-১৬১)
বোঝা যায় বিমল তার ভালোবাসাকে এখনও স্বীকার করলে সে বিমলের কাছে যেতে প্রস্তুত। বিমলকে যখন সে পাচ্ছে না তখন নিজের জীবন এবং সেই সঙ্গে আরো কয়েকজন মেয়ের জীবন সে তার বুদ্ধিদীপ্ত সিদ্ধান্তে বাঁচিয়ে দিতে চেয়েছে। লাবণ্যর নিজের স্বীকারোক্তি:

“[… …. প্রমীলার কথা আমি জানি। কিন্তু আমার সঙ্গে লখনৌ না গেলে নগেন বিভার সঙ্গে দার্জিলিং যেত। বিভাটা বোকা, ছ মাস পরে আর কার সঙ্গে নগেন কোথায় যেত কে জানে! আমি এক ঢিলে দুই পাখি মেরেছি। অনেকগুলি মেয়েকে বাঁচাচ্ছি, নিজের জীবনযাত্রাকে সহজ করছি।” ( ২, পৃ-১৬১)

লাবণ্যর এই কথার মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, সে যে কোনো পরিস্থিতিতে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারে। বিমলকে না পেয়ে সে হাহুতাশ করে নি, ভেঙে পরে নি, এমন কি বিরহে মন খারাপ করে জীবনযাত্রাকে জটিলও করে তোলে নি, সে অন্য একটি পথ বেছে নিয়েছে। একই সঙ্গে সে নাম না-জানা কয়েকটি মেয়েকে বিপদ থেকে বাঁচিয়েছে।

এ উপন্যাসে শাস্তার বাড়ির ঝি বিন্দুর মধ্য দিয়ে লেখক একটি শ্রেণিকে তুলে ধরেছেন। বাড়ির ঝি যে বাড়ির খবর বাইরে পাচার করে তা এই চরিত্রটির মধ্যে দেখা যায়। শান্তাদের চলে যাওয়ার আগাম খবরটি ঝির মাধ্যমেই প্রমীলা জানতে পারে। আবার শাস্তার ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ার কথাও ঝি বাইরে এসে বলে। বাড়ির কর্তার কথামতো যে তাকে চলতে হয় এটিও বিন্দুর মধ্যে দেখা যায়।

শাস্তার খবর নিতে বিমল গেলে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে বিমলের মুখের ওপর দরোজা বন্ধ করে দেওয়ায় পরাধীনতা স্পষ্ট। আবার টাকা দিয়ে কার্য হাসিল করে নেওয়ার ব্যাপারটি বিন্দুকে দিয়ে করা যায়, ঝি শ্রেণির এই দিকটিও বিন্দুর মধ্যে দেখা যায়। বিমল টাকা দিয়ে বিন্দুর কাছে থেকে মৃত্যুপথযাত্রী শাস্ত্রার খবর সংগ্রহ করে।

নগেনের কাকিমা চরিত্রটি একটি সুখী নারী চরিত্র। স্বামী সানী তাকে প্রচণ্ড ভালোবাসে। বিয়ের পর তারা এক দিনের জন্যও আলাদা হয় নি। তাই তাদের সম্পর্ক কিছুটা তিক্ত হয়েছে ভেবে সে সজনীকে কিছুদিনের জন্য অন্যত্র পাঠাতে চায়, কিন্তু সম্মানী ট্রেন ছাড়ার সময় লাফিয়ে প্লাটফর্মে নেমে পড়ে। কাকিমা, সজনীর এ ভালোবাসায় অভিভূত হয়।

মার্কসইজমে যোগ দেওয়ার পূর্বেই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মধ্যে শ্রেণিসচেতনতা প্রবলভাবে ছিল ‘শহরতলী’ উপন্যাস তার প্রমাণ। এ উপন্যাসে সর্বপ্রথম লেখক মার্কসীয় দৃষ্টিকোণ থেকে মানুষের স্বরূপ এঁকেছেন। সরাসরি মার্কসবাদে যোগ দিয়ে তিনি তত্ত্বাশ্রয়ী সাহিত্য রচনা করেছেন, এই সমালোচনা খণ্ডনের প্রকৃষ্ট প্রমাণ ‘শহরতলী’ উপন্যাস।

এ উপন্যাসই সাক্ষ্য দেয় তিনি প্রথম থেকেই অর্থাৎ ব্যক্তি জীবনেই শ্রেণি সচেতন ছিলেন এবং তাঁর মমতা নিম্নশ্রেণির প্রতি প্রবলভাবে বিদ্যমান ছিল। শহরতলী’ দুই খণ্ডে বিভক্ত। উপন্যাসটিতে যশোদা কেন্দ্রীয় চরিত্র। যশোদার মধ্য দিয়ে লেখক নিজস্ব দর্শন প্রকাশ করছেন। যশোদা সকল শ্রেণির মানুষ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখে।

তাই উচ্চবিত্তের অন্তসারশূন্যতা, মধ্যবিত্তের কৃত্রিমতা, বাহ্যিক ঠাট বজায় রাখা, সীমাবদ্ধ অবস্থা, নিম্নবিত্তের স্বতঃস্ফুর্ততা, প্রাণচাঞ্চল্য, সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতে অক্ষমতা সবই তার দৃষ্টিগোচর হয়েছে। যশোদা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নারী চরিত্র সৃষ্টির এক ভিন্ন মাত্রা। পরিবারের গণ্ডি ছাড়িয়ে একটি শ্রেণির সঙ্গে একাত্ম হয়েছে সে।

পূর্ববর্তী উপন্যাসে লেখক ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির সংঘাত দেখিয়েছেন। বৈরী পরিবেশের বিরুদ্ধে ব্যক্তির লড়াই দেখিয়েছেন। কিন্তু এখানে যশোদা শ্রমিক শ্রেণির জন্য আত্মত্যাগ করেছে, সত্যপ্রিয়র মতো ক্ষমতাশীল ব্যক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। নিজের কোনো স্বার্থের জন্য নয়, সামাজিক স্বার্থের জন্য তার তৎপরতা। মানিক সাহিত্যে এরূপ পুরুষ চরিত্রেরও অভাব। সমালোচকের মন্তব্য:

“এমন বলিষ্ঠ, আত্মনির্ভরশীল, দৃপ্ত আত্মসম্মানজ্ঞানসম্পন্ন, ভাবপ্রবণতাহীন, অথচ রূঢ় ব্যবহারের অন্তরালে মায়া মমতায় কোমল, সেবানিপুণ, তীক্ষ্ণবুদ্ধি স্ত্রীলোক সংসারে, বা সাহিত্যে সুলভ নহে। ১৭

যশোদা শ্যামার বৃহৎ পরিসর। তাকে সকলে ‘চাঁদের মা’ বলে ডাকে। লেখক যশোদাকে জননীরূপেই তৈরি করেছেন। শ্রমিকদের সঙ্গে বসবাসের সময় যশোদাকে সকল সময়ই অনুভব করতে দেখা যায় মৃত সন্তান চাঁদকে। চাঁদের দুঃখ ভুলবার জন্যই সে এতোগুলো বুড়ো শিশু নিয়ে বাস করছে। যশোদা কুলি-মজুর শ্রেণির মাতা হতে আগ্রহী হয়েছে:

“যশোদা যেন এক মহান মাতৃশক্তির প্রতীক, যে তার অনুগত ও প্রসারিত পরিবারভুক্ত সমস্ত মানুষের ভালোর জন্যে সব কিছু ত্যাগ করতে প্রস্তুত।”১৮

শ্যামা এবং সাধনার মধ্য দিয়ে মাতৃত্বের বোধ যশোদার মধ্যে এসে বিস্তৃত হয়েছে। শ্যামা নিজের সন্তানের জন্য কষ্ট করেছে। তার সমস্ত জ্ঞান-বুদ্ধি-পরিশ্রম শুধুমাত্র নিজের সস্তানের জন্য। অন্যদিকে ‘অমৃতস্য পুত্রাঃ’য় সাধনা অনুপমের সঙ্গে তরঙ্গকেও নিজের সংসারে ঠাঁই দিয়েছে। যদিও সাধনার স্বামী নেই, সংসারে টানাটানি, তবু সে তরঙ্গকে ফেলতে পারে নি।

অবশ্য শেষ পর্যন্ত তরঙ্গ সাধনার সঙ্গে থাকে না। বীরেশ্বরের বাড়ি আশ্রয় নেয় এবং আত্মহত্যা করে। তবু সাধনা যে তরঙ্গকে ঠাঁই দিয়েছিল তা তার মাতৃত্ববোধেরই পরিচয়। তাছাড়া অনুপমের প্রতি তরঙ্গের প্রণয়টান ধরা না পড়লে সাধনা তরঙ্গকে কটু কথা বলত না। সাধনার এ আচরণও মাতৃত্বেরই অধিকার। যশোদার সন্তান চাঁদ বেঁচে নেই। চাঁদের জন্য যশোদার হৃদয় হু হু করে। এই রিক্ত হৃদয় পূরণ করার জন্য যশোদা শ্রমিকদের নিয়ে মেতে থাকে।

দুবেলা তাদের ভাত রাঁধে, ওষুধ-পথ্যের ব্যবস্থা করে, ভালো-মন্দের ভাবনাও ভাবে। যশোদা পরিকল্পনাহীনভাবেই এতে বাধা দেয়:

“সম্পর্কটা গড়িয়া উঠিয়াছিল আপনা হইতে, স্বাভাবিকভাবে। প্রথমে ওদের কেবল ভাড়াটে হিসাবে যশোদা বাড়িতে থাকতে দিয়াছিল মাত্র, ওদের সুখদুঃখ ভালোমন্দের ভাবনাটাও যে তাকে একদিন ভাবিতে হইবে সে তখন এ কথাটা কল্পনাও করিতে পারে নাই। চোখের সামনে এই শ্রেণির জীবগুলির কয়েকজন প্রতিনিধির জীবনযাপনের প্রক্রিয়া দেখিতে দেখিতে যশোদা টের পাইয়াছিল, এরা সব বয়স্ক শিশুমাত্র, অভাবে আর চাপে খানিকটা বিগড়াইয়া গিয়াছে। একটু একটু করিয়া তখন মায়া জাগিয়াছিল যশোদার মধ্যে। একটু একটু করিয়া তারপর সে জড়াইয়া গিয়াছিল ওদের জীবনের সঙ্গে। চাঁদের জন্য সব সময় যশোদার মনটা তখন হু হু করিত, এতগুলি বয়স্ক শিশুকে পাইয়া শোকটা তার কমিয়া গিয়াছিল।” ( তখ, পৃ. ২৪৯ )

নন্দ যশোদার ভাই হলেও যশোদার আচরণ মায়ের মতো। নন্দকে সে মাতৃত্বের আদরেই বড় করে তোলে। চাঁদ বেঁচে থাকলে যশোদার আচরণ কী হতো তা বলা কঠিন। চাঁদ নেই বলেই পরিবারের গণ্ডি সে ছাড়াতে পেরেছে, তারপর নিজেকে বৃহৎ পরিসরে সমর্পণ করেছে। প্রথমে নিজের বাড়িতে ভদ্র ভাড়াটে রাখত তারপর তাদের কৃত্রিমতা তার ভালো লাগে নি, তারপর তার দৃষ্টি গেছে নিম্নবিত্তদের প্রতি। এই শ্রেণির প্রতি-ই তার মমতা-ভালোবাসা ।

শ্রমিক শ্রেণির প্রতি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের যে মমতা তা যশোদার মধ্য দিয়েই শুরু হয়েছে। যশোদার মুখ দিয়েই তিনি বড়লোক আর ভদ্রলোকদের কটাক্ষ করেছেন:

“চাদ্দিকে হু হু করে বাড়ি তুলে গণ্ডা গণ্ডা ভদ্রলোক এসে বাসা বাঁধছে, ভদ্রলোক কাকে বলে জানো না? চাষা মজুরকে যারা ঘেন্না করে, বড়োলোকের পা চাটে, ন্যাকা ন্যাকা কথা কয়, আধপেটা খেয়ে দামি দামি জামাকাপড় পরে, আরাম চেয়ে চেয়ে ব্যারামে ভোগে, খালি নিজের সুখ খোঁজে, মান-অপমান বোধটা থাকে টনটনে কিন্তু যত বড়ো অপমান হোক দিব্যি সয়ে যায়, কিছু না জেনে সবজান্তা হয়-” (তখ, পৃ.- ২৩৩)

 

নারী চরিত্র পর্ব ১

 

শ্রেণিচেতনার দিক দিয়ে যশোদা নিম্ন শ্রেণির গুনগান গাইলেও তার মধ্যে সম্পূর্ণ পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব বিদ্যমান।

যশোদার আচার-আচরণ, কথা-বার্তা, বোধ সবই পুরুষ প্রতিনিধির মতো। নারীও যে পুরুষতন্ত্র বহন করে, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় যশোদার মধ্য দিয়ে স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন। উপন্যাসে আছে:

“নিজে সে যে স্ত্রীলোক এটা তার সব সময় খেয়ালও থাকে না।” (৩খ, পৃ. ১৩৪)

সমাজে নারী না হয়ে মানুষ হয়ে বাঁচাটা সম্মানজনক। কিন্তু নারীর পুরুষ হয়ে ওঠা পুরুষতন্ত্রকে প্রশ্রয় দেওয়া । যশোদার মধ্যে এই বোধ দেখা যায়। অভিজ্ঞতায় তার জ্ঞান হয়:

“সংসারে যত গণ্ডগোলের গোড়া মেয়ে মানুষ।” (৩খ, পৃ. ১৩৪)

তাই যশোদার দুটি বাড়ির যেটিতে সে এবং তার ভাই নন্দ থাকে সেটি মেস বা হোটেলের মতো করে শ্রমিকদের ভাড়া দিয়েছে এবং মেয়েদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে। সংসারে মেয়েরা যে গণ্ডগোল করে সেটি তার সংসারের প্রয়োজনে। সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে বিপরীতধর্মী এবং প্রভু শ্রেণির পুরুষের সঙ্গে চলতে গিয়ে অসহায় নারীকে বিভিন্ন অবস্থার শিকার হতে হয়-এই বোধকে লালন না করে যশোদা সরাসরি নারীকে দোষ দিয়েছে।

আবার নন্দর কাছে সুবর্ণ আসলে কোনো কারণ ছাড়া শুধুমাত্র মেয়েটি নন্দর প্রেমে পরেছে এই অপরাধে সুবর্ণকে সে বাধা দিতে তৎপর হয়। উচ্চমধ্যবিত্ত আর নিম্নমধ্যবিত্তের বিভেদ নয়, একটি মেয়ের স্বাধীন মতকে সে সহ্য করতে পারে নি। এক্ষেত্রে একজন পুরুষের মতো আচরণ করে।

যশোদা খাপছাড়া কিন্তু সাহসী জীবনযাপন করে। সমাজ একটি মেয়ের এমন জীবন যাপন বরদাশত করে না।

“এ রকম অবস্থায় অন্য কোনো স্ত্রীলোক হয় পুরুষের আশ্রয় বুজিত, নয় মানুষের মতবাদ ও নির্দেশের চাপে ধ্বংস হইয়া যাইত, যশোদা কিছুই করে নাই। জীবনযাপন করে সে স্বাধীন, কারো কাছে তার কোনো প্রত্যাশা নাই, নিন্দা-প্রশংসা সে গ্রাহ্য করে না, কারও দরদের জন্য কাঁদিয়াও মরে না।” ( ৩খ, পৃ.-১৩৪)

এভাবে লেখক একটি নারীকে পুরুষের স্তরে পৌঁছে দিয়ে নারীকে সমাজের সমান অংশ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তবে যশোদার শারীরিক বর্ণনায় লেখক তাকে নারীসুলভ রাখেন নি-যশোদা লম্বা চওড়া, শক্ত-সমর্থ, নারীসুলভ লাবণ্য ও কোমলতা নেই। সে কারণে কোনো পুরুষের সঙ্গে তার কোনো অবৈধ সম্পর্ক থাকবে তা কারো মনেও আসে না। কোমল নারীর ভেতরে এমন একটি বলিষ্ঠ চরিত্র চিত্রিত হলে নারী চরিত্রের ক্ষেত্রে আরো গুরুত্ববহ হতো। এ ক্ষেত্রে লেখকের দুর্বলতা চোখে পরে।

যশোদা সর্বদাই সাদাসিধে জীবন যাপনে অভ্যস্ত। সুধীর তাকে সাজগোজ করে বউভাতে যেতে বললে সে বলে কচি খুকি নাকি সাজবো? লেখক বলেছেন:

“সাজগোজের ধার সত্যই যশোদা ধারে না, সে বয়সও নাই, শখও নাই, বয়স থাকার সময়েও শখ ছিল কি না সন্দেহ।” (৩খ, পৃ.-১২৫)

তবে নিমন্ত্রণ খেতে যাওয়ার সময় একটা ভালো শাড়ি পরে যেতে হবে যশোদার। সে বাক্স খুলে শাড়ি খুঁজতে থাকে, পুরোনো তিনটি রঙিন শাড়ি পাওয়া যায়, কিন্তু রঙিন শাড়ি পরতে রাজি নয় সে। অবশেষে একটি ফিকে রঙের শাড়ি পেয়ে সে হাঁপ ছাড়ে। শুধু সাজ পোশাকই নয়, তার জীবনযাত্রা, ঘরদোরও সাধারণ। সে দুটি বাড়ির মালিক, অনেকগুলো ভাড়াটে তার সে রীতিমত বড়লোকী চালচলনে থাকতে পারতো। কিন্তু কুলি-মঞ্জুর ভাড়াটেরা তাকে নিয়মিত ভাড়া তো দেয়ই না, উপরন্তু তার ওপর খাওয়ার ভারটিও পড়ে এবং যশোদা সানন্দে সকলের সেবা করে চলে।

যশোদা পরোপকারী ও দায়িত্বশীল। সে তার বাড়িতে কুলি-মজুরদের ভাড়া দেয় এবং টাকার বিনিময়ে রান্না করে খাওয়ায়। সকলে মিলে তাদের একটি সংসার। যশোদা এই সংসারের কর্ত্রী। ভাড়াটেরা সকলে ঠিকমতো টাকা দেয় না বলে যশোদা তাদের তাড়িয়ে দেয় না।

আবার কারো চাকরি না থাকলে কিংবা কেউ নতুন গ্রাম থেকে এলে তার চাকরি জোগাড় করে দেওয়ার দায়িত্ব যশোদা নিজে থেকেই নেয়। তাই সকলে তাকে সমীহ করে। কারো অসুখবিসুখ হলে যশোদা নিজে থেকে তাদের সেবাযত্ন করে, ওষুধ-পথ্য আনে, কেউ বিপদে পরলে তাকে টাকা দিয়ে সাহায্য করে। একটি সন্তানকে হারিয়ে এতোগুলো সন্তানের সে যেন জননী:

“নিজের বা নিজের ভাইয়ের জন্য আজ এ বেলা যশোদার উনানে আঁচ দিবার দরকার ছিল না, পাড়ায় বউভাতের নিমন্ত্রণ আছে। কিন্তু আরো যে বিশ-বাইশজন লোক বাড়িতে আছে তাদের জন্য যশোদার রাঁধিতে হইল। [… […] এতগুলি লোককে উপবাসী রাখিয়া ভাইকে নিয়া কি নিমন্ত্রণ খাইতে যাওয়া চলে?” (তথ, পৃ. ১২৪ )

ভাড়াটেদের সঙ্গে আত্মীয়তা না থাক আত্মার সম্পর্ক আছে। তাদের মধ্যে মান-অভিমানও চলে। মদ খেয়ে মতি আর সুধীর দেরি করে ঘুম থেকে উঠলে কাজে যাওয়া দেরি হবে বলে খাওয়া বন্ধের কথা বলে যশোদা। সে এও জানে পেট ভরে ভাত-তরকারি খাওয়া তাদের বিলাসিতা, এ থেকে তাদের বঞ্চিত করা ঠিক হবে না।

তাই মতি আর সুধীরের ভাত বেড়ে সে বাজার করার নাম করে বাইরে যায়, যেন ওরা তাড়াতাড়ি খেয়ে কাজে যেতে পারে। ধনঞ্জয় একবার যশোদার সঙ্গে রাগ করে বাড়ি চলে গিয়ে আবার ফিরে এলে যশোদা তাকে সানশে বাড়িতে জায়গা দেয়। এবার ধনঞ্জয়ের কাছে টাকা নেই সে জন্য সে অন্য কোথাও থাকতে চাইলে যশোদা কপট অভিমানে বলে

“রাস্তায় ঘুরে ঘুরে কাটিয়ে দেবে আর কলের জল খেয়ে পেট ভরাবে। তাই করগে যাও, আমার কাছে এসেছ কেন? আমি কাজ জুটিয়ে দেব সে পর্যন্ত আমার অন্ন খেতে মানে বাধবে-এমন যদি মানী দুর্যোধন তুমি রোজগার করতে বেরিয়েছ কেন ঘর থেকে?” (৩খ, পৃ. ১৬০ )

শুধু কুলি-মজুরই নয়, ‘শহরতলী’ দ্বিতীয় খণ্ডে কুলি-মজুরের সঙ্গে যশোদার সম্পর্ক ঘুচে যাওয়ার পর ভদ্রঘরের মেয়ে-বউরা তার বাড়ি এলে, সে যখন তাদের শ্যাওলা ধরা জীবনের কথা জানতে পারে তখন

“উপেক্ষা, অবহেলা বা বিতৃষ্ণার বদলে যশোদার মনে জাগে মমতা।” ( ৩খ, পৃ.- ২৩৭)

যশোদার ভদ্র ভাড়াটে সুব্রতা যখন চায়ের সরঞ্জাম কেনার জন্য গহনা বিক্রি করতে চায় তখন বড় বোনের দায়িত্ব নিয়ে সে সুব্রতাকে নিবৃত করে। সুব্রতা সন্তানসম্ভবা হলে তাকে বুকে তুলে নেয়। যামিনী সন্তানসম্ভবা যোগমায়াকে নিয়ে এলে যশোদা যামিনীকে তার গোঁয়ার্তুমির জন্য নানা রকম অভিযোগ করে। এবং যোগমায়ার এ রকম সময় তাকে নিয়ে টানাটানির জন্য যামিনীকে কড়া কথা বলে

“প্রথমবার লোকে কত সাবধানে রাখে, মন ভালো রাখার জন্য বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেয়, আর আপনি এমন একটা বিচ্ছিরি কাণ্ড বাধিয়ে বসলেন। বয়স তো কম হয়নি আপনার?” (তথ, পৃ.-২৫৯)

শত্রু সত্যপ্রিয়র মেয়ে হলেও যোগমায়াকে ভালো রাখার জন্য যশোদা প্রাণপণে চেষ্টা করে, তাকে সাহস দেয়, তাকে নিয়ে সিনেমায় যায়। মহীতোষ এসে সত্যপ্রিয়র নিষ্ঠুরতা সম্পর্কে বললে তাকে থামিয়ে যোগমায়াকে শান্ত করে, অবশেষে মাতৃত্বের দায়িত্ববোধে সে সত্যপ্রিয়র কাছে মেয়ে-জামাইকে ফিরিয়ে নেওয়ার আবেদন জানায়।

যশোদা তার ভাড়াটেদের ব্যাপারে সচেতন। সে তাদের সুখ-দুঃখ দেখে নিজে থেকেই। যশোদার অন্য বাড়িতে নারী-পুরুষের গাদাগাদি। সেখানে একটা জলের কলে হয় না-কারো কোনো অভিযোগ না থাকলেও যশোদা আরেকটি কল বসানোর জন্য দরখাস্ত করে। নিজে থেকেই নদের চাঁদের বউ চাঁপার মায়ের জন্য সুধীরকে দিয়ে ওষুধ আনার।

পরেশ জেলে গেলে পরেশের বউকে বাপের বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসে। কুলি-মজুররা তার কাছে ভালো, ভদ্রলোকরা নাকি ছোটলোক আর অপদার্থ। ভদ্রলোকদের সে কটাক্ষ করে- ভদ্রলোকের ভেতরের ফাঁকিটুকু ধরতে পারে। সুধীর তার সঙ্গে বেয়াদবি করলে সে কষ্ট পায়, রাগ করে আবার মনে মনে ভাবে “তার কুলি মজুররাই ভালো। এদের যদি আপন না করিবে, আপন হইবে কারা?

সত্যপ্রিয়র মতো যারা বড়োলোক, অথবা জ্যোতির্ময়ের মতো যারা ভদ্রলোক? বড়োলোক, ভদ্রলোক আর ছোটলোক, বিগড়াইয়া অবশ্য গিয়াছে সকলেই, তবু অভাবে যারা বিগড়াইয়া গিয়াছে তারা এখনও মানুষ আছে খানিক খানিক। আর এ অবস্থায় জীবন কাটাইয়া খানিক খানিক মানুষ থাকাও কী সহজ গৌরবের কথা। সুধীরের মতো একজন করিয়া প্রত্যেক দিন তার সঙ্গে বেয়াদবি করুক, তবুও যশোদা চিরকাল এদেরই ভালোবাসিবে।” (তখ, পৃ. ১৮৬)

এই কুলি-মজুরদের সে অধিকার আদায় করে নিতে শেখায়। যে তা না পারে তার প্রতি হীन দৃষ্টিতে তাকায় যশোদা। তার ভাড়াটে জগতের বোন কালো গাঁ থেকে এসেছে, শহরে ভাব এখনো রপ্ত করতে পারে নি। জগতের প্রেমিকা চাঁপা তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে বাসন মাজতে বসলে, কালো একপাশে মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে থাকে।

কালোর প্রতি যশোদা মমতা বোধ করে, কিন্তু স্বাস্থ্যবান কালোকে স্বনির্ভর করার জন্য রোগা চাঁপাকে সে কিছু বলে না। যশোদা দেখে কালো অভিমান করে দাঁড়িযে আছে। কিন্তু এ কার ওপর অভিযান? এমন মুখ ভার করার দাম কি কেউ কাউকে দেয়?

এই অহেতুক অভিমান থেকে বাস্তব জগতে বের হওয়ার জন্য আঘাত পেয়ে প্রতিহত করার সাহস অর্জনের জন্য যশোদা কালোর হয়ে চাপাকে কিছু বলে না। যশোদা প্রবল ব্যক্তিত্বের অধিকারী। অকারণে ভাড়াটেদের সঙ্গে বসে গল্প করা, হাসি-ঠাট্টা করা সে পছন্দ করে না। সুধীর তার সঙ্গে বসে গল্প করতে চাইলে সে বলে:

“বসে বসে গল্প করবো তোমার সঙ্গে? খাবে তো খেয়ে যাও সুধীর, নয়তো উপোসে রাত কাটাবে বলে রাখলাম।” ( ৩খ, পৃ. ১৪৮ )

 

নারী চরিত্র পর্ব ১

 

কুলি-মজুরদের সঙ্গে যেমন তার ব্যক্তিত্ব বজায় থাকে, উচ্চবিত্তের বেলায়ও তার নড়চড় হয় না। নন্দকে সত্যপ্রিয় অপমান করলে সে ক্ষোভে ফেটে পরে। সে নন্দকে নচ্ছার, হারামজাদা বলে গালি দেয়। সত্যপ্রিয় যখন কয়েক শো কর্মচারীর মধ্যে থেকে নন্দকে উঠিয়ে তার জন্য আসন আর রুপোর থালা আনতে বলে তখনই নদ গটগট করে চলে এলো না কেন সে জন্য নন্দকে ধিক্কার দেয়।

আবার সত্যপ্রিয়র বাড়ি নিমন্ত্রণ খেতে গিয়ে যশোদা যখন খাচ্ছিল, তখন সত্যপ্রিয়র সেজোমেয়ে যশোদাকে দেখে বিলখিল করে হাসে। যশোদা তাকে ছুঁড়ি বলে সম্বোধন করে এবং বলে

“এ রকম যে হাসতে নেই, ছোটলোকের বাড়ির মেয়েরও সেটুকু শিক্ষে আছে।” ( ৩খ, পৃ. ১৭৭)

যশোদা কুলি-মজুরদের আন্দোলনে জড়িয়ে পরে। যশোদা শ্রমিক নয়, বিভিন্ন সময় শ্রমিকদের উপকার করে। সে তীক্ষ্ণবুদ্ধিসম্পন্ন নারী। নিজের বুদ্ধিমত্তার জন্য সে শ্রমিক আন্দোলনে জড়িয়ে পড়লো। ভরদ্বাজ মতির গালে আলকাতরা মেখে দিলে সুধীর কারখানায় মারামারি করে। সে জন্য পূর্ব ধর্মঘটের আটজন পান্ডাসহ মতি সুধীরের চাকরি চলে যায়। এই শ্রমিকরা দিনভর আন্দোলন করে, দাবি আদায়ের জন্য ধর্মঘট করে।

এরপর মতি সুধীরের বাড়িতে শ্রমিকরা আসে। বাড়ির আঙিনায় তাদের জায়গা হয় না, ত্রিশ/চলিশজন বাড়িতে থাকে, গলিতে ভিন্ন করে অন্য সকলে। এই বিপদে তারা যশোদার কাছে পরামর্শ চায়। যশোদার একটি বুদ্ধিদীপ্ত কথায় তাদের আন্দোলনের মোড় ঘুরে যায়। যশোদা খুক্তি হাতে রান্না ঘরের দরোজায় দাঁড়িয়ে প্রথমে এতো লোক বাড়িতে ঢোকার জন্য গালমন্দ করে, তারপর সব শুনে বলে

“দু-নম্বর মিলে ছুটে যেতে পারলে না সবাই মিলে, সেখানেও ঘর্মঘট করাতে পারলে না? (৩৬, পৃ. ১৪৬)

এই সহজ কথাটা কারো মনে হয় নি। যশোদার এই কথায় সকলে সম্বিত ফিরে পায়, তারা যশোদার পরামর্শের জন্য ব্যগ্র হয়ে ওঠে। যশোদা তাদের বলে কয়েকজন মিলে দু-নম্বর মিলের লোকজনকে খুঁজে বের করতে আর পরদিন ভোরে সেখানে সবাইকে যেতে। বেছে বেছে কয়েকজনকে থাকতে বলে অন্য সকলকে সে যেতে বলে।

কয়েকজনের সঙ্গে যশোদা পরামর্শ করে দুই ঘণ্টা।এমনি করে পরিবেশ-পরিস্থিতির কারণে কোনো ধরনের পূর্ব পরিকল্পনা ছাড়াই যশোদা শ্রমিক আন্দোলনে জড়িয়ে পরে। পরদিন সত্যপ্রিয়র মিল থেকে ডাক আসে- মজলিসে তাকে যেতে হবে-গাড়ি নিয়ে কাশীবাবু নিজে তাকে নিতে এসেছে। কাশীবাবু বলে

“আপনি মাতিয়ে দিয়েছেন ওদের, আপনি না গেলে ওরা কারও কথা শুনবে না।” (তথ, পূ.)

যশোদা শ্রমিকদের দাবি মিটিয়ে দিতে বলে। কিন্তু শ্রমিকদের দাবি বেড়ে গেছে এরই মধ্যে। গতবারে যেসব দাবির জন্য ধর্মঘট হতে যাচ্ছিল সে দাবিও এই দাবির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। মালিক পক্ষের ধারনা যশোদার পরামর্শে এটা হয়েছে। যশোদা তার সাধারণ বোধ থেকে বলে:

“আমার পরামর্শ কি ওরা শোনে? শুনলে কি আর এ দুর্দশা হয় ওদের? কত বলি যে কাজকর্ম যখন থাকে, পয়সা জমা দুটো, অসময়ে কাজে লাগবে। কানেও তোলে না কেউ আমার কথা।” ( ৩খ, পৃ. ১৪৬)

শ্রমিক-মালিক সকলেই যখন যশোদাকে নেত্রীর আসনে বসিয়েছে তখন যশোদা মায়ের মমতাসুলভ কথা বলছে। শ্রমিক স্বভাবের গোড়ায় যে সমস্যা সেটা নিয়ে সে বেশি চিন্তিত। যশোদাকে দেখে পাঁচ ছয়শো শ্রমিক উৎসাহিত হয়ে ওঠে। অফিস ঘরের বৈঠকে যশোদাকে নিয়ে যাওয়া হয়। যশোদা এখানে তৃতীয়পক্ষ। মালিকপক্ষ যশোদার উপর ক্ষুব্ধ। শ্রমিক সমিতি যশোদার ওপর বিরক্ত। শ্রমিক সমিতি যশোদাকে বলে:

“আমাদের না জানিয়ে ধর্মঘট আরম্ভ করা কি আপনার ঠিক হয়েছে?” (তখ, পূ. -১৪৭)

তবে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে তাতে যশোদার কোনো হাত ছিল না, অবশ্য পরে বুদ্ধি সে দিয়েছে এবং সকল শ্রমিকের প্রতিনিধি হিসেবে আলোচনায় বসেছে। তবে যশোদা জানে বড়ো অসময়ে ধর্মঘট শুরু হয়েছে, ঝোঁক কেটে গেলে অনেকেই কাজে যোগ দেবে। তার চেয়ে যতটুকু পারা যায় দাবি আদায় করে ধর্মঘট তুলে দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।

তাদের মধ্যস্থতা হলো এভাবে- দশজনের মধ্যে নয়জনকে কাজে ফিরিয়ে নেওয়া হবে, চলিশজন নতুন লোক নেবে, এর মধ্যে ত্রিশজন যশোদা ঠিক করে দেবে, কাজের সময় আর মঞ্জুরি সম্পর্কে দাবি মেটানো হলো না। যশোদা এখানে একজন তীক্ষ্ণবুদ্ধিসম্পন্ন নেত্রীর মতো আচরণ করলো। যখন আলোচনার আরম্ভ হয়, তখন সে শুনল বেশি, কথা বললো কম, তারপর অবস্থা বুঝে সিদ্ধান্ত নিল।

রাজনৈতিক ব্যাপারে যশোদা পারদর্শী নয়। সত্যপ্রিয় ধূর্ত ব্যক্তি। তার সঙ্গে পেরে ওঠা যশোদার পক্ষে দুষ্কর, তবু যশোদা শ্রমিকদের মধ্যমণি হয়ে রইল। অন্যদিকে সত্যপ্রিয় যশোদাকে পরাস্ত করার জন্য প্রাণপণে কার্যক্রম শুরু করলো। তবে, রাজনৈতিক চালে যশোদা কিছু ভুল করে ফেললো। প্রথমেই যে ভুলটি করলো তা হলো- অল্প দাবি আদায়ে কেন যশোদা ধর্মঘট তুলতে বললো, তা যশোদা শ্রমিকদের খোলাসা করে বললো না, তাই যশোদার সঙ্গে শ্রমিকদের একটি দূরত্ব রয়ে গেল।

যশোদা নন্দর চাকরির কথা জ্যোতির্ময়কে আগেই বলেছিল, ধর্মঘটের কিছুদিন পরই জ্যোতির্ময় নন্দকে একটা চাকরি দিলো। যশোদা বুঝতে পারে যে এ সময় সত্যপ্রিয়র মিলে তার ভাইয়ের চাকরি করতে যাওয়াটা ভালো দেখায় না, তাই সে নন্দকে দোকান করে দিতে চায়, কিন্তু কুঁড়ে প্রকৃতির নদ দোকান করবে না, সে চাকরি করবে। এদিকে নদ গানবাজনা করে, তাস খেলে দিন দিন অমানুষ হয়ে উঠছে, উপায় না দেখে তাই যশোদা নন্দকে চাকরি করতে পাঠালো।

যশোদা নিজেকে বুঝালো এই বলে যে, নন্দ সামান্য বেতনে চাকরি করতে যাচ্ছে। তারপর সত্যপ্রিয় তার বাড়িতে পিতার শ্রাদ্ধের নিমন্ত্রণে ঘরভর্তি লোকের সামনে নন্দকে অপদস্থ করলে জ্যোতির্ময় নন্দকে চাকরিতে আসতে নিষেধ করে। যশোদা তখন নিশ্চিন্ত হয়। কিন্তু সত্যপ্রিয় ছাড়বার পাত্র নয়, সে অনেক ধূর্ত মানুষ।

তার হঠাৎ কীর্তন শোনার শখ হয়। তার বাড়িতে খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন আছে, ওই দিন নন্দ সত্যপ্রিয়র বাড়ি কীর্তন করবে আর যশোদার নিমন্ত্রণ-সত্যপ্রিয় যশোদার সঙ্গে মিল আর শ্রমিকদের অবস্থা সম্বন্ধে কথাবার্তা বলতে চায়।

এ দিকে মিলে আরেকটি ধর্মঘটের গুঞ্জ চলছে, দু-চারজন পাণ্ডা এসে যশোদার সঙ্গে দেখা করেছে। যশোদাকে সত্যপ্রিয়র খাতির করার কারণ সে বুঝতে পারলো। তবু মিলে এখন কাজ খুব কম, ধর্মঘট করে কিছু ফল হবে না তার চেয়ে কথাবার্তা বলে কিছু দাবি আদায় হলে সেটা ভালো হবে ভেবে যশোদা ধর্মঘট করতে দিলো না। আবার ধর্মঘট না করার কারণ সে শ্রমিকদের বললোও না।

সে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে গেলো সত্যপ্রিয়র বাড়ি। যশোদার সঙ্গে শ্রমিকদের আবার একটি দূরত্ব সৃষ্টি হলো, সরল-সহজ যশোদা তা বুঝতেও পারলো না। কিন্তু সত্যপ্রিয় কর্ম হাসিল করার জন্য বদ্ধপরিকর। সে যশোদার সঙ্গে খেলতে শুরু করলো। কীর্তন শোনার পর জ্যোতির্ময়কে দিয়ে যশোদাকে তার অবসর যাপনের ঘরে ডেকে পাঠিয়ে সে তার বেশ পরিবর্তন করে।

অবসর যাপনের ঘরটির একপাশে চৌকির মতো সাদাসিধে ছোট একটি খাটে বিছানা, একটি রিভলভিং বুকসেলফে কতগুলি বই আর মেঝেতে আসন করে লেখার জন্য একটি ডেস্ক। সত্যপ্রিয় খালি গায়ে হাঁটুর ওপর কাপড় তুলে মেঝেতে আসন-পিঁড়ি হয়ে বসেছে। পরনের কাপড় গরদের, কাঁধে মোটা পইতা, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা, বাহুতে কবজ, তাবিজ, কবজির কাছে স্ফটিকের জপমালা জড়ানো। ঘর এবং সত্যপ্রিয়র বেশ অতি সাধারণ যশোদাকে কাবু করে ফেলেঃ

“মানুষটাকে প্রণাম করিবার কোনো সংকল্পই তার ছিল না, কিন্তু ঘরে ঢুকিয়া প্রৌঢ় ও সাধুবেশধারী ব্রাহ্মণকে সে একেবারে পায়ে হাত দিয়া প্রণাম করিয়া ফেলিল, […. …. ….] দেখিয়া জ্যোতির্ময় ভাবিতে থাকে, এই জন্যই কি সত্যপ্রিয় তাড়াতাড়ি বেশ বদলাইয়াছে, যশোদার মনে শ্রদ্ধা জাগাইবার জন্য?” ( তখ, পৃ. 198 )

সত্যপ্রিয় কৌশলী, সে যশোদার সঙ্গে দেশের অবস্থা নিয়ে আলোচনা শুরু করে, নন্দকে ভালো চাকরি দেওয়ার কথা বলে এবং শ্রমিকদের দাবি-দাওয়ার বিষয়ে বিবেচনার কথা বলে উঠে পরে। যশোদাকে সে কোনো কথা বলার সুযোগই দেয় না। এদিকে যশোদা আগেই ধর্মঘট বাতিল করেছে। যশোদার তীক্ষ্ণ বুদ্ধি সব বুঝতে পারে কিন্তু এখন তার কিছু করার নেই। সে জ্যোতির্ময়কে বলেঃ

“এমন তুখোড় দেখিনি। ” ( ৩খ, পৃ. ১৭৬)

বার বার যশোদা বোকামি করতে শুরু করলো। সত্যপ্রিয়র ধূর্ততার কাছে সে ধুলোর মতো উড়ে যায়। তবু শ্রমিকরা যশোদার কাছে আসে, পরামর্শ করে এমনকি তাদের সভায় গিয়ে বক্তৃতা করতে বলে। এ সময় যশোদার বাড়িতে দুটি বিয়ে সম্পন্ন হয়। সুধীর আর কালো, জগৎ আর চাঁপা- দুটি বিয়ের পর সে আবার ধর্মঘটের মধ্যে ব্যস্ত হয়ে যায়।

সে শ্রমিকদের বিভিন্ন প্রশ্ন খুঁটে খুঁটে জিজ্ঞাসা করে, শ্রমিকদের কথা কাটাকাটি মন দিয়ে শোনে, তারপর মত প্রকাশ করে। এর মধ্যে ঘটে যায় আর এক ঘটনা। পরদিন ধর্মঘট হবে, কাজে যেতে হবে না, তাই রাতে মতি প্রায় এক মাইল দূরে এক চেনা স্ত্রীলোকের ঘরে নিশ্চিন্ত মনে মদ খেতে গিয়েছিল, তার ওপর কার রাগ ছিল, সে মতিকে মারধর করে। পরদিন মিলে গুজব রটে মতি খুন হয়েছে, এই নিয়ে শ্রমিকদের মধ্যে মারামারি হয়।

মতিকে যশোদা হাসপাতালে দেখতে যায়, তখনও গুজব রটে যশোদার ওপর অকথ্য অত্যাচার হয়েছে, সে হাসপাতালে গেছে। শ্রমিকদের আবার মনের মিল হয়ে যায়, তারা ধর্মঘট শুরু করে দেয়। মারামারিতে সুধীর জখম হয়েছিল, পরদিন পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে যায়। যশোদা কালোর কান্নায় সুধীরকে ছাড়াতে যাওয়ার সময় কাশীবাবুর সঙ্গে দেখা হয়।

কাশীবাবু সুধীরকে নিয়ে যশোদাকে অশীল কথা বললে যশোদা কাশীবাবুর মুখ রাস্তায় জোরে জোরে ঘষে দেয়, তাই যশোদাও জেলে যায়। তিনদিন পর সত্যপ্রিয়র মেয়ের বিয়ে। এ সময় সে হাঙ্গামা চায় না, আবার কাঁটা দিয়ে কাঁটাও তুলতে চায়। তাই সে নিজে যশোদাকে ছাড়িয়ে আনে এবং কাশীবাবুকে গালমন্দ করে। সে বলে

“আমার দেশের মানুষ ওরা, দুটি অন্নের জন্য খাটতে এসেছে, খিটিমিটি বাধে নিজেদের মধ্যে তা মিটিয়ে নেব, ওদের না পোষায় ওরা কাজ করবে না, আমার না পোষায় আমি কারখানা তুলে দেব-পুলিশ ডাকবো কোন লজ্জায় ?” ( ৩খ, পৃ. ১৯১) তারপর সে যশোদাকে বলে:

“আমি যদি বলি তিনমাস পরে আমি নিজে খোজখবর নিয়ে ওদের সমস্ত নালিশ আর দাবির ব্যবস্থা করবো, হাঙ্গামাটা তুমি মিটিয়ে দিতে পারবে?” ( তখ, পৃ. ১৯১)

যশোদা এবারও সত্যপ্রিয়কে বিশ্বাস করলো। যদিও এ সময় ধর্মঘট করে কিছু দাবি আদায় করা ভালো, তবু সে সত্যপ্রিয়কে বিশ্বাস করে ধর্মঘট উঠিয়ে নিল। সত্যপ্রিয় নিজের গাড়িতে করে যশোদাকে মেয়ের বিয়েতে আনলো। যশোদার খাতিরের কোনো ত্রুটি রাখলো না।

এরপর নন্দকে ষাট টাকা বেতনে চাকরি দিলো। যশোদার যশোদার নিষেধ সত্ত্বেও নন্দ চাকরি করতে গেলো। এবার শুরু হলো সত্যপ্রিয়র মিলে চাকরি যাওয়ার মরশুম। শ্রমিকরা যশোদাকে এড়িয়ে চলতে শুরু করলো। পরে যশোদা বুঝলো

“খুবই সহজ একটা চাল দিয়া যশোদাকে সত্যপ্রিয় কুপোকাত করিয়াছে। প্রথমে রটিয়াছে এই যে যশোদা ভিড়িয়াছে উপরওয়ালাদের সঙ্গে, যশোদা বিশ্বাসঘাতিনী। প্রমাণ? আগে একবার ধর্মঘট ঘটাইয়াছিল কে সকলের ক্ষতি করিয়া? গতবার ধর্মঘট থামাইয়াছে কে সকলের ক্ষতি করিয়া?

সত্যপ্রিয়র সঙ্গে, কাশীবাবুর সঙ্গে এত অন্ত রঙ্গতা কীসের যশোদার, দুবেলা সত্যপ্রিয়র মোটর চাপিয়া কেন সে সত্যপ্রিয়র বাড়ি নিমন্ত্রণ রাখিতে যায়? নন্দর মতো একটা ছোঁড়া যে মিলে অমন চাকরি পাইল, এটা কীসের পুরস্কার? এক একটা ছুতা দিয়া একে একে ধর্মঘটের সাত-আটজন পাণ্ডাকে তাড়াইয়া দেওয়া হইল এটা কার পরামর্শ?” ( ৩খ, পৃ. ১৭৬)

রাজনৈতিক চালে হেরে গিয়ে যশোদা নিঃস্ব হয়ে পড়লো। শ্রমিকরা তাকে ত্যাগ করলো-শুধু ধনঞ্জয় ছাড়া। যশোদা একা হয়ে পড়লো। আসলে সুগঠিত শক্তির কাছে যশোদা পরাজিত হয়েছে। শুধু আবেগ দিয়ে কোনো আন্দোলন হয় না, এর জন্য বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজনঃ

“বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে শ্রমিক সমস্যাকে সাহিত্যে রূপায়িত করার প্রশ্ন মানিকই প্রথম উপলব্ধি করেন এবং ‘শহরতলী’ উপন্যাস থেকেই তার শুরু। ১৯

‘শহরতলী’ দ্বিতীয় খণ্ডে দেখা যায় নন্দও সুবর্ণকে নিয়ে পালিয়ে গেছে। শহরতলী শহরে রূপান্ত রিত হচ্ছে। প্রায় সকলে বাড়ি বিক্রি করে চলে গেছে। যশোদার বাড়িতে এসে রূপান্তর থেমে গেছে। যশোদার পরে কুমুদিনীর বাড়ি তারপর আরো কয়েকটি বাড়ি যশোদার জন্য তারা বিক্রি করতে পারছে না।

সত্যপ্রিয় বেনামীতে বাড়ি কিনে নিচ্ছে বলে যশোদা তার শত্রুর কাছে বাড়ি বিক্রি করবে না। যশোদার যুদ্ধ এখনও শেষ হয় নি। তাকে নিঃস্ব করে দেওয়ার প্রতিশোধ সে নিতে চায়। তারপর অনেক কষ্টে যশোদাকে বাড়ি বিক্রি করতে রাজি করায় কুমুদিনী। সে যাওয়ার জন্য তার বড় বড় চুলি পা দিয়ে ভেঙ্গে ফেলে, তার পায়ে লোহার শিক ঢুকে যায়। সে শিক টান দিয়ে খুলে ফেলে সেখান দিয়ে তীব্রবেগে রক্ত বের হতে থাকে।

যশোদা তাকিয়ে থাকে উনুনের ভগ্নস্তুপের দিকে। এক সময় বিশ-পঁচিশ জনের জন্য মোটা ভাত সে এই উনুনে রান্না করতো, আজ তারা সকলেই যশোদাকে ত্যাগ করেছে। তার মনে আবার ক্ষোভ দানা বেঁধে ওঠে। সে আবার বাড়ি বিক্রির চিন্তা বাতিল করে দেয়। কুমুদিনী তার সঙ্গে খুব রাগারাগি করলে সে বলে:

“সত্যপ্রিয় কিনে নিচ্ছে তো ঘরবাড়ি ওকে আমি বেচব না, লাখ টাকা দিলেও না।” ( তখ, পৃ. ২২৪ )

এরপর শুধু যশোদা আর কুমুদিনী ছাড়া সকলে বাড়ি বিক্রি করে দেয়। এ সময় যশোদার একটা সুযোগ আসে সত্যপ্রিয়কে বিপাকে ফেলার। সত্যপ্রিয়র মেয়ের জামাই যামিনী শ্বশুরের সঙ্গে রাগ করে স্ত্রীকে নিয়ে বাড়ি থেকে চলে এসে যশোদার বাড়ি ভাড়া নেয়। যশোদাও রাজি হয়, সত্যপ্রিয়কে বিপাকে ফেলার জন্য। কিন্তু যশোদা এবারও ভুল করে।

কারণ সত্যপ্রিয় এবার অন্যভাবে প্রতিশোধ নেয়। তার কোম্পানির রাস্তার জন্য জায়গা প্রয়োজন। রাস্তা যাবে যশোদার বাড়ির ওপর দিয়ে গভর্নমেন্টের কাছ থেকে নোটিশ আসে। অবশেষে সম্পূর্ণ হার স্বীকার করে যশোদাকে বাড়ি বিক্রি করতে হয়।

যশোদা বাস্তব বুদ্ধিসম্পন্ন নারী, কিন্তু ধূর্ত সত্যপ্রিয়র সঙ্গে সে পেড়ে উঠলো না। নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে গিয়ে সত্যপ্রিয়র মেয়েকে কটু কথা বললে, সত্যপ্রিয়র কথায় তার ইংগীত ছিল:

“আমার চাকরবাকরের দোষ দেখিয়ে দেবার সাহস পর্যন্ত অনেকের হয় না।” (তখ, পৃ. ১৭৮)

তখন যশোদা বোঝে বাস্তব জগৎ কতটা নির্মম। টাকা কত কিছু করতে পারে। বড়োলোককে ভয় আর খাতির করা সংস্কারে দাঁড়িয়েছে। সত্যপ্রিয় চটলে যে ভয়ের কারণ আছে যশোদার তা বুঝতে বাকি থাকে না। আবার সত্যপ্রিয়র মেয়ের বিয়ের আগে ধর্মঘট মিটিয়ে দিলে নিজের গাড়িতে সত্যপ্রিয় যশোদা আর নন্দকে বাড়িতে নিয়ে যায়। তখনও যশোদা শঙ্কিত হয়ে ওঠে, নন্দকে বলে:

“উহু, কী যেন মতলব আছে লোকটার। নইলে এমন বাড়াবাড়ি করত না। ” (৩খ, পৃ.-১৯২)

সব বুঝেও যশোদা শেষ রক্ষা করতে পারে না । যশোদার নিজের আত্মীয় বলতে কেউ নেই, একমাত্র ভাই নন্দ ছাড়া। নন্দকে যশোদা নিজের হাতে বড় করেছে। কিন্তু সে মনের মতো হয় নি। ভাইয়ের ভালোর জন্য সে সর্বদাই চিন্তিত থাকে। ভাই যাতে বখে না যায় বাস্তব জগতের সংস্পর্শে আসে, তাই মনে সংশয় থাকলেও নন্দকে সত্যপ্রিয়র মিলে কাজে পাঠায়।

 

নারী চরিত্র পর্ব ১

 

চাকরি থেকে ফিরতে তার সন্ধ্যা হয়, মুখ হয়ে যায় শুকনো, যশোদা তাকে দুধ-কলা-সন্দেশ খাওয়ায়। রাতে সমস্ত দিনের খুঁটিনাটি বিষয় বিস্তারিত শোনে। যশোদা বুঝতে পারে তার ভাবপ্রবণতা কমছে না। তাই সে আরো চিন্তিত হয়। নন্দ কীর্তন গেয়ে নিজেকে আরো নষ্ট করছে ভেবে সে তার কীর্তন গাওয়া পছন্দ করে না। নন্দকে কোনো বিষয়ে প্রশ্রয়ও দেয় না।

তবে, সত্যপ্রিয় নন্দকে অপমান করলে, নন্দ লুচি পোলাও ফেলে চলে এসেছে শুনে খুশি হয়, তারপর তার হৃদয় ভাইয়ের জন্য কেঁদে ওঠে। সুধীরকে রাজেনের সাইকেলে খাবার আনতে পাঠায়-লুচি, তরকারি, ডাল, মাংস, ডিম ভাজা, মামলেট, সাতরকম মিষ্টি, দই এবং রাবরি। নন্দ যশোদাকে কিছুই বুঝতে না দিয়ে সুবর্ণকে নিয়ে পালিয়ে যায়।

‘শহরতলী’ দ্বিতীয় খণ্ডে দেখি নন্দের চিন্তায় যশোদা ব্যাকুল হয়ে ওঠে। অজিত আর সুব্রতাকে দেখে নন্দ আর সুবর্ণের কথা মনে হয়। যখন সে জানতে পারে নন্দ সিনেমা করছে তখন সে সিনেমা দেখতে যায়। অতঃপর রাজেনকে দিয়ে নন্দর ঠিকানা জোগাড় করায়। নন্দ ধনী হয়েছে জেনে সে নিশ্চিন্ত হয়।

যশোদা সংস্কারহীন আধুনিক মানুষ। কুলি-মজুরদের সঙ্গে তার বসবাস হলেও তাদের মতো করে ভাবনা সে ভাবে না। তাই ধনঞ্জয় যখন তাকে বলে যে তাদের গাঁয়ের রাধাচরণ কবরেজ বলেছে তার বউ বাঁচবে না, ছেলেমেয়ে হতে গেলেই মারা যাবে। তখন যশোদা তাকে বলেছে:

“এক চড়ে মাথাটি ঘুরিয়ে দিতে পার নি তোমাদের গাঁয়ের রাধাচরণ কবরেজের?” (৩খ, পৃ. ১৬০ )

উচ্চবিত্তদের সম্পর্কে তার বোধও আধুনিকতার পরিচয় দেয়। বড়োলোকের দান সম্বন্ধেও তার বিশেষ শ্রদ্ধা নেই।

“কোটিপতিরা লাখ টাকার হাসপাতাল স্থাপন না করিলেই বরং সে একটু আশ্চর্য হয়,” ( ৩খ, পৃ. ২০৮)

যশোদার স্বামীর কথা উপন্যাসে কিছু জানা যায় না, তার সন্তান মৃত এটা জানা যায়। মা, বোন, নেত্রী এ সবই কি যশোদার সব? তার মনে কি কোনো রোমান্সের জন্ম হয় না? যশোদার সম্পর্কে গুজব একটা শোনা যায়। দশ-বারো বছর আগে সত্যপ্রিয়র বাগানবাড়ি যখন তৈরি হয় নি, ঝোপ-ঝাড়ে ভরা ছিল, তখন সেখানে কুস্তির আখড়ার ওস্তাদ ছিল কেদার। রাস্তার ষাঢ়কে সরিয়ে সে পথ চলত।

সে চলে যাওয়ার পর বিশ্ব সংসারে যশোদা আর নাকি পুরুষ দেখতে পায় না। তার স্বামী সম্পর্কে তার কোনো ভাবমরতার কথা উপন্যাসে নেই। এতো দিন পর যশোদা ধনঞ্জয়কে পায়। কাশীনাথ যখন বলে সুধীর তার বেড় পায় কিনা, তখন যশোদার ইচ্ছে হয় কাশীনাথকে ডেকে ধনঞ্জয়কে দেখানোর। ধনঞ্জয়ের কথায় যশোদা রাগ করতে পারে না, হাসে। বিয়ের কথার প্রসঙ্গে ধনঞ্জয় যখন বলে:

“তবে যদি তোমার মতো বড়োসড়ো কাউকে-” ( ৩খ, পৃ. ১৬০ ) তখন যশোদা না রেগে প্রচণ্ড শব্দে হেসে ওঠে। সত্যপ্রিয়র বাড়িতে তার পিতার মাসিক শ্রাদ্ধের সময় নন্দর কীর্তন শুনতে শুনতে যশোদা ধনঞ্জয়ের কথা ভাবে। সে চিন্তা করে:

“ধনঞ্জয়টা সত্যই কী নিষ্ঠুর, এ জগতে কেবল সেই পারে যশোদাকে বুকে তুলিয়া লইতে কিন্তু একবারও কী সে বলিল এসো যশোদা, আমার বুকে এলো? ( ৩খ, পৃ.- ১৭৩)

দ্বিতীয় খণ্ডে যশোদা ধনঞ্জয়ের সঙ্গে বেশ আপনজনের মতো ব্যবহার করে। সকলে তাকে ত্যাগ করলেও ধনঞ্জয় যায় নি। উনুন ভাঙ্গতে গিয়ে যশোদার পা কেটে গেলে সে আবেগে বলে:

আমারও ডান পা-টা জখম হয়েছে, দেখেছ? ….. […] হয়তো আমার পা-টাও তোমার মতো কেটে বাদ দিতে হবে।” ( তখ, পৃ. ২১৯)

যশোদার ভেতরে ফ্রয়েডীয় আকাঙ্ক্ষা থাকলেও সে সকলের প্রেম প্রত্যাশী নয়। সুধীর তাকে সরাসরি প্রেম নিবেদন করে দুজন মিলে দূর দেশে চলে যেতে চাইলে যশোদা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। যশোদা বুঝতে চায় সুধীরের আসল উদ্দেশ্য কী। সে চিন্তা করে:

“এসব মানুষকে বিচার করা বড়ো কঠিন। এদের মতো একাধারে এমন বোকাহাবা পাকা, বজ্জাত, ঝানু, শিশু কোমল, কঠোর, সাহসী, ভীরু, ভালো আর মন্দ জীব আর হয় না। (৩খ, পৃ. ১৮৫)

ধন. য় আর যশোদাকে নিয়ে মানুষের মধ্যে কথা উঠলে প্রথমে এ নিয়ে যশোদা মাথা ঘামায় না। তারপর দেখে ধনঞ্জয় সত্যিই খুব আহ্লাদি হয়ে গেছে। যশোদা ধনঞ্জয়কে স্বনির্ভর করার জন্য সকলের সঙ্গে বসে খেতে বলে, একা একা হাঁটতে বলে, কড়া কথাও বলে। যশোদা যে ধনঞ্জয়কে অনেক বেশি প্রশ্রয় দিয়ে ফেলেছিল এটা তার লিবিডো তাড়নারই একটি দিক।

দ্বিতীয় খণ্ডে দেখা যায় সকলে যশোদাকে ত্যাগ করেছে, নন্দও সুবর্ণকে নিসয়ে উধাও হয়ে গেছে, শুধু ধনঞ্জয় তাকে ত্যাগ করে নি, কুঁড়ে প্রকৃতির ধনঞ্জয়ের সে ক্ষমতাই নেই, সে চাকরিও করে না, যশোদার ওপর বসে বসে খায়। ভাইয়ের চিন্তায় যশোদা দিশেহারা। নন্দর জেল হবে কি-না সে বিষয় নিয়েও চিন্তিত। সে ভাবে বিয়ে দেওয়া যায় কি-না? তারপর আপন মনে বলে ওঠে:

” কিন্তু বিয়ে কি হবে? ( ৩খ, পৃ. ২২১) এ কথা শুনে ধনঞ্জয় চমকে ওঠে। এই চমকে ওঠার অর্থ সে যশোদাকে মনে মনে বিয়ে করতে চায়। যশোদা চমকে ওঠা দেখে বুঝতে পারে। সে রাগ করে না:

“যশোদার মনের মেঘ ফাঁক হইয়া কোথা হইতে যেন খানিকটা সোনালী রোদ আসিয়া পড়িল।” ( ৩খ, পৃ. ২২১)

এ থেকে বোঝা যায় যশোদার মনেও প্রেম জেগে রয়েছে। অচ্যুত গোস্বামীর মতে: “তার অন্তরের নিরুদ্ধ কামনা সমস্ত শ্রমিকদের মধ্যে একজন প্রণয়ীকে খুঁজে বেড়ায়,

যদিও সে জানে যে, সে স্থূলকায় এবং কুৎসিত হওয়ার ফলে কারও পক্ষে তার প্রতি আকৃষ্ট হওয়া সহজ নয়। এই অন্তঃসলিলা প্রণয় কামনার জন্যই সে সত্যপ্রিয়র মিষ্টি ব্যবহার এবং কৃত্রিম মর্যাদা দানের জালে সহজে ধরা পড়ে এবং প্রতারিত হয়। ২০

সব বিষয়ে গম্ভীর প্রকৃতির যশোদা মাঝে মাঝে হেঁয়ালি করে, ঠাট্টা করে। যার কারণে তাকে জীবন্ত মানুষ মনে হয়। মতি আর সুধীরকে খাওয়ার সুযোগ করে দিয়ে নন্দর ওপর খাওয়ানোর ভাড় দিয়ে বাইরে থেকে ঘুরে এসে নন্দকে মতি-সুধীরের কথা জিজ্ঞাসা করলে নন্দ বাধ্য হয়ে বলে- ওরা খেয়েছে। তারপর পেট ধুয়ে রেখে গেছে যেন যশোদা টের না পায় আর নন্দকেও বলতে বারণ করেছে। তখন যশোদা নন্দকে হেঁয়ালি করে গম্ভীর হয়ে বলে

“পেটের জ্বালায় ওরা না হয় বারণ না মেনে খেয়ে গেল, বলবি না বলে তুই যে আমায় বলে দিলি বড়ো? ধিক তোকে বিশ্বাসঘাতক। বিশ্বাসের মান যে রাখে না। মানুষের মধ্যে তাকেই বলি সবচেয়ে হীন, চোর-জোচ্চোর ভালো তার চেয়ে। ( তখ, পৃ.-১৪২)

এ রকম সময় যশোদাকে কেউ বুঝতে পারে না। তার মনের ভাব কী? সে সত্যি রাগ করেছে, না-কি রাগ করার ভান করছে কিছু বোঝা যায় না। সে দুর্বোধ্য হয়ে থাকে। বাড়ি বিক্রির জন্য জিনিসপত্র পাঠিয়ে আবার যশোদা মত বদলে রাজেনকে দিয়ে লরিতে করে রাতেই মালপত্র ফিরিয়ে আনতে বললে রাজেন বকশিশ চায়। যশোদা বলে
“রাত্তিরে আমায় পাহারা দিয়ো।” (৩খ, পৃ. ২২৩ )

তখন ধনঞ্জয় অসহায় বোধ করে। যশোদার কথা সত্যি না মিথ্যা তা সে বুঝতে পারে না।

যশোদা চরিত্রটি বিচ্ছিন্নতাদের একটি উদাহরণ। সে সকলের মধ্যে বাস করে কিন্তু কারো সঙ্গে তার সখ্যতা নেই-কেবল দারিত্ব-কর্তব্য। আবার যারা সখ্যতা গড়তে চায় তাদের সঙ্গে যশোদাকে মানায় না, তাই সে সেখানে ধরা দেয় না। তার সঙ্গে কারো মানসিক যোগাযোগ নেই। শুধু ধনঞ্জয় তাকে ঘিরে থাকে, এখানেও দুজন কেউ কারো কাছে উন্মুক্ত নয়, নিজেদের ভাবনায় নিজেরা বিভোর।

দ্বিতীয় খণ্ডের পুরোটা জুড়েই যশোদা একাকিত্বের যন্ত্রণা ভোগ করেছে। নিজের ভাইটিও তাকে ছেড়ে চলে গেছে। বড় উনুন ভাঙতে গিয়ে যশোদার পা কেটে গেলে তার মানসিক আর শারীরিক যন্ত্রণা একাকার হয়ে যায়। ভাঙা মনের সাময়িক বিলাসের জন্য সে কাটা জায়গা থেকে আঙুল সরিয়ে নেয়-রক্তপাতের পথ উন্মুক্ত হয়ে রক্ত পড়তে থাকে। ধনঞ্জয় জিজ্ঞাসা করে খুব ব্যথা পেয়েছে কিনা। যশোদা বলে

“কীসের ব্যথা? আমার আবার ব্যথা-বেদনা কীসের শুনি?” ( তখ, পৃ. 218 )

যশোদার মন এতো ভেঙে গেছে যে সে আবেগে নিজের ক্ষোভ, যন্ত্রণা প্রকাশ করে ফেলে। য তার চরিত্রে কখনো ছিল না। সে আর নিজেকে আড়াল করতে পারে না ।

“না লাগে নি, একটুও লাগে নি। আমার আবার লাগালাগি কী? মুখপোড়া ভগবান আমায় লোহা দিয়ে গড়েছেন জান না?” ( তখ, পৃ. ২১৯) তার যে মন ভালো নেই সে কথাও সে নির্দ্বিধায় বলে দেয়:

“বাড়ি ভরা লোক ছিল আমার, তুমি ছাড়া আজ কেউ নেই, কী অদেষ্ট বলো তো আমার?”( ৩খ, পৃ.-২১৯)

যশোদাকে একাকিত্ব প্রবলভাবে আক্রমণ করে। কারো কাছে নালিশ করা, অভিমানে বিচলিত হওয়া তার স্বভাব নয়, সে এখন তা-ও করা শুরু করে। কুমুদিনীর কাছে সে মনের কথা উজাড় করে বলে সত্যপ্রিয় তার কত বড়ো সর্বনাশ করেছে। সে জন্য সে সত্যপ্রিয়র কাছে বাড়ি বেচবে না। পরে একদিন সত্যপ্রিয়র সঙ্গে দেখা হলে সে নড়তে পারে না, তার চোখে জল চলে আসে। সুব্রতা এসে তার বাড়িতে লোকসমাগম ঘটালেও সে তাতে খুশি হতে পারে না। একটি সংসারের প্রত্যাশায় তার মন সর্বদা হাহাকার করে:

“কিন্তু কোথায় যশোদার চাঁদ? আত্মীয়স্বজনভরা সংসার? সংসার না থাকিলে কি গিন্নি হওয়া চলে। মজুরদের নিয়া সে সংসার গড়িয়া গিন্নি হইয়া বসিয়াছিল, সত্যপ্রিয় সে সংসারও তার ভাঙিয়া দিয়াছে।” (৩খ, পৃ.-২৩৬)

এতো কিছুর পরও যশোদা নন্দকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে সুখের সংসারের। নন্দ আর সুবর্ণকে নিয়ে সে নতুন করে সুখের সংসার করবে। কিন্তু সিনেমার গিয়ে দেখল তারা দুজনই সিনেমায় অভিনয় করছে। সিনেমার অভিনেত্রী বাড়ির বউ সেজে তো আর সংসার করবে না, যশোদার এ আশাটিও অঙ্কুরেই নষ্ট হয়ে যায়। সংসারের প্রতিটি মানুষের মতো সেও ভাবে:

“আমার মতো ভাগ্যবর্তী সংসারে কেউ নেই। আমি যা ধরতে যাই তাই ফসকে যায়। যে সুখ আমার জোটা উচিত ছিল, তা জোটে না। মরণও হচ্ছে না সেই জন্যে।” ( তথ, পৃ. ২৬৬)

যশোদার চিন্তা-চেতনা আধুনিক, সৃষ্টিশীল। সময়ের সঠিক মূল্য দিতে সে বদ্ধপরিকর। নন্দর বয়স চলে যাচ্ছে, সে কিছু করছে না তাই তার একটা চাকরির জন্য যশোদা মরিয়া হয়ে জ্যোতির্ময়ের কাছে যায়। সত্যপ্রিয়র মিলে চাকরি করা ঠিক নয় ভেবেও প্রথম বার এবং কম পয়সা বেতন দেখে নন্দকে সে চাকরি করতে পাঠায়।

মঞ্জুরদের সময় থাকতে সাবধান হয়ে টাকা সঞ্চয় করতে বলে। এ গেলো যশোদার একটি দিক। অন্যদিকে, যশোদার বাড়িতে যখন অদ্রবাড়ির লোকসমাগম হয়, তখন শুধু সময় নষ্ট করার পক্ষপাতী সে নয়। তাই অলকা আর খুকুকে দিয়ে সে একটি গানের স্কুল গড়ে তোলে। যেখানে পাড়ার মেয়েরা বিনে পয়সায় গান শিখতে পারে।

 

নারী চরিত্র পর্ব ২

 

 

“পুতুল নাচের ইতিকথা, পদ্মানদীর মাঝি, প্রাগৈতিহাসিক, সরীসৃপ, মহাকালের জটার জট, প্যাক, দিবারাত্রির কাব্য প্রভৃতি গল্প উপন্যাসেই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যে গতানুগতিকের পথ অতিক্রম কওে নতুনের আশ্বাদন এনে দিয়েছেন। কিন্তু ‘শহরতলী’ উপন্যাসে শ্রমিক জীবন, শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক এবং বিশেষ করে সত্যপ্রিয় এবং যশোদার মত অভাবিত চরিত্রসৃষ্টিতে যে অনন্যসাধারণ ক্ষমতার পরিচয় দিয়েছেন তা সত্যই বিস্ময়ের বিষয়। ২১

উপন্যাসের শেষে যশোদা অন্য কোথাও চলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। তার মনে হয় আবার উনুন ভাঙতে হবে। যশোদার বাড়ির ওপর দিয়ে শহরের উন্নয়নের জন্য রাস্তা হবে। তবে সে শহর এলাকায় স্বচ্ছন্দবোধ করে না। তাদের শহরতলী শহরে পরিণত হয়েছে। সে আবার শহরতলীর খোঁজে বেরিয়ে পড়বে নিশ্চয়।

সত্যপ্রিয়র বড় মেয়ে যোগমায়া। উচ্চবিত্ত পরিবারে মেয়ে বলে সে আহাদি প্রকৃতির। যোগমায়া সুশ্রী নয়, তবে সত্যপ্রিয় টাকা খরচ করে তার জন্য রূপবান জামাই কিনেছে। যেন সোনার ওজনে সোনার পুতুল। কিন্তু বিয়ের এক বছরের মধ্যে যোগমায়ার মুখের হাসি নিতে স্থায়ী বিষাদ আশ্রয় নিয়েছে আর চোখের দৃষ্টিও হয়েছে উদাস। এই চরিত্রটির দুটি দিক আছে- কন্যা এবং স্ত্রী। সে বাস্তব বুদ্ধিসম্পন্ন নারী নয়। না চাইতেই সব কিছু পেয়েছে। তাই বাস্তব জগৎ সম্পর্কে তার কোনো ধারণাই নেই।

বিয়ের পরও যোগমায়া বাবার বাড়িতে থাকছে, তাই তার নিজের সংসার হয়ে ওঠেনি। একই সঙ্গে সে কন্যার আদর-আহ্লাদ পায়, আবার যামিনীর স্ত্রীর মর্যাদাও পায়। কিন্তু তার চোখেমুখে স্থায়ী একটি বিষাদের কারণে সত্যপ্রিয় চিন্তিত হয়ে ওঠে। তার ধারণা হয়, যামিনী কোনোভাবে তার মেয়েকে যন্ত্রণা দিচ্ছে। তাই তাদের দুজনকে কিছুদিনের জন্য বিচ্ছিন্ন করতে চায়। যোগমায়াকে দেশে পাঠানোর আয়োজন করে। কিন্তু যোগমায়া আপত্তি করে, সে যাবে না। সত্যপ্রিয় বলে

‘কদিন বেড়িয়ে আয়। বিয়ের পর দেশের সবাই তোকে দেখতে চাচ্ছে। (তখ, পৃ.- ২৪৫)

যোগমায়া মনে করে সত্যপ্রিয়র মেয়ে জামাইকে আত্মীয়স্বজনকে দেখানোর ইচ্ছে হয়েছে। সে আর আপত্তি করে না। কিন্তু যখন বুঝতে পারে তাকে একা যেতে হবে তখন সে বেঁকে বসে। স্বামীকে ফেলে সে কোথাও যাবে না। এখানেই বোঝা যায় যোগমায়া বিয়ের পর স্বামীঅন্তপ্রাণ হয়েছে। এরপর সত্যপ্রিয় তার উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে অন্যপথ ধরে। সে যামিনীকে দিলী পাঠিয়ে দেয়।

বাবার ওপর প্রচণ্ড রাগ করে যোগমায়া বাড়ির সকলের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দেয়। যোগমায়া সন্তানসম্ভবা জেনে যামিনীকে আনতে বাধ্য হয় সত্যপ্রিয়। তখনই যোগমায়ার মুখে হাসি ফোটে। যামিনীর টাকার আবদারে সত্যপ্রিয় জামাই এবং মেয়েকে টাকা না দিলে যোগমায়ার মুখ আরো কালো হয়।

গরিবের ছেলে যামিনী টাকার জন্য যোগমায়াকে যন্ত্রণা দেয়। তারপরও স্বামীর প্রতি ভালোবাসা যোগমায়া চরিত্রটিকে রহস্যাবৃত করেছে। যোগমায়ার সুখ সত্যপ্রিয় সত্যিই কিনতে পারেনি। শ্বশুরবাড়ি থেকেও যামিনী স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া করে। যোগমায়ার স্বামীভাগ্য ভালো নয়

“ঘুম ভাঙ্গার পর হইতে যামিনীর অপিস যাওয়া পর্যন্ত একবার ধারে কাছেও ঘেঁষিল না দেখিয়া বোঝা গেল, দুজনে ঝগড়া হইয়াছে।” (৩খ, পৃ.-২৪৬)

সত্যপ্রিয় তার মোটা বুদ্ধিতে মনে করে:

“পুরুষ মানুষ যদি অকারণে মেয়ে মানুষকে মারধর গালাগালি না করে, তবে আর মেয়ে মানুষের সুখের জন্য কী দরকার হইতে পারে সে বুঝিতে পারে না।’ (তখ, পৃ.- 289 )

মিষ্টি ভদ্র সম্পর্ক আর স্নেহ মমতার সম্পর্কের ভিন্নতা সত্যপ্রিয় বোঝে না। স্বামীর দিক দিয়ে যোগমায়া সুখী হতে পারে না। যোগমায়ার স্ত্রী সত্তা অপমানিত হয়। যামিনীকে কিছুদিনের জন্য তার বাড়ি পাঠিয়ে দিল, কিন্তু তাতে ফল ভালো হলো না। যামিনী এবার স্ত্রীকে নিয়ে অন্য কোথাও থাকতে চায়।

যামিনীর একগুঁয়েমি যোগমায়াকে সংকটে ফেলে। তবে তার বাবার রাজপ্রাসাদের মতো বাড়ি, দামি আসবাব, দাস-দাসী, লোকজন খাওয়ানোর হইচই, কর্তার মেয়ে হিসেবে সকলের ওপর কর্তৃত্ব- যোগমায়ার একঘেঁয়ে লাগে। জীবনে নতুনত্বের স্বাস পাবার জন্য সে যামিনীর প্রস্তাবে রাজি হয়।

মেয়েরা স্বামীর ঘর করতে যায়, যোগমায়া সে কথা জানে। সে এও জানে যে স্বামীর ঘর করতে যাওয়া মহা গৌরবের এবং সৌভাগ্যের। বাস্ত বজগৎ সম্পর্কে জ্ঞানহীন যোগমায়া ভিন্নস্বাদের জীবন উপভোগ করার জন্য চঞ্চল হয়ে ওঠে। তবে সে বিশ্বাস করে সত্যপ্রিয় তাকে যেতে দেবে না। তাই বলে:

স্বামীর সঙ্গে স্বামীর ঘর করতে যাব, তা লুকিয়ে চুরিয়ে যাব কেন?’ (তখ, পৃ.-২৫৬) যোগমায়ার কন্যাসত্তা পিতার প্রতি বিশ্বাসে অটল। সে বাবার সঙ্গে অভিমান করে স্বামীর সঙ্গে যেতে চায়। বাবার আহ্লাদি মেয়ে সে, বাবাকে বিপাকে ফেলার জন্য তার চেষ্টা।

তাছাড়া স্বামীর সঙ্গে যাওয়াটা তার অভিপ্রায় নয়। তার মন দোটানায় দোলে। সিদ্ধান্তে আসে যে পিতাকে সে একটা শান্তি দেবে। ভালোবাসার, মায়া-মমতার আবদার। কিন্তু সত্যপ্রিয় ভালোবাসা-মায়া- মমতা বোঝে না, সে কঠোর মনের মানুষ। যোগমায়া যামিনীর সঙ্গে চলে যাওয়ার অনুমতি দিলে সে রাজি হয়। এতে যোগমায়ার কোমল মনে আঘাত লাগে:

“যোগমায়ার পৃথিবী অন্ধকার হইয়া যায়। শুধু আশা নয়, যোগমায়ার বিশ্বাস ছিলো সত্যপ্রিয় কখনো তাকে পাঠাইতে রাজি হইবে না, রাগ করিবে, বকুনি দিবে, তাকে বুঝাইবে আর সে তখন কাঁদিয়া কাটিয়া অনর্থ করিবে। কাঁদিতে কাঁদিতে বলিবে যে, তোমার জন্যইতো সব গোলমাল, তুমি কেন ওকে অপমান করলে। তার বদলে একী! এককথায় তাকে অনুমতি দিয়া দিল? এখন তো আর না গিরা উপায় থাকিবে না।” (৩খ,পৃ.-২৫৭)

যোগমায়া বিপাকে পরে। যশোদার বাড়িতে ভাড়াটে হয়ে যাওয়ার ইচ্ছে তার হয় না। আবার বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার ইচ্ছাও উবে যায়। সে অন্যপথ ধরে- ছল করে সত্যপ্রিয়কে বলে তোমাকে কষ্ট দিয়ে যাবো না। কিন্তু সত্যপ্রিয় জবাব দেয় তার কোনো কষ্ট নেই। অবশেষে উপায়হীন যোগমায়া আর যামিনী সত্যপ্রিয়কে প্রণাম করে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়। যশোদার ঘর দেখে যোগমায়া আতঙ্কিত হয়ে ওঠে।

“ঘাটপালক, আলমারি, ড্রেসিংটেবিল এসব না থাক, কিন্তু এ কী দেয়াল, এ কী মেঝে, এ কী দরজা জানালা। কতটুকু ঘর।” (৩খ, পৃ. ২৫৮)

যশোদা যোগমায়াকে সাহস দেয়, কিন্তু সে দমে গিয়েছে। বিদ্যুতের আলো নেই। ঘরের দেয়াল যেন সরে সরে আসে, সে যশোদার পিছু পিছু ঘোরে। যামিনীর শখানেক টাকা, যোগমায়ার সাতাত্তর টাকা আর গহনা তাদের সম্বল। এ নিয়ে তারা হাল ফ্যাশনের বাড়িতেও যেতে পারে না। যোগমায়ার অবস্থা দিন দিন খারাপ হয়। সন্তান-সম্ভবা যোগমায়া যশোদার কাছ থেকে ধার করা মনের জোর নিয়ে দিনযাপন করে। লেখক বলেছেন:

“যশোদা না থাকিলে ইতিমধ্যেই হয়তো তার নার্ভাস ব্রেকডাউন ঘটিয়া যাইতো।” (৩খ, পৃ. ২৬০ )

যোগমায়া যামিনীকে অভিযোগ করে

“আমাকে মেরে ফেলে বাবাকে কষ্ট দেবে বলে তুমি আমায় জোর করে এনেছ।” (৩খ, পৃ. ২৬০ )

যোগমায়ার দাদা মহীতোষ এলে যোগমায়া আনন্দে পাগল হয়ে ওঠে। কিন্তু সত্যপ্রিয় এখানে আসতে বারণ করেছে শুনে সে কষ্টে মুহ্যমান হয়। বাড়ির সকলে তার নিন্দা করে জেনে সে স্ত ন্ধ হয়ে যায়। সে চলে এসেছে বলে বাড়ির কোনো পরিবর্তন হয়নি জেনে অভিমানে সে কেঁদে ফেলে।

যোগমায়ার এতোদিন নিজের সংসার ছিলো না। এ কুঁড়েঘর যোগমায়ার নিজের সংসার। নিজের সংসারে সে নিজেই কর্ত্রী। তাই দাদা মহীতোষকে সে অভ্যর্থনা আর আদর যত্নের জন্য ব্যস্ত হয়ে ওঠে। বাজার থেকে একরাশ খাবার এনে খাওয়ায়। বাড়ির কথা খুঁটে খুঁটে জিজ্ঞাসা করে।

 

নারী চরিত্র পর্ব ২

 

মহীতোষের তথ্যে যোগমায়ার মন বীভৎস রকম খারাপ হয়ে যায়। মন ভালো করার জন্য যশোদার উদ্যোগে যোগমায়া সিনেমায় যায় । লেখক নিম্নমধ্যবিত্ত আর উচ্চবিত্তের একটি ছোট সংঘাত দেখিয়েছেন সিনেমায় যাওয়ার বেশভূষার মাধ্যমে। যোগমায়ার জমকালো পোশাক সকলের সাধারণ পোশাকের সঙ্গে খাপ খায় না। শ্রেণী বিভেদটা স্পষ্ট হয় যশোদার কথায়

“যদি ভাবে তো ভাববে যে, আমরা তোমার চাকর-দাসী তুমি কোথাকার রাজরানি- টানি হবে। পাঁচ-সাতজন চাকর-দাসী নিয়ে বায়োস্কোপ দেখতে এসেছ।” (তখ, পৃ.- ২৬৩)

অবশেষে যশোদার নামে বাড়ি বিক্রয় নোটিশ আসলে যোগমায়া স্বামীকে বিয়ে বাড়ি ফিরে যায়। এতো কিছুর পরও যোগমায়ার পিতৃভক্তি যায় না। তাই নোটিশ আসার পর রাজেন সত্যপ্রিয়কে হনুমান বলে গাল দিলে যোগমায়া খেপে যায়, রাগারাগি করে। এরপর সহানুভূতির কোন সম্ভাবনা নেই দেখে ঘরে গিয়ে কান্না শুরু করে।

যোগমায়া চরিত্রের মধ্যদিয়ে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় নারীমনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন। উচ্চবিত্ত হয়েও সে যে সৌভাগ্যবর্তী হতে পারেনি তা-ও স্পষ্ট হয়েছে। পিতা ইচ্ছে করলেই মেয়ের জীবন হাসি-আনন্দে ভরে দিতে পারে না। নারীর জীবন স্বামীর ওপর নির্ভর করে, সমাজের এই সত্যটিও যোগমায়া চরিত্রে অংকিত হয়েছে।

যোগমায়া বাস্তববুদ্ধিহীনা নারী। আদরে-আহ্লাদে লালিত পালিত হয়ে গরিব স্বামীর সঙ্গে বসবাস করতে গিয়ে পিতার কাছে স্বামীর টাকা জোগাতে হিমশিম খেয়ে ওঠে। তারপর স্বামীর গোঁয়ার্তুমিতে তার জীবন বিপর্যন্ত হয়ে যায়। যোগমায়া দুজন পুরুষের আত্মসম্মানের টানাটানিতে বিধ্বস্ত হয়েছে, দেহ মনে বিপর্যন্ত হয়েছে।

পিতার একগুঁয়েমি, গোঁয়ার্তুমি, স্বামীর বুদ্ধিহীন সিদ্ধান্ত এবং মেরুদণ্ডহীনতা- অপারগতা যোগমায়া চরিত্রকে বিপর্যস্ত করেছে। সমাজে নারী স্বাধীন নয়, সে পিতা বা স্বামীর ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে। মানিক বন্দোপাধ্যায় যোগমায়া চরিত্রের মধ্য দিয়ে সুক্ষ্মভাবে এই সত্যকে তুলে ধরেছেন।

যোগমায়ার মায়ের চরিত্র উচ্চবিত্ত শ্রেণির অন্দর মহলের কর্ত্রীর চরিত্র প্রকাশ করেছে। এখানে সে কর্ত্রী হয়েও কর্ত্রী নয়, তার কোন অস্তিত্ব নেই। মত প্রকাশের অধিকার নেই। যশোদার বাড়িতে আসা মধ্যবিত্ত বিভিন্ন নারীর চরিত্রও এইরূপ মেরুদণ্ডহীন জীবনযাপন করে। তারা প্রায় সকলেই বিকারগ্রস্ত।

‘শহরতলী’ দ্বিতীয় খণ্ডে সুব্রতা চরিত্রের আবির্ভাব। সুব্রতার বর্ণনায় লেখক বলেছেন: “মুখখানা সুশ্রী, বুদ্ধিতে উজ্জ্বল চপল দুটি চোখ।” (৩খ, পৃ.-২২৮)

সুব্রতা আর তার স্বামী অজিত যশোদার বাড়িতে ঘর ভাড়া নেয়। যশোদা ভদ্রলোকদের পছন্দ করে না, কিন্তু সুব্রতার বুদ্ধিতে যশোদা তাদের ঘর ভাড়া দিতে বাধ্য হয়। ছয় মাস ধরে বিয়ে হয়েছে সুব্রতার। ভাশুর এবং জায়ের অপছন্দের মেয়ে সুব্রতাকে বিয়ে করেছে অর্জিত এবং কারখানায় পঁচিশ টাকায় কুলি-মজুরের একটা কাজ নেওয়ায় অজিতের ভাই-বৌদি খেপেছে। তাই সুব্রতা আর অজিত ঘরভাড়া করে আলাদা সংসার পাতে।

সুব্রতা সুন্দরী, হাসিখুশি, মিশুক প্রকৃতির মেয়ে। সে তার জায়ের চেয়ে সুন্দর বলেই তার জা তাকে পছন্দ করেনি। তার স্বভাবে যশোদা মুগ্ধ হয়। বাড়ি ভাড়া নেয়ার সময় সে যখন কথা বলছিলো, এতটুকু মেয়ের কাছে এতো গোছানো পাকা কথা শুনে যশোদা অবাক হয়। মনে হয় মা মাসি কারো নকল করে সে কথা বলছে।

যশোদার চোখের সামনে একটি সুন্দর ঈর্ষণীয় সংসার সাজায় সুব্রতা। দেওয়ালে ছবি টাঙায়, জানালায় পর্দা দেয়, আলনায় কাপড় সাজিয়ে রাখে, চৌকির পায়ায় রঙিন ঢাকনি দেয় আর আসবাব কেনার জন্য পরিকল্পনা করে। ‘জননী’তেও শ্যামার বাড়ি ভাড়া নিয়ে কনকলতা এমন রিক্ত-পরিচ্ছন্ন সংসার সাজিয়েছে।

তাদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিরোধ নেই- সুখী দম্পতি। সংসারের প্রয়োজনে চারের দামি সেট কেনার জন্য সুব্রতা গহনা বিক্রির জেদ ধরে, কিন্তু অঙ্গিত বিক্রি করে না। পরে যশোদার মধ্যস্থতায় সমাধান হয়। সুব্রতা সম্পর্কে যশোদা ভাবে

“সুব্রতার গিন্নিপনা আছে, পাকামি নাই, লজ্জাহীনতা আছে, বেহায়াপনা নাই, বুদ্ধি আছে, কুটিলতা নাই …………]।’ (৩খ, পৃ.-২৩১ )

সুব্রতা সন্তান সম্ভবা হলে সে সাবধানী হয়ে গেলো। চায়ের দামি সেট কেনার মত প্রয়োজনগুলো বাতিল করে দিল। অনাগত সন্তানের ভবিষ্যৎ ভাবনায় আসন্ন যা নিজেকে প্রস্তুত করতে শুরু করলো। এমনকি খরচপত্রও কমিয়ে ফেললো। সে সংযমী হয়।

“সুব্রতার মধ্যে ন্যাকামি নাই। তরুণ মনের স্বাভাবিক ভাব প্রবণতা তার মধ্যে যথেষ্টই আছে কিন্তু দমনও যে করিতে জানে।” (৩খ, পৃ. ২৩৪ )

সুব্রতা চরিত্রের সবচেয়ে বড় দিক, সে খুব মিশুক। সে আস্তে আস্তে পাড়ার কাছের এবং দুরের সকলের সঙ্গে ভাব জমিয়ে ফেললো। অদ্রবাড়ির মেয়েরা দুপুরবেলা যশোদার বাড়ি আসতে থাকেঃ

“কয়েক মাসের মধ্যে দেখা গেল যশোদার বাড়িতে দুপুরবেলা রীতিমতো মেয়েদের বৈঠক বসিতে আরম্ভ করিয়াছে। দু-একটি মেয়ে নয়, উকিল, ডাক্তার, মাস্টার, প্রফেসর, কেরানি, জীবনবীমার এজেন্ট প্রভৃতি অনেক রকম ভদ্রলোকের বাড়ির অনেক মেয়ে। সকলের বাড়ি যে খুব কাছে তাও নয়। বড় রাস্তার ধারের কয়েকটি বাড়িতে পর্যন্ত সুব্রতা তার পরিচয়ের অভিযান আগাইয়া নিয়া গিয়াছে।” (তখ, পূ. – ২৩৫)

এরপর সুব্রতা যশোদার পরামর্শে গানের স্কুল খুলে ফেললো। এরপর যশোদার ঘর ভাড়া নিয়ে যোগমায়া এলে সে প্রথমে উদ্ভাসিত হলো, কিন্তু যোগমায়ার রকম দেখে সে পরে দমে গেলো। সুব্রতা বুদ্ধিমতী মেয়ে। তাই সে যশোদাকে ঠিক চিনতে পারে। নিজের অদূরভবিষ্যতের অবস্থা দেখে সে যশোদাকে ছাড়তে চায় না। যশোদার বাড়ি বিক্রির কথায় অজয় কোথাও ঘর খুঁজতে চাইলে সুব্রতা জানায় সে যশোদার সঙ্গেই যাবে। শহরতলীর শহরে পরিণত হওয়ার সঙ্গে তাল রেখে সুব্রতা চরিত্র চিত্রণ লেখকের নিপুণ দক্ষতার পরিচয়।

যশোদার সই কুমুদিনী। স্বামী-পুত্র নিয়ে তার সংসার। যশোদার পাড়াতেই সে বাস করে। যশোদার সমালোচনায় তার সীমা নেই, কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে যশোদাকে পছন্দ করে এবং ভালোবাসে। স্বামীর সম্পর্কে কুমুদিনী বেশ সচেতন। স্বামীকে যশোদার কোনো কাজে থাকতে দেয় না। প্রথমখণ্ডে কুমুদিনী চরিত্রটিকে একটা কুট চরিত্র হিসেবেই চিত্রিত হতে দেখা যায়। কুমুদিনী আড়ালে যশোদার দুর্নাম করে, আবার উপকার পাওয়ার সম্ভাবনা থাকলে নির্বিবাদে সেটা আদায় করে। লেখক জানিয়েছেন:

“উপকার পাওয়ার পরেই যশোদার নিন্দায় কুমুদিনী হইয়া উঠে।” (তখ, পৃ. ১৬৭) রাজেন এই নিষ্পাগুলো যশোদাকে শোনায়। যশোদা তখন বলে: “তবে কী জানো সরকারমশায়, আমার জন্য এর সত্যি মায়া আছে।” (তখ, পৃ. ১৬৮)

কুমুদিনীর মায়া সত্যিই আছে। তাই সে বন্ধুত্বসুলভ মনে যশোদাকে সাবধান করতে আসে- ধনঞ্জয়কে নিয়ে পাড়ায় কথা হচ্ছে। ধনঞ্জয়ের প্রতি যশোদার অতিরিক্ত আগ্রহ লোকের চোখে পড়ছে। স্বামী-সন্তানহীন যশোদার গায়ে কলঙ্ক লেপন কুমুদিনী সহ্য করতে পারে না। যশোদা লোকের অহেতুক নিষ্পার প্রতিবাদ করলে কুমুদিনী বলে:

“যা খুশি করগে ভাই তুই, কলঙ্কে আর ডর কি তোর, বোঝার ওপর শাকের আঁটি বই তো নয়। ছেলেবেলা সই পাতিয়েছি, তাই বলা, নয়তো আমার কী এলো গেলো।” (৩খ, পৃ.-২০৩ )

প্রথম খণ্ডে কুমুদিনী চরিত্র এখানে শেষ হয়েছে। দ্বিতীয় খণ্ডে আমরা দেখতে পাই কুমুদিনীর ভেতরে এক প্রকৃত বন্ধুসত্তা, যেখানে কোনো কূট কৌশল নেই। দ্বিতীয় খণ্ডে শহরতলী শহর হয়ে উঠেছে। সকলে মোটা টাকায় বাড়ি বিক্রি করে চলে গেছে, নতুন নতুন পাকা বাড়ি উঠছে। যশোদার বাড়ি পর্যন্ত এসে রূপান্তর থেমে গেছে। সে বাড়ি বিক্রি করে নাই। তার জন্য কুমুদিনী এবং জার পরে আরো কয়েকটি বাড়ি বিক্রি হতে পারে নি।

কুমুদিনীর টাকার শখ প্রবল। সে যশোদাকে অনেক বলেও বাড়ি বিক্রি করাতে পারে না। এরপর যশোদা রাজি হয়ে দু দিনের জন্য হোটেলে গিয়ে উঠলে কুমুদিনী প্রকৃত বন্ধুর মতই জিনিসপত্র বেঁধে রাখে। আবার যশোদা এখনই চলে যাবে বলে সকলে মিলে থাকার জন্য কুমুদিনীও তার সঙ্গে এক বাড়িতেই উঠবে।

আবার যশোদা মত বদলায়- বাড়ি সে বিক্রি করবে না। কুমুদিনী আবার খেপে যায়। বাড়ি বিক্রির জন্য যশোদাকে বোঝায়। এরপর পাড়ার অন্য সকলে বাড়ি বিক্রি করলে কুমুদিনী যশোদার জন্যই টাকার শখ ত্যাগ করে বাড়ি বিক্রি না করে যশোদার সঙ্গে থাকে। যশোদা তাকে কাজ না দিলেও সে নিজে থেকেই যশোদার কাজ করে দেয়। যশোদা শ্রমিকদের মিটিংয়ে গেলে বাড়িতে রান্না হচ্ছে না দেখে কুমুদিনী এসে যশোদার বাড়ি রান্না করে দেয়। তার সম্পর্কে লেখকের মন্তব্য:

“শত্রুর বাড়িতে নিজে রাঁধিয়া দিতে না আসিলে কুমুদিনীর বোধহয় তৃপ্তি হয় না। ” (৩খ, পৃ. ২৫৩ )

যশোদার বাড়িতে যে কোনো ঘটনা ঘটলে কোনো কিছু করার না থাকলেও কুমুদিনী এসে দাঁড়ায়, বোঝার চেষ্টা করে, যশোদার ভাল-মন্দ দেখে। সত্যপ্রিয়র মেয়ে যোগমায়া এবং তার জামাই যামিনী রাগ করে যশোদার বাড়ি ভাড়া নিলে সে যশোদার আসন্ন বিপদের কথা টের পায়।

একপাশে মুখ বুজে বসে থাকে সে। কুমুদিনী চরিত্র চিত্রণে কয়েকটি অসংগত দিক দেখা যায়। ২১৭ পৃষ্ঠায় আছে কুমুদিনী আার রাজেন দুইজনে একা মানুষ, ২২৫ পৃষ্ঠায় আছে ‘কুমুদিনীর ঘরভরা ছেলেমেয়ে’। আবার, ২৫৩ পৃষ্ঠায় আছে- ‘কথা ছিলো কুমুদিনীর ননদ আসিয়া রাঁধিয়া দিবে।’

অপরাজিতা চরিত্রটিকে আমরা দেখি তার বউভাতের দিন থেকে। জোতির্ময়ের তুলনায় তার বয়স অর্ধেকেরও কম। সে নিতান্ত বুকি। সত্যপ্রিয়কে খুশি করার জন্য জ্যোতির্ময় একটি খুকিকে বউ করে এনেছে। অপাজিতা চরিত্রটি পূর্ণাঙ্গতা পায় নি । জোতির্ময়ের চরিত্রের প্রভুভক্তি দেখানোর জন্য অপাজিতার বিভিন্ন সমস্যা উপস্থিত হয়েছে।

সেখানে সে নিজের মতামতের কোনো মূল্য পায় নি। দাম্পত্য জীবনেও সে স্বাধীন নয়। এক্ষেত্রে আবহমান বাঙ্গালি সমাজের চিত্রই লেখক দেখিয়েছেন। সারাদিন অফিসের কাজ শেষে শ্রান্ত জ্যোতির্ময়ের ‘পুতুল নিয়া খেলা করার আমোদ অপরাজিতা:

“অপরিপুষ্ট ও অপরিণত অপরাজিতার বিবর্ণমুখ ও উৎসুক দৃষ্টি শ্রান্তি দূর করিতে সাহায্য করে।” (তখ.পৃ.-১৫০)

জ্যোতির্ময়ের কথায়, আদবে, সোহাগে অপরাজিতা আধমরা হয়ে যায়, কোন দিন মূর্ছা যাওয়ার উপক্রম হয়। সে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে থাকে, তার বুকের মধ্যে ঢিপ ঢিপ করে। তবে মাঝে মাঝে অপরাজিতারও অফুরন্ত জীবনী শক্তি আসে। তার ফর্সা মুখ রক্তবর্ণ হয়ে থাকে, আবেগের আতিশয্যে নিজের চুল ছেঁড়ার উপক্রম করে।

“প্রাণহীন জড়বস্তুর মতো কেবল সোহাগ গ্রহণ করার বদলে সোহাগের বন্যায় স্বামীকে একেবারে ভাসাইয়া দিবার চেষ্টা করে।” (তথ, পৃ. ১৫০ )

এমনি করে আস্তে আস্তে অপরাজিতা অসুস্থ হতে থাকে, কিন্তু জ্যোতির্ময় তা বুঝতে পারে না। বাড়িতে কেউই তার অবস্থা অনুমান করে ডাক্তার দেখায় না:

‘এ বাড়িতে কে অনুমান করিবে অসুখের ঝড়েই একরাত্রে মেয়েটার অবস্থা হইয়াছে দুমড়ানো মোচড়ানো চারার মতো?’ (৩খ, পৃ.-১৫১ )

এভাবে ধীরে ধীরে অপরাজিতা আরো অসুস্থ হয়ে পরে। সুবর্ণ বউদিকে ঠাট্টা করে আর সুধীরা হিংসা করে। কেউই আসল অবস্থা বিচার করে তার রোগমুক্তির ব্যবস্থা করে না। সমাজে বউদের অবস্থাই এই রকম। বউরা একটি দম দেওয়া যন্ত্র, তার নিজের কোনো শক্তি নেই, নিজের চলবার অধিকারও নেই।

 

নারী চরিত্র পর্ব ২

 

নিজেকে প্রকাশ করবার চেষ্টা অপরাজিতা দু-একবার করেছে, মতও দিয়েছে, কিন্তু সিদ্ধান্তের জন্য জোতির্ময়ের উপর নির্ভর করতে হয়েছে। সত্যপ্রিয়র পিতার মাসিক শ্রাদ্ধতে তাদের নিমন্ত্রণ আছে। অপরাজিতার যাওয়ার ইচ্ছা নেই। সে শুধু বলতে পারে: “আমি যাবো?” জ্যেতির্ময় যখন বলে সত্যপ্রিয়র বাড়ি নিমন্ত্রণ যেতেই হবে, তখন-

‘গভীর শ্রান্তিতে অপরাজিতার হাই ওঠে, আবার শুইয়া পড়িতে ইচ্ছা হইতেছে। (৩খ, পৃ. ১৭২)

এরপর সে একটু স্বাধীন মত প্রকাশ করে বলে সত্যপ্রিয়র দেওয়া নেকলেস পরে যাবে না। সে জানায়:

“সোনাটা পিতলের মত দেখাইতেছে, পাথর আর মুক্তাগুলি যেন কাচ আর পুঁতি।” ( তখ, পৃ. ১৭২)

অপরাজিতা কাউকে না দেখিয়ে নেকলেসটি লুকিয়ে রেখেছিল। জোতির্ময়ের সঙ্গে অপরাজিতার কথোপকথনে তাকে অনেক বুদ্ধিমতী মনে হয়। অপরাজিতা বলে- ‘আমাদেরই ভুল হয়েছিলো, জিনিসটা নকল। জ্যোতির্ময় যেন চোখে দেখিয়াও বিশ্বাস করিতে পারে না, তাই কী হয়, উনি আসল জিনিস বলে নকল দেবেন? অপরাজিতা উত্তর দেয়:
“আসল জিনিস বলে তো দেন নি।” (তখ.প্র.-১৭৩)

অপরাজিতা আবার বলে না যাওয়ার কথা। কিন্তু জ্যোতির্ময় তাকে ভুল বোঝে। সে ভাবে নেকলেস কালো হয়েছে বলেই অপরাজিতা যেতে চাচ্ছে না। জ্যোতির্ময়ের কড়া কথা শুনে অপরাজিতা মুখ ফুটে আর নিজের শরীরের অসুস্থতার কথা বলতে পারে না। সে নিজেকে বাঁচাবার জন্য যশোদার শরণাপন্ন হয়। নিজের শরীর ও মনের কথা যশোদাকে খুলে বলে। যশোদা ভাবে

“বউটাও বা এমন হাবা কেন, স্বামীকে অসুখের কথা বলিতে লজ্জা পায়।” (তখ, পৃ. ১৮১)

যশোদা জ্যোতির্ময়কে অপরাজিতার কথা বুঝিয়ে বলে এবং তাকে কিছুদিন বাপের বাড়ি পাঠাতে বলে। যশোদার কথায় সে অন্যমনস্ক হয়ে যায় এবং সত্যপ্রিয়র মেয়ের বিয়ের পর অপরাজিতাকে বাপের বাড়ি পাঠাবে বলে জানায়। তারপরও অপরাজিতা বিয়েতে যেতে অস্বীকৃতি জানালে, জ্যোতির্ময় পীড়াপীড়ি করে তাকে নিয়ে যায়। বিয়েবাড়িতে গিয়ে তার অবস্থা এতো খারাপ হয় যে, হাসপাতালে নিতে হয়। শেষ পর্যন্ত অপরাজিতার মৃত্যু হয়। জ্যোতির্ময়ের অতিরিক্ত চাকরিভক্তি এবং প্রভুভক্তি তাকে সংসার সম্পর্কে উদাসীন করে এবং এইটেই অপারিজতার মৃত্যুর কারণ।

সমাজবাস্তবতাও এর জন্য কম দায়ী নয়। জ্যোতির্ময়ের পরিবারের লোকেরা যদি সচেতন হতো তবু অকালে তাকে মৃত্যুবরণ করতে হতো না। কিন্তু কেউ তাকে সাহায্য করলো না। যশোদার তৎপরতাও জ্যোতির্ময়ের কারণে ব্যর্থ হলো।
জ্যোতির্ময়ের অবিবাহিত বোন সুবর্ণ। সে সকলের আদরে আহ্লাদিত। তার চরিত্রে কয়েকটি দিক স্পষ্ট- প্রেমিক, বোন এবং ননদ। জ্যোতির্ময়ের বউভাতে সুবর্ণ চরিত্রের প্রথম প্রকাশ । বিয়ের কনের মতো সে সাজগোজ করেছে:

“আজিকার উৎসবটি যেন তারই বিবাহের ভূমিকা- সাজগোজেই যেখানে যত বড় আছে, সকলকে আজ সে আয়ত্ত করিয়া রাখিবে।” ( ৩খ, পৃ.-১২৭ )

আনন্দে উত্তেজনায় আহাদে আর ন্যাকামিতে সেই মধ্যমণি হয়ে রইল। যশোদার ভাই নন্দ সত্যি সত্যিই সুবর্ণকে দেখে হা হয়ে গেলো। জ্যোতির্ময়ের আহ্লাদি বোন সুবর্ণ, অপরাজিতার আদরের ননদ। ননদসুলভ আচরণ সে করে। বৌদির দোষত্রুটি ধরা নয়, বউদিকে টিপ্পনি কাটতেই সে পটু। বেলা করে ঘুম থেকে ওঠার জন্য অপরাজিতাকে দেখে বড় বোন সুধীরা মুখ বাঁকালেও সুবর্ণ মুচকি মুচকি হাসে আর পাকামো করে

“আড়ালে ডাকিয়া নিয়া গত রজনীর ইতিহাস সব না হোক কিছু শুনিবার জন্য কেবলই খোঁচায়, তোষামোদ করে, আর কেবলই ভয় দেখায়, না যদি বলো বউদি, সুবর্ণ অপরাজিতাকে সত্যিই ভালোবেসে ফেলে। অপরাজিতা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে যাওয়ার সময় সুবর্ণ অস্ফুট শব্দ করে কান্না করে।

অসুস্থ অপরাজিতা হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে এ অবস্থায় জ্যোতির্ময় অফিসে যাচ্ছে শুনে সুবর্ণ আপত্তি করে। তারপরও অফিসে যাবে জেনে স্নেহময়ী সুবর্ণ নিজেকে সংযত রাখতে পারে না:

“রাত্রিটাও অপিসে থেকো- সুবর্ণের মুখ বিবর্ণ, চোখ ফুলিয়া গিয়াছে। বলিতে বলিতে আবেগে বিবর্ণ মুখে রক্তের সঞ্চার হয়, মাথা ঝাঁকি দিয়া সে আবার বলে, বউদি যেন মরে মরে, মরে, মরে। মরে যেন তোমার হাত থেকে রেহাই পায়।” (৩খ, পৃ.-২০০ )

সত্যিই অপরাজিতা মরে যায়। সুবর্ণের তখন অন্য অনুতাপ, তার আশঙ্কা সে মরতে বলেছে বলেই হয়তো অপরাজিতা মরে গেছে। অনুতপ্ত অসহায় সুবর্ণ জ্যোতির্যয়ের গায়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পরে কান্না শুরু করে। এই সুবর্ণ অনেক কোমল, স্নেহময়ী। দায়িত্বভার তাকে কেউ দেয় নি, কিন্তু ভালোবাসার দায়িত্ব সে কাঁধে তুলে নিয়েছে।

সুবর্ণ অভিমানী, স্নেহ প্রত্যাশী। সুবর্ণের অসংযত কথায় জ্যোতির্ময় তার গালে চড় দিলে সে অভিমান করে থাকে। কিন্তু কেউ কোন স্বান্ত্বনার বাক্য বলে না? সুধীরাকে বলে সে বাড়ি থেকে চলে যাবে। সেখানে সুধীরা তাকে চুপ করতে বলে, কোনো মায়া মমতা দেখায় না। এরপর সে যায় যশোদার কাছে, সেও কোনো সহানুভূতি জানায় না।

অবশেষে সে সত্যিই কোথাও চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়, তখন দেখা হয় নন্দ’র সাথে। নন্দর সহানুভূতি পেয়ে সে নন্দকে নিয়ে পালিয়ে যেতে চায়। কিন্তু অপরাজিতার মৃত্যু তাকে থামিয়ে দেয়। এখানে সুবর্ণ বাস্তব বৃদ্ধিহীন, খেয়ালি প্রকৃতির।

সুবর্ণ সবচেয়ে সক্রিয় তার প্রেমিকসত্তায়। সত্যপ্রিয়র পিতার মাসিক শ্রাদ্ধের দিন নন্দ’র কীর্তন শুনে সে নন্দকে পছন্দ করে। কীর্তন শুনে সে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে যায় :

“মুখখানা লম্বাটে হইয়া গিয়াছে সুবর্ণের, ছোট একটু হা করিয়া আছে, দু-চোখ বড়ো বড়ো করিয়া খোলা, কী একটা রোগের যন্ত্রণায় মেয়েটা যেন মুখ ভেংচি দিয়াছে।” (৩খ, পৃ. ১৭৩-১৭৪)

যশোদা অন্দরে গেলে সুবর্ণ তার কাছে নন্দর উচ্ছাসিত প্রশংসা করে। সকলে কীর্তনের প্রশংসা করছে, সে কথাও বলে। পরদিন দুপুর বেলা কীর্তনের অবসাদে নন্দ যখন ঝিমুচ্ছে, তখন সুবর্ণ এসে উপস্থিত হয়। সে নন্দর কীর্তন পুনর্বার শুনতে চায়। কিন্তু আয়োজন ছাড়াতো নন্দ কীর্তন গাইতে পারে না। সুবর্ণ উত্তেজনা চেপে রাখতে পারে না। আবেগ তার উথলিয়ে ওঠে। সে বলে

“কীর্তন যে এমন হয়, আমি সত্যি জানিতাম না। কাল শুনতে শুনতে আমার যে কী রকম হচ্ছিল-” (তখ, পৃ. ১৭৯)

উত্তেজনায় সুবর্ণ ঘুমাতে পারে নি, তার জ্বরও এসেছে, চোখ পাগলের মত হয়েছে। প্রেমের প্রথম সোপানে সুবর্ণ উদ্ভ্রান্ত হয়েছে। তার বউদি যশোদাকে ডাকতে বলার সঙ্গে সঙ্গে তাই সে ছুটে এসেছে। এসে উত্তেজনায় সে যশোদাকে দেখতেই পায় নি, নন্দর কাছে কীর্তন শোনার আবদার জানিয়েছে আর যশোদাকে বলেছে আসল কথা। যশোদা তাকে তার বাড়ি এনে বরফ পানি দিয়ে মাথা ধুয়ে শরবত খাওয়ালে সে কিছুটা সুস্থ হয়।

যশোদার মিষ্টি কথা শোনা মাত্র সে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। এমনি করে প্রেমের প্রথম ধাক্কা সে কাটিয়ে ওঠে। এরপর আর থামতে পারে না সুবর্ণ। সে এবার নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে। জ্যোতির্ময়ের চড় খেয়ে সে নন্দের ওপর নির্ভর করে। অনেক দূরের অজানা শহরে নদীর ধারে তারা ঘর করবে।

নন্দর কাছে সারা দিন কীর্তন শুনে সে ঘরক্সার কাজ করবে। কিন্তু অপরাজিতার মৃত্যু তাদের নিরুদ্দেশ হতে দিল না। এবার সুবর্ণ নন্দর চাকরি নিয়ে চিন্তিত হয়, কেমন করে নন্দকে তাদের পর্যায়ে তুলবে, কিংবা তারা যদি নন্দদের মতো মধ্যবিত্ত হয়ে যায় তাও হয়।

নন্দকে সে সত্যপ্রিয়র কাছে চাকরির জন্য পাঠায়। সত্যপ্রিয়র কৌশলে নন্দ চাকরিও পায়। যশোদা সে চাকরি ছাড়তে বললে সুবর্ণর পরামর্শে নদ চাকরি ছাড়ে না। সুবর্ণ চিন্তা করে নন্দর একশ টাকা বেতন হতো। সুবর্ণ অপরাজিতার কথা বলে জ্যোতির্ময়কে চাকরি ছেড়ে দিতে বলে যেন তারা নন্দদের স্তরে নেমে যায়। অতঃপর কোনো উপায় না দেখে সুবর্ণ আর নন্দ নিরুদ্দেশ হয়।

‘শহরতলী’ দ্বিতীয় খণ্ডে দেখা যায়, তারা কোথায় গেছে যশোদা বা জ্যোতির্ময় কেউই জানে না। তারপর একসময় যশোদা জানতে পারে নন্দ সিনেমায় অভিনয় করছে। হলে গিয়ে তারা সুবর্ণকেও সিনেমায় অভিনয় করতে দেখে। রাজেন খবর নিয়ে আসে নদ আর সুবর্ণ অনেক বড়লোক হয়েছে। সুবর্ণের মাধ্যমে উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারের একটি মেয়ের প্রথা ভাঙা দেখিয়েছেন লেখক।

‘অহিংসা’ উপন্যাসে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় মানব মনের সূক্ষ্ম বিশেষণ করেছেন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই উপন্যাসেই মনোবিশেষণ সবচেয়ে জটিল এবং সমৃদ্ধ। আশ্রমকে কেন্দ্র করে উপন্যাসের কাহিনী আবর্তিত হয়েছে। এই আশ্রমটি মহীগড়ের রাজা সাহেবের দান। রাজপুত্র নারায়ণ কয়েক দিন লুকিয়ে রাখার জন্য পালকিতে করে একটি মেয়েকে আশ্রমে নিয়ে আসে। এই মেয়েটির নাম মাধবীলতা।

মাধবীলতা প্রথম দিন আশ্রমে এসেই আশ্রম এবং সদানন্দের স্বাভাবিক জীবনে অস্বাভাবিক ক্রিয়া করেছে সিমেন্ট করা উঠানে হিলতোলা জুতা ঠুকে সে সদানন্দের কাছে এসে খপ করে সদানন্দের হাত ধরে ফেলে। তার কোনো সংযম নেই:

“মুখে তীব্র মদের গন্ধ, যে গন্ধে সদানন্দের চিরকাল বমি আসে। [… …….. দুহাতে সদানন্দের গলা জড়াইয়া গদগদ হইয়া বলিল, শোনো, আমি কেউ নয় বললাম না এক্ষনি তোমাকে, তা সত্যি নয় । আমি মাধবী মাধবীলতা- লতাটা কেটে বাদ দিয়েছি একদম।” (৩খ, পৃ. ২৮২)

মাধবী তার মামা-মামির কাছে বড় হয়েছে শুধু এ কথা জানা যায়- এ ছাড়া তার অতীতের আর কোনো কথা জানা যায় না। আশ্রমেই নতুন করে তার জীবনের শুরু। প্রথম দিন সে ঘুম সদানন্দের পিঠের কাছে কুণ্ডলী পাকিয়ে ঘুমিয়ে থাকে। সকালবেলা সদানন্দ উঠে ঘুমান্ত মাধবীকে দেখতে পায়।

প্রৌঢ় বয়সী সদানন্দের কাছে মাধবী কুমারীত্ব হারায়, ফ্রয়েডীয় যৌন তত্ত্বকে অবলম্বন করে মাধবী চরিত্রটি অংকন করা হয়েছে। সদানন্দ বিপিন মহেশ চৌধুরি বিভূতি এদের চিন্তা-চেতনা একগুঁয়েমি, পরশ্রীকাতরতা ইত্যাদি মাধবীর জীবনের গতিকে নিয়ন্ত্রণ করেছে, তবে মাধবীর নিজস্ব চেতনায় তার মনের গতি নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। মাধবীর জীবনের বিভিন্ন পর্যায় উপন্যাসের কাহিনীকে এগিয়ে নিয়ে গেছে।

নারায়ণ মাধবীকে নিয়ে আসে আশ্রমে। কয়েক দিনের জন্য সে মাধবীকে রেখে যায়। সব ব্যবস্থা করে তারপর মাধবীকে নিয়ে যাবে। এরই মধ্যে সদানন্দ মাধবীর মনে ভয় এনে দেয়। সে মাধবীকে বলে নারায়ণ দুদিন পর তাকে ছেড়ে পালাবে, তখন সে কী করবে? এমন ভুল, এমন ছেলেমানুষি কেউ করে? একথা শুনে মাধবী খাবারের পেট, চায়ের কাপ সদানন্দের দিকে ছুঁড়ে মারে, তারপর বাঘিনীর মতো আঁচড়িয়ে সদানন্দের মুখে রক্ত বের করে দেয় এবং সদানন্দের কোলে মুখ গুঁজে কাঁদতে আরম্ভ করে।

মাধবীর অসহায়তা এখানে প্রবলভাবে ধরা পরে। সে ঘর থেকে পালিয়ে এসেছে নারায়ণের হাত ধরে, আবার নারায়ণকে বিশ্বাস করতে পারছে না, এখানে এসে সদানন্দের হাতে সে ধর্ষিত হয়েছে। সেই সদানন্দই আবার তাকে পরিস্থিতি বোঝানোর চেষ্টা করছে। মাধবী কাউকে বিশ্বাস করতে পারছেন না, তার সামনে কোনো পথ খোলা নেই। অল্প বয়সী একা একটা মেয়ের পক্ষে বুদ্ধিদীপ্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

সে কোনো উপায় না দেখে সদানন্দকে আক্রমণ করে, আবার তারই কোলে মুখ গুঁজে কাঁপতে আরম্ভ করে। সে যেন নিজেকে সাধু সদানন্দের কাছে সমর্পণ করে দেয়- এবার সদানন্দ তাকে নিয়ে যা খুশি করুক। এ হলো অনেক ঝঞ্ঝাট বয়ে যাওয়া একটি মেয়ের নিস্তেজ হয়ে যাওয়া। কয়েকদিনের উত্তেজনা, ভয়, না খাওয়া- সবকিছুর প্রভার পরে তার ওপর

“একই মনের মধ্যে হিংসা-অহিংসা আছে বলেই মাধবীর হিংস্র হয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছে। আবার যুগ যুগ ধরে গোষ্ঠী মনস্তত্ত্বে সাধু-গুরু ইত্যাদির প্রতি মানুষের যে অবলম্বনবোধ, সেই বোধেই যে সদানন্দ তার কৌমার্য বিলাসী, নারীত্বের এই বিপর্যয় বোধের মুহূর্তেও মাধবী সেই বিপর্যয়কারীকেই অবলম্বন হিসাবে আঁকড়ে ধরেছে। ২২

সদনান্দ মাধবীকে আশ্রমের অন্যান্য মেয়েদের কাছে দিয়ে আসতে চায়, মাধবী তৎক্ষণাৎ রাজি হয়। উপন্যাসে তার উচ্ছ্বাস চোখে পড়ে

“মাধবীলতা যেন বেশ উৎসাহের সঙ্গে জোরে জোরে পা ফেলিয়া চলিতে থাকে, তপোবনের শোভা দেখিয়া সে যেন খুশি হইয়াছে, ভিজা মাটিতে পা ফেলিয়া হাঁটিতে যেন আরাম পাইতেছে।” (৩খ, পৃ.- ২৮৭)

এরপর মাধবী নারায়ণের সঙ্গে ফিরে যায় না, সে আশ্রমেই থাকে উমা আর রত্নাবলীর কাছে। এখানেই মাধবীর মনের একটি জটিল দিক স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আবার সদানন্দের চিন্তায়ও মাধবীর স্বাভাবিক আচরণ সম্পর্কে সম্ভাব্যতা প্রকাশিত হয়:

“যদি সে তুলনা করে এই বিরাট দেহ শ্রীহীন দরিদ্র, প্রৌঢ়ের সঙ্গে রূপবান ধনবান সঙ্গী যুবকটির, আর তুলনা করিয়া যদি তার মনে খটকা বাধে যে কী হইবে ধার্মিকের মুখোশ পরা নরপিশাচটার আশ্রমে বাস করিয়া, তার চেয়ে রাজপুত্রের হাত ধরিয়া উধাও হইয়া যাওয়া ঢের ভালো, যা হোক তা হোক ফলাফল?” (৩খ, পৃ. ২৯০)

 

নারী চরিত্র পর্ব ২

 

মাধবীর মনে এই চিন্তা আসা স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু কোন চিন্তা থেকে মাধবী রাজপুত্রেকে ত্যাগ করে আশ্রমে থেকে যায় তার সন্ধান পাওয়া কঠিন। কুমারীত্ব হরণকারী সদানন্দের কথায় মাধবী সম্মোহিত হবে কেন তাও বোঝা দুষ্কর। তবে পঞ্চাশের কাছাকাছি বয়সের উমাকে ধুলায় গড়া ভঙ্গুর পুতুলের মতো সদানন্দের পায়ে লুটিয়ে পড়তে দেখে এবং উমার দেহ থরথর করে কাঁপতে দেখে মাধবীর বুক ঢিপ ঢিপ করতে থাকে। সদানন্দ এ সময় উমাকে উপদেশ দেয় দার্শনিকের মতো:

“মন হল ঘরের মতো, ধুলোবালি এসে জমা হয়, ঝাঁট দিয়ে সেসব সর্বদা সাফ করে নিতে হয়, নইলে ঘর যেমন আবর্জনার স্তরে ওঠে, মনও তেমনি কুচিন্তায় আচ্ছন্ন হয়ে যায়।” (৩খ, পৃ.-২৮৯)

সদানন্দের এরূপ কথায় বাস্তব বুদ্ধিহীন, ঘর পালানো অল্পবয়সী মাধবীর সম্মোহিত হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কারণ কথা শুনত শুনতে মাধবী আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না, সে মেঝেতেই বসে পড়ে। মাধবীর আশ্রমে থাকা নিয়ে বিপিন প্রশ্ন তোলে। সদানন্দের হাব-ভাব দেখে ভীত হয়ে সে মাধবী সম্পর্কে সদানন্দকে বলে তোর পাতানো মেয়ে, কিন্তু সদানন্দ মাধবীকে মেয়ে বলে স্বীকার করে না।

মাধবীর আশ্রমে ভালোলাগা না । মাঝে মাঝে মন খারাপ হয়ে যায়। আকাশে মেঘ করে, মাধবীর ঘরের ভেতরও সে রকম মেঘলা হয়ে যায়। যেন

“এ ভরা বাদর

মাহ ভাদর

শূন্য মন্দির মোর। ২

মাধবী রাতে ঘুমাতে পারে না। সদানন্দ বিপিনকে এ কথা জানালে বিপিন মাধবীর ভার নেয়। সেদিন থেকে বিপিন আর মাধবীর আত্মীয়তা গড়ে ওঠে। মাধবী আশ্রমে কাজকর্ম করে- সকাল-বিকাল গোয়ালঘরে দুধ দোহানোর সময় সে উপস্থিত থাকে, রান্নার সময় তরকারি কুটে দেয়, কেউ অসুস্থ থাকলে তার জন্য পথ্য তৈরি করে। আস্তে আস্তে আশ্রমের জীবন মাধবীর ভালোলাগতে থাকে।  আগে সে সদানন্দের অন্দর মহলে উপদেশ শুনতে যেতো কিন্তু কিছুই বুঝতে পারত না, কিন্তু বিপিনের কথায় সে তাও বুঝতে পারে। সদানন্দের প্রশ্নের উত্তরে মাধবী আশ্রমের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলে

“কীভাবে সুখে শান্তিতে বেঁচে থাকা যায় মানুষকে তাই বুঝিয়ে দেওয়া, ধর্মের মধ্যে যে বিকার এসেছে সংশোধন করা, সমাজ গঠনে-” (৩খ, পৃ.-২৯৬)

সদানন্দ এখানেই তাকে থামিয়ে দেয়। মাধবী সদানন্দের সামনে এখন আর প্রাণোচ্ছল নয়, সে শুধু শ্রদ্ধা-ভক্তি করে, হাসি-আনন্দের মুখে ছিপি আটকে দেয়, বিপিন মাধবীকে এমনি করে গড়ে তুলে। বিপিন মাধবীকে পুরোপুরি অধিকার করে, অনেক কাজের ঝামেলায় থাকা সত্ত্বেও সে মাধবীর সঙ্গে গল্প করে, তপোবনে বেড়াতে বের হয় আবার মাধবী যাতে ছোটখাটো কাজ করে সময় কাটাতে পারে সে ব্যবস্থাও করে দেয়।

বিপিন আর সদানন্দের প্রশ্রয়ে মাধবী আশ্রমের অনেক ব্যাপারে সাহসী হয়ে উঠে। মহেশ চৌধুরী এসে সদানন্দের দর্শন লাভের জন্য ধরনা দিলে শতাধিক লোকসমাগম হয়, আশ্রমের কাজে ব্যাঘাত ঘটে। মাধবী মহেশ চৌধুরিকে বকুনি দিতে আরম্ভ করে

“মাথা খারাপ হয়ে থাকে অন্য কোথাও গিয়ে পাগলামি করুন না ?” (তখ, পৃ.-৩০৬) তারপর মাধবী নিজের চেষ্টায় মহেশ চৌধুরীকে সদানন্দের চরণ দর্শন করায়। সে নিজের দায়িত্বে মহেশকে সদানন্দের কাছে নিয়ে যায়। ক্ষুব্ধ সদানন্দকে চোখের জলে বশ করে “কত ভাবিয়া কত হিসাব করিয়া নিজের দায়িত্বে বড় একটা কাজ করিতে গিয়া বুকটা ভয়ে ও উত্তেজনায় টিপটিপ করিতেছিল, সদানন্দ দেবতা না দানব মাধবীর জানা নাই কিন্তু এমন ভয় সে করে সদানন্দকে যে কাছে আসিলেই তার দেহমন কেমন একসঙ্গে আড়ষ্ট হইয়া যায়, সদানন্দ তাকে বুকে তুলিয়া নইলেও সে জন্য সে নতুন কিছুই আর অনুভব করিতে পারে না, …………।” (৩খ,পৃ.-৩০৯)

শেষ পর্যন্ত মাধবীর চোখের জলে সদানন্দ নরম হয়ে মহেশকে প্রণাম করতে দিল। বিপিন মাধবীর কাছে সদানন্দকে মহাপুরুষ করে তুলেছিল। মহেশকে সদানন্দ মিথ্যা কথা বললে সে বিশ্বাসে ফাটল ধরে। আশ্রমে মহেশের ধরনা দেওয়ার ব্যাখ্যা আর নিজের কৈফিয়ত দিতে গিয়ে সে সদানন্দকে জানিয়ে এলো তার বিশ্বাসভঞ্জের কথা। মাধবীর আচরণ এখানে একটু অসংলগ্ন মনে হয়

“আকুল হইয়া সে কাঁদিতে আরম্ভ করিয়া দিল আর বলিতে লাগিল, কেন আপনি মিছে কথা বললেন। কেন বললেন!” (৩খ, পৃ. ৩১১ )

এখানে মাধবী প্রথম দিনই একজন ভণ্ড নরপিশাচ সাধুর দেখা পেয়েছিল। সেই সাধু সম্পর্কে সে হঠাৎ দিব্যজ্ঞান কেন করল তা বোঝা যায় না, তার তো সদানন্দ সম্পর্কে কোনো সৎ বিশ্বাস থাকারই কথা নয়, সেক্ষেত্রে বিশ্বাস ভঙ্গ হয়ে সে কাঁদতে থাকে কেন এটাও বিস্ময়ের ব্যাপার। আশ্রমের বহমান একটি ধারায় প্রবাহিত মাধবীর জীবন হঠাৎ করেই আবার জটিল হয়ে ওঠে।

এ জটিলতা যেমন বাইরে থেকে তার ওপর প্রভাব বিস্তার করে, তেমনি তার মনে জটিল চিন্তা এবং ভাবময়তার উদয় হয়। সদানন্দ মাধবীর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য, নিজের মনকে বশে আনার জন্য সাতদিন ঘরের কোনে লুকিয়ে থাকে। কিন্তু তার মন স্থির হওয়ার পরিবর্তে আরো অস্থির হয়। সে মাধবীকে অভিসারের নিমন্ত্রণ করে:

“না, একটু রাত করে এসো। এই এগারোটা সাড়ে এগারোটার সময়। অনুরোধ নয়, আদেশ। এতক্ষণে মাধবীলতা বুঝিতে পারিয়েছিল, আহ্বানটা খাঁটি অভিসারের, ধর্ষণের ফলে প্রেমের জন্ম হওয়ায় এতদিন যে পূর্ব রাগের পালা চলিতেছিল আজ তার সমাধি।” (৩খ,পৃ.-৩১২)

এ হলো বাইরের দিক থেকে মাধবীর ওপর চাপ। কিন্তু মাধবী নিজেও এ আহ্বান উপেক্ষা করতে পারে না। তাই অভিসার বাতিল না করে শুধু বলে:

“আজ নয়, পরশু যাব।” (৩খ, পৃ.-৩১২)

মাধবীকে সদানন্দ ত্রয়োদশীর জ্যোৎস্নার লোভ দেখায়। মাধবী তখন কেলেঙ্কারির ভয় দেখায়, কিন্তু সদানন্দ বলে সে নিজেই সব ব্যবস্থা করবে। মাধবী আবার দুপুরে সদানন্দের ঘরে যায়, অভিসারের সময়টা একটু পিছানোর জন্য, সেখানে যে বিপিনকে দেখে বিব্রত হয়। তখন সদানন্দ বাইরে এসে শোনে মাধবীর কথা।

মাধবীকে তার পাকা ঝানু-বাজারের বেশ্যার মতো মনে হয়। মাধবীর মনের ভেতরে জন্ম নিয়েছে দ্বন্দ্ব। একদিকে তার আত্মসম্মান, ব্যক্তিত্ব লোকলজ্জা, অন্যদিকে সদানন্দের পাশবিক অনাচারের প্রতি এক দুর্নিবার আকর্ষণ। মাধবীর আত্মদ্বন্দ্বের পর্যায়ে রাতে বিপিন তাকে ডাকতে যায়।

শশধর এসেছিল মহেশের অসুখের সংবাদ নিয়ে। মহেশ চৌধুরী মাধবীকে একবার দেখতে চায়। বিপিন একা রাত করে মাধবীকে মহেশ চৌধুরীর বাড়ি পৌঁছে দিতে যাবে। মাধবী মনে করে সদানন্দ বিপিনকে দিয়ে মাধবীকে ডেকে পাঠিয়েছে। সে ক্ষোভে ফেটে পরে। চিন্তা করে:

“সে এত সপ্তা, মানুষের কাছে তার মর্যাদা এত কম যে, প্রকাশ্যভাবে বিপিনকে দিয়া সদানন্দ তাকে অভিসারে যাওয়ার হুকুম পাঠাইয়া দিতে পারে এমন অনায়াসে।”(৩,পৃ.-320)

সদানন্দ বিপিনকে ডেকে পাঠিয়েছে বলেই তার এতো রাগ-ক্ষোভ, নইলে কী মাধবীর অভিসারে যেতে আপত্তি নেই। মানব মনের এই সূক্ষ্ম জটিল দিক মাধবীর মাধ্যমে লেখক তুলে ধরেছেন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় দেখিয়েছেন ধর্ষণেও প্রেমের জন্ম হয়। মাধবী তাই লোকচক্ষুর অন্তরালে সদানন্দের কুটিরে যেতে মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিল। তবে তার ভেতরের সৎ চিন্তা যে একেবারে মুছে গেছে তা নয়। তাই সে বিপিনের উপর ক্ষিপ্ত হয়:

“ও! আপনি বুঝি পাওনা মিটিয়ে নেবেন আগে ? শিগগির নিন, একটু তো ঘুমাতে হবে রাত্রে ?” (তখ,পৃ. 230 )

এ সময় মাধবীর মনে হয় রাজকুমারের মিসট্রেস হওয়াই ভালো ছিল। ফাঁকা মাঠে মাধবীলতার হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে বিপিনের মনে হয় আঙুলগুলো তার পাখির পালকের মতো কোমল হয়ে উঠুক সে মাধবীর সর্বাঙ্গে হাত বুলিয়ে দেবে মাধবীর মাথা বিপিন নিজের বুকে চেপে ধরে। মাধবীকে সে বাড়ি কিনে দিতে চায় তার নামে ব্যাংকে টাকা জমা রাখতে চায়। সে জিজ্ঞাসা করে মাধবীর ওপর কে অত্যাচার করেছে, তাকে বিপিন আশ্রম থেকে বের করে দেবে। প্রকাশিত হয় বিপিনের পাশবিকতা:

“কী উগ্র উদারতা বিপিনের। এদিকে চাপিয়া ধরিয়াছে মাধবীর মাথাটা নিজের বুকে, মুখে তাকে জিজ্ঞাসা করিতেছে কে অত্যাচার করিয়াছে তার উপর, কে কষ্ট দিয়াছে তার মনে। ” (৩খ,পৃ.-৩২১)

মাধবীলতার মনে হয়:

“বিপিন সত্যই মানুষ নয়, ” ( ৩, পৃ.-৩২১)

মাধবীর জীবন এমন করে জটিল হয়ে ওঠে। এরপর বিপিন তাকে মহেশ চৌধুরির বাড়ি পৌঁছে দিতে তাকে নিয়ে নৌকায় ওঠে। ভিতরে বাইরে চরম জটিলতার মাঝে মহেশ চৌধুরীর বাড়ি গিয়ে মাধবী স্বস্তি পায়। তবে বিপিন এখানেও তাকে তাড়া করে। বিপিন প্রতিদিনই আসে । তারপর আস্তে আস্ত বিপিন আসা কমিয়ে দেয়। মহেশ সুস্থ হয়ে উঠলে মাধবীরও কাজ কমে যায়। সবকিছু তার একঘেয়ে লাগে। গ্রামের মেয়েরা তার কাছে ঘেঁষার ভরসা পায় না। তাদের কাছে মাধবী একটি রহস্য:

“আশ্রমবাসিনী কুমারী সন্ন্যাসিনী (বয়স কত হইয়াছে ভগবান জানেন) সাধারণ বেশে আশ্রম ছাড়িয়া আসিয়া মহেশ চৌধুরীর বাড়িতে বাস করিতেছে, গাঁয়ের মেয়েদের কাছে সে কতকটা স্বর্গচ্যুত অপ্সরি কিন্নরীর মতো রহস্যময়ী জীব।” (৩খ, পৃ.-৩২২)

মহেশ চৌধুরীর বাড়ি মাধবীলতার আদরযত্নের অভাব নেই, বিভূতির মা তাকে মেয়ের মতো আপন করেছে, কিন্তু মাধবীর এখানে ভালে লাগে না। আশ্রমের জীবনের পর এ জীবন নীরস মনে হয়, আশ্রমে অনেক নরনারীর নির্জনতা, গাছপালায় ঘেরা কুটিরগুলা কোনো কিছু ঘটার অপেক্ষায় থাকে, এখানে কিছু ঘটার নেই। বিপিনকে মাধবীলতা সদানন্দের কথা জিজ্ঞাসা করে। মাধবী সদানন্দ সম্পর্কে বলে।

“উনি বেশ লোক।” (তখ, পু.-৩২৩)

মানুষের জীবন যে জটিল আরেকবার প্রমাণিত হয়। যে সদানন্দের অত্যাচারে মাধবী অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল, তার প্রতি-ই সে বারবার আকৃষ্ট হয়। বিপিন বিস্মিত হয়

“মাধবীলতার মুখে এ কথা শুনিয়া বিপিন প্রায় চমকাইয়া যায়। নৌকায় উঠিবার আগে রাগের মাথায় সদানন্দের কুটিরের দিকে পা বাড়াইয়া, স্টেজে সরলা কোমলা বনবালার অভিনয় করিয়া হয়রান হইয়া গরম মেজাজে সাজঘরে ফিরিয়া আসা বেশ্যার মতো ফুঁসিতে ফুঁসিতে মাধবীলতা যে সব কথা বলিয়াছিল, বিপিন তার একটি শব্দও ভোলে নাই।” (৩খ, পৃ.-৩২৩)

বিপিনের সঙ্গে গল্প করাটাও মাধবীলতার জন্য বিস্ময়ের ব্যাপার। কারণ, ইতোপূর্বে বিপিনের লিবিডো তাড়নার পরিচয়ও মাধবীলতা পেয়েছে। তাই মহেশ চৌধুরি বিপিনের প্রশংসা করলে সে হাসবে কি কাঁদবে ভেবে পায় না। এই বিপিনকে সে রাগে ক্ষেভে বলেছিল, তার মিসট্রেস হয়ে থাকতে হবে কি না। সেই বিপিনের সঙ্গে সে গল্প করে, সদানন্দের সম্পর্কে ভালো মন্তব্য করছে।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় উপন্যাসে ফ্রয়েডীয় মনোবিকারের এমন জীবন্ত চরিত্র আর নেই। বিপিন মাধবীলতাকে মহেশ চৌধুরী লোক কেমন জিজ্ঞাসা করলে যে বলে, ভালো নয়। সে আশ্রমে ফিরেও যেতে চায়। তবে আশ্রমে গিয়ে সে কি করবে তা বলতে পারে না। মহেশ চৌধুরির কাছে মাধবী বিপিনকে দুর্নাম করে, বলে উনি অপদার্থ ভীরু কাপুরুষ- ” (পৃ.-৩২৬)

মাধবীলতার মন একেক সময় একেকজনের প্রতি বিরূপ হতে থাকে আর সে নিজে অদ্ভুত আচরণ করে।

“মহেশ চৌধুরির উপর বিরক্তিটা তার এত বেশি বাড়িয়া গিয়াছে, লোকটাকে দেখিলেই গায়ে যেন আজকাল তার জ্বর আসে। কিছুদিন আগে মাধবীলতা বিপিনকে বলিয়াছিল, মহেশ চৌধুরি লোক ভালো নয়। তখন বিপিনের সাহচার্য সে সহ্য করিতে পারিত না। আজকাল মহেশ চৌধুরির একসুরে বাঁধা মনোবীণার একঘেয়ে ঝংকারগুলি একেবারে অতিষ্ঠ করিয়া তোলায় বিপিনের মধ্যেও হঠাৎ সে কিছু কিছু বৈচিত্র্য আবিষ্কার করিয়া ফেলিয়াছে। বিপিনের কাছে আর তাই মহেশ চৌধুরির সম্বন্ধে কোনো রকম মন্তব্য করে না, মহেশ চৌধুরির কাছে বিপিনকে বিশেষণের পর বিশেষণে অভিনন্দিত করিয়া চলে চালবাজ, মিথ্যুক, লোভী, অসংযত প্রভৃতি কত সংজ্ঞাই যে বিপিনকে সে দেয়।” (৩খ, পৃ. ৩২৭ )

 

নারী চরিত্র পর্ব ২

 

মহেশ চৌধুরির ছেলে জেল থেকে বাড়ি আসলে মহেশ চৌধুরি সকলকে নিয়ে আশ্রমে যেতে চায়। আশ্রমে যাওয়ার কথা শুনে মাধবীলতা আনন্দিত হয়ে ওঠে। আশ্রমে গিয়ে তারা গাছের গুঁড়িতে বসে রত্নাবলীর সঙ্গে গল্প করতে থাকে। সদানন্দ এলে বিভূতি তাকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে চায় না। ঠিক এই সময় বিপিন এসে মাধবীর আশ্রমে আসার কৈফিয়ৎ চায়। মাধবী বিপিনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। সে ঔদ্ধত্যভাবে বলে:

“বারণ করেছেন মানে? উনি বারণ করবার কে? বেশ করেছি আমি আশ্রমে এসেছি।” ( তখ, পৃ. ৩৩১ )

সকলের সামনে সদানন্দ মাধবীকে বলে

“আমার ওখানে একবার আসবে মা মাধু?” (তখ, পৃ. ৩৩২ )

এই দিন সন্ধ্যায় বিপিনের সঙ্গে ঝগড়া করে সদানন্দ মহেশের বাড়ি এসে আশ্রয় নেয়। মাধবীলতা সকালের মতো তেজোদীপ্ত থাকতে পারে না। সে সদানন্দকে প্রশ্ন করে বসে বিপিন কেন তাকে তাড়িয়ে দিল। সে সদানন্দের ঘরে একা এসে বলে:

“আপনাদের দিয়ে কোনো ভালো কাজ হতে পারে না। খালি নিজেদের মধ্যেই মারামারি করবেন তো কাজ হবে কী? ছি ছি নিজের নিজের স্বার্থচিন্তাই যদি করবেন। দিনরাত, এসব কাজে কেন আসেন আপনারা ?” (৩খ, পৃ. ৩৪১ )

বিপিন আর সদানন্দের পরিচয় মাধবীর অজানা নয়। তবু তারা ভালো কাজ করবে মাধবীর পক্ষে এ চিন্তা করা একেবারেই অমুলক, তথাপি মাধবী তার মনের নির্দিষ্ট গতিতেই চিন্তা করে রেখেছে এরা দুজন ভালো কাজ করতে নেমেছে।

যে সদানন্দকে একদিন সে আঁচড়ে কামড়ে একাকার করে দিতে চেয়েছিল, বিপিনের কাছে যার বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফেটে পড়েছিল, যার জন্য তার জীবন অতিষ্ঠ হয়েছিল মহেশ চৌধুরির বাড়ি তার আগমনে মাধবীর নিষ্ক্রিয়ভাবে দূরে থাকাই ছিল স্বাভাবিক কর্ম কিন্তু সে তা থাকতে পারে না। সদানন্দের সঙ্গে ব্যঙ্গবিদ্রূপের সুরে কথা বলে সে যেন আরো ঘনিষ্ঠ হয়ে পরে

“বিপিনবাবু কেন মহাপুরুষ হবেন, মহাপুরুষ তো আপনি।” (৩খ, পৃ.-৩৪১) মাধবী ঘনিষ্ঠ হলেও সদানন্দ ভোলেনি নিজের আচরণের কথা। সে তাই মাধবীর প্রতি কামাসক্ত হয়ে তাকে বলে মহাপুরুষ না ভেবে তার কোনো উপায় নেই, নইলে যে তাকে দ্বিচারিণী হতে হবে। বিভূতির সঙ্গে মাধবীর বিয়ের কথায় সদানন্দ মাধবীকে ডেকে পাঠায়। মাধবী এলে সদানন্দ দরজা-জানালা বন্ধ করে দেয়, চোখ দেখে মাধবী ভীত হয়ে ওঠে।

“ভয়ংকর একটা আঘাতে দেহে মনে তাকে চিরদিনের জন্য পঙ্গু করিয়া দিবার সাধটাই সদানন্দের মনে মাথাচাড়া দিয়া উঠিয়াছে।” (৩খ, পৃ.-৩৫১)

মাধবীলতা অজ্ঞান হয়ে যায়। জ্ঞান ফিরে বাইরে এসে সে বিভূতির বুকে মুখ গুঁজে কাঁদে, বিভূতিকে এর প্রতিকার করতে বলে। এর জের ধরে মহেশ চৌধুরির বাড়ি এক বিরাট কাণ্ড ঘটে যায়। বিভূতি সদানন্দের নাকে ঘুষি দিয়ে নাক ফাটিয়ে দেয়। বিভূতির এই আচরণে মহেশ চৌধুরি বিভূতির ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে হাতুড়ি দিয়ে নিজের নাকে আঘাত করে নিজে সদানন্দের চেয়ে বেশি আঘাতপ্রাপ্ত হয়।

মাধবীর বিয়ের পর সদানন্দকে বিপিন আশ্রমে ফিরিয়ে নিয়ে যায়, মাধবীকে সদানন্দের কাছে ফিরিয়ে দেবে এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে। বিয়ের পর সদানন্দ ডেকে মাধবীর কাছে কোনো সাড়া পায়নি, এমনকি মাধবী তাকে এড়িয়ে চলেছে। এক দিনের জন্য হলেও মাধবীর এই অহংকার ভাঙতে সদানন্দ বদ্ধপরিকর।

এক রাতের জন্য হলেও যে মাধবীকে চায়। এমনি অবস্থায় বিপিন মাধবীকে সাবধান করে দিয়ে আসে রত্নাবলী বা উমা কেউ ডাকতে গেলেও যেন মাধবী আশ্রমে না আসে। মাধবীও এ ব্যাপারে সচেতন থাকে। সে এখন স্বামী সোহাগী। বিস্তৃতি তাকে স্ত্রীর উপযুক্ত মর্যাদা দিয়েছে। সংসার পেয়ে মাধবী উৎফুল হয়ে উঠেছে:

“বিভূতির ঘুম আসিলেও তাকে সে ঘুমাইতে দেয় না, প্রাণের চেয়ে যে প্রিয়তর তাকে পর্যন্ত ভালোবাসিতে ভালোবাসিতে শ্রান্ত হইয়া বিস্তৃতি ঝিমাইয়া পড়িলে মাধবীলতা অক্লান্ত চেষ্টায় যেভাবে আবার তাকে বাঁচাইয়া তোলে, মানুষের বাস্তব জীবনে যে সে ধরনের অপরূপ কাব্যের স্থান আছে বিস্তৃতি কোনোদিন কল্পনাও করিতে পারে নাই।” (৩খ, পৃ. ৩৭২)

মাধবীর এই সুখের জীবনে পুলিশ এসে বাড়িতে হানা দেয়। তলাশি চালায়। সদানন্দ বিস্তৃতির পিছনে পুলিশ লেলিয়ে দিয়েছে। বিভূতির কাছে মাধবী জানতে পারে সদানন্দ পুলিশ লেলিয়ে দিয়েছে। মাধবী ক্ষোভে-দুঃখে দিশেহারা হয়ে ওঠে ঘুরে ফিরে বারবার এই আলোচনা করতে থাকে।

বিভূতি মাধবীর এই বিচলিত ভাব দেখে মুগ্ধ হয়, কৃতজ্ঞ হয়। “বিভূতির এই কৃতজ্ঞতাই মাধবীলতাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করিয়াছিল। বড়ো সহজে বিস্তৃতির মন ভুলানো যায়। একটু আদরযত্ন করা, রূপের সামান্য একটু বিশেষ ভঙ্গি দেখানো, বিভূতির কাছে এ সমস্ত যে কত দামি বুঝিতে পারিয়া মাধবীলতা নিজেই অবাক হইয়া যায়। [… ….] বিভূতির কপালে হাতের তালু ঘষিয়া দিতে দিতে সে ব্যগ্রকন্ঠে বলে, না না, তুমি ভেবো না, ও তোমার কিচ্ছু করতে পারবে না।” (৩খ, পৃ. ৩৭৩)

মাধবী বিভূতিকে বলে তার কিছু হলে মাধবী মরে যাবে। আবেগে মাধবীর চোখে জল আসে। পরদিন সে আশ্রমে যায় সদানন্দের কাছে কৈফিয়ৎ চাইতে। শশধরের বউকে সে বলে যে সদানন্দের মুক্তপাত করতে যাচ্ছে, বাড়িতে পুলিশ লেলিয়ে দেয়, এতো বড় স্পর্ধা। শশধরের বউ আর মনোহর দত্তর মা’কে রত্নাবলীর কুটিরে বসিয়ে রেখে মাধবী একা যায় সদানন্দের সঙ্গে বোঝাপরা করতে। সদানন্দের মহলে ঢুকতে গিয়ে তার দেখা হয় বিপিনের সঙ্গে। বিপিন তাকে যেতে নিষেধ করে। কিন্তু মাধবী বদ্ধ পরিকর:

“মাধবীলতার নিজেরও বুকের মধ্যে অকথ্যরকমের টিপটিপ করেছিল, তবু সে মুখে সাহস দেখাইয়া বলিল, আপনার ভয় নেই, উনি আমার কিছু করতে পারবেন না। ” (৩খ, পৃ.-৩৭৫)

মাধবী ঘরে ঢোকামাত্র সদানন্দ দরোজা বন্ধ করে দেয়, বেলা পরে আসে কিন্তু মাধবী বের হয় না। বিপিন বাইরে বসে থাকে। অনেক সাহস সঞ্চায় করেও মাধবীর শেষ রক্ষা হয় না। রত্নাবলী গিয়ে পড়ন্ত বেলায় মাধবীকে নিয়ে আসে। রাত্রে বিভূতি মাধবীকে জেরা করা শুরু করে। মাধবী শুধু বলে পুলিশ লেলিয়ে দিল কেন। মাধবী ছলনার আশ্রয় নেয়।

“মাধবীলতার সর্বাঙ্গ অবসন্ন হইয়া আসিতেছিল, জাগিয়া আছে তবু ঘুমেই দু- চোখ বুজিয়া গিয়াছে। মনের মধ্যে একটা ধিক্কার ভরা আর্তনাদ গুনগুনানো গানের মতো মৃদু চাপা সুরে গুমরাইতেছে। কী হইয়াছে? কেন হইয়াছে? কোথায় হইয়াছে? কবে হইয়াছে? কিছুই যেন মনে নাই। অবসাদের যন্ত্রণা যে এমন বৈচিত্র্যময় সকলেই তা জানে, তবু সকলের পক্ষেই ‘এটা কে তা জানিত’র পর্যায়ের।” (৩খ,পৃ.-৩৭৯)

পরদিন জেরা করেও বিভূতি কিছুই বুঝতে পারল না। শুধু বোঝা গেল সদানন্দের হাতে-পায়ে ধরে বলে এসেছে বিস্তৃতির পিছনে যেন পুলিশ না লাগায়। এমনি করে বারবার মাধবী জটিল জীবনে পদার্পণ করে। মহেশের কাছে ধরা পরে সদানন্দ সম্পর্কে তার দুর্বল দিক, বিভূতির কাছে সে অবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। বিভূতি চিন্তা করে মাধবী তো কচি খুকি নয়।

মাধবীর সংসারে সন্দেহের-অবিশ্বাসের বীজ বপন হয়। এর কয়েক দিন পর মহেশ চৌধুরি তাকে নিয়ে আবার আশ্রমে গেলো। মাধবীকে ডাকতে পাঠালো সদানন্দকে। মহেশ আর রত্নাবলী দাঁড়িয়ে রইল, প্রায় একঘণ্টা পর মাধবী খবর আনল সদানন্দ বলে পাঠিয়েছে সরকার থাকলে মহেশ যেন সন্ধ্যার পর দেখা করে, মহেশ চৌধুরি মাধবীকে নিয়ে বাড়ি ফিরে এলো, বিভূতি মারা যাওয়ার পর মাধবীর শোকটা তত জোরালো হলো না, তবে তাকে খুব রুক্ষ দেখায়, যেন ভিতর থেকে রস শুকিয়ে গেছে।

বিভূতির মৃত্যুর পিছনে যে সদানন্দ দায়ী সে কথা বলে মহেশ চৌধুরিকে মাধবী খুব খোঁচানো শুরু করে। মহেন তখন মাধবীকেও দায়ী করে। মাধবী স্তম্ভিত হয়ে যায়। তারপর কোর্টে ছেলেকে দোষী বলে মহেশ চৌধুরি। মাধবী তখন কান্নায় ভেঙে পড়ে, কিন্তু মহেশ চৌধুরী মাধবীকে সদানন্দের সঙ্গেই পাঠিয়ে দেয়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সংসারের অন্যতম সত্য উচ্চারণ করেন:

“মাঝরাত্রে আশ্রমের পিছনের ঘাটে বাঁধা নৌকায় উঠিয়া সদানন্দ আর মাধবীলতা চালিয়া গেল।” (তখ, পৃ. ৪০৩ )

মাধবীলতার জীবন এভাবে অঙ্কিত হয়েছে। নারায়ণের হাত ধরে ঘর ছেড়ে সে আশ্রমে আশ্রয় নিয়েছে, কিন্তু নারায়ণের সঙ্গে জীবনযাপন করেনি। সদানন্দের হাতে সে ঝুমারীত্ব হারিয়েছে, বিভূতিকে বিয়ে করে সংসার পেতেছে আবার সদানন্দের কৌশলে বিভূতি মারা গেলে বিধবা মাধবী স্বামীর নিহত হওয়ার জন্য বিচার চেয়েছে, সদানন্দের বিরুদ্ধাচরণ করেছে কিন্তু শেষ পর্যন্ত সদানন্দের সঙ্গেই সে আশ্রম ত্যাগ করে চলে গেছে।

একটি মনে কত বিচিত্র চেতনা ভর করতে পারে মাধবীর মাধ্যমে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় দেখিয়াছেন। মাধবী নিজে বারবার অস্তিত্ববান হওয়ার চেষ্টা করেছে। মাঝে মাঝে সে বুদ্ধিদীপ্ত সিদ্ধান্তও নিয়েছে, কিন্তু সব সময় নিজে নিজের মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে নি। মাধবী বিভূতিকে অধিকার করেছিল প্রথম থেকেই।

বিয়ের আগে আশ্রমে বেড়াতে গিয়ে সদানন্দকে প্রথম না করা মহেশ যখন সদানন্দের পা ধরে ক্ষমা চায়, তখন কোনো উপায় না দেখে মাধবী বিভূতিকে বলেছিল

“প্রণাম করে নিন। তারপর এঁকে নিয়ে বাড়ি যাই চলুন।” (তখ, পৃ-৩৩৩ ) বিভুতি তখন প্রণাম করেছিল, আবার বিয়ের পর বিভূতির ভুলের কারণে যখন মহেশ অন্য গ্রামের লোকের হাতে মার খেয়ে আসে তখন বিস্তৃতি মাধবীর পরামর্শ চায়, মাধবীকে বলে: “ওদের মেরে ফেলা উচিত, খুন করে ফেলা উচিত।” (৩খ, পৃ.-৩৯২)

বিস্তৃতি ওদের মেরে ফেলতে গিয়ে সদানন্দের কৌশলে নিজেই মারা গেলো। মাধবীর চারপাশের সকলকে সে অধিকার করেছে। সদানন্দ বিপিন বিভূতি প্রয়েডীয় মনস্তত্ত্বমূলক আকর্ষণে জর্জরিত হয়েছে। অন্যদিকে মহেন বাস্তব বুদ্ধিসম্পন্ন একজন মানুষ, সে ব্যভিচার এড়িয়ে সুস্থ জীবনযাপনে আগ্রহী। কিন্তু অসুখের সময় সে কেন মাধবীকে দেখতে চায় এটা বোধগম্য হয় না।

আবার বিপিন সদানন্দের সঙ্গে মাধবীকে জড়িয়ে কুৎসা রটাচ্ছে দেখে সে নিজের ছেলের সঙ্গে মাধবীকে বিয়ে দেয়। পরিচয়হীন কুড়ানো মেয়ে মাধবীর সঙ্গে নিজের একমাত্র পুত্রের বিয়ে দেওয়ার মধ্যেও মহেশ চৌধুরির কোনো দার্শনিক যুক্তি নেই। মাধবী সম্পর্কে মানিক বন্দ্যেপাধ্যায় একটি অসংগতি রেখেছেন, তার উপন্যাসে- উপন্যাসের শেষে তিনি বলেছেন ‘মাধবীলতা প্রথম দিন রাত্রে আশ্রমে আসিবার সময় নৌকা হইতে এই ‘ঘাটেই নামিয়াছিল।’ (৪০৩) কিন্তু মাধবীর আসার সময় উপন্যাসের প্রথম দিকে আছে

“আট বেয়ারার পালকি চাপিয়া মহীগড়ের রাজা আজ আসে নাই। আসিয়াছে রাজপুত্র। মাধবীলতাকেও সঙ্গে আনিয়াছে সেই, আনিয়াছে পালকির মধ্যে এককোণে লুকাইয়া। একেবারে অন্দরে ঢুকিয়া পালকি থামিয়াছে, রাজা সাহেব স্বয়ং রানি সাহেবকে সঙ্গে করিয়া আশ্রমে আসিলে যেখানে থামে।” ( ৩খ, পৃ.-২৮২)

শেষ পর্যন্ত এ কথা বলা যায়- ‘অহিংসা’ উপন্যাস নিয়ন্ত্রণ করেছে।

‘অহিংসা’ উপন্যাসে অপ্রধান নারী চরিত্রগুলোর মধ্যে বিস্তৃতির মা, রত্নাবলী, উমা এবং শশধরের বউ। বিভূতির মা একটি সক্রিয় চরিত্র। মহেশ চৌধুরি সদানন্দের দর্শনের জন্য রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে বসে থাকলে বিভূতির মা তাকে ফিরিয়ে আনতে যায়। সে বৃষ্টির সময় দাওয়ায় উঠেও বসে না, স্বামীর সঙ্গে ভিজতে থাকে।

তখন মহেশ চৌধুরি তাকে নিয়ে বাড়ি ফিরে যেতে চাইলে সে যায় না। সে মহেশকে নিয়ে ভয় পায়। এতো কাণ্ডের পর মহেশ বাড়ি ফিরে যেতে চাইলে সে যায় না। সে মহেশকে নিয়ে ভয় পায়। এতো কাণ্ডের পর মহেশ বাড়ি ফিরে গেলে সে হয়তো আর তার সঙ্গে সংসারই করতে চাইবে না। কিন্তু তার সাধু সদানন্দের প্রতি অত ভক্তি নেই। মহেশ যখন প্রণাম করতে চললো তখন সে বলে:

“আমি এখান থেকেই মনে মনে প্রণাম জানাচ্ছি, তুমি যাও প্রণাম করে এসো।”(তখ, 1. -৩০৮)

এরপর বিভূতি বাড়ি ফেরার পর সকলে যখন আশ্রমে যায়, তখনও সে যায় না। বাড়িতে সদানন্দ এলেও তার ভিতরে কোনো পরিবর্তন ঘটে না। স্বামীর সিদ্ধান্তগুলো কেবল মেনে নেয়। তবে ছেলের ব্যাপারে সে উদাসীন নয়। মাধবীর সঙ্গে বিস্তৃতির বিয়ের কথায় সে আপত্তি তোলে, আবার মহেশের বিড়াল মারার পর মহেশ যখন খাবে না বলে একগুঁয়েমি শুরু করে তখন প্রথম সে গর্জে ওঠে। অসহ্য হয়ে দুধের বাটি ঘর থেকে বাইরে ছুড়ে ফেলে আগাগোড়া একটা বিছানার চাদর মুড়ি দিয়ে দেওয়ালের দিকে মুখ করে শুয়ে থাকে।

বিভূতির মায়ের ভিতর সন্তান বাৎসল্য প্রবল। মাধবী তাদের বাড়িতে এলে সে মাধবীকে মেয়ের মতো বুকে তুলে নেয়, আদর যত্ন করে। বিভূতি বাড়ি ফিরে এলে বিস্তৃতির চেহারা দেখে সে কেঁদে বুক ভাসায়। এটা সেটা রান্না করে ছেলের জন্য, ছেলের খাওয়ার ব্যাকুলতা দেখে তার চোখে জল আসে। ছেলের মৃত্যুর পর মহেশ আদালতে বিস্তৃতির দোষ প্রমাণ করে এলে সে ক্ষোভে ফেটে পরে:

“আদালতে দশজনের কাছে তুমি আমার ছেলের নিন্দে করে এলে! এবার আমি গলায় দড়ি দেব। আমি অনেক সয়েছি, আর সইব না।” ( ৩খ, পৃ.-৪০২)

শশধরের বউ একটি নীরব নারী চরিত্র। সে সকলের থেকে দূরে থাকে। কিন্তু সকলের প্রয়োজনের সময় গিয়ে হাজির হয়। স্বামীর সঙ্গে তার সম্পর্ক কেমন তা বোঝা যায় না। কেবল সে যে প্রয়োজনের সময় প্রয়োজনীয় কাজটি করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ তা দেখা যায়। সদানন্দর নাকে ঘুষি দিয়ে তাকে আহত করলে সে সেবা শুরু করে দেয়, আবার মহেশ হাতুড়ি দিয়ে নাকে আঘাত করে অজ্ঞান হয়ে পড়লে তাকেও সেবা করে। তাকে মাধবীর সঙ্গে তিনবার কথা বলতে দেখা যায়। বিভূতির সঙ্গে যখন মাধবীর বিয়ের কথা হয় তখন সে ফোকলা দাঁতে বলে:

“ঠাকুরপোর সঙ্গে তোমার বিয়ে হবে দিদি?” ( ৩খ, পৃ. ৩৪৮)

মহেশকে শশধরের বউ খেতে দিলে মাধবী যখন রেগে যায় তখন মাধবীকে সে স্মরণ করিয়ে দেয় তার আজ কিন্তু ছুঁতে নেই। আর একবার তাকে সঙ্গে নিয়ে মাধবী যখন আশ্রমে যেতে চায় তখন সে বলে সাধু বাবাকে যে মাধবী এতো ভক্তি করে তা সে জানতো না। যখন মাধবী জানায় সদানন্দর মুণ্ডুপাত করতে যাচ্ছে, তখন সে ভয় পেয়ে বলে:

“বাড়িতে এঁরা জানতে পারলে কিন্তু বড্ড রাগ করবেন।” (৩খ, পৃ.-৩৭৪)

যদিও এ চরিত্রটির পরিসর খুব কম তবু তার প্রকৃতি বুঝতে পাঠকের অসুবিধা হয় না।

রত্নাবলী আশ্রমের একজন আশ্রিতা। সে বিভিন্ন বিষয়ে সন্দেহপ্রবণ এবং সাহসী। বিপিন মাধবীকে নিয়ে একা মহেশের বাড়ি যেতে চাইলে সে বিপিনকে বাধা দেয়। সেও তাদের সঙ্গে যেতে চায়। তারপর বিপিন যখন তাকে একবারে আশ্রম থেকে চলে যাওয়ার কথা বলে তখন সে ভীত হয়ে ওঠে এবং নিজের জায়গা থেকে বিচ্যুত হয়।

আবার মাধবী কার সঙ্গে কী করেছে তা শুনতেও আগ্রহী হয়। সে ছেলেদের বিশ্বাস করে না। বিপিন তার গা ঘেষে বসলে সে ভীত হয়ে ওঠে। সে এও জানে তার পক্ষে কিছু করা সম্ভব হবে না। সকলে সত্য বুঝলেও কেউ তার পক্ষ নিয়ে কথা বলার সাহস পাবে না, সকলে বিপিনকে ভালোবাসে।

বিপিন যখন সদানন্দ আর মাধবীকে নিয়ে কুৎসা রটাচ্ছে তখনও সে সাহসী হয়ে একা মহেশের বাড়ি আসল খবরের জন্য ছুটে যায়। বিভূতির সঙ্গে মাধবীর বিয়ের কথা শুনে সে তাজ্জব হয়ে যায়। মাধবীকে অনুযোগ দিয়ে বলে:

“তুই কী মাধু? আমার জানাসনি কিছু?” ( ৩থ, পৃ. ৩৪৭ )

 

নারী চরিত্র পর্ব ২

 

সদানন্দর ঘরে মাধবী কী করছে তা দেখতে বিপিনকে উপেক্ষা করে সে দেখতে যায়। এ সব দিক দিয়ে রত্নাবলী একটি সাহসী চরিত্র। রত্নাবলী নিজে শশধরের প্রতি অনুরক্ত। শশধর তাকে আশ্রমে রাখতে যাবে জেনেই সে রাত করে মহেশের বাড়ি আসে।

উমা চরিত্রটির পরিসর আরো কম। সন্তানদের উপেক্ষায় টিকতে না পেরে সে আশ্রমে এসে আশ্রয় নিয়েছে। রত্নাবলী তার ভাইঝি। নারীর প্রতি তার বিশেষ টান আছে। মাধবীর সম্পর্কে তার মনোভাবে তা বোঝা যায়। সদানন্দ মাধবীকে নিয়ে উষা আর রত্নাবলীর কাছে রাখতে গেলে সে সন্দিহান হয়ে ওঠে। সে সাধু-সন্ন্যাসীর প্রতি অন্ধ ভক্ত। তাই যখন বিপিন বলে সদানন্দ সন্ন্যাস ছেড়ে দিয়েছে, তখন সে খেপে যায়।

‘চতুষ্কোণ’ উপন্যাসটি একটি নিরীক্ষাধর্মী উপন্যাস। বিভিন্ন নারীর মধ্য দিয়ে সমাজের বিভিন্ন স্ত রের নারীর দৃষ্টিভঙ্গি দেখানো হয়েছে। এই নারীরা প্রত্যেকেই রাজকুমারকে ঘিরে রয়েছে।

এদের মধ্যে সবচেয়ে ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, বিবেকবান, বন্ধুত্বপূর্ণ, তীক্ষ্ণবুদ্ধিসম্পন্ন সরসী। উপন্যাসের শেষে সরসীর শেষ কথার মধ্য দিয়ে জীবনবোধ সম্পর্কে দার্শনিকতা স্পষ্ট হয়:

“ জীবন তো খেলার জিনিস নয় মানুষের।” (৪খ, পৃ.-৮৬) সরসী সামাজিক কাজ করতে পছন্দ করে। ঘরে তার মন বসে না, সারাদিন সভা-সমিতির ব্যাপার নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু সে ধীরস্থির প্রকৃতির। সে কখনো ব্যস্ত হয় না

“একদিনে পঞ্চাশটি জায়গায় কাজে যাইতে পারে অনায়াসে, কিন্তু চলে সে ধীরে ধীরে পা ফেলিয়া, আস্তে আস্তে উচ্চারণ করে কথা, শান্ত দৃষ্টিতে তাকায়, কখনও উত্তেজিত হয় না।” (৪খ, পৃ.-২৪)

সরসী সবচেয়ে কঠিন কাজটিও সহজে করে ফেলতে পারে। তার আয়োজিত মিটিং- এ নির্ধারিত সভাপতি কয়েক ঘন্টার নোটিশে একেবারে শহরের বাইরে গেলে সে অনায়াসে স্যার কে এলকে সভাপতি হতে রাজি করায়, অথচ অন্য কারো কথায় এতটুকু সভায়, আরেকজনের বদলি সভাপতি হতে স্যার কে এল কখনোই রাজি হতো না। সমাজে চারদিক বজায় রাখা কম কঠিন নয়।

রিণি মালতীর মধ্যে সর্বক্ষণ রেষারেষি লেগেই রয়েছে, আবার কালোর মত মেয়েও অন্য মেয়েদের ঈর্ষা করে, কিন্তু সকলের কাছে সরসীর গ্রহণযোগ্যতা আছে। মনের সবচেয়ে গোপন কথাটি তারা সরসীকে বলে।

বাস্তববুদ্ধিসম্পন্ন সরসীর রাজকুমার সম্পর্কে ভুল হয়। রাজকুমার যখন মানুষের দেহে থিওরি খুঁজে ব্যস্ত তখন সে রাজকুমারকে বখাটে ভাবতে পারে না, ভাবতে পারে না আর দশটা লোলুপ পুরুষের মতো রাজকুমার তার দেহের দিকে তাকাচ্ছে, কারণ রাজকুমার সম্পর্কে তার বিশেষ দুর্বলতা আছে। সে মনে করে এতো দিনে রাজকুমার তার সুন্দর মনের সন্ধান পেয়েছে।

এতকাল রাজকুমার তার দেহের সৌন্দর্যে মুগ্ধ ছিল, তাই তার দিকে সংকোচে তাকাতে পারতো না। এখন সে বুঝতে পেরেছে তার ভেতরের সৌন্দর্যকে তাই তাকে রাজকুমার ভালোবেসে ফেলেছে। ভালোবাসে বলেই তার দিকে তাকাতে আর কোনো সংকোচ নেই। সে আরো ভাবে “পুরুষের মন ভুলানো মেয়েলি হাবভাবের সপ্তা অভিনয় সে যে কখনও করে না, লজ্জাবতী লতা সাজিয়া থাকে না, নাঁকি সুরে কথা বলে না, ভাবপ্রবণতা পছন্দ করে না, বাজে খেয়ালে হালকা খেয়ালে সময় নষ্ট করে না, এ সব বোধহয় রাজকুমারের খেয়াল হইয়াছে।” (৪খ, পৃ. 81 )

এই বোধের মধ্য দিয়ে বোঝা যায় সরসী প্রেমময়ী। প্রেম তার সকল চেতনায় সকল কিছুকে সুন্দর করে ভাবায়। আবার রুক্মিণীর বাড়িতে রাজকুমারের যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু সে যায়ও নি, চিঠি লিখে ক্ষমাও চায় নি এ অভিযোগে রাজকুমারকে বাঁচানোর জন্য সে রুক্মিণীকে মিথ্যে করে চিঠির কথা বলে, তারপর পোস্ট অফিসের ঘাড়ে সকল দোষ চাপিয়ে রাজকুমারকে উদ্ধারেরর চেষ্টা করে।

রাজকুমারের পাশে সে কখনো বন্ধুর মতো এসেছে, কখনো প্রেমিকের মতো। রাজকুমার রিণির দেহ দেখতে চেয়ে অপমানিত হওয়ার পর মুসড়ে পরে, তার উন্মাদনা দেখে সরসী রাজকুমারকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে।

একদিন রাতে বিয়েবাড়ি থেকে রাজকুমারকে ডেকে সকলকে রেখে একা সে জনহীন বাড়িতে আসে। তারপর তার নিরাবরণ শরীর দেখায়। এতে রাজকুমারের সুস্থ জীবনে উত্তরণ ঘটে। কিন্তু রিণির অসুস্থতা রাজকুমারকে আবার বিচলিত করে দেয়। সে মনে করে রিপি তার জন্যই পাগল হয়েছে। রাজকুমার নিজেকে খাপছাড়া উদ্ভট ভাবে। রাজকুমারের মানসিক বিপর্যস্ততা কাটানোর জন্য সে তাকে বলে:

“খাপছাড়া হওয়াটা সব সময় নিন্দনীয় হয় না রাজু। সাধারণ মানুষের সঙ্গে চিন্তাশীল প্রতিভাবান মানুষের খাপ না খাওয়াটাই বেশি স্বাভাবিক। সুস্থ অবস্থায় রিপি হয়তো তোমার নাগাল পেত না, তোমার ব্যক্তিত্ব ওকে পীড়ন করত, তাই ও তোমায় সহ্য করতে পারত না। পাগল হয়ে এখন আর ও সব অনুভূতি নেই, তোমায় তাই ওর ভালো লাগে, বিনা বাধায় তোমায় শ্রদ্ধা করতে পারে।” (৪খ, পৃ.-৮৩)

মালতীর সঙ্গে রাজকুমারের সম্পর্ক জটিল পর্যায়ে চলে গেছে। মালতীর জীবনকে সে কষ্টকর। মানসিক বিপর্যয়ে পৌঁছে দিয়েছে। এ ব্যাপারে সে আবার সরসীর দ্বারস্থ হয়। রাজকুমারের মানসিক যন্ত্রণা লাঘবের জন্য সে মালতীর সঙ্গে কথা বলার ভার নিয়ে রাজকুমারকে নিশ্চিন্ত করে। আবার রিপিকে বিয়ে করার ব্যাপারে সে স্যার কে এল-এর মতো সেও রাজকুমারকে বিয়ে করা থেকে বিরত থাকতে বলে।

রিপির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতাতে কোনো দোষ নেই, সে রিণিকে সারিয়ে তোলার জন্যই এ ব্যবস্থা করছে। এতে সংকোচেরও কিছু নেই। কিন্তু জীবনের মূল্য এতো কম নয় যে তাকে অনিশ্চয়তার দিকে নিয়ে যাবে। সরসীর সিদ্ধান্ত বুদ্ধিদীপ্ত। সে বুঝতে পারে হঠাৎ নেওয়া আবেগের কোনো ভুল সিদ্ধান্ত রাজকুমারের জীবন নষ্ট করে দিতে পারে।

তাই রাজকুমারকে বিয়ে থেকে নিবৃত করে। সরসীর জীবন একমুখী। তার কোনো উত্থান পতন নেই। জীবনের বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাতও নেই। তার জীবন চলার পথে কোনো অভ্যান্তরীণ বা বাহ্যিক বাধা নেই, নিজে সে স্বাধীন। তবে স্বাধীনভাবে সে ঠিক কী কী কাজ করে সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা নেই। শুধুমাত্র রাজকুমারকে ঘিরে তার কিছু জীবনমুখী সিদ্ধান্ত আছে, যা রাজকুমারকে সুস্থ জীবনে উত্তোরণে সহায়তা করে।

“সরসী রাজকুমারের নিউরোসিসের অবস্থাটা বুঝতে পারে। সরসী তার রুদ্ধ অবচেতনকে মুক্ত করে দিতে সহায়তা করে। ২৪

মালতী চরিত্রটি বিশেষণের দাবি রাখে। সে কল্পনা আর বাস্তব জীবনের মধ্যে বিধ্বস্ত হয়েছে, আবার নিজের মনের দ্বিমুখী টানে হয়েছে ধরাশায়ী। ‘চতুষ্কোণ’ উপন্যাসে নারী চরিত্রের মধ্যে তার জীবনই মনের সুক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অনুভূতির কারণে বিপর্যস্ত হয়েছে। জীবনের সিদ্ধান্তহীনতা এবং হঠাৎ নেওয়া কোনো সিদ্ধান্তের কারণে সর্বনাশের আশংকা মালতীর জীবনের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অবস্থার সৃষ্টি করেছে। মালতী বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছে:

“মধ্যবিত্ত সমাজে প্রেমকে কেন্দ্র করে আত্মঘাতী এক বিকার অবস্থা বৰ্তমান। ২

তাই মালতী কখনো বা স্ববিরোধী আচরণ করেছে, আত্মদ্বন্দ্বে ভুগেছে। মানুষের জীবন অনেক সময়ই নিজের নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। মানব মনের জটিল ভাবনাগুলো বিভিন্ন অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে, যা সে নিজেও চায় না। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এ বিষয়ের দিকে সচেতন ছিলেন এবং বাস্তব জীবন তার মূলসমেত আনার জন্যই তার লেখনী। সেই দিক দিয়ে মালতী চরিত্রটি সার্থক।

রাজকুমার মালতীর প্রাইভেট টিউটর, কিন্তু তাদের সম্পর্কটা ঠিক ছাত্র-শিক্ষকের মতো নয়, অনেকটা বন্ধুর মতো। রাজকুমার সম্পর্কে তার তীব্র আকর্ষণ আছে। উপন্যাসে তার আগমন ঘটে একটি অসংগত আচরণের মধ্য দিয়ে, যে আচরণ স্বাভাবিক মানুষ করবে না। শুধু মনকে যে প্রাধান্য দেয়, মন যা চায় তা করতে যে পারে সে এ রকম ঘটনা ঘটাতে পারে। এ উপন্যাসে।

“গোটা মানুষ ও তাহার মানসসমগ্রতাকে বাদ দিয়া তাহার সাধারণতঃ অবদমিত অংশবিশেষকে তাহার যৌন আকাঙ্ক্ষার অসংখ্য অণু-পরমাণুকে অগণিত বুদবুদরাশির ন্যার দ্রুত উত্থান-বিলয়শীল, যৌন কল্পনার ছায়াছবিগুলিকে একটা অবিচ্ছিন্ন ঐক্য, একটা অখণ্ড জীবনের প্রতিরূপ দেওয়া হইয়াছে।

কলেজ থেকে ফেরার সময় মালতী দেখতে পায় রাজকুমার রিপিদের বাড়ি ঢুকছে। কৌতূহলবশত সেও ঢোকে। সে বলে
“কলেজ থেকে ফিরছি, দেখি আপনি এ বাড়িতে ঢুকে পড়লেন। ব্যাপারটা ভালো করে না জেনে আর কী তখন বাড়ি ফিরতে পারি, আপনিই বলুন?” (৪খ, পৃ.-২২) রাজকুমারের ওপর নিজের অধিকার রিপির সামনে প্রতিষ্ঠা করার জন্য সে রিশির সামনে রাজকুমারকে নিজের সঙ্গে বাইরের দিকে যেতে বলে।

রিণি আসার আগেই সে রাজকুমারকে জানিয়েছে রিপি তাকে দেখতে পারে না, তাই সে রিপিদের বাড়ি আসে না। রিপির সঙ্গে তার রেষারেষি রাজকুমারকে কেন্দ্র করেই। মালতী কোমল, ভাবপ্রবণ, ভালোবাসার বাস্তবতা সম্পর্কে অনভিজ্ঞ। সে রাজকুমারকে ভালোবাসে। রাজকুমারও একমাত্র মালতীর সঙ্গেই ভালোবাসার মতো সম্পর্কে জড়িয়ে যায়। মালতী রাজকুমারের ব্যাপারে খুব সচেতন। সে সকল সময় নিজেকে আকর্ষণীয় করে উপস্থাপন করার জন্য প্রস্তুত হয়ে থাকে।

এক অবিরাম বর্ষণের দিন রাজকুমার তাকে পড়াতে আসবে কি না ঠিক নেই, কিন্তু তার মনে হয় যদি আসে, তাই দুপুরের গুমোটের খেদে আত্মগানিময় শরীরটিকে সযত্ন প্রসাধনে চাঙা করে তোলে। এই দিনই রাজকুমার আর মালতীর এক অদৃশ্য বন্ধন রচিত হয়। রাজকুমার মালতীর চেয়ারের পেছনে দাঁড়িয়ে তার খাতা দেখতে যায়, মালতীর মাথা তখন রাজকুমারের বুকে লাগে, মালতী এরপর আর নিজেকে সামলাতে পারে না সে রাজকুমারের হাতের আংটিতে মুখ রেখে পিপাসার্তের মতো পান করতে থাকে।

এ সময় আসে মালতীর প্রেমে পাগল প্রায় শ্যামল। শ্যামল বৃষ্টিতে ভিজে গেছে, সে মালতীর কাছে শুকনো কাপড় চায়, কিন্তু মালতী শ্যামলকে বাড়িতে রাখতে রাজি নয়, অন্তত এই সময়। সে শ্যামলের সঙ্গে নিষ্ঠুরের মতো আচরণ করে। সে অবজ্ঞা করে নিষ্ঠুরভাবে বলে “শুকনো কাপড় দিয়ে কী করবে, রাস্তায় নামলেই তো কাপড় আবার ভিজে যাবে।

একেবারে বাড়ি গিয়ে কাপড় ছাড়ো।” (৪খ, পৃ.-৩৩)

শ্যামলের প্রতি মালতীর ভালোবাসা নেই, তবে মমতা আছে, প্রশ্রয় আছে, কিন্তু রাজকুমারের প্রতি তার ভালোবাসার টান। ভালোবাসার প্রথম অভিসারে সে তৃতীয় কাউকে রাখতে রাজি নয়।

সে রাজকুমারকে বলে শ্যামল ছেলেমানুষ, শ্যামলের এ সব নীরব পূজার ন্যাকামি তার ভালো লাগে না। এই একদিনে মালতী বড় হয়ে যায়, আর মালতীর সাথে যারা পড়ে-শ্যামল ছেলেমানুষ। তার আর রাজকুমার সম্পর্কে কোনো সংশয় নেই, এই ঘটনার মধ্য দিয়ে যেন রাজকুমারকে তার পাওয়া হয়ে গেছে। সে তাই রাজকুমারকে সরাসরি বলে:

আজ কাপড় দিলে বসে থেকে আমাদের জ্বালাতন করত। “(৪খ, পৃ.-৩৩)

মালতী বুদ্ধিসম্পন্ন মেয়ে। রাজকুমারকে ভালোবাসলেও সে অন্ধ প্রেমিক নয়। ভালো-মন্দ জ্ঞান তার আছে। সে মানুষের দৃষ্টি দেখে ভালো মন্দ বুঝতে পারে। যেখানে রাজকুমারের লোলুপ- সৃষ্টি সম্পর্কে রিপি ভুল করেছে, এমনকি বাস্তববুদ্ধিসম্পন্ন সরসী ভুল করেছে, সেখানে মালতীর ভুল হয় না। মালতী বুঝতে পারে এ দৃষ্টিতে ভালোবাসা নেই। ভালোবাসার দৃষ্টিতে তাকে এভাবে দেখলে সে বরং খুশি হতো:

“কিন্তু চোখে তার ভালোবাসা নাই। মনে মনে কী যেন সে হিসাব করিতেছে যার যাচাই করার দৃষ্টিতে তার সর্বাঙ্গে চোখ বুলাইতেছে!” (৪খ, পৃ. ৪১)

রাজকুমার আর মালতীকে পড়ায় না। কারণ সে বুঝতে পারে তার কাছে পড়লে মালতীর পাশে আর ভরসা নেই। মালতী ভাবে রাজকুমার তাকে হয়তো আবেগ আর উত্তেজনা থেকে দূরে রাখতে চাইছে। রাজকুমারের প্রকৃতি সে বুঝতে পারে না। তার নিজের যুক্তি দিয়ে সে বিচার করে। সকলে মিলে বিয়েতে যাচ্ছে মালতীরা।

গাড়িতে সকলের জায়গা হবে না জেনে মালতী রাজকুমারকে অধিকার করে সরসীকে টেক্কা দিয়ে রাজকুমারকে নিয়ে ট্রামে যাবে বলে বেরিয়ে যায়, যাওয়ার আগে সে শ্যামলকেও অপমান করে যায়। কিছুক্ষণ আগে শ্যামল বলেছে রাজকুমারের মনুষ্যত্ব নেই, নে রাঙ্কেল। সেই রাগে এতোক্ষণে মালতীর চোখে জল আসে।

রাজকুমারের অপমান যে তারও অপমান সে তা রাজকুমারকে বলে। মধ্যবিত্তবাঙালি একটি নারী এ ধরনের অভিপ্রায় ব্যক্ত করবে এটাই স্বাভাবিক। মালতী এখন শুধু বিয়ের অপেক্ষায়। ‘জীবনের জটিলতায় প্রমীলাও নগেন সম্পর্কে এরূপ ভুল করেছিল। তবে এ ভুল মালতী বা প্রমীলার নয়। এ ভুল রাজকুমার আর নগেনের প্রতারণার।

তারা শুধু বুঝতে পারে নি যে তারা প্রতারকের ফাঁদে পা দিয়েছে। তবে প্রমীলা নগেনের বিরুদ্ধে কোনো কিছু করে নি শুধু স্টেশনে ছুটে গিয়েছে। তারপর আর তারা মুখোমুখি হয় নি। কিন্তু মালতী সাহসী। সে রাজকুমারকে দিয়ে হোটেলের রুম ভাড়া নেওয়ায়। সে যে কোনো উপায়ে রাজকুমারকে বাঁধতে চায়। আসবার আগে শ্যামলের সঙ্গে ঝগড়া করে। তাকে অপমান করে, তাকে বাড়িতে আসতে বারণ করে। কিন্তু মালতী শেষ পর্যন্ত শ্যামলকেও ছাড়তে পারে না, সে শ্যামলকে আবার আসতে বলে

“শোনা, তোমাকে কয়েকটা কথা বুঝিয়ে বলা দরকার। আজ আমার সময় নেই, ক্ষমতাও নেই। কাল সন্ধ্যার পর একবার এসো।” (৪খ, পৃ.-৬৮)

 

নারী চরিত্র পর্ব ২

 

এমনি করে মালতী শ্যামল এবং রাজকুমার দুজনের দিকেই ঝুঁকে থাকে, সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। আবার হোটেলের রুমে সে রাজকুমারকে চূড়ান্তভাবে বাঁধার যে কৌশল কল্পনা করেছে। তাও ঠিক রাখতে পারে না। বাঙালী নারীর এ এক চিরন্তন দিক:

“রাজকুমারকে না হারাইবার ব্যাকুল, একনিষ্ঠ সাধনায় সে শ্যামলের প্রতি নিষ্ঠুরতম ব্যবহার করিয়াছে। কিন্তু আত্মসমর্পণের মুহূর্তে সে কোন দুর্বোধ্য প্রেরণার বশে পিছাইয়া আসিয়াছে । ২৭

মধ্যবিত্তের সংস্কার এসে তাকে ক্ষতবিক্ষত করে:

“নিজেদের অতৃপ্ত কামনার সঙ্গে এদের মজ্জাগত সংস্কারের একটা দ্বন্দ্ব সব সময় বিদ্যমান। মালতীর যে রাজকুমারের সঙ্গে যৌন মিলনের পূর্বেই গা বমি বমি করে, বস্তুত তা আর কিছুই নয় মালতীর ভেতরকার সংস্কারজনিত বন্ধের প্রতিক্রিয়ার ফল ছাড়া। ২৮

রাজকুমার তাকে রেখে রিণির বাবার সঙ্গে দেখা করতে গেলেই সে মনে মনে ভেঙে পড়ে। যৌন মিলনের দ্বারা রাজকুমারকে বাধতে তার মন সায় দেয় না। সে আবার রাজকুমারকে বলে দূরে কোথাও অন্তত দুমাস তারা দুজন একসঙ্গে এক বাড়িতে থাকবে। আত্মদানের উদ্দেশ্যে এসেও সে নিজেকে দান করতে পারে না।

চিরন্তণ সংস্কারের ভয় তাকে জাপটে ধরে। সে নিজেকে বাঁচানোর জন্য দুমাসের কথা বলে, কিন্তু এই ব্যবস্থাও সে গ্রহণ করতে পারবে না। মধ্যবিত্ত সংস্কার তার পথ রুদ্ধ করবে। তাই রাজকুমারও মালতীর ব্যাপারে নিশ্চিত হয়। এরপর সরসী মালতীতে স্বাভাবিক করার ভার নেয়। তখন রিণি অসুস্থ হয়েছে। মালতী রিণির প্রতি সহানুভূতিশীল হয়।

রিশি চরিত্রটি আধুনিক এবং ভাবপ্রবণ চরিত্র। সে উচ্চবিত্ত শ্রেণির নারী। তার চলাফেরা অতি আধুনিক। সে গান গায়, হাফপ্যান্ট পরে টেনিস খেলে। রাজকুমারকে ভালোবাসে। ‘চতুষ্কোণ’ উপন্যাসের প্রতিটি নারী-ই রাজকুমারকে নিয়ে আপন আপন ভুবন তৈরি করে। রিপিও এর ব্যতিক্রম নয়। রাজকুমারকে নিয়ে তার ন্যাকামিও আছে। উপন্যাসে তার প্রথম আবির্ভাব – সে গান গাইছে।

রাজকুমার এসে দাঁড়ালে সে বুঝেও না বোঝার ভান করে গেয়ে চলে এবং গান শেষ হওয়ার পর অতিরিক্ত আবেগে চুম্বন প্রত্যাশায় নিজের মুখ রাজকুমারের দিকে বাড়িয়ে দেয়। রাজকুমারের প্রত্যাখ্যানে সে পাথরের মূর্তি হয়ে যায়। রাজকুমার গল্প করতে চাইলে রিলি বসে, কিন্তু গল্প জমে না। অবশেষে রাজকুমার বিদায় নেয়। রাজকুমার সম্পর্কে রিপি চোখেমুখে অবজ্ঞা ফুটে ওঠে।

রাজকুমার ঘরের বাইরে আসার সঙ্গে সঙ্গে সে আবার গানের প্র্যাকটিস আরম্ভ করে। অর্থাৎ রিণি লজ্জা পায় নি, অপমানিত হয় নি, বরং রাজকুমারকে অভদ্র ভেবেছে। তবে কিছুক্ষণ পর নিচে হলঘরে এসে মালতীকে রাজকুমারের সঙ্গে কথা বলতে দেখে নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে। মালতী তখন রাজকুমারকে বাইরে আহ্বান করছে। রিণি রাজকুমারকে ভেতরে আসতে বলে।

মালতীর কাছে সে কিছুতেই হার মানবে না। সে দিন রাজকুমার দুজনকে একসঙ্গে বাড়িতে রেখে চলে এসেছিল। রিপির ভেতরে রাজকুমার সংক্রান্ত বোধ আরো বাড়তে থাকে। না পাওয়াকে পেতে তার মন সদা চঞ্চল হয়ে থাকে। তাই রাজকুমার যখন তার শরীর খুঁটে খুঁটে দেখে সে তখন ভুল বোঝে। সে মনে করে:

“রাজকুমারের মন কবিত্বময়, বাস্তব জগতের অনেক উঁচুতে নিজের মানস-কল্পনার জগতে সে বাস করে; বড়ো ভাবপ্রবণ প্রকৃতি রাজকুমারের। তার মনের ঐশ্বর্য রাজকুমারকে মুগ্ধ করিয়াছে, তার হাসি কথা গান ভাবালোকের অপার্থিব আনন্দ দিয়াছে রাজকুমারকে, তার সান্নিধ্য অনুভব করিয়াই রাজকুমারের মন এমনভাবে অভিভূত হইয়া গিয়াছে যে একটি চুম্বনের প্রয়োজনও সে বোধ করে নাই। রাজকুমার তাই চমকাইয়া গিয়াছিল, কী করিবে ভাবিয়া পায় নাই।” (৪খ, পৃ. 81 )

তবে রিপির এই বোধেরও পরিবর্তন অচিরেই ঘটে। সে টেনিস খেলে বাড়ি এসে স্নান করবে। কিন্তু রাজকুমার তার আগেই তাকে একটি কথা বলতে চায়। রিণি মনে করে সে তাকে প্রেমের প্রস্তাব দেবে। কিন্তু রাজকুমার বলে অন্য কথা। সে বাথরুমে দাঁড়িয়ে রিপির স্নান করা দেখবে।

সে নারী দেহের নগ্নরূপ দেখে থিওরি আবিষ্কার করবে। এতে রিণি প্রচণ্ড রেগে যায়। রাজকুমার সম্পর্কে তার ধারণা পুরোপুরি বদলে যায়। এতে ভালোবাসা থাকলে হয়তো সে এতো কষ্ট পেতো না। সে বলে:

“একটা উপদেশ নিয়ে যাও। আর একটি মেয়েকে যখন কথাটা বলবে, মালতীকেই বলবে বোধহয়, কিছু বুঝিয়ে বলতে যেয়ো না। শুধু বোলো যে তোমার এ সাধটা না মেটালে তুমি পাগল হয়ে যাবে, সায়ানাইড খাবে। হয়তো রাজি হতে পারে। ” (৪খ, 1. -৫১)

নারীত্বের সাধারণ বোধ সকল নারীর ক্ষেত্রেই সমান। রিপির এ কথা রাজকুমারকে বুঝিয়ে দেয়। এর পর রিপি পাগল হয়ে যায়।

“রিণির তীব্র আকাঙ্ক্ষা, রাজকুমারের মন্থর বিধান্ত গতিতে অসহিষ্ণু হইয়া, তাহার দুর্বোধ্য, আত্মবিরোধী আচরণে পীড়িত হইয়া, অবশেষে পাগলামিতে ফাটিয়া পড়িয়াছে।’

দেহ সম্বন্ধে সচেতন রিপি বাউজের বোতাম লাগায় না কাপড় তার লুটিয়ে থাকে। রাজকুমারকে দেখলে সে শান্ত থাকে, অন্যরা তাকে ধরে রাখতে পারে না। পাগল রিণির রাজকুমারের প্রতি কোনো রাগ নেই, অভিমান নেই। রিপি অবচেতন একটি মানুষ

“রিণির অহং-এর আবরণ ভেঙে যেতে, সে এখন রাজকুমারের সামনে নিজের নারীত্ব সম্পর্কেও আর সচেতন নয়।

উপন্যাসে একটি দৃশ্যে গিরীন্দ্রনন্দিনী এবং তার মা-কে পাওয়া যায়। তবে একটি দৃশ্যে তাদের উপস্থিতি হলেও পরোক্ষভাবে রাজকুমারের জীবনের বিকৃতির কারণ তারাই। যদিও একেক সময় একেক জিনিস নিয়ে মেতে থাকতে রাজকুমার পছন্দ করে তবু নারী দেহ স্পর্শ করার আগ্রহ তাদের কারণেই প্রবল হয়েছে।

একটি দৃশ্যেই স্পষ্ট হয় গিরি রাজুমারের ওপর অধিকার আদায় করতে চায়, কিন্তু বাঙালি হাজার হাজার পরিবারের মতো শারীরিক সংস্কার তার মধ্যে বিদ্যমান। রাতে রাজকুমারের গিরিদের বাড়ির নিমন্ত্রণ আছে, কিন্তু রাজকুমারের মাথা ধরার কারণে সে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে পারবে না। এই কথা বলতে রাজকুমার গিরিদের বাড়ি আসে। গিরি তখন শেমিজ ছাড়া শুধু ডুরে শাড়ি পরে আছে। তাই সে সংকুচিত। কিন্তু রাজকুমারকে খাওয়ার ব্যাপারে খোঁচা দিয়ে বলে:

“তা খাবেন কেন গরিবের বাড়িতে?” (৪খ, পৃ.-১৪)

তাছাড়া সে আরো বলে, না খেলে শরীরের রক্ত কমে যায় তাই মাথাধরা আরো বাড়বে। এবার রাজকুমার গিরির হার্ট দেখতে গিয়ে ডুরে শাড়ির নিচে হাত রাখে, এতে গিরির মুখ কালো হয়ে যায়। সে বলে:

“ছি ছি! এসব কী।” (৪খ, পৃ. ১৫)

সে উপরে গিয়ে তার মাকে বলে। গিরির মাও রেগে অগ্নিমূর্তি ধারণ করে । রাজকুমার উপরে গেলে সে বলে:

“বেরো হারামজাদা, বেরো আমার বাড়ি থেকে।” (৪খ, পৃ.-১৫)

শরীর নিয়ে এমন বিড়ম্বনায় রাজকুমারকে আর কখনো পড়তে হয় নি। এ সময় থেকে তার ক্ষু এই অপমানের কথা মনে হতে থাকে এবং তার মাথায় বিভিন্ন উদ্ভট চিন্তা উদয় হতে থাকে । রাজকুমারের আরেকটি উদ্ভট চিন্তা শরীর দেখে মেয়েদের মানসিক দিক নির্ণয়। এই চিন্তাটি আসে কালীকে দেখে।

কালী মনোরমার দুর সম্পর্কের বোন। মনোরমা কালীকে তার কাছে এনে রেখেছে রাজকুমারের সঙ্গে বিয়ে দিতে। কালী সাধারণ মেয়ে, তাকে দেখে রাজকুমারের মনে হয় তার গড়নটি পর্যন্ত ঘরোয়া ছাঁচে। রাজকুমার কালীর হার্ট পরীক্ষা করে একটু প্রেমিকের ভঙ্গিতে তাকে একহাত দিয়ে বেষ্টন করে। কিন্তু কালীর আচরণ গিরির মতো নয়:

“কালী যেন নীরব আত্মনিবেদনের জন্য প্রস্তুত হয়েই আছে। ১ প্রতিটি নারীর থেকে প্রতিটি নারী আলাদা। খাওয়ার পর তাই এই দিনই কালী তাকে মশলা দিতে আসলো। তবে কালীর অভিযোগ অন্য জায়গায়। রাজকুমারের অনেক মেয়েবন্ধু তার পছন্দ নয়। সমাজে বন্ধুত্বের একটি সাধারণ বোধ আছে, কালী সেই মত পোষণ করে।

“আপনার শুধু মেয়ে বন্ধু, গণ্ডা গণ্ডা মেয়ে বন্ধু। বেটাছেলের অত মেয়ে বন্ধু থাকতে নেই।” (৪, পৃ.-৫২)

কালী রাজকুমারকে কাছে টানতে পারে না বলে মনোরমা তাকে তিরস্কার করে। তখন থেকে সে নিজেকে আকর্ষণীয় করতে চেষ্টা করে। সহজ-সরল মেয়েটার মনে জটিলতার আগমন ঘটে “মনোরমা যতটুকু সাজাইয়া দেয় তার উপর সে নিজে আরেকটু বেশি করিয়া সাজ করে। গায়ে একটু বেশি সাবান ঘষে, মুখে একটু বেশি ক্রিম মাখে, একটু বেশি দামের কাপড় পরে।” (8, পৃ. 99 )

মেয়েটার মন ভেঙে যায়। সে রাজকুমারকে অধিকার করবার জন্য বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। সরসী রাজকুমারের কাছে এলে সে খেপে যায়। রাজকুমারকে অভিযোগ করে ঘরের বউয়ের মতো, তার চোখে জল আসে। এতটুকু মেয়ের মধ্যে ভাবাবেগের উদয় হয়। নিতান্ত বালিকা থেকে সে নারীতে পরিণত হয়।

রাজকুমার এই মেয়েটার জীবনকে জটিল করে তোলে। তবে কালীর জীবন জটিল করার পেছনে মনোরমার অবদান সবচেয়ে বেশি। সেই কালীকে এনেছে। এবং বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সাজ সাজিয়েছে, রাজকুমারকে স্বপ্ন দেখতে সাহায্য করেছে। মনোরমা নিজেও একটি জটিল চরিত্র। সে স্বামীকে নিয়ে রাজকুমারের বাড়িতে ভাড়াটে হয়ে আসে এবং আসার দ্বিতীয় মাস থেকেই রাজকুমারের দিদি হয়ে তাকে ভাড়ার বদলে চারবেলা খাওয়ায় এবং কিছু কাজ করে দেয়।

এতেই সে সন্তুষ্ট থাকে না, নিজের মনের সুপ্ত কাম জাগ্রত হয়। সে সেই কাম চেতনা চরিতার্থ করার জন্য কালীকে নিয়ে আসে। বাঙালি কূলবধূর কূল রক্ষা করে নিজের বাসনা অন্যের মধ্যে দেখতে সে উদ্যোগী হয়। তবে নিজেও সে রাজকুমারের কাছে উপযাজক হয়ে ধরা দেয়, তার রাগ-অভিমানেরও আতিশয্য দেখা যায়। সে দিনের মধ্যে অন্তত আট- দশবার রাজকুমারকে ডাকে, কিন্তু প্রতিবারই মনে হয়, এই তার প্রথম ও শেষ আহ্বান।

গিরিদের বাড়ি থেকে আসার পর মনোরমা রাজকুমারকে ডাকে। তখন সে দেড় বছরের ছেলেকে ঘুম পাড়াচ্ছে। ছেলেটি তার পরিপুষ্ট স্তন ধরে আছে। এ বিষয়ে তার রাজকুমারের সঙ্গে আলোচনা চলে না। কিন্তু তার ভেতরের যৌন চেতনা তাকে রাজকুমারের দিকে পরিচালিত করে। সে অবলীলাক্রমে বললো:

“এমন দুষ্ট হয়েছে ছেলেটা। খায় না কিন্তু ঘুমানোর আগে ধরা চাই।” (৪খ, পৃ.-১৬)

অতঃপর এ বিষয়ে আলোচনা হলো এবং মনোরমা রাজকুমারকে আহ্বান জানালো খোকার হাত ছাড়িয়ে দিতে। রাজকুমারের আপত্তি মনোরমার বুদ্ধির কাছে টিকলো না। অবশেষে রাজকুমার খোকার হাতে হাত দেয়।

“খোকার কচি হাত আর মনোরমার কোমল স্তনের স্পর্শ যেন অবিস্মরণীয় সুগন্ধি। অনুভূতিতে ভরা তেজস্কর রসায়নের মতো তার মধ্যে নবজীবনের সঞ্চার করিতে লাগিল।” (৪খ, পৃ.-১৬)

স্বামী থাকতেও মনোরমার এই আচরণ তার মনোবিকারেরই লক্ষণ। মনোরমা চরিত্রে ফ্রয়েডীয় মনোবিকার প্রবলভাবে লক্ষণীয়। তার মধ্যে আত্মসম্মানবোধও প্রবল। রাজকুমার খোকাকে ছোঁড়া বললে সে খেপে যায়। রাজকুমার আদর করে বলেছি বললেও সে তুষ্ট হয় না। সে বলে “আমার ছেলেকে যদি আদর করে ছোঁড়া বলতে পারো, আমাকেও তো তবে তুমি

আদর করে বেশ্যা বলতে পারো অনায়াশে।” (৪খ, পৃ. ১৭)

এখানে এ সত্য স্পষ্ট হয় যে মনোরমা সচেতনভাবে রাজকুমারের সঙ্গে অসংগত আচরণ করে। তার স্বামীর সঙ্গে তার সম্পর্ক কেমন তা জানা যায় না। তবে, কালীর ব্যাপারে রাজকুমারেরর স্পষ্ট উত্তর শোনার পর তার কথাতেই তার স্বামী বাড়ি বদল করে, এতে মনে হয় স্বামীর প্রতি তার আধিপত্য রয়েছে। মনোরমার অতৃপ্ত যৌন কামনার কারণেই কালীকে সে এনে রেখেছে। নিজের কাছে।

রাজকুমারকে সে জিজ্ঞাসা করে কালীকে তার কেমন লাগে, কালীকে সে মিউজিয়াম দেখাতে নিয়ে যেতে চেয়েছে তা-ও মনে করিয়ে দেয়। কালীর বিয়ের জন্য ভাবনা নেই, বিলেত ফেরত পাত্রের মা সাধাসাধি করছে। এসব বলে আর রাজকুমারের মনোযোগ দেখে। কালী সম্পর্কে তার অনুভূতি দেখে

কালীকে মনোরমা কখনও বেশি সাজায় না, তার ঘরোয়া সাধারণ সাজেই বৈচিত্র্য সৃষ্টির চেষ্টা করে। কালীর একরাশি কালো চুল আছে, কোনোদিন মনোরমা লম্বা বিনুনি ঝুলাইয়া দেয়, কোনোদিন রচনা করে কুলানো ফাঁপানো খোঁপা। সকালে ঘরের কাজ করার সময় কালীর গায়ে সাদাসিধে ভাবে জড়ানো থাকে নিমন্ত্রণে যাওয়ার জমকালো দামি শাড়ি, বিকালে সযত্ন প্রসাধনের পর তাকে পরিতে হয় সাধারণ মিলের কাপড়।” (৪খ, পৃ.-৩৯)

 

নারী চরিত্র পর্ব ২

 

মনোরমা যেন কালীর মধ্য দিয়ে নিজের অপূর্ণ বাসনা দেখতে পায়। আবার কালী রাজকুমারের ঘরে বেশি সময় থাকলে তার বুকের ভেতর টিপটিপ করে, কালীকে বাঁচানোর জন্য সে ছটফট করে। আবার ভাবে-

“শুধু আজের জন্য বাঁচাইতে গিয়া সে যদি কালীর চিরদিনের মরার ব্যবস্থা করিয়া বসে?” (৪খ, পৃ.-৫৩)

কালীর মধ্য দিয়ে মনোরমার জীবন জটিল হয়ে ওঠে। রাজকুমার যখন একেবারে শান্ত হয়ে যায়, তখন সে আরো চিন্তিত হয়ে পড়ে, আশা করবে না হতাশ হবে কিছু বুঝে উঠতে পারে না। এরপর রাজকুমার কালীকে তার মায়ের কাছে পাঠিয়ে দিতে বলে। মনোরমা বিষাদ আর হতাশার যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যায়। মনে হয় কালীকে নয়, মনোরমাকেই প্রত্যাখ্যান করেছে রাজকুমার।

মনোরমা চরিত্রটি মানসিক বিকারমূলক চরিত্র। বিয়ের আগে কোনো এক পুরুষের স্পর্শে তার মধ্যে যে চাঞ্চল্য দেখা দিয়েছিল, সেই বোধ তার মধ্যে সুপ্ত রয়েছে, তারই প্রতিক্রিয়ায় সে রাজকুমারের সঙ্গে জটিল সম্পর্কে লিপ্ত হয়। নিজে আড়ালে থেকে সে কালীকে দিয়ে রাজকুমার এবং কালীর মনের বিভিন্ন জটিল মুহূর্ত অবলোকন করে। এতেই সে তৃপ্তি পায়।

কিন্তু রাজকুমার কালীকে প্রত্যাখ্যান করলে তাই সে নিজে কালীর চেয়ে বেশি ভেঙে পরে, তার অপমানবোধ বেশি হয়। অবশেষে সে রাজকুমারের বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। এ উপন্যাসে প্রতিটি নারী তাদের নিজস্ব মনোবাসনা নিয়ে রাজকুমারের দিকে ঝুঁকেছে বলে তারা তাদের মতো করে রাজকুমারকে চেয়েছে, কিন্তু রাজকুমার স্বরূপে বিদ্যমান। তাই প্রায় প্রতিটি নারী-ই মানসিক কষ্টের শিকার হয়েছে।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় শোষিত মানুষের রূপকার। এ শোষণ রাষ্ট্রীয়, সামাজিক এবং পারিবারিক। তিনি নিরাসক্ত শিল্পীর মতো বাইরে থেকে সমাজকে পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং উপন্যাসের কন্টেন্ট হিসেবে তা উপস্থাপন করেছেন। সমাজে শোষক ও শোষিত এই দুই শ্রেণি। কিন্তু শোষিত শ্রেণির মধ্যেও নারীরা পুরুষের দ্বারা অধিকতর শোষিত।

দৃষ্টিভঙ্গির নৈর্বক্তিকতায় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর উপন্যাসে সারীদের শ্রেণির মধ্যে শ্রেণিগত অবস্থানটি স্পষ্ট করে তুলে ধরেছেন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর উপন্যাসে নারীর বিভিন্ন রূপ অঙ্কন করেছেন। নারী মানব সম্প্রদায়ের অর্ধেক। তবে তার সে মর্যাদা সমাজ দেয় না, কিন্তু পরিস্থিতির কারণে সে পুরুষের চেয়েও বেশি সক্রিয় হতে পারে, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় অধিকাংশ উপন্যাসে তা দেখিয়েছেন।

নারী যেমন বাহ্যিক পরিবেশে সক্রিয়, তেমনি নিজের মনকেও নিয়ন্ত্রণ করেছে। লেখক সামাজিক বিভিন্ন জটিলতা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে মানুষের মনকে অবলম্বন করেছেন। তাঁর উপন্যাস গুলিতে নারীদের মনের জটিলতার পরিচয় পাওয়া যায়।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসের নারীরা সংগ্রামশীল এবং পরিস্থিতির মোকাবেলায় সক্ষম। যশোদা, সরসী, প্রমীলারা আপন অবস্থানে সক্রিয়। তারা বৈরী পরিবেশের মধ্যে থেকেই সংগ্রাম করে টিকে থেকেছে। মানব মনের চাওয়া-পাওয়ার দ্বন্দ্ব, কষ্টকে গোপন করে সুখী হওয়ার চেষ্টা, স্বপ্নবিসর্জন দিয়ে ক্ষত-বিক্ষত হওয়া, পুরুষের স্বেচ্ছাচারিতায় সৃষ্ট বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে খাপখাওয়ানোর প্রচেষ্টা-সকল কিছু নারী চরিত্রগুলির মধ্যে দেখা যায়।

প্রতিটি নারীই তাদের লক্ষ্যে পৌছানোর জন্য অবিচল। ঘাত-প্রতিঘাত সংঘাতের মধ্য দিয়ে তাদের পদযাত্রা। নারী চরিত্রগুলি পর্যালোচনা করে আমরা দেখতে পাই তারা অস্তিত্বশীল হওয়ার প্রচেষ্টায় সদা তৎপর। বাস্তবের সঙ্গে সংঘাতে মানুষ সত্যের মুখোমুখি হয়।

সংগ্রামের স্তরে স্তরে মানুষ আরো জটিলতর পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়।  মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নারী চরিত্রগুলি এমনি জটিলতায় বসবাস করে, মুক্তির পথ খোঁজে এবং শেষ পর্যন্ত অস্তিত্বশীল হয়।

Leave a Comment

Are you human? Please solve:Captcha