মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জননী উপন্যাস (বই নিয়ে পর্যালোচনা)

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘জননী’ উপন্যাস বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য সৃষ্টি, যা মায়ের আত্মত্যাগ, সংগ্রাম, প্রেম, এবং নিঃস্বার্থ মমতার এক মর্মস্পর্শী উপাখ্যান। এই উপন্যাসে তিনি মাতৃত্বের গৌরব, নারীর অসীম ত্যাগ, এবং পারিবারিক সম্পর্কের জটিলতা অত্যন্ত বাস্তবধর্মী ভাষায় তুলে ধরেছেন।

‘জননী’ মূলত গ্রামীণ বাঙালি জীবনের প্রতিচ্ছবি, যেখানে দরিদ্র পরিবারের মায়ের সংগ্রাম, সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার লড়াই এবং সামাজিক বাধাগুলো স্পষ্টভাবে চিত্রিত হয়েছে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এই উপন্যাসে মায়ের চরিত্রের মাধ্যমে দেখিয়েছেন কীভাবে একজন নারী জীবনের প্রতিকূলতা, দারিদ্র্য, এবং অমানবিক পরিস্থিতির মধ্যে থেকেও নিজের পরিবারকে আগলে রাখে।

উপন্যাসটির ভাষা, বর্ণনা, এবং চরিত্রায়ণ অত্যন্ত শক্তিশালী, যা পাঠকের হৃদয়ে গভীর ছাপ ফেলে। এটি শুধু একটি গল্প নয়, বরং মায়ের চিরন্তন ত্যাগ, মানবিকতার জয়গান এবং অসীম ধৈর্যের প্রতীক।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘জননী’ তাই কেবল এক সাহিত্যিক সৃষ্টিই নয়, বরং এটি বাংলা সাহিত্যে মায়ের মহিমাকে অবিস্মরণীয় করে তোলার এক অনন্য প্রচেষ্টা।

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জননী উপন্যাস

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জননী উপন্যাস

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় জীবনবাদী লেখক। তিনি জীবনকে রূপায়ণের নিমিত্তে উপন্যাস রচনা করেছেন। মানবজীবনের পুল্কাপুপুক্ষসত্যকে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই তাঁর উদ্দেশ্য। তিনি জীবন ও জগতের অনুভূতি কোনো কিছুই বাদ না দিয়ে মূলসমেত সাহিত্যে তুলে ধরেছেন। তাঁর উপন্যাসগুলোতে বিভিন্ন শ্রেণির সমাবেশ ঘটেছে। তাঁর প্রতিটি উপন্যাস ভিন্ন ভিন্ন বোধ, ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশ-পরিস্থিতি এবং বৈচিত্র্যময় বিষয়ের প্রতিনিধিত্ব করে।

জননী উপন্যাস (১৯৩৫)

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম গ্রন্থিত উপন্যাস ‘জননী’ (১৯৩৫)। শহরতলীর এক নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের কাহিনী নিয়ে এ উপন্যাসটি লেখা হয়েছে। জননী শ্যামার সন্তান জন্মের মধ্যদিয়ে উপন্যাসের শুরু এবং তার পুত্রবধূ সুবর্ণের সন্তান জন্মের পর উপন্যাস শেষ হয়েছে। উপন্যাসে লেখক দেখিয়েছেন নিম্নমধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারের একজন মায়ের সংগ্রামমুখর জীবন।  শ্যামার স্বামী শীতল ছিটগ্রস্ত, নেশাখোর, খেয়ালি, বদমেজাজি এবং সংসার সম্পর্কে উদাসীন। সন্তান লালন-পালন, তাদের লেখপড়া, সংসারের প্রতিদিনের হিসাব সবই শ্যামা নিয়ন্ত্রণ করে।

উপন্যাসে দেখা যায়

“শ্যামার জীবনে তাহার প্রণয়াবেশ অপেক্ষা তাহার গৃহিণীত্বই সুপরিস্ফুট।”১

 

কমল প্রেসের টাকা আত্মসাৎ করে শীতল জেলে গেলে শুরু হয় শ্যামার অসহায় জীবন। তার মামাও হাজার টাকা আত্মসাৎ করে নিরুদ্দেশ হয়। তবু শ্যামা বিপদের কাছে আত্মসমর্পণ করে। না। সন্তানদের ভবিষ্যৎ চিন্তায় নতুন পথের সন্ধান করে। নিজেদের বাড়ি ভাড়া দিয়ে ননদ মন্দার বাড়ি প্রবেশ করে।

এখানে শুরু হয় শ্যামা আর তার সন্তানদের নতুন জীবন। মন্দার সংসারে দিনরাত পরিশ্রম করে সন্তানদের লালন-পালন করে শ্যামা। তার মূল্যবোধেরও অবনতি ঘটে। ছেলের জন্য খাবার চুরি করে, বাড়িতে ভাড়াটে নেই হারান ডাক্তার নিজে মাসে মাসে টাকা পাঠাচ্ছে, জেনেও চুপ করে থাকে। শীতল জেল থেকে ছাড়া পেলে শ্যামাকে বাড়িটি বিক্রি করে দিতে হয়। মেয়ে বকুলের বিয়ে আর শীতলের চিকিৎসায় যখন শ্যামা প্রায় নিঃস্ব তখন বড় ছেলে বিধান লেখাপড়া ছেড়ে চাকরি নেয়। শ্যামা আবার সপরিবারে কলকাতায় আসে।

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জননী উপন্যাস

 

কিছুদিন অনন্য বাড়ি থেকে নিজের বাড়ি ভাড়াটে হয়ে আসে ওরা। বিধানকে বিয়ে দেয়। সংসারের বোঝা কাঁধে নিয়ে শ্যামা নিজের জীবনের চাওয়া-পাওয়াকে বিসর্জন দিয়েছে । কিন্তু বিধানের বউয়ের পরিপূর্ণ যৌবন দেখে সে ঈর্ষান্বিত হয়ে ওঠে। বউকে ভালোবাসতে পারে না। তারপর বিধানের বউ সন্তানসম্ভবা হলে শ্যামা তাকে বুকে টেনে নেয়। জননীর প্রতি জননীর এবং একজন জননীর দায়িত্ব-কর্তব্য ও মমতার কথা এ উপন্যাসে লেখক বলেছেন।

Leave a Comment

Are you human? Please solve:Captcha