মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে সমাজ ও সংসারজীবন: শ্রেণি-সংকট, অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও মধ্যবিত্তের মনস্তাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদ

বাংলা উপন্যাসের চিরায়ত ধারায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রোমান্টিক ভাবালুতা কিংবা শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের করুণ রসে সিক্ত মধ্যবিত্ত ঘরানার যে প্রথাগত ঐতিহ্য বিরাজমান ছিল, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯০৮–১৯৫৬) সেখান থেকে সম্পূর্ণ বেরিয়ে এসে সাহিত্যকে দাঁড় করিয়েছেন বস্তুনিষ্ঠ বাস্তবতার শক্ত জমিনে। বিজ্ঞানের প্রখর পর্যবেক্ষণশীলতা, মার্কসীয় দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ এবং ফ্রয়েডীয় মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর কথাসাহিত্যকে দান করেছে অনন্য এক বৈজ্ঞানিক গভীরতা। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে সমাজ ও সংসারজীবন নিছক প্রেম, দয়া, স্নেহ কিংবা পারিবারিক আতিথেয়তায় বাঁধা কোনো আদর্শিক প্রাঙ্গণ নয়; বরং তা অর্থনৈতিক টানাটানি, অস্তিত্বের সংগ্রাম, শ্রেণির শোষণ, প্রথাগত সংস্কার এবং মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েনের এক নির্মোহ যুদ্ধক্ষেত্র।

‘জননী’, ‘জীবনের জটিলতা’, ‘শহরতলী’, ‘অহিংসা’, ‘চতুষ্কোণ’, ‘আদায়ের ইতিহাস’, ‘চালচলন’ এবং ‘পদ্মানদীর মাঝি’র মতো কালজয়ী উপন্যাসগুলোতে তিনি অবমিত জনমানুষ ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের অন্দরমহলের চিত্র অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে ব্যবচ্ছেদ করেছেন। বহুবিবাহ ও যৌতুক প্রথার সামাজিক ব্যাধি, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যকার বয়সের চরম বৈষম্য, আশ্রিত জীবনের মানবেতর নিগড়, ভাই-বোনের জটিল মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন এবং দারিদ্র্যজনিত তীব্র স্থানসংকট কীভাবে মানুষের ব্যক্তিত্ব ও পারিবারিক সম্পর্ককে পরিচালিত করে—মানিক তা একজন দক্ষ শল্যচিকিৎসকের মতো অনাবৃত করেছেন। বিশ শতকের ত্রিশ ও চল্লিশের দশকের প্রেক্ষাপটে রচিত তাঁর এই উপন্যাসসমূহ কেবল তৎকালীন বাঙালি মানসের নিখুঁত সামাজিক দলিলই নয়, বরং তা সাহিত্য ও সমাজতাত্ত্বিক গবেষণার ক্ষেত্রে এক কালজয়ী আকর।

সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপ
  • মূল প্রতিপাদ্য: মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথাসাহিত্যে স্থান পাওয়া বাঙালি সমাজ ও সংসারজীবন কোনো কাল্পনিক বা ভাবালু আখ্যান নয়; বরং তা দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ, অর্থনৈতিক সংকট, এবং ফ্রয়েডীয় মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের এক নির্মোহ দলিল।
  • মূল উপন্যাসসমূহ: ‘জননী’ (১৯৩৫), ‘জীবনের জটিলতা’ (১৯৩৬), ‘শহরতলী’ (১৯৪০), ‘অহিংসা’ (১৯৪১), ‘চতুষ্কোণ’ (১৯৪২), ‘চালচলন’, ‘আদায়ের ইতিহাস’, ‘পদ্মানদীর মাঝি’ এবং ‘অমৃতস্য পুত্রাঃ’।
  • বিশ্লেষিত সামাজিক উপাদান: বহুবিবাহ ও যৌতুক প্রথা, দাম্পত্যে বয়সের ব্যবধান, সামাজিক ও বৈষয়িক স্বার্থপরতা, দারিদ্র্য ও স্থানসংকট, আশ্রিত জীবনের নিপীড়ন, ভাই-বোনের জটিল মনস্তাত্ত্বিক সম্পর্ক, এবং গৃহসজ্জার শ্রেণিভিত্তিক নান্দনিকতা।
  • সাহিত্যিক তাৎপর্য: রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্রের প্রথাগত আবেগাশ্রিত মধ্যবিত্ত সংসারের বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সংসারকে এক কঠিন জীবিকা ও অস্তিত্বের যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।

বাংলা উপন্যাসের ধারায় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯০৮–১৯৫৬) এক অনন্য ও ক্রান্তদর্শী ব্যক্তিত্ব। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রোমান্টিক ভাবালুতা কিংবা শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের করুণ রসে সিক্ত মধ্যবিত্ত ঘরানার যে প্রথাগত ঐতিহ্য বাংলা সাহিত্যে বিরাজমান ছিল, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সেখান থেকে সম্পূর্ণ বেরিয়ে এসে উপন্যাসকে দাঁড় করিয়েছেন কঠিন বাস্তবতার জমিনে। বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে তাঁর মধ্যে যে পর্যবেক্ষণশীলতা ও বস্তুপন্থী দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠেছিল, তার সফল প্রতিফলন ঘটেছে তাঁর সামাজিক উপন্যাসগুলোতে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস সমাজ সংসারজীবনকে নিছক স্নেহ, প্রেম, মমতা কিংবা আতিথেয়তার বাঁধনে বাঁধা কোনো সুষম প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখায় না; বরং তাঁর কলমে সংসার ফুটে উঠেছে অর্থনৈতিক টানাটানি, অস্তিত্বের সংগ্রাম, শ্রেণির শোষণ, কুসংস্কার এবং মনস্তাত্ত্বিক জটিলতার এক বাস্তব ক্ষেত্র হিসেবে।

‘জননী’, ‘শহরতলী’, ‘অহিংসা’, ‘চতুষ্কোণ’, ‘জীবনের জটিলতা’, ‘আদায়ের ইতিহাস’, ‘চালচলন’ প্রভৃতি উপন্যাসে তিনি দেখিয়েছেন, সাধারণ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবার কীভাবে অর্থকষ্ট, সামাজিক চাপ এবং ব্যক্তিস্বার্থের ঘাত-প্রতিঘাতে পরিচালিত হয়। মানবসম্পর্কের সৌন্দর্যকে অস্বীকার না করেও, সেই সম্পর্কের নেপথ্যে থাকা বৈষয়িক লাভ-ক্ষতির হিসাব এবং মানুষের আদিম স্বার্থপরতাকে তিনি নিপুণভাবে অনাবৃত করেছেন।

Table of Contents

দাম্পত্য জীবন, দ্বিতীয় বিবাহ ও বহুবিবাহের রীতিনীতি

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামাজিক উপন্যাসে বিশ শতকের ত্রিশ ও চল্লিশের দশকের বাঙালি সমাজের একটি করুণ ও স্বাভাবিক ছবি হলো বহুবিবাহ এবং পুরুষশাসিত পরিবারের ইচ্ছাস্বাধীন পুনর্বিবাহের প্রথা। তৎকালীন সমাজে স্ত্রীর মৃত্যু কিংবা কোনো বিশেষ পারিবারিক কারণ ছাড়াও পুরুষ মানুষের একাধিক বিয়ে করাকে সমাজ অত্যন্ত স্বাভাবিক দৃষ্টিকোণ থেকে গ্রহণ করত।

দ্বিতীয় বিবাহ ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার বাস্তবতা

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘জননী’ উপন্যাসের শুরুতেই আমরা বহুবিবাহের রূপটি দেখতে পাই। প্রধান চরিত্র শ্যামা হলো শীতলের দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী। প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর বা প্রথম সংসার থাকা সত্ত্বেও শীতল পুনরায় বিয়ে করে। শুধু শীতলই নয়, এই উপন্যাসের রাখাল চরিত্রটিও কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়াই দ্বিতীয়বার বিয়ে করে। আবার ‘জীবনের জটিলতা’ উপন্যাসে শান্তার রহস্যজনক মৃত্যুর পর অধর দ্বিতীয় বিয়ের উদ্যোগ নিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করে না।

এই সমাজচিত্র কেবল ‘জননী’ বা ‘জীবনের জটিলতা’য় সীমাবদ্ধ নয়; তাঁর অন্যান্য প্রধান উপন্যাসেও এটি একটি নিয়মিত সামাজিক প্রথা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে:

  • পদ্মানদীর মাঝি: হোসেন মিঞার সমাজব্যবস্থা এবং জেলেপাড়ার বাস্তবতায় কপিলার স্বামী অনায়াসে দ্বিতীয় বিয়ে করে প্রথম স্ত্রীকে অনিশ্চয়তায় ফেলে দেয়।
  • অমৃতস্য পুত্রাঃ: দ্বিতীয় বিয়ের কারণে দাম্পত্য সংঘাত চরম রূপ নেয়। বীরেশ্বরের দ্বিতীয় বিয়ের প্রতিবাদে তার প্রথম স্ত্রী তার একমাত্র সন্তান শ্যামলালকে নিয়ে স্বামীর ভিটে ত্যাগ করে চলে যায়।
  • শহরতলী: এই উপন্যাসে শিল্পাঞ্চল ও শ্রমজীবী সমাজের প্রভাবে গড়ে ওঠা দ্বিতীয় বিয়ের একাধিক উদাহরণ রয়েছে। ধনঞ্জয় দুটি বিয়ে করেছে। প্রথম দুই স্ত্রী মারা যাওয়ার পর সে যশোদার মতো কোনো স্বাবলম্বী নারীকে বিয়ে করার বাসনা পোষণ করে। আবার শহরতলীর দ্বিতীয় খণ্ডে যশোদার বাড়ির আড্ডায় আসা অমলার সামাজিক পরিচয় দিতে গিয়ে লেখক লিখেছেন:
    “ইনশিয়োরেন্স এজেন্ট জগদীশের দ্বিতীয় পক্ষের বউ অমলা!…….. …..” (৩য় খণ্ড, পৃ. ২৩৯)

    উদ্ধৃতিটি থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়, সমাজের সর্বস্তরে—বীমা প্রতিনিধি থেকে শুরু করে কারখানা শ্রমিক বা কেরানি—দ্বিতীয় বিয়ে কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা ছিল না।

  • শুভাশুভ: এই উপন্যাসে সমরেশের মামাকে তিন তিনটি বিয়ে করতে দেখা যায়, যা তৎকালীন সামাজিক শিথিলতা ও পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যের চরম দৃষ্টান্ত।

যৌতুক, সম্পত্তিপ্রীতি ও বৈবাহিক স্বার্থপরতা

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে বিয়ে কেবল দুটি মনের মিলন নয়; বরং তা অনেক ক্ষেত্রে বৈষয়িক সম্পত্তি অর্জনের একটি কৌশল। স্ত্রীর ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সম্পত্তির ওপর স্বামীর লোভ সমাজে এক গভীর ব্যাধির মতো ছড়িয়ে ছিল।

‘জননী’ উপন্যাসে শীতল চরিত্রটি একজন ছিটগ্রস্ত, নীতিহীন ও দায়িত্বজ্ঞানহীন মানুষ। কিন্তু বিয়ে করার ক্ষেত্রে সে অত্যন্ত হিসাবযোগী। সে এমন মেয়েকে বিয়ে করতে চেয়েছিল যার কাছ থেকে ভবিষ্যতে সম্পত্তি পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। শ্যামার মামার সম্পত্তি প্রাপ্তির আশাতেই সে শ্যামাকে বিয়ে করেছিল। লেখক স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন:

“উত্তরাধিকারীবিহীন এই মামাটির কিছু সম্পত্তি না থাকিলে শীতল শ্যামাকে বিবাহ করিত কিনা সন্দেহ।” (১ম খণ্ড, পৃ. ৫০)

পরবর্তীকালে যখন শ্যামার মামা তাঁর যাবতীয় সম্পত্তি বিক্রি করে দিয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে যান, তখন শীতলের মুখোশ খুলে পড়ে। সে শ্যামার ওপর অমানুষিক মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন শুরু করে। স্ত্রীকে সে জীবনসঙ্গিনী মনে না করে নিজের কেনা সম্পত্তি মনে করত এবং নিজের ব্যর্থতার সমস্ত দায় শ্যামার ওপর চাপিয়ে তাকে মারধর করত।

একইভাবে ‘শহরতলী’ উপন্যাসে জ্যোতির্ময় চরিত্রটিকে দেখা যায় যৌতুক নিয়ে বিয়ে করতে। বিয়ের আয়োজন এবং যৌথ পরিবারের সামাজিক মনোভাব প্রকাশ করতে গিয়ে লেখক মন্তব্য করেছেন:

“আয়োজন ভালোই হইয়াছে, চাকুরে জামাইকে টাকা মেয়ের বাপ ভালো রকমেই দিয়াছেন।” (৩য় খণ্ড, পৃ. ১২৬)

বিয়ের বাজারে পাত্রের সামাজিক অবস্থান ও চাকরিকে পুঁজি করে কীভাবে অর্থ আদায় করা হতো, জ্যোতির্ময়ের বিবাহ প্রসেঙ্গ তা স্পষ্ট হয়। অন্যদিকে ‘চতুষ্কোণ’ উপন্যাসে রাজকুমারের সঙ্গে দূরসম্পর্কের বোন কালীর বিয়ে দেওয়ার জন্য মনোরমা নানা ফন্দি আঁটে। কিন্তু রাজকুমার যখন কালীর প্রতি অনিহা প্রকাশ করে তাকে বাড়িতে ফেরত পাঠাতে চায়, তখন মনোরমা শেষ যুক্তি হিসেবে কালীর বাবার আর্থিক অবস্থাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে বলে:

“ওর বাবার অবস্থা খারাপ নয়। মেয়েটাকে সস্তায় তোমার ঘাড়ে চাপানো যাবে বলে চেষ্টা করিনি ভাই।” (৪র্থ খণ্ড, পৃ. ৮৪)

দাম্পত্যে বয়সের ব্যবধান, মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন ও অমিল

বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে স্বামী ও স্ত্রীর বয়সের চরম বৈষম্য দাম্পত্য জীবনে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বের সৃষ্টি করেছিল। মানিকের উপন্যাসে এই বয়সের ব্যবধানকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া টানাপোড়েন অত্যন্ত প্রখরভাবে উঠে এসেছে।

বৈষম্যমূলক বয়স এবং দাম্পত্য অসামঞ্জস্য

‘জননী’ উপন্যাসে শীতল ও শ্যামার বয়সের নির্দিষ্ট হিসাব দেওয়া না থাকলেও শ্যামা যে শীতলের থেকে বয়সে অনেক ছোট এবং শীতলের এটি দ্বিতীয় বিয়ে, তা থেকে অসম বয়সের স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ‘জীবনের জটিলতা’ উপন্যাসে শান্তা ও অধরের বয়সের ব্যবধান ছিল অনেক বেশি। আবার ‘শহরতলী’ উপন্যাসে জ্যোতির্ময় ও অপরাজিতার বয়সের পার্থক্য ছিল আকাশপাতাল; অপরাজিতার বয়স ছিল জ্যোতির্ময়ের অর্ধেকেরও কম।

এই বয়সের পার্থক্যের কারণে গড়ে ওঠা দাম্পত্য জীবনের বৈষম্যকে একটি তুলনামূলক ছকের মাধ্যমে সহজভাবে বোঝা যেতে পারে:

উপন্যাসের নাম স্বামী ও স্ত্রীর চরিত্র বয়সের ব্যবধানের স্বরূপ সম্পর্কের ফল ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব
জননী শীতল ও শ্যামা অত্যাধিক (শীতলের দ্বিতীয় বিয়ে) স্বামীর খামখেয়ালিপনা, স্ত্রীর ওপর নির্যাতন ও একাকী সংগ্রাম।
জীবনের জটিলতা অধর ও শান্তা অস্বাভাবিক ব্যবধান মানসিক অতৃপ্তি, শান্তার বিমলের প্রতি আকর্ষণ ও চরম ট্র্যাজেডি।
শহরতলী জ্যোতির্ময় ও অপরাজিতা অপরাজিতার বয়স স্বামীর অর্ধেকের কম মানসিক দূরত্বের কারণে সংসারে সমন্বয়হীনতা ও পারস্পরিক অসন্তোষ।
জননী মোহিনী-বকুল / বিধান-সুবর্ণ সমবয়সী বা স্বাভাবিক পার্থক্য তুলনামূলক বোঝাপড়া ও মানসিক সামঞ্জস্য।
জীবনের জটিলতা কনক ও অজয় স্বাভাবিক পার্থক্য পারস্পরিক সহমর্মিতা ও সহনশীলতা।

দাম্পত্যে বন্ধুত্বের অভাব ও পরকীয়ার সূত্রপাত

মানিকের দৃষ্টিভঙ্গিতে দাম্পত্য জীবনের সবচেয়ে বড় সংকট হলো স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ‘বন্ধুত্বে’র অভাব। সমাজে অধিকাংশ দম্পতি সামাজিক বাধ্যবাধকতার কারণে একসাথে বসবাস করে, কিন্তু তারা একে অপরের সত্যিকারের বন্ধু হতে পারে না।

‘জীবনের জটিলতা’ উপন্যাসে শান্তা ও অধরের দাম্পত্য জীবন একেবারেই ভালোবাসাহীন। শান্তা অধরের সংসার পরিচালনা করে কেবল মানিয়ে চলার স্বার্থে। কিন্তু শান্তার বুভুক্ষু মনস্তত্ত্ব একজন প্রকৃত সহচর ও বন্ধু খুঁজে বেড়ায়। এই মানসিক শূন্যতাই তাকে আস্তে আস্তে বিমলের কাছাকাছি নিয়ে যায় এবং একসময় তা গভীর অনুরাগে পরিণত হয়। মানিক দেখিয়েছেন, যেখানে দাম্পত্যে মনের মিল ও বয়সের সামঞ্জস্য থাকে না, সেখানে বাহ্যিক সামাজিক নিয়ম দিয়ে মনকে আটকে রাখা যায় না।

বৈষয়িক মানসিকতা, শ্রেণিসংগ্রাম ও অর্থনৈতিক সংকট

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে প্রতিটি চরিত্রকে কোনো না কোনোভাবে বৈষয়িক চিন্তা বা টাকার হিসাব-নিকাশ করতে হয়। কারণ তাঁর উপন্যাসে সমাজ জীবনের মূল চালিকাশক্তি হলো অর্থনীতি।

মধ্যবিত্তের বৈষয়িক উদ্বেগ ও অস্তিত্বের লড়াই

‘জননী’ উপন্যাসের শ্যামা চরিত্রটি বৈষয়িক উদ্বেগের এক জীবন্ত প্রতীক। তার সমস্ত চিন্তা কীভাবে সংসারটিকে একটু উন্নত করা যায়। দোতলায় ঘর তোলার জন্য সে তিল তিল করে অর্থ ও সরঞ্জাম গুছিয়ে ফেলে। মামা বাড়িতে এলে মামার গচ্ছিত কোনো টাকা আছে কিনা তা নিয়েও তার মনে সূক্ষ্ম অর্থনৈতিক হিসাব চলে। কিন্তু স্বামী শীতলের খামখেয়ালিপনা ও চুরির অপরাধে পুরো পরিবার যখন সমাজে ছোট হয়ে যায়, তখন শ্যামা অস্তিত্ব রক্ষার জন্য কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়:

  1. প্রথমে সে বাড়ির একতলা ভাড়া দিয়ে নিজেরা দোতলায় উঠে যায়।
  2. অর্থ সংকট তীব্র হলে পুরো বাড়ি ভাড়া দিয়ে বনগাঁয়ে চলে যায়।
  3. মন্দা ও রাখাল বাড়ি বিক্রি করে দেওয়ার পরামর্শ দিলে বৈষয়িক ভীতিতে সে পীড়িত হয় এবং শেষ পর্যন্ত নিজের বাড়িটি আগলে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে।
  4. পরবর্তীতে ছেলে বিধান চাকরি পেলে এবং সংসারের দায়িত্ব নিলে শ্যামার ওপর থেকে সেই চরম বৈষয়িক চিন্তার বোঝা নেমে যায়।

উত্তরাধিকার সূত্রে বিধানও মায়ের কাছ থেকে এই ‘সংসারচিন্তা’ ও সূক্ষ্ম অর্থনৈতিক সচেতনতা লাভ করে।

ক্যাপিটালিজম ও আশ্রমে বৈষয়িক হিসাব-নিকাশ

কেবল সাধারণ গৃহস্থ পরিবারেই নয়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় দেখিয়েছেন কীভাবে শিল্পপতি এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের চালকরাও বৈষয়িক মানসিকতায় চালিত হয়।

  • শহরতলী (সত্যপ্রিয়): শিল্পপতি সত্যপ্রিয়র জীবনের একমাত্র সাধনা হলো অর্থ উপার্জন। সে বৈষয়িক চিন্তায় এতটাই আচ্ছন্ন যে যশোদাকে অহংকার করে বলে:
    “বছর বছর ব্যাঙ্কের টাকা যে আমার কী করে হু হু করে বেড়ে যাচ্ছে, নিজেই ভালো বুঝতে পারি না।” (৩য় খণ্ড, পৃ. ২০৭)
  • অহিংসা (বিপিন): ‘অহিংসা’ উপন্যাসে ধর্মের আবডালে থাকা বিপিনের মূল লক্ষ্য আশ্রমে অর্থ ও সম্পত্তি বৃদ্ধি করা। আশ্রমের পরিসর বাড়ানো, ঘর তোলা, আমবাগান ও তপোবনের জমি কেনা এবং প্রণামি আদায় করাই তার প্রধান চিন্তা। যেদিন আশ্রমে সদানন্দের ধর্মীয় ভক্তিতে মানুষ বিভোর হয়, সেদিন বিপিনের স্নান মুখে আনন্দের হাসি ফুটে ওঠে এবং সে মনে মনে হিসাব করে:
    “আজ প্রণামি জুটিবে ভালো।” (৩য় খণ্ড, পৃ. ২৭৯)

আশ্রমের সুরক্ষার জন্য বিপিন ক্ষমতাশীল ব্যক্তিদের সাথে আপস করে। মহীগড়ের রাজা সাহেব এবং রাজপুত্রকে সে সমীহ করে চলে যতক্ষণ না পাকা দানপত্র তার নামে হস্তান্তরিত হয়। কিন্তু যখন দানপত্র তার নামে চলে আসে, তখন রাজা সাহেবের প্রতি তার কৃত্রিম ভক্তি কমে যায়। সুবিধাবাদী বিপিন শেষ পর্যন্ত তার দীর্ঘকালের পরম বন্ধু সদানন্দকে সরিয়ে দিয়ে মহেশকে দিয়ে আশ্রম চালানোর ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নেয়।

সংসারজীবনের বাস্তবতায় দারিদ্র্য, স্থানসংকট ও অবমিত চেতনা

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোটগল্প ও উপন্যাসের একটি প্রধান ক্ষেত্র হলো দারিদ্র্য ও মধ্যবিত্ত জীবনের তীব্র স্থানসংকট। অর্থনৈতিক নিপীড়ন কীভাবে মানুষের বিবেক ও মানসিকতাকে সংকীর্ণ করে তোলে, মানিক তা বৈজ্ঞানিক সততার সাথে তুলে ধরেছেন।

খাদ্য ও বাসস্থানের অপ্রতুলতা

‘জননী’ উপন্যাসে অভাবের সংসারে শ্যামার চালচলন ও হিসাব ছিল অত্যন্ত নির্মম। বিধানকে সে সাধারণ স্কুলে ভর্তি করায়, সাবানের খরচ বাঁচাতে বাড়িতে ক্ষার দিয়ে কাপড় কাচে, আর ছোট শিশুর জন্য মাত্র এক পোয়া দুধ বরাদ্দ করে। তার এই চুলচেরা হিসাব সম্পর্কে লেখক বলেছেন:

“গুন দিত সেই অপরাহ্নে, সারাদিন বুকে যে দুধটুকু জমিত বিকালে তাহাতেই খোকার পেট ভরিয়া যাইত। কত হিসাব ছিল শ্যামার ব্যাপক ও বিস্ময়কর!” (১ম খণ্ড, পৃ. ৭৯)

একইভাবে ‘জীবনের জটিলতা’ উপন্যাসে প্রমীলাদের বাড়ির দারিদ্র্যের যে চিত্র চিত্রিত হয়েছে তা অত্যন্ত মর্মান্তিক। সকালে প্রমীলাদের বাড়িতে আলুভাতে ভাত রান্না হয় না। ছোট ভাই পাঁচু ও বোনা অনিলার জন্য মাত্র দুই পয়সার মুড়ি বরাদ্দ থাকে। অথবা রাতে আটার রুটি বাঁচলে তারা সকালে খায়। কিন্তু প্রমীলা ও তার মায়ের জন্য সকালে কোনো নাস্তার বরাদ্দ থাকে না। ক্ষুধার তীব্র যন্ত্রণায় প্রমীলা কাঁচা চাল চিবিয়ে পানি খেয়ে পেট ভরানোর চেষ্টা করলে তার বাবা তাকে উল্টো গালাগাল করে।

স্থানসংকট ও নিম্নমধ্যবিত্তের মানসিক চাপ

অর্থনৈতিক সংকটের সাথে যুক্ত হয় স্থানসংকট। ‘জীবনের জটিলতা’ উপন্যাসে স্থানসংকটের কারণে প্রমীলাকে ভাইবোনের বিছানায় অত্যন্ত সংকীর্ণ জায়গায় গুটিসুটি মেরে শুতে হতো।

স্থানসংকটের চরম চিত্র পাওয়া যায় ‘শহরতলী’ উপন্যাসের দ্বিতীয় খণ্ডে। সত্যপ্রিয় যখন ডাক্তারখানায় যায়, তখন সেখানে আসা একটি তরুণের সাথে তার কথা হয়। তরুণটি রাতে ঘুমাতে পারে না শুনে সত্যপ্রিয় তাকে দরজা-জানালা বন্ধ করে পদ্মাসনে বসে ধ্যান করার অবাস্তব পরামর্শ দেয়। তখন তরুণটি তার সংসারের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে কাতর কণ্ঠে বলে:

“আজ্ঞে, আমার ঘরে আমার চারটি ভাইবোন শোয়, আমার বাপ-মাও ও ঘরে থাকেন। ঘরে সব সময় লোক থাকে। […] আরেকটা ঘরে দাদা-বউদি শোয়। আর ঘর নেই আমাদের।” (৩য় খণ্ড, পৃ. ২৪৩)

নিম্নমধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারের স্থানসংকট কীভাবে মানুষের ব্যক্তিগত জীবন ও মানসিক শান্তি কেড়ে নেয়, এই একটি দৃশ্যেই মানিক তা অনবদ্যভাবে প্রকাশ করেছেন।

                     [মধ্যবিত্তের অর্থনৈতিক সংকট ও মানসিক প্রভাব]
                                          │
       ┌──────────────────────────────────┼──────────────────────────────────┐
       │                                  │                                  │
[খাদ্য ও পুষ্টির চরম ঘাটতি]        [স্থানসংকট ও ভিড়ের যন্ত্রণা]      [সম্পর্কের নৈকট্য হ্রাস]
       │                                  │                                  │
- শিশুর দুধে কাটছাঁট (জননী)      - এক কামরায় বহু সদস্য (শহরতলী)    - স্বার্থপরতা ও ঈর্ষার জন্ম
- কাঁচা চাল চিবিয়ে ক্ষুধা দমন    - ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অভাব        - মানসিক অবসাদ ও পারিবারিক
  (জীবনের জটিলতা)                  (জীবনের জটিলতা)                  কলহ

মাতৃত্ব, নারীচরিত্র এবং শ্বশুরবাড়ির ক্ষমতার রাজনীতি

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে মাতৃত্ব কোনো নিছক দেবীত্ব বা রোমান্টিক মহিমায় মণ্ডিত নয়; বরং তা বাস্তব জীবনের কঠিন অভিজ্ঞতায় গড়ে ওঠা এক সংগ্রামী সত্তা।

মায়ের বিভিন্ন রূপায়নের তুলনা

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে মাতৃত্ব ও নারী চরিত্রের কয়েকটি প্রধান রূপ লক্ষ্য করা যায়:

  • শ্যামা (জননী): ত্যাগের প্রতীক হলেও সে বাস্তবানুগ। চার সন্তানের দারিদ্র্য ও বঞ্চনা তাকে সংসারের স্বার্থে অন্যায়ের সাথে আপস করতে শিখিয়েছে। সে বুঝেছে, মমতার চেয়ে আত্মরক্ষা ও স্বার্থপরতাই টিকে থাকার আসল চাবিকাঠি।
  • অনুরূপা (জীবনের জটিলতা): সে শ্যামার সম্পূর্ণ বিপরীত। সংসারের নানা ঝঞ্জাটে সে নিষ্ক্রিয়। সন্তানদের ভালো-মন্দের অংশীদার সে হতে পারে না। সকালে সন্তানদের জলখাবার বানানোর সময়টুকুও তার হাতে থাকে না।
  • যশোদা (শহরতলী): সে মায়ের এক বৃহৎ ও সর্বজনীন রূপ। আশ্রিত কুলিমজুরদের কাছে সে ‘জগজ্জজননী’ সদৃশ, কিন্তু নিজের স্বার্থ ও সম্মানের প্রশ্নে সে অত্যন্ত কঠোর।
  • যোগমায়ার মা (শহরতলী): শান্ত, নিরীহ ও সর্বদাই ভীতিসন্ত্রস্ত এক নারী। ধনী স্বামীর সংসারে সে মানিয়ে নিতে পারেনি; পরিবারের সবার অপরাধে নিজেকে অপরাধী মনে করে সবার কাছে ক্ষমা চেয়ে দিন কাটায়।

বউ-শাশুড়ির দ্বন্দ্ব, পিসশাশুড়ি ও ‘ঘরজামাই’-এর অবস্থান

বাঙালি সমাজে বউ-শাশুড়ির দ্বন্দ্ব একটি চিরন্তন চিত্র। ‘জননী’ উপন্যাসে শ্যামার শাশুড়ি ছিল না বলে সে আক্ষেপ করলেও, মন্দা চরিত্রটি শাশুড়ির অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে নিজের সন্তানদের চুরি করে বাপের বাড়িতে নিয়ে আসে। বকুলের জীবনে পিসশাশুড়ির অত্যাচার তাকে নিষ্পেষিত করে ফেলে। আবার শ্যামা নিজে যখন শাশুড়ি হয়, সেও পুত্রবধূকে সহানুভূতির সাথে গ্রহণ করতে পারে না; বরং বধূর রূপ-যৌবন দেখে ঈর্ষান্বিত হয় এবং ছেলেকে পর করে নেওয়ার সংশয়ে ভোগে (যদিও বধূ অন্তঃসত্ত্বা হলে তার মাতৃ হৃদয় জেগে ওঠে)।

শ্বশুরবাড়ির এই নির্যাতন কেবল নারীদের ওপরই চলত না; পুরুষরাও এর শিকার হতো। ‘শহরতলী’ উপন্যাসে সত্যপ্রিয়র বড় জামাই তার বাড়িতে ‘ঘরজামাই’ হিসেবে থাকে এবং সত্যপ্রিয়র হুকুমমতো পুতুলের মতো চালিত হয়। ‘অহিংসা’ উপন্যাসেও মহেশ চৌধুরীর দুই মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে যাওয়াকে লেখক কটাক্ষ করে বলেছেন:

“দুটি মেয়ে গিয়াছে শ্বশুরবাড়ি নামক নকল সামাজিক ভোলে।” (৩য় খণ্ড, পৃ. ২৯৯)

আশ্রিত জীবনের অবহেলা, মনস্তাত্ত্বিক দাসত্ব ও সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে ‘আশ্রিত’ বা অন্যের বাড়িতে আশ্রয়ে থাকা মানুষদের মানবেতর জীবন অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সাথে ফুটে উঠেছে। অর্থহীনতার কারণে আশ্রিতদের নিজেদের কোনো ব্যক্তিগত সময় বা ইচ্ছা-অনিচ্ছা থাকে না।

কায়িক শ্রম ও আশ্রিতদের মর্যাদা

‘জননী’ উপন্যাসে শ্যামা যখন অন্যের বাড়িতে আশ্রিত অবস্থায় ছিল, তখন ভোর পাঁচটা থেকে রাত এগারোটা পর্যন্ত তাকে একটানা পরিশ্রম করতে হতো। তবুও সে কোনো কৃতজ্ঞতা পায়নি, পেয়েছে কেবল অবহেলা। লেখক বলেছেন:

“আশ্রিতার সমস্ত অবসর মুহূর্তগুলো কেমন করিয়া কর্তব্যে ভরিয়া ওঠে কেহ টেরও পায় না।” (১ম খণ্ড, পৃ. ১০০)

একইভাবে ক্যানভাসার বনবিহারীর আশ্রিত জীবন ছিল অত্যন্ত করুণ। সারাদিন ওষুধের সুটকেস মাথায় নিয়ে ঘোরার পর বাড়ি ফিরে তাকে গৃহকর্তার পরিবারের সকলের হুকুম তামিল করতে হতো—কখনও বাজার থেকে রুটি আনা, কখনও বাচ্চার দেখভাল করা, আবার কখনও গৃহকর্তার সাথে দাবার ছক সাজানো।

আশ্রিতদের মনস্তাত্ত্বিক দাসত্ব ও সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস

উচ্চবিত্ত বা ধনী পরিবারের আশ্রিতরা কেবল শারীরিক খাটুনিই খাটে না, তারা মানসিকভাবেও নিজেদের ছোট ভাবতে বাধ্য হয়। ‘শহরতলী’ উপন্যাসে সত্যপ্রিয়র বাড়িতে আশ্রিত দূরসম্পর্কের আত্মীয়রা সর্বদা কর্তার ভয়ে সন্ত্রস্ত থাকত। বাড়ির অনুষ্ঠানের দিন সত্যপ্রিয়র সেজো মেয়ে ও তার আশ্রিত পিসতুতো বোনের গহনা নিয়ে কথোপকথনে এই দাসত্ব স্পষ্ট হয়:

সেজো মেয়ে (মুখভার করে): সবাই চলে গেলেই তোমার দুল ফিরিয়ে দেব।
পিসতুতো বোন (ভীত হয়ে): কেন ভাই?
সেজো মেয়ে: দিদির কানবালা ধার করে পরতে পারবে বলেই তো যেচে যেচে নিজের বিচ্ছিরি দুল দুটো আমায় পরালে।
পিসতুতো বোন: তুই নিজেই তো চেয়ে নিলি ভাই?
সেজো মেয়ে: কখন চাইলাম?
পিসতুতো বোন: না ঠিক, এমন বোকা আমি।
সেজো মেয়ে: বোকা তুমি নও। দুল দুটো পরলে নিজেকে খুব সুন্দর দেখায় জানো কিনা তাই আমি যেই দুল দুটো নিয়ে এলাম, ওমনি ফন্দি এঁটে দিদির কানবালা নিয়ে পরলে… ফরসা রঙের অহংকারে ফেটে পড়ছ!
পিসতুতো বোন (কাতরভাবে): আমার রংটা তো ফ্যাকাশে সাদা ভাই, তোর মতো দুধেআলতা তো নয় ভাই? কানবালা খুলে ফেলব? (৩য় খণ্ড, পৃ. ১৭৭)

এই কথোপকথনটি প্রমাণ করে, ধনী আত্মীয়া কীভাবে আশ্রিত বোনটিকে সৌন্দর্যের ক্ষেত্রেও মানসিকভাবে নিপীড়ন করত এবং আশ্রিত বোনটি কীভাবে নিজেকে মানিয়ে নিতে বাধ্য হতো।

ভাই-বোনের সম্পর্ক: গভীর আত্মিক টান থেকে দ্বন্দ্ব ও বিচ্ছিন্নতা

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে ভাই-বোনের সম্পর্ক কেবল প্রথাগত স্নেহের বন্ধন নয়; বরং তা জীবনসংগ্রাম, আত্মত্যাগ এবং অনেক ক্ষেত্রে গভীর বিচ্ছিন্নতার এক অনন্য মনস্তাত্ত্বিক দলিল।

প্রমীলা-বিমল ও সুনীল-লতার আত্মত্যাগের সম্পর্ক

‘জীবনের জটিলতা’ উপন্যাসে বিমল ও প্রমীলার সম্পর্ক বাংলা সাহিত্যের এক অন্যতম সেরা ভাই-বোনের চিত্রায়ণ। শৈশবে প্রমীলার কুড়িয়ে পাওয়া অচল সিকি বিমল কেড়ে নিয়েছিল। পরে নিজের ভুল বুঝতে পেরে মায়ের পয়সা দিয়ে অচল সিকিটি বদলে দিয়েছিল। সেই ছোট ঘটনা থেকে শুরু করে সারাজীবন তারা একে অপরের বিপদে পাশে দাঁড়িয়েছে।

  • শান্তার মৃত্যুর পর প্রমীলা বিমলকে সামলাতে চেষ্টা করে এবং বাস্তবতাকে মেনে নিতে বলে।
  • নগেন যখন গহনা পাঠিয়ে প্রমীলাকে অপমান করে, তখন বিমল বোনের পাশে দাঁড়িয়ে বলে:
    “আজ তোর কোনো কাজ নেই, কোনো দায়িত্ব নেই। কেউ তোকে ডাকবে না। এখানে বসে রাসকেলটার কথা ভাব আর ঘেন্না করতে শেখ।” (২য় খণ্ড, পৃ. ১৫৪)
  • বোনের আত্মসম্মান বাঁচাতে বিমল নগেনের সুপারিশকৃত চাকরি ছেড়ে দেয়। পরবর্তীতে যখন অধর প্রমীলাকে বিয়ে করার কুপ্রস্তাব দেয় এবং তার বাবা তাতে রাজি হয়, বিমল বাবার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে শান্তার স্মৃতিচিহ্ন পুড়িয়ে সংসারের সমস্ত অর্থনৈতিক দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেয়।

লেখক তাঁদের এই আত্মিক টানকে গভীর ভাষায় প্রকাশ করেছেন:

“দাদার জন্য প্রমীলার কখনও কান্না পায়, বোনের জন্য বিমলের বুকের ভিতরটা কখনও পুড়িয়া যায়।” (২য় খণ্ড, পৃ. ১৫৫)

একইভাবে ‘চালচলন’ উপন্যাসে সুনীল জানতে পারে তার বাঁশির সুরে বোন লতার ঘুম আসে না। যদিও সুনীল জানত লতার রাতে দেরি করে ঘুমানোর অভ্যাস, তবুও বোনকে মানসিকভাবে স্বস্তি দিতে সে বাঁশি বাজানো বন্ধ করে দেয়। সুনীল জানত, লতার শরীর খারাপ হলে পড়াশোনা বন্ধ হবে এবং পরিবার তাকে যেমন-তেমন ছেলের সাথে বিয়ে দেবে। তাই বোনের ভবিষ্যৎ বাঁচাতে সুনীল গোপনে তাকে সাহায্য করে।

যশোদা-নন্দ: নির্ভরশীলতা থেকে বিচ্ছিন্নতার ট্র্যাজেডি

‘শহরতলী’ উপন্যাসে যশোদা ও তার ছোট ভাই নন্দর সম্পর্ক প্রথমে ছিল গভীর নির্ভরশীলতার। যশোদা নন্দকে কোলে-পিঠে করে মানুষ করেছে। কিন্তু নন্দ যখন বড় হয়ে সত্যপ্রিয়র চক্রান্তে পা দেয় এবং বোনের অজান্তে সত্যপ্রিয়র কাছে চাকরি ভিক্ষা করে, তখন ভাই-বোনের সম্পর্কে ফাটল ধরে।

নন্দ যখন বোনকে ডিঙিয়ে চাকরি নেয়, তখন যশোদা গভীরভাবে আহত হয়। লেখক এই মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব নিয়ে লিখেছেন:

“একটা রহস্যময় ব্যবধানের সৃষ্টি হইয়াছে দুজনের মধ্যে। যশোদা স্পষ্ট অনুভব করিতে পারে, জিজ্ঞাসা করিয়া কিছু জানা যাইবে না, এতকাল পরে নন্দর জীবনে এমন একটা গোপন কিছুর আমদানি হইয়াছে যা নিজস্ব ব্যক্তিগত সম্পদ, দিদিকে সে ভাগ দিতে পারিবে না।” (৩য় খণ্ড, পৃ. ২০৬)

পরবর্তীতে নন্দ সুবর্ণকে নিয়ে পালিয়ে যায় এবং সত্যপ্রিয়র চালে যশোদা শ্রমিকদের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়। উপন্যাসের শেষে দেখা যায় নন্দ সিনেমায় অভিনয় করে ধনী হয়েছে, তার ঘরে গদি আঁটা চেয়ার হয়েছে, কিন্তু যে বোন তাকে রক্ত পানি করে মানুষ করেছিল, সেই যশোদার কাছে সে আর ফিরে আসেনি।

স্থানিক বাস্তবতা, গৃহসজ্জা ও ‘রিক্ত পরিচ্ছন্নতা’র নান্দনিকতা

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত ঘরের অন্দরমহল এবং গৃহসজ্জার বিবরণ কেবল বর্ণনামূলক নয়; তা চরিত্রগুলোর সামাজিক শ্রেণি ও মনস্তাত্ত্বিক রুচির পরিচয় বহন করে।

বাধ্যবাধকতা থেকে বাড়ি ভাড়া দেওয়া

অর্থনৈতিক সংকটের কারণে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের চরিত্রগুলো নিজেদের বাড়ি ভাড়া দিতে বাধ্য হয়:
  • জননী: শীতল জেলে গেলে শ্যামা সংসার চালাতে বাড়ি ভাড়া দেয়।
  • শুভাশুভ: ব্যবসায়ে মন্দা দেখা দিলে সমরেশ তার দোতলা বাড়ি ভাড়া দেয়।
  • শহরতলী ও চতুষ্কোণ: যশোদা মানসিক একাকীত্ব দূর করতে এবং রাজকুমার নিজের বড় বাড়িতে সঙ্গী পেতে ঘর ভাড়া দেয়।

নতুন দম্পতির গৃহসজ্জা ও ‘রিক্ত পরিচ্ছন্নতা’

‘জননী’ উপন্যাসে কনকলতা ও তার স্বামীর ঘর ভাড়ার দৃশ্য এবং ‘শহরতলী’ উপন্যাসে সুব্রতা ও অজিতের ঘর সাজানোর বিবরণে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় মধ্যবিত্তের “রিক্ত পরিচ্ছন্নতা” (Stark Cleanliness) ধারণাটি চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।

[নতুন দম্পতির ঘর সাজানোর নান্দনিকতা]
 ├── কনকলতা (জননী)
 │    ├── দক্ষিণের জানালায় নতুন পর্দা ও দামি কাঠের খাট
 │    ├── দরজার উল্টো পাশে আয়না বসানো টেবিল ও কাঠের চেয়ার
 │    └── রান্নাঘরে চকচকে টিনের বয়াম, কাচের জার, স্টোভ ও চায়ের বাসনের পরিচ্ছন্ন সাজসজ্জা
 └── সুব্রতা (শহরতলী)
      ├── চৌকির পায়ায় রঙিন কাপড়ের ঢাকনি
      ├── আলনায় পরিপাটি করে সাজানো কাপড়
      └── দেওয়ালে ছবি-ফটো এবং খালি স্থানে পরিচ্ছন্নতার ছাপ

এই সাজসজ্জা প্রমাণ করে যে, অভাব বা উপকরণের সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও শিক্ষিত মধ্যবিত্ত নতুন দম্পতিরা কীভাবে তাদের নিজস্ব পরিমণ্ডলে একটি শালীন ও নান্দনিক পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করত।

সন্ন্যাস বনাম সংসার: তারকনাথের অভিজ্ঞতা ও উপন্যাসের মূল সুর

‘জননী’ উপন্যাসে সংসারের জটিলতা, অভাব ও দায়িত্বের বিপরীতে সন্ন্যাস বা বৈরাগ্য জীবনের এক চরম বস্তুবাদী ব্যবচ্ছেদ করেছেন তারকনাথ চরিত্রটির মাধ্যমে। তারকনাথ যখন সংসারের টানাপোড়েনে অতিষ্ঠ হয়, তখন সে সন্ন্যাস জীবনের ছদ্ম-সহজতার কথা চিন্তা করে:

“একটা গেরুয়া কাপড় পরো, গায়ে একটা গেরুয়া আলখাল্লা চাপাও, গলায় ঝুলাইয়া দাও কতগুলি রুদ্রাক্ষ ও স্ফটিকের মালা, তারপর যেখানে খুশি যাও, আতিথ্য মিলিবে, অর্থ মিলিবে, ভক্তি মিলিবে, কত নারী দেহ দিয়া সেবা করিয়া পুণ্য অর্জন করিবে। ধার্মিকের অভাব কিসের? আজ ধনীর অতিথিশালায় শ্বেতপাথরের মেঝেতে খড়ম খটখট করিয়া হাঁটা, কাল সম্মুখে অফুরন্ত পথ… সন্ধ্যায় গভীর ইঁদারার শীতল জল, সদ্যদোয়া ঈষদুষ্ণ দুধ, ঘিয়ে ভিজানো চাপাটি, আর ভীরু সলজ্জা গ্রাম্য কন্যাদের প্রণাম…” (১ম খণ্ড, পৃ. ৬০)

কিন্তু মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় দেখিয়েছেন, এই সন্ন্যাস বা বৈরাগ্য আসলে এক ধরনের পলায়নবৃত্তি। তারকনাথ শেষ পর্যন্ত এই ভণ্ডামিতে টিকে থাকতে পারে না; সে ভাগ্নির টাকা আত্মসাৎ করে পালিয়ে যায়। অন্যদিকে, শ্যামা সমস্ত অভাব, প্রতারণা ও কষ্টের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সংসারকে টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম চালিয়ে যায়। ফরাসি লেখক আঁদ্রে মোরোয়ার (André Maurois) বিখ্যাত উক্তিটি এখানে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক:

“তীরে দাঁড়িয়ে ভাবনা-চিন্তা করলে সাঁতার কাটা কোনোদিনই শেখা যায় না। একবার নেমে পড়লে সাঁতারু স্রোত এবং পানির শীতলতার সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়াতে শেখে।”

শ্যামাও ঠিক তেমনি সংসারের উত্তাল স্রোতে ঝাঁপ দিয়ে টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে গেছে। মানিকের উপন্যাসে এই বাস্তবমুখী লড়াই-ই জীবনের শেষ কথা।

বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি ও সমালোচকদের মূল্যায়ন

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস সামাজিক দলিল হিসেবে বাংলা সাহিত্যে কেন এত কালজয়ী, তা তাঁর সমাজ-বিশ্লেষণের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি লক্ষ্য করলেই স্পষ্ট হয়। প্রখ্যাত সাহিত্য সমালোচকদের মতে, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সমাজের সংকটগুলোকে ওপর থেকে দেখেননি; তিনি সরাসরি অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর ভেতরে প্রবেশ করেছেন।

সমালোচকের মতামত

“তিনি সংকটের মধ্য দিয়ে সত্যের কাছে এসে পৌঁছেছেন, সমাজ ও সংস্কৃতির ট্র্যাজিক ধারণার উপাত্তে তিনি এসে পৌঁছেছেন, নির্যাতনের মৌলিক স্বরূপ ধরতে পেরেছেন: অর্থনৈতিক নির্যাতন।”

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামাজিক উপন্যাসের মূল নির্যাস হলো—মানুষের নৈতিকতা, প্রেম, দয়া কিংবা নিষ্ঠুরতা কোনোটিই আকাশ থেকে পড়ে না। সমাজব্যবস্থা, উৎপাদনের সম্পর্ক, দারিদ্র্য এবং শারীরিক ও মানসিক চাহিদাই মানুষের সংসারজীবন ও সামাজিক আচরণ নির্ধারণ করে।

রেফারেন্স:

  1. Bandyopadhyay, Manik. Manik Granthabali (Vols. 1, 2, 3, 4 & 6), Bengal Publishers, Kolkata.
  2. Azad, Humayun. Upanyasashilpa o Manik Bandyopadhyay, Muktadhara, Dhaka.
  3. Jahangir, Borhanuddin Khan. Manik Bandyopadhyay-er Sahityakarma o Samajbhavna, Bangla Academy, Dhaka.
  4. Mitra, Sarojmohan. Manik Bandyopadhyay-er Jiban o Sahitya, Granthalaya Private Limited, Kolkata.
  5. Ghosh, Nityapriya. Manik Bandyopadhyay: Rajniti o Sahitya, Dey’s Publishing, Kolkata.
  6. Sharif, Ahmed. Bangla Sahitye Samaj o Sanskritir Rupayan, Bangla Academy, Dhaka.

Leave a Comment

Are you human? Please solve:Captcha