বনফুলের ছোটগল্প (১৯৩৬-১৯৪৭): বিষয় ও রচনারীতি

বনফুল, আসল নাম বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়, বাংলা সাহিত্যের এক অমর গল্পকার, যিনি তাঁর ক্ষুদ্র অথচ গভীর ও অর্থবহ ছোটগল্পগুলোর জন্য বিখ্যাত। বনফুলের ছোটগল্পগুলোতে সহজ সরল ভাষায় জীবনের গভীর সত্য, মানবিক দ্বন্দ্ব, সমাজের বৈচিত্র্য এবং মানুষের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

বনফুলের গল্পগুলোতে ক্ষুদ্রতম বাক্যে তিনি বড় বড় জীবনদর্শন তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। তাঁর লেখায় হাস্যরস, ব্যঙ্গ, মানবিক বেদনা, প্রেম, সামাজিক বৈষম্য এবং জীবনের নানা মাধুর্য অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটে ওঠে। তিনি অনেক সময় গল্পের মূল বার্তাটি পাঠকের কল্পনায় ছেড়ে দেন, যা তাঁর গল্পগুলোকে অনন্য করে তোলে।

বনফুলের উল্লেখযোগ্য ছোটগল্পগুলোর মধ্যে ‘দুটি পাতা’, ‘ভুল’, ‘আকাশপথ’, ‘ছন্দপতন’, ‘ভালোবাসা’, ‘রাজার রোগ’, ‘কুমড়ো ফুল’, ‘মাটির মানুষ’ প্রভৃতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এসব গল্পে তিনি মানুষের আবেগ, সংকট, হাসি-কান্না, ভালোবাসা, এবং জীবনের গভীরতর সত্যগুলোকে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।

বনফুলের গল্পগুলো ছোট হলেও তাদের গভীরতা, বক্তব্যের তীক্ষ্ণতা এবং সৃজনশীলতার বৈচিত্র্য বাংলা সাহিত্যে এক স্থায়ী আসন তৈরি করেছে, যা তাঁকে বাংলা ছোটগল্পের এক অবিস্মরণীয় প্রতিভা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। আজকে আমরা বনফুলের ছোটগল্প (১৯৩৬-১৯৪৭): বিষয় ও রচনারীতির সূচিপত্র আলোচনা করবো।

 

বনফুলের ছোটগল্প (১৯৩৬-১৯৪৭): বিষয় ও রচনারীতি

 

বনফুলের ছোটগল্প (১৯৩৬-১৯৪৭): বিষয় ও রচনারীতির সূচিপত্র

ছোটগল্প কথাসাহিত্যের একটি বিশেষ রূপবন্ধ যা দৈর্ঘ্যে হ্রস্ব এবং একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। ছোটগল্পের আকার কী হবে সে সম্পর্কে কোন সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নেই। সব ছোটগল্পই গল্প বটে কিন্তু সব গল্পই ছোটগল্প নয়। একটি কাহিনী বা গল্পকে ছোটগল্পে উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য কিছু নান্দনিক ও শিল্পশর্ত পূরণ করতে হয়। ছোটগল্পের সংজ্ঞার্থ কী সে নিয়ে সাহিত্যিক বিতর্ক ব্যাপক। এককথায় বলা যায়- যা আকারে ছোট, প্রকারে গল্প তাকে ছোটগল্প বলে।

 

বনফুলের ছোটগল্প (১৯৩৬-১৯৪৭): বিষয় ও রচনারীতি

 

সূচিপত্র

১. বাংলা ছোটগল্পের বিকাশ

রবীন্দ্রপূর্ব ও রবীন্দ্র-উত্তর বাংলা ছোটগল্প

  • পূর্ণচন্দ্র চট্টপাধ্যায়
  • ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
  • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
  • প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
  •  প্রমথ চৌধুরী
  •  অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
  • বুদ্ধদেব বসু
  • প্রেমেন্দ্র মিত্র।
  • জগদীশ গুপ্ত
  • বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
  • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
  • প্রমথনাথ বিশী
  • শিবরাম চক্রবর্তী

২. বনফুলের জীবনকথা

  • বনফুলের জীবনকথা
  • বনফুলের ছেলেবেলা
  • বনফুলের শিক্ষাজীবন
  • বনফুলের সাহিত্যজীবন

৩. বনফুলের ছোটগল্পের বিষয় বৈচিত্র্য

  • বনফুলের ছোটগল্পের বিষয় বৈচিত্র্য
  • মধ্যবিত্ত জীবনের নানাদিক
  • চরিত্রপ্রধান গল্প
  • মনস্তত্বমূলক গল্প
  • ব্যঙ্গ ও হাস্যরসপ্রধান গল্প
  • প্রেমাশ্রিত গল্প
  • সমাজ সমস্যামূলক গল্প
  • পশুপ্রীতিমূলক গল্প
  • রুপক ও প্রতীকধর্মী গল্প
  • অতিপ্রাকৃত পরিবেশের গল্প

৪. শিল্পরীতি

বনফুলের ছোটগল্পের শিল্পরীতি

 উপসংহার

আমরা আমাদেও নির্ধারিত সময়সীমায় প্রকাশিত বনফুলের প্রথম ছয়টি গল্পগ্রন্থ যথাক্রমে- বনফুলের গল্প (১৯৩৬); বনফুলের আরও গল্প (১৯৩৮); বাহুল্য (১৯৪৩); বিন্দুবিসর্গ (১৯৪৪); অদৃশ্যলোকে (১৯৪৬); এবং আরও কয়েকটি (১৯৪৭) আলোচনার জন্য গ্রহণ করেছি। এতে প্রকাশিত মোট ১৪৭টি গল্পকে আলোচনার সুবিধার্থে মোটামুটিভাবে মধ্যবিত্ত জীবনের নানাদিক, চরিত্রপ্রধান গল্প, মনস্তত্বমূলক গল্প, ব্যঙ্গ ও হাস্যরসপ্রধান গল্প, সমাজ- সম্যামূলক গল্প, প্রেমাশ্রিত গল্প, পঞ্চপ্রীতিমূলক গল্প, রূপক ও প্রতীকধর্মী গল্প এবং অতিপ্রাকৃত পরিবেশের গল্প মোট নয়টি বিষয়ে সীমাবদ্ধ রেখেছি।

শিল্পীমাত্রই জীবন-সন্ধানী। কথাশিল্পী বনফুল, তার ব্যতিক্রম নন। তাঁর কৌতূহলপূর্ণ জীবন-জিজ্ঞাসা বিচিত্র মাত্রায় ছোটগল্পে নানামুখী আবেদন নিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে। মানুষের ব্যক্তিরূপের অসঙ্গতি কিংবা অসামান্যতা কখনো গাঢ় কখনো উজ্জ্বল বর্ণে তাঁর ছোটগল্পে আত্মপ্রকাশ করেছে।

 

 

বনফুলের ছোটগল্প (১৯৩৬-১৯৪৭): বিষয় ও রচনারীতি

 

বনফুলের মানবচরিত্রের অভিজ্ঞতা ছিল ব্যাপক ও বিস্তৃত, তাই তাঁর গল্পের বিষয়ও হয়েছে ব্যাপক বিস্তৃত। সমাজে সাধারণভাবে অবহেলিত চরিত্র সম্পর্কে বনফুল বলেছেন, ‘আমি প্রত্যহ মোটরে করিয়া বাজারে যাইতাম। মাছ, মাংস, তরিতরকারি কিনিতাম।

ক্রমশঃ মেছোদের সহিত, মাংস-বিক্রেতাদের সহিত এবং তরকারিওয়ালা ও তরকারি- উলীদের সহিত একটা ভালোবাসার বন্ধনেও আবদ্ধ হইলাম। একটা নূতন জগৎ আবিষ্কার করিলাম তাহাদের মধ্যে । ইহাদের লইয়াই আমি ‘হাটে বাজারে’ বইটি লিখিয়াছি। ইহাদের সংস্পর্শে আসিয়া হৃদয়ঙ্গম করিয়াছিলাম যে যদিও ইহারা অশিক্ষিত কিন্তু অমানুষ নয় বরং তথাকথিত শিক্ষিতদের অপেক্ষা কম ভণ্ড, মনে মুখে এক, মুখোশ বা পালিশের ধার ধারে না।’

“আমার হাটে বাজারে বইটির ড্রাইভার আলী একটি সত্য চরিত্র, কাল্পনিক নহে। মোটরমিস্ত্রিদের মধ্যে অনেক চরিত্র আমার মনে দাগ কাটিয়া গিয়াছে। তাহাদের চরিত্র আমার গল্প-উপন্যাসে আসিয়া পড়িয়াছে। কেবল একটি বইতে নয় তাঁর সমগ্র রচনায় অভিজ্ঞতা ও ব্যাপক সহানুভূতির পরিচয় পাওয়া যায়।

আবার তিনি মধ্যবিত্ত মানসিকতার নানা প্রান্তকে নৈর্ব্যক্তিক ভাব তাৎপর্যে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করেছেন। তাই মধ্যবিত্ত জীবনের নানাদিক পর্যায়ে আমরা স্বল্প পরিসরে যতটা সম্ভব বনফুলের মধ্যবিত্ত মানসিকতার গল্পের নানা দিকের আভাস দিয়েছি। ‘জৈবিক নিয়ম’ গল্পটিতে যৌবনের আতিশয্যের পাশাপাশি লেখকের মানবিক অপঘাতের প্রতি প্রচ্ছন্ন সহমর্মিতা, এবং ‘হাসির গল্পে সম্পূর্ণ প্রতিকূল পরিবেশে বসে হাসির গল্প লেখার প্লটের কথা রয়েছে।

সন্দেহপ্রবণতা মধ্যবিত্ত মানসিকতার অনেকটা অংশ জুড়ে বিস্তৃত লাভ করে ব্যক্তিজীবনকে করে তোলে দুর্বিষহ। ফলে
দাম্পত্য জীবনে অশান্তি নেমে আসে, পরস্পর পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা হারিয়ে ফেলে। ব্যতিক্রম গল্পটিতে এই বিষয়টি
প্রাধান্য পেয়েছে।

পণপ্রথার কারণে উপযুক্ত মেয়ে পাত্রস্থ করতে না পারার দুশ্চিন্তা, বিয়ের ফর্দ কমাতে যেয়ে কৌশলের আশ্রয় নিয়ে শেষ পর্যন্ত মান না রাখতে পারা, বন্ধুর প্রতি বন্ধুর বিশ্বাসের পরীক্ষা নিতে যেয়ে অবিশ্বাসের জন্ম, পাওনা টাকা আদায় করতে যেয়ে পাওনাদারের হেনস্থা, দেনাদারের ছলচাতুরি, এবং সমাজসেবক ডাক্তারের অসৎ পন্থা অবলম্বনের ফলে নিজের পুত্রের জীবনাবসান ঘটানো প্রভৃতি বিষয় প্রাধান্য পেয়েছে।

একইভাবে চরিত্রপ্রধান গল্পের আলোচনায় রয়েছে ব্যক্তির চরিত্রের বিশেষ দিকের প্রতি আলোকপাত। এ পর্যায়ের বেশিরভাগ গল্পই উত্তমপুরুষের জবানিতে লিখিত। কথক কখনো বহুকাল পূর্বে একবার দেখা, বহুবার শোনা এমন ব্যক্তিচরিত্র সম্পর্কে, কখনো বহু সময় ধরে দেখা ব্যক্তিচরিত্র সম্পর্কে, কখনো বন্ধু-চরিত্র সম্পর্কে, কখনো আড্ডায় দেখা ব্যক্তিচরিত্র সম্পর্কে আবার কখনো কথক সামান্য সময়ের জন্য উপস্থিত থেকে ব্যক্তির নির্দিষ্ট নামে সম্পূর্ণ ঘটনাটি বিবৃত করেছেন। তাঁর রচিত একটি চরিত্রের সঙ্গে আরেকটি চরিত্রের কোনো মিল নেই।

প্রতিটি চরিত্রই স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বের দাবীদার। এসব চরিত্রের মধ্যে রয়েছে জীবনযুদ্ধে অপরাজিত ব্যক্তির কথারূপ, নিম্নবিত্ত মানুষের জীবন সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীনতা, আবার প্রত্যয়বাদী দৃঢ় ব্যক্তিত্বের প্রতীকরূপে উপস্থাপন, বাহ্যিক পরিচয়ের অন্তরালে অভ্যন্তরীণ পরিচয়ের স্বরূপ উদ্ঘাটন– আরো অসংখ্য বিষয় নিয়ে তাঁর চরিত্রপ্রধান গল্পগুলো নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল। বনফুল এসব ব্যক্তিচরিত্রের মাধ্যমে সামাজিক বিচ্যুতি ও অসঙ্গতির উপর তর্জনীসংকেত করেছেন।

মানুষের অবচেতন মনের কার্যকলাপ সজ্ঞানে মানুষ দূরে সরিয়ে রাখে, অনুকূল পরিবেশে সেগুলি স্বপ্নের আকারে আবির্ভূত হয়ে ব্যক্তিচরিত্রকে ভিন্ন পথে পরিচালিত করে। অর্থাৎ অবচেতন সত্তা থেকে উঠে আসা মানব মনের বিচিত্র ক্রিয়াশীলরূপ বনফুলের মনস্তত্বমূলক গল্পের বিষয়বস্তু হয়েছে। আমরা “ভিতর ও বাহির’, ‘ঐরাবত’, ‘যুগল স্বপ্ন’, ‘অনির্বচনীয়’, ‘ছেলে মেয়ে’ গল্পগুলো এ পর্যারের আলোচনা করেছি।

বনফুলের রচনাকর্ম বিশেষ কোনো প্রকরণে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর রচনাকর্ম বিচিত্রপথে অগ্রসর হয়েছে। তিনি মানুষের জীবন সম্পর্কে যে বহুমুখী অভিজ্ঞতা লাভ করেছেন তা সাহিত্যের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করেছেন–কখনো পরিহাসের ছলে, কখনো ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের মাধ্যমে, কখনো কৌতুকের মাধ্যমে নিরাসক্ত আবেগহীন ভঙ্গিমায়।

ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের অন্তরালে মানুষের অসহায়তার প্রতি বনফুলের মমত্ববোধ প্রচ্ছন্নভাবে রসব্যঞ্জনার সৃষ্টি করেছে। তিনি গল্পে মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, স্বভাবের বৈষম্য, স্ববিরোধ ভণ্ডামি ও সমাজের অসঙ্গতিকে তীক্ষ্ণ বুদ্ধিদীপ্ত দৃষ্টির সাহায্যে তুলে ধরেছেন।

বনফুল এতটাই স্বচ্ছভাবে সমাজকে তুলে ধরেছেন যে তাঁর এক একটি ছোটগল্প সমাজের এক একটি দর্পণ। সাহিত্যসাধনার মধ্য দিয়ে বনফুল সমাজসংস্কার চেয়েছেন। তাঁর সমাজ চেতনার এই নিদর্শন রয়েছে তাঁর অনেক মূল্যবান প্রবন্ধে। তাঁর ‘বাংলার অতীত ও ভবিষ্যৎ’ প্রবন্ধটি বাঙালি জাতির সামাজিক উত্থান-পতনের বিশ্লেষণ।

এখানে তিনি স্বাধীনতা-উত্তর বাঙালির দুঃখদুর্দশায় ব্যথিত হয়ে ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাখ্যা করে বলেছেন যে, স্বাধীন রাষ্ট্রে বাঙালির বিরুদ্ধে অন্যায় অবিচার অত্যাচারের সীমা লঙ্ঘন করলে প্রয়োজনবোধে এই সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে হবে। সুধীজনকে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হবার জন্য আহ্বান জানিয়ে বলেছেন যে, আমরা যেন মনুষ্যত্বের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হই। তাঁর ‘সম্বর্ধনার উত্তর প্রবন্ধটিও একই ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ, প্রবন্ধটিতে তিনি বলেছেন, ‘মনুষ্যত্ত্বের যে প্রেরণা রবীন্দ্রনাথকে একদা উদ্বুদ্ধ করিয়াছিল সে বিষয়ে আমাদের সচেতন হওয়া উচিত।

নপুংসক ভীরু মনোবৃত্তি আজ বাঙালি জাতিকে বাকসর্বস্ব হাস্যাস্পদ বিদুষকে পরিণত করিয়াছে। স্বাধীনতার পরে আমাদের মনুষ্যত্ব দেওলিয়া হইয়া গিয়াছে। এ অবস্থার অবসান ঘটাইতে গেলে রবীন্দ্রনাথের মনুষ্যত্বের আদর্শ সম্মুখে রাখিয়া আমাদের এখন আত্মানুসন্ধানের একান্ত প্রয়োজন।’

‘ভাষণ’ প্রবন্ধটিতেও তাঁর সমাজ চেতনার অনেক মূল্যবান কথা রয়েছে। তাঁর গল্পেও সমাজ একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে। চিকিৎসাসূত্রে বনফুল সমাজের সর্বশ্রেণীর মানুষের সংস্পর্শে আসার সুযোগ লাভ করেছেন সেই সঙ্গে দেখেছেন ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান, মানুষের অর্থলোলুপতা, দরিদ্রের উপর ধনীর শোষণ বঞ্চনার ছবি। তাঁর এই অভিজ্ঞতাকে অবলম্বন করে যেসব গল্প রচিত হয়েছে সেসব গল্পগুলোই সমাজ- সমস্যামূলক গল্প।

 

বনফুলের ছোটগল্প (১৯৩৬-১৯৪৭): বিষয় ও রচনারীতি

 

ছেলেবেলাতেই পশুপাখি ও ইতর প্রাণীর প্রতি বনফুলের একটা আকর্ষণ ও কৌতূহলবোধ কাজ করত। পরিণত বয়সেও তাঁর এই পশুপ্রীতি উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। তাঁর উপন্যাসে, নাটকে, ছোটগল্পে ও রম্যরচনায় এই প্রীতির ছাপ স্পষ্ট। শুধু তাই নয় বাল্যকালে অনেক প্রজাপতি ও কীটপতঙ্গের পিছনেও ঘুরেছেন তিনি।

তাঁর গল্পে এদের অনিবার্যতার কারণে আমরা পঞ্চপ্রীতিমূলক গল্পের পর্ববিভাগ করেছি। এরপর রূপক ও প্রতীকধর্মী গল্পের আলোচনা করেছি কিন্তু আলোচিত গল্পের বাইরেও পরবর্তীকালে বনফুলের রচিত অনেক রূপক ও প্রতীকধর্মী গল্প রয়েছে। যেমন, ‘পাখি’, ‘রূপান্তর’, ‘অতি ছোট গল্প’। সর্বশেষে আমরা বনফুলের অতিপ্রাকৃত পরিবেশের গল্পের আলোচনা করেছি। ‘অদৃশ্যলোকে’ গল্পগ্রন্থের প্রায় সব গল্পই এই পর্যায়ে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

বনফুল তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘পশ্চাৎটে’ তাঁর অদৃশ্যলোকে বিশ্বাসস্থাপনের অনেক ঘটনা বিবৃত করেছেন। সেসব ঘটনার একটি ঘটনা হলো–হঠাৎ একদিন পাগড়িধারী বিশালকায় সাধু বনফুলের ল্যাবরেটরিতে এসে বললেন- ‘আপনার ভাগ্য গণনা করতে চাই?’ এ বিষয়ে বনফুলের কৌতূহল থাকায় তিনি রাজি হয়ে গেলেন। প্রথমে জ্যেতিষী তাঁকে একটি ফুলের নাম করতে বললেন।

বনফুলের হাত দেখলেন, তাঁর নাকের কাছে হাত রেখে দেখলেন কোন নাসারন্ধ্র দিয়ে বেশি বাতাস বের হচ্ছে, অনেকক্ষণ ধরে একটি কাগজে অঙ্ক কষে শেষে বললেন– “ঠিক এক বৎসরের মধ্যে আপনার একটি বাড়ী হইবে। বাড়ীর সহিত কিছু জমিও থাকিবে।’ বনফুল জ্যেতিষীর এই ভবিষ্যদ্বাণী শুনে বললেন- আপনি যাহা বলিলেন তাহা অসম্ভব কারণ বাড়ী কিনিবার মতো টাকা আমার নাই।

এক বৎসরের মধ্যে হইবে এ আশাও নাই।’ জ্যোতিষী দক্ষিণা নিলেন না, যাবার সময় বলে গেলেন- ‘আপনি যেদিন গৃহ প্রবেশ করিবেন সেদিন আসিব এবং সেইদিন টাকা লইব।’ সত্যি সত্যি এক বৎসরের মধ্যে বনফুলের একটি বাড়ি হলো। বনফুল যেদিন গৃহে প্রবেশ করতে যাচ্ছেন তার আগের দিন আবার জ্যোতিষী বনফুলের ল্যাবরেটরিতে এসে হাজির হলেন।

তাঁকে অভ্যর্থনা করে বনফুল বললেন- ‘আপনার ভবিষ্যদ্বাণী ফলিয়াছে। কি প্রণামী দিব, বলুন?’ জ্যোতিষী পরের দিন বনফুলের বাড়িটি দেখে বললেন- ‘দক্ষিণ দুয়ার যমের, সুতরাং এ গেট বন্ধ করিয়া বাড়ীর পশ্চিম দিকে গেট করিতে হইবে।’ তারপর বললেন, এ বাড়িতে একটি ভদ্র জিন আছে তাকে বিতাড়িত করতে হবে তা নাহলে এ বাড়িতে টিকে থাকা দায় হবে। তিনি জিন তাড়ানোর জন্য এক বাটি দুধ ও একটি আ-ছোলা নারিকেল কিনে রাখতে বললেন, পরের দিন জ্যোতিষী এসে সব ব্যবস্থা করবেন।

‘পরদিন খুব ভোরে আসিয়া তিনি ছাদের চিলেকোঠায় গিয়া বসিলেন। এক জামবাটি দুধের ভিতর সেই গোটা নারিকেলটি বসানো হইল। তিনি চক্ষু বুজিয়া ধ্যান করিতে লাগিলেন তাহার পর আমাকে ও আমার স্ত্রীকে বলিলেন, আপনারাও আমার পাশে বসিয়া মনে মনে সেই ‘জিন’কে অনুরোধ করুন, তিনি যেন এ বাড়ী ছাড়িয়া অন্যত্র চালিয়া যান। এবং তিনি যখন চলিয়া যাইবেন, তখন যেন এমন কিছু করিয়া যান যাহাতে আমরা বুঝিতে পারি তিনি চলিয়া গেলেন ।

আমরা তিনজনই পাশাপাশি চোখ বুজিয়া মনে মনে প্রার্থনা করিতে লাগিলাম। একটু পরেই অলৌকিক ঘটনাটি ঘটিল। জামবাটির দুধটা টগবগ করিয়া ফুটিয়া উঠিল। নারিকেলটি মাটিতে পড়িয়া গেল। সত্যই ব্যাপারটি বিস্ময়কর। ঠাণ্ডা দুধ যে অমন টগবগ করিয়া ফুটিতে পারে, তাহা সত্যই কল্পনাতীত ছিল। জ্যোতিষী বলিলেন, ‘জিন চলিয়া গেলেন। এবার আপনারা স্বাচ্ছন্দে এখানে বসবাস করুন।’ বনফুল জ্যোতিষীকে পঁচিশ টাকা দিয়ে প্রণাম করলেন।’

আমরা ১৯৩৬-১৯৪৭ সালের মোট ছয়টি গল্পগ্রন্থের বিষয় ও রচনারীতির পাশাপাশি তাঁর প্রথম ছয়টি গ্রন্থকে প্রথম পর্যায়ের রচনা বলে উল্লেখ করেছি। কিন্তু আলোচনান্তে আমরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি যে, প্রথম ছয়টি গ্রন্থ প্রথম দিকের রচনা, তবে প্রথম পর্যায়ের রচনা নয়। কিছু দৃষ্টান্তের সাহায্যে আমরা ব্যাপারটি যুক্তিসংগতভাবে ব্যাখ্যা করছি। যেমন,

বনফুলের শেষদিকের গল্পগ্রন্থ মণিহারী (১৯৬৩), ছিটমহল (১৯৬৫), ও এক ঝাঁক খঞ্জন (১৯৬৭), গ্রন্থগুলোর সঙ্গে বনফুলের গল্প (১৯৩৬), বনফুলের আরও গল্প (১৯৩৮), ও অদৃশ্যলোকে (১৯৪৬) গল্পগ্রন্থগুলোর বিষয় ও রচনারীতি সাযুজা লক্ষ করা যায়। ছিটমহল গ্রন্থের ‘বাবা’, ‘পুনর্মিলন’, ‘মুণ্ড সমস্যা’, ‘ঠাকুমা’, ‘মনু’, ‘বৃত্ত-চ্যুত’ ‘ঢেউ’, মণিহারী গল্পগ্রন্থের ‘পুচ্ছা’, ‘হাস’ এবং দূরবীন (১৯৬২) গ্রন্থের ‘আইনের বাইরে’, ‘গিরিবালা’, প্রভৃতি গল্পগুলোকে অদৃশ্যলোকে গ্রন্থের গল্প বলে সহজেই চালিয়ে দেয়া যায়।

আবার ছিটমহল গ্রন্থের ‘নমো যন্ত্র’ ও ‘সুনন্দা’ গল্পদুটির সঙ্গে বনফুলের আরও গল্পগ্রন্থের ‘বাস্তব ও স্বপ্ন’ গল্পটির আঙ্গিকের সঙ্গে সাদৃশ্য রয়েছে। যেমন, ‘সুনন্দা গল্পে’ ‘চন্দ্রকান্ত ঘোষ হু হু করিয়া কাঁদিয়া ফেলিলেন। তাহার পর আগাইয়া আসিয়া নাটকীয় ভঙ্গীতে সুনন্দার পা দুটি জড়াইয়া ধরিয়া বলিতে লাগিলেন, “ আমি অসহায় আমাকে মাপ করুন, এবারকার মতো মাপ করুন- ” সুনন্দা তাহাকে মাপ করিল কিনা তাহা জানা গেল না, কারণ প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ছারপোকার কামড়ে সুনন্দার ঘুমটা ভাঙ্গিয়া গেল। বীভৎস জীবনটা হঠাৎ প্রতিভাত হইয়া উঠিল তাহার চোখের সামনে। সেই দুর্গন্ধ বিছানা, ময়লা দেওয়াল, আশেপাশে তাহার নগ্ন অর্ধনগ্ন ভাইবোনদের ঘুমন্ত চেহারা, রাশের ড্রেণের ভ্যাপসা গন্ধ। মায়ের কন্ঠস্বর শোনা গেল ।

“সুনি ওঠ ওঠ। উনুনে তাড়াতাড়ি আঁচ দে। আজ সোমবার তোর বাবার আপিসের ভাত দিতে হবে না ? মনে পড়িল কয়েক দিন আগে চন্দ্রকান্তি ঘোষ একদল লোক লইয়া তাহাকে দেখিতে আসিয়াছিল। মনে পড়িল বাবা তাহাদের কি খোসমোদটাই না করিতেছিলেন। মনে পড়িল প্রায় দশ টাকার জল খাবার আনানো হইয়াছিল। চন্দ্রকান্ত কিন্তু তাহাকে পছন্দ করে নাই। সব মনে পড়িয়া গেল।

‘বাস্তব ও স্বপ্ন’ গল্পে

“কল্পনাপ্রবণ পলাশকান্তির যখন নিদ্রাভঙ্গ হইল তখন বেলা পাঁচটা। নিদ্রাভঙ্গ হইলেও স্বপ্নভঙ্গ হইতে চায় না । অত্যন্ত দীর্ঘ স্বপ্ন দেখিয়াছে সে । তাহার মনে হইতে লাগিল কুপিতা হেমাঙ্গিনী আশে পাশে কোথাও ঘুরিতেছে । কয়েক সেকেণ্ড পরেই সে সম্পূর্ণরূপে জাগরিত হইয়া পরিপূর্ণরূপে উপলব্ধি করিল যে সে তাহার সেই পুরাতন মেসের সনাতন জারুল কাঠের চৌকিতেই শুইয়া আছে। সমস্তটাই স্বপ্ন ! আঃ বাঁচা গেল।

সে তড়াক করিয়া লাফাইয়া উঠিয়া পড়িল, ‘শেলফ’ হইতে হেমাঙ্গিনীর ‘ফটো’খানা লইয়া আর একবার ভাল করিয়া দেখিল। দেখিতে মন্দ নয় মেয়েটি। তবুও খপ্পরে আর সে পা দিবে না। ‘

মণিহারী, ছিটমহল ও এক ঝাঁক খঞ্জন গ্রন্থগুলোর গল্পেও প্রথম দিকের গল্পের মতো ভূমিকাযুক্ত গল্প রয়েছে। যেমন, মণিহারীর বিরজুর মা’ গল্পে এক ঝাঁক খঞ্জনের ‘সামান্য কিছু’ গল্পে, ছিটমহলের ‘পাগলির হাসি’ গল্পে।

 

বনফুলের ছোটগল্প (১৯৩৬-১৯৪৭): বিষয় ও রচনারীতি

 

‘পাগলির হাসি’ গল্পে

“আমাদের মন জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে অনেক জিনিস সঞ্চয় করিয়া রাখে। সর্বদাই সে এ কাজ করিতেছে। তাহার এই সংগ্রহশালার নাম স্মৃতি-ভাণ্ডার। এই ভাণ্ডারে সংগ্রহের পদ্ধতিটি কিন্তু অদ্ভুত। তাহা কোন সামাজিক বা সাংসারিক নিয়ম মানিয়া চলে না। সেখানে ধনীর পাশে দরিদ্র বা মহারাজের পাশে ভিখারীর ছবি মোটেই বেমানান নয়। হাসির পাশে অশ্রু, সবলের পাশে দুর্বল, গম্ভীরের পাশে অগম্ভীরের সমাবেশ সেখানে দুর্লভ নয়।

সকলের মনের মধ্যেই এই বিচিত্র ‘মিউজিয়াম’ আছে। আমরা কিন্তু সর্বদা এ সম্বন্ধে সচেতন থাকি না। প্রায়ই দেখা যায় একটা অন্যমনস্কতার পরদা এই সংগ্রহশালার ধারে ঝোলানো আছে। মাঝে মাঝে কিন্তু পরদাটা কোনও প্রবল আবেগের হাওয়ায় উড়িয়া যায়, তখন হঠাৎ আমরা এই বিচিত্র সংগ্রহের দিকে চাহিয়া অবাক হইয়া যাই। হয়তো একটা ছবি, হয়তো একাটা অজানা ফুলের হঠাৎ ভাসিয়া-আসা সৌরভ আমাদের আকুল করিয়া তোলে।

‘বিরজুর মা’ গল্পে

“মণিহারী গ্রামের বিরজুর মাকে মণিহারী গ্রামবাসীদের মনে আছে কিনা জানি না, কেননা, মানুষের স্মৃতি বড় ক্ষণজীবী। স্বার্থের সম্পর্ক যাহার সহিত যতক্ষণ থাকে, মানুষ তাহাকে ততক্ষণ মনে রাখে। স্বার্থের সম্পর্ক ফুরাইলেই মানুষ ভুলিয়া যায়, ইহাই নিয়ম। ‘৪১

বিন্দুবিসর্গ গন্থের ‘ক খ গ’ গল্প, ছিটমহল গ্রন্থের ‘মহামানব কেনারাম ও ক’ গল্প, এবং এক ঝাঁক খঞ্জন গছের ‘বর্ণমালা’ প্রভৃতি গল্পের চরিত্রায়ণ কৌশলে বর্ণমালার ব্যবহার রয়েছে।

ভাষারীতির ক্ষেত্রে বলা যায় প্রথম দিকের গল্পের ভাষারীতিই শেষদিকের গল্পেও বজায় রয়েছে। অর্থাৎ সাধুরীতি, চলিত রীতি, এবং সাধুচলিতের মিশ্রিত রীতি। তাঁর প্রথম দিকের উপমানের ব্যবহার শেষদিকের গল্পেও রয়েছে। যেমন, বনফুলের আরও গল্প গ্রন্থের ‘অলকানন্দা’ গল্পে ‘গরম দুধে পাউরুটি পড়িলে তাহার যেমন অবস্থা হয়–দিগিন্দ্রের অবস্থা তখন অনেকটা তাই–অর্থাৎ বাহ্যজ্ঞানশূন্য। ২ ছিটমহল গ্রন্থের ‘মহামানব কেনারাম ও ক; গল্পে–এ শুনে বিগলিত কেনারাম কুণ্ডুর মুখভাব মাখন মাখানো পাউরুটির মতো হয়ে গেল।’ ‘সুনন্দা’ গল্পে–তাঁহার চক্ষু আনত হইল, মুখখানি সিক্ত পাউরুটির মতো দেখাইতে লাগিল।

তাছাড়াও বনফুলের আলোচিত প্রথম ছয়টি গল্পগ্রন্থে তাঁর চিন্তা-চেতনা অর্থাৎ মানসগঠনের যে পরিপক্বতা রয়েছে। তা থেকে স্পষ্টই প্রতীয়মান হয় যে, আলোচিত ছয়টি গল্পগ্রন্থ প্রথম দিকের রচনা, প্রথম পর্যায়ের রচনা নয়। বনফুল বাংলা সাহিত্যে বিশেষ করে ছোটগল্পের রূপকলার জন্য সর্বাধিক পরিচিত। আমরা আলোচিত ছয়টি গ্রন্থের আঙ্গিক সম্পর্কে যে ধারণা দিয়েছি সেটি তাঁর পরবর্তীকালের একাধিক গ্রন্থের বহু গল্পে লক্ষ্য করা যায়– বিষয়টি আমরা যতটা সম্ভব সীমিত পরিসরে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। কিন্তু তার বাইরেও তাঁর ভিন্ন আঙ্গিকের গল্প রয়েছে।

প্রকৃতপক্ষে বনফুল ছিলেন একজন সুস্থ জীবনশিল্পী। বনফুলের গল্পগুলো যেন মানুষের চরিত্রের শত দিকের শত অভিজ্ঞতালব্ধ ফল। মানুষের জীবনের সব খুঁটিনাটি যা মুহূর্তের মধ্যে বুদবুদের মতো মিলিয়ে যায় সেসব মুহূর্তকে তুলে ধরে তার মধ্যে সমগ্রতা দান করেন। তাঁর সৃজনীপ্রবাহ কখনো সীমাবদ্ধ থাকেনি গতানুগতিকতায় বিশেষত গল্পরচনার ক্ষেত্রে তাঁর পরীক্ষা-নিরীক্ষার আগ্রহ সততই এক চরম দুঃসাহসের প্রমাণ দিয়েছে। অর্থাৎ নিজের চেতনায় ধরা চলমান জীবনের অজস্ররূপ প্রতিফলিত করেছেন নিজস্ব সৃষ্টির অবয়বে।

সমালোচকের মতে-“জীবনের একটুখানি অংশমাত্র ছোটগল্পে দেখানো হয়, বনফুল এ সত্য মানেন। তাঁর বিষয়বস্তুকে তিনি নিজস্ব দৃষ্টিতে দেখেন। তাই তাঁর গল্পে নিজস্বতার ছাপ গভীরভাবে মুদ্রিত।” অরুণকুমার মুখোপাধ্যায়- ‘বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়’, কালের প্রতিমা(১৩৮১), পৃ-১০৮ ।

আলোচনান্তে আমরা বলতে পারি যে, বাংলা সাহিত্যে ছোটগল্পের বিষয়বস্তু ও রীতির ক্ষেত্রে বনফুল এক ব্যতিক্রমী ধারার স্রষ্টা। জীবন নির্বাচন ও রূপায়ণের ক্ষেত্রে তিনি পূর্ববর্তী কিংবা সমকালীন সকল গল্পকার থেকে স্বতন্ত্র মানবচরিত্রের। অভিজ্ঞতা তাঁর যেমন ছিল ব্যাপক ও গভীর তেমনি তাঁর গল্পের বিষয়ও হয়েছে ব্যাপক ও বিস্তৃত। তাঁর গল্প একদিকে যেমন চরিত্রপ্রধান, মনস্তত্বমূলক, ব্যঙ্গ ও হাস্যরস প্রধান অপরদিকে তেমনি রূপক ও প্রতীকধর্মী, সমাজ- সমস্যামূলক, পশুপ্রীতিমূলক। তাঁর এইসব গল্পে উঠে এসেছে কলোনিশাসিত সমাজজীবন এবং তাঁর পাত্র-পাত্রীরা হৃদয়ধর্ম অপেক্ষা জীবনধর্ম, যুক্তি ও বুদ্ধি দ্বারা পরিচালিত।

মানবজীবনের যেদিকগুলো সাধারণত শিল্পী সাহিত্যিকদের কাছে ধরা পড়ে না; ত-ই বনফুলের গল্পে দেখা দিয়েছে। গল্পের ক্ষেত্রে অল্পকথন ও অতিকথন-বর্জন তাঁর বৈশিষ্ট্য এবং চরিত্রের কোনো বৈশিষ্ট্য কিংবা জীবনের একটি প্রদীপ্ত মুহূর্তকেই তিনি গল্পের বিষয় করে নিয়েছেন। তাঁর বর্ণনার অভিনবত্ব আছে। কত সীমিত আয়তনে কত বেশি কথা বলা যায় তারই এক চরম পরীক্ষা করেছেন বনফুল তাঁর বহু গল্পে শিশিরকুমার দাশ যাকে চূর্ণক গল্প বলে অভিহিত করেছেন, বাংলা সাহিত্যে বনফুল তার প্রবর্তন করেন। সেই সঙ্গে সমালোচককথিত আখ্যানক গল্পও লিখেছেন বিস্তর।

Leave a Comment